স্বস্তিতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভ
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১২:৩৯
॥ উসমান ফারুক॥
অর্থ পাচারসহ হাজারো উপায়ে নাকাল করে রেখে যাওয়া অর্থনীতি মাত্র ছয় মাসেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা ও সঠিক নেতৃত্বে। ব্যাংকিং চ্যানেল ও হুন্ডিতে অর্থ পাচার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বেড়েছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এক বছরে নতুন করে অতিরিক্ত ছয় বিলিয়ন ডলার আসছে চলতি অর্থবছরে। এর সঙ্গে রপ্তানি খাত থেকেও অতিরিক্ত ৫-৬ বিলিয়ন ডলার আসবে বলে তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একদিকে চুরি বন্ধ, অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে চলে এসেছে। ফলে সবচেয়ে দুর্ভোগের জন্য গত তিন বছর থেকে দায়ী ঘাটতিতে থাকা বৈদেশিক বাণিজ্যের চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাব ইতিবাচক হয়েছে। অর্থনীতির এ কয়টি খাত শক্তিশালী অবস্থানে চলে আসায় ডলারের বিপরীতে মান ধরে রাখতে পারছে টাকা। ডলারের বিনিময় হার কত হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দরকষাকষি করার সক্ষমতায় পৌছে গেছে বাংলাদেশ।
এতদিন বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোই ডলারের দর ঠিক করে দিত। নীতি বাস্তবায়নে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরায় চার বছর পর মূল্যস্ফীতির মতো পাগলা ঘোড়ায় লাগাম দিতে পেরেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে যেনতেন উপায়ে ঋণ দেয়া বন্ধ হওয়ায় তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এতে ব্যাংক ঋণের সুদহারও কমতে শুরু করেছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারির শেষের দিক বা মার্চের প্রথম দিকেই কমে যাবে ব্যাংক খাতে সব ধরনের ঋণের সুদহার। এখন প্রয়োজন আর্থিক খাত ধ্বংসে দায়ী দুর্নীতিবাজদের তালিকা করে বিচারের আওতায় আনা। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাবেক প্রধানদের বিচারের আওতায় না আনলে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করতে পারে তারা।
ডলার নিয়ে চার দেশকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ
ডলারের দর কত হবে, তা আগে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও এক্সচেঞ্জ হাউসের প্রাধান্য দেখা যেত বাংলাদেশে। করোনা মহামারির পর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ সরকারের ছল-চাতুরী ও অর্থ পাচারের কারণে সবচেয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি। তখনই রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন থেকে নেমে আসে নিট ১৫ বিলিয়ন ডলারে। এর চাপে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকা মান হারাতে শুরু করলে তিন বছরের ব্যবধানে ৮৪ টাকা থেকে ১২২ টাকায় নেমে আসে। মাঝখানে ১২৫-১২৬ টাকায় চলে গিয়েছিল। টাকার মান সবচেয়ে বেশি কমেছে গত বছর।
ডলার সংকটের সুযোগ নিয়ে টাকার মান নির্ধারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো চাপে রাখত বাংলাদেশকে। তাদের দেওয়া দর অনুযায়ী মূল্য না দিলে ডলার না দেওয়ার হুমকি ছিল। বাধ্য হয়ে টাকার মান দ্রুত অবনমন করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
সেই অবস্থান থেকে উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের আয় ও রপ্তানি খাত। সাধারণত দেশে প্রতি বছর ২০-২২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। সর্বশেষ অর্থবছরে এসেছে ২৩ বিলিয়ন বা দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত সাত মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে বা বেশি এসেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। এতে বছর শেষে অতিরিক্ত ৬ বিলিয়ন ডলার আসতে পারে প্রবাসী আয়।
