৭ নভেম্বর : অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং একটি বিপ্লব
৮ নভেম্বর ২০২৪ ১০:৫৬
॥ এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান ॥
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তুসেই ইতিহাসকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছে যে সত্যিকার ইতিহাসকেই মানুষ এখন ভুলে যেতে বসেছে। ঐতিহাসিক সত্য হলো এই যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে যে অস্থির অবস্থা বিরাজ করছিল, ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের ফলে সেটি আরো জটিল রূপ লাভ করে। যার ফলে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব এক প্রকারের অবধারিত হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান তারই শীর্ষ রাজনৈতিক সহযোগীদের সক্রিয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যম সারির কতিপয় অফিসার কর্তৃক সংঘটিত এক অভ্যুত্থানে নিহত হন। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবেরই দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী, আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষনেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদ। খন্দকার মোশতাক এবং অভ্যুত্থান সংঘটনকারী ঐ সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকেন।
সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড বা নির্দেশ সূত্র ফিরিয়ে আনার কথা বলে ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর রাতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান এবং নিজেই আবার চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করে নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তাদের নিরাপদে দেশত্যাগ করার সুযোগও করে দেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদে না রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং ৬ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করে নিজে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মহান স্বাধীনতার ঘোষক, জেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনীতে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। ফলে ৩ নভেম্বর তাকে পদচ্যুত করা ঘোষণা দিয়ে গৃহবন্দি করা হলে তার প্রতি বিরাজমান সহানুভূতি তীব্র ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। এমন মোক্ষম সময়েই জেনারেল জিয়ার প্রতি সেনাসদস্যদের মধ্যে বিরাজমান ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত তীব্র ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে এবং তার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে লে. কর্নেল (অব.) তাহের আরেকটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা তৈরি করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা সামরিক বাহিনীর মধ্যে লিফলেট ছড়িয়ে সাধারণ সিপাহিদের উত্তেজিত করে তোলে। এ ধরনের প্রচারণার মধ্যে সবচেয়ে অপরিণামদর্শী যে ক্ষতিকর দিকটি ছিল তা হলো, সামরিক বাহিনীকে কর্মকর্তাশূন্য করার মতো দিকভ্রষ্ট প্রচারণা। সে সময়ে জাসদের চালানো প্রচারণার উল্লেখযোগ্য স্লোগানগুলো ছিল, ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’, ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই, সুবেদারের ওপরে অফিসার নাই।’
জেনারেল জিয়ার প্রতি অনুগত ২য় ফিল্ড আর্টিলারির সেনা-কর্মকর্তা ও জওয়ানরা লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আগে থেকে আঁচ করতে পেরে পৃথকভাবে একটি আগাম পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ফেলেন অতি গোপনে। সেই অনুযায়ী ৬ নভেম্বর রাত অর্থাৎ ৭ নভেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে অর্থাৎ জাসদের অভ্যুত্থান শুরু হবার ১ ঘণ্টা আগেই ২য় ফিল্ড আর্টিলারির জওয়ানরা মেজর মহিউদ্দিন এবং সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়ে তাকে মুক্ত করেন এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে তাকে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসেন।
বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতারা যখন জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করে কর্নেল তাহেরের কাছে নিয়ে যাবার জন্য সেনানিবাসে আসে, তখন তারা খুবই হতাশ হয়। লে. কর্নেল (অব.) তাহের নিজেও হতাশ হয়ে পড়েন। তারপরও শেষ কৌশল হিসেবে তিনি জেনারেল জিয়াকে ২য় ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টার থেকে বের করে আনার জন্য নিজেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। কিন্তু পরিস্থিতি তৎক্ষণে পাল্টে গেছে। সাধারণ সিপাহিদের সাথে জনতাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছে এক অভূতপূর্ব বিপ্লবে। বিনা রক্তপাতে স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লবের মাধ্যমে পালাবদলের পরও; এমনকি বঙ্গভবন থেকে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল শাফায়াত জামিল পালিয়ে গেছেন, এটা জানার পরও হাসানুল হক ইনু এবং লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের নির্দেশে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা মরিয়া হয়ে ওঠে এবং সেনানিবাসের ভেতরে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
২য় ফিল্ড আর্টিলারিতে কর্নেল তাহের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে জেনারেল জিয়াকে বের করে আনার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার জন্য রেডিও স্টেশনে নেয়ার প্রস্তাব করেন। সেখানে উপস্থিত অন্যরা ২য় ফিল্ড আর্টিলারিতেই রেডিও কর্মকর্তাদের ডেকে এনে জেনারেল জিয়ার ভাষণ রেকর্ডিং করানোর পাল্টা প্রস্তাব দেন। এতে লে. কর্নেল (অব.) তাহের একাধারে আরো ক্ষিপ্ত ও হতাশ হন।
এমতাবস্থায় লে. কর্নেল (অব.) তাহের তার অনুগত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের যেকোনো মূল্যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলকে হত্যার নির্দেশ দেন। কর্নেল শাফায়াত জামিল এ নির্দেশের কথা তার ব্রিগেড মেজর হাফিজের কাছ থেকে জেনে তা বঙ্গভবনে অবস্থানরত খালেদ মোশাররফকে অবহিত করেন। সেনানিবাসে ফোন করে খালেদ মোশাররফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হন এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলকে বঙ্গভবনে অবস্থান করতে বলে কর্নেল হায়দার ও কর্নেল হুদাকে নিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। তারা প্রথমে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর প্রধান কর্নেল নুরুজ্জামানের বাসায় গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করেন। সেখান থেকে তারা খালেদ মোশাররফের এক আত্মীয়ের বাসায় যান এবং কয়েক জায়গায় ফোন করার পর শেরেবাংলা নগরে অবস্থানরত ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্নেল নওয়াজেশের সাথে কথা বলে নিরাপত্তার আশ্বাস পান এবং সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথিমধ্যে একটি দুর্ঘটনায় তাদের গাড়িটি নষ্ট হয়ে গেলে প্রথমে তারা মোহাম্মদপুরের ফাতেমা নার্সিং হোমে যান। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাম্পে পৌঁছান।
কর্নেল নওয়াজেশ আহমেদ টেলিফোনে জেনারেল জিয়াকে তার ক্যাম্পে খালেদ মোশাররফের উপস্থিতির বিষয়টি জানান। জেনারেল জিয়া ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নিরাপত্তার সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্নেল নওয়াজেশকে নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি কর্নেল নওয়াজেশের ক্যাম্পে অবস্থানরত রেজিমেন্টের আরেকজন সেনা কর্মকর্তা মেজর জলিলের সাথেও কথা বলে তাকে নির্দেশ দেনÑ যেন তিনি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ছাড়াও বাকি আরো দুজন সেনা কর্মকর্তাকে যথাযথ নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে কর্নেল নওয়াজেশকে সাহায্য করেন।
কর্নেল হুদার স্ত্রী নিলুফার হুদার বইয়ের তথ্যানুযায়ী, এ সময় ঢাকা সেনানিবাসের ২য় ফিল্ড আর্টিলারিতে অবস্থানরতদের কাছ থেকে জানা যায়, যখন জেনারেল জিয়া কর্নেল নওয়াজেশ এবং মেজর জলিলের সাথে কথা বলছিলেন তখন লে. কর্নেল (অব.) তাহের মিনিট ১৫ এর জন্য বাইরে চলে যান। সেখান থেকে ফিরে তিনি জেনারেল জিয়ার কাছে খালেদ মোশাররফের সঠিক অবস্থান জানতে চান এবং আবারও কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে যান।
সেনাপ্রধানের আদেশ ও নিশ্চয়তা পেয়ে কর্নেল নওয়াজেশ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং তার দুই সঙ্গীর জন্য নাশতার আয়োজন করেন। তাদের নাশতা পরিবেশনের