অর্থনীতির স্বস্তির জায়গা রপ্তানি খাতেও প্রবৃদ্ধি আছে ১১ শতাংশে। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে ২৩ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এবার অতিরিক্ত ৫-৬ বিলিয়ন ডলার আসবে রপ্তানি থেকে। এতেই ধীরে ধীরে উন্নতি হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ফলে খেজুর, ছোলা, চিনি, তেল ও ডালসহ রমজান মাসের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য আমদানিতে কোনো সমস্যা হয়নি বাংলাদেশের।
সাধারণত রোজা শুরু হওয়ার তিন মাস আগে থেকেই পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। তখনই ডলারের অতিরিক্ত জোগানের প্রয়োজন হয়। আগে-ভাগে আমদানি করলে যথাসময়ে অর্থাৎ রোজা শুরু হওয়ার আগের মাসেই বাজারে চলে আসে সব পণ্য। এবার মার্চের শুরু থেকেই হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। ফলে ভোগ্যপণ্য নিয়ে কোনো সমস্যা দেখবে না এবার বাংলাদেশের মানুষ। বাড়তি এ আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায়নি বাংলাদেশ।
রিজার্ভ ভেঙেও ডলার দিতে হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সার্বিকভাবে আমদানি দায় গত ছয় মাসে সাড়ে তিন শতাংশ বেশি হয়েছে গত বছরের তুলনায়। অথচ ডলার সংকটের কারণে গত বছরের জুনেও নেতিবাচক ছিল আমদানি। প্রয়োজনীয় ডলার না থাকায় গত অর্থবছরটিতে ১১ শতাংশ কম এসেছিল আমদানি পণ্য। আমদানির সেই নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। আমদানি দায় মেটানোর পরও চলতি হিসাব ও আর্থিক হিসাবে কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি। বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় এ উন্নতির কারণে ডলার দর নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারছে বাংলাদেশ।
ডলারের বিনিময় হার কীভাবে নির্ধারণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক- এমন প্রশ্নে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সোমবার মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে বিনিময় হার একটি স্থিতিশীল জায়গায় রাখতে পেরেছি। ডলারের বিনিময় হার এখন একটি ব্যান্ডের মধ্যে রেখে লেনদেন করতে দেয়া হচ্ছে। একেবারে খোলা ছাড়া যাবে না, কারণ আমাদের বাণিজ্য ভারসাম্য অনেক ভালো অবস্থানে আছে। আমরা কেন এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের দেওয়া দর অনুযায়ী ডলার কিনব? আমাদের সেই অবস্থা নেই। আমরা এখন বারগেইন করে কিনব।’
বিদেশি চারটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান কারসাজি ও জোটবদ্ধ হয়ে ডলারের দর বাড়ানোর চেষ্টা করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘একটি বড় দেশের দূতাবাস পর্যন্ত এসেছে তাদের দেশের এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া দর অনুযায়ী ডলার কেনার তদবির করতে। আমরা বলে দিয়েছি, আমরা ক্রেতা, দর আমরা দেব। এই দরে যার কাছে ডলার পাবো, তার কাছ থেকেই কিনব। তাদের বলেন, ডলারের দর বাজার অনুযায়ী করতে।’
গভর্নর বলেন, আমরা জানি, ডলারের দর কতটুকু হতে পারে। আমাদের রিজার্ভ তো ভালো অবস্থানে আছে। আইএমএফের ঋণের চতুর্থ কিস্তি এখনো না পেলেও রিজার্ভ স্বস্তিতে আছে। আমরা কেন রেট বাড়াবো, টাকার মান কমানোর দরকার নেই। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডলারের দাম বাড়াতে চায়, আমরা তা হতে দেব না। যখন প্রয়োজন হবে, তখনই আমরা দর বিবেচনা করব।
কমতে শুরু করেছে ব্যাংক ঋণে সুদহার
গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগতে থাকা সাধারণ মানুষ এবার সুখবর পেল। দুই অঙ্ক থেকে এক অঙ্কে নেমেছে মূল্যস্ফীতির হার। বোরো ফসলের ধানে সোনালি হয়েছে মাঠ-প্রান্তর। সেই ফসল উঠলে মূল্যস্ফীতি আরো কমে আসবে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে বিনিময় হার গত দুই মাস ধরেই ডলারের বিপরীতে ১২২ টাকার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ।
ডলারের জোগান ঠিক থাকায় আগামীতেই টাকার মান ধরে রাখতে পারবে বাংলাদেশ। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়বে না। কমে যাবে মূল্যস্ফীতির হারও। এ দুই শক্তিতে জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি আরো কমে ৭-৮ শতাংশে নেমে আসবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অর্থনীতির এ জায়গা ঠিক করতে প্রবৃদ্ধির ফিরিস্তি থেকেও সরেছে সরকার। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোনোর ছক কষা হয়েছে।
সেই ধারণা নিয়ে চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমি আগেও বলেছি, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছর প্রবৃদ্ধির বছর হবে না। এটি হবে সামষ্টিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার বছর। আমি বড় প্রবৃদ্ধি হবে আশাও করি না, স্বপ্নও দেখি না। কারণ এটি সম্ভব নয়। এখন সামষ্টিক অর্থনীতিকে সচল করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনাই প্রথম উদ্দেশ্য। এরপর অন্যান্য বিষয়গুলো দেখা যাবে।
অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরায় ব্যাংক খাতে ছল-চাতুরী করে দেয়া ঋণের পরিমাণ শূন্যে নেমে এসেছে। ব্যাংক খাতে টাকা ফেরত আসতে শুরু করায় ইসলামী ব্যাংকসহ প্রায় সব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিতে উন্নতি হওয়ার তথ্য দিয়েছেন গভর্নর। এ কারণে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে। ইতোমধ্যে গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হার ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। আগামীতে ঋণের অঙ্ক বাড়লেও সুদহার বাড়বে না উল্টো কমে আসবে। উদ্যোক্তাদের খরচ কমে গেলে মূল্যস্ফীতি আরো কমবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার কমতে শুরু করেছে। এর অর্থ হচ্ছে ব্যাংকগুলোর কাছে যথেষ্ট তারল্য রয়েছে। সরকার প্রয়োজনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নেয় ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে। সম্প্রতি ৯১ দিন মেয়াদি বিল ও বন্ডের সুদহার ১১ শতাংশের ঘরে নেমেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ১২ শতাংশ থেকে নেমে পৌনে ১১ শতাংশ হয়েছে, আগে যা এর চেয়ে বেশি ছিল।
এর মানে হচ্ছে ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে সরকারকে ঋণ দিতে ৫০০ কোটি টাকা চেয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার প্রস্তাব দেয়। সেখান থেকে সবচেয়ে কম সুদের বিপরীতে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিল ও বন্ডের সুদহার কমে যাওয়ার গ্রাফ তৈরি করা হয়েছে। সেই হিসাবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সুদহার কমাতে বাধ্য হবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন তথ্য দেওয়ার পর প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। ব্যাংক ও ধনী বিনিয়োগকারীরা বেশি লাভের আশায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেছেন। গত ১১ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুই মাস পর ৫০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে। সেখানে ব্যাংক খাত অনেক দিন পর একাই ৮০ কোটি টাকার লেনদেন করেছে। সাধারণত ব্যাংক খাত ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকার লেনদেন করে।
অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে অর্থনীতি। সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ায় গত দুই মাস টাকার মান কমেনি। অথচ এ সময়ে ভারতীয় রুপির দাম কমে গেছে ডলারের বিপরীতে। এখন ডলার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাচার করা টাকা ফেরত আনার উদ্যোগের পাশাপাশি পাচারকারীদের সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সব ধরনের দুর্নীতি জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। একইসঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতির ভিত শক্ত করতে দুর্নীতিবাজদের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া না হলে নীতির সুফল টেকসই হবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরো নজর দিতে না পারলে দুষ্কৃতকারীরা ফের ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে পারে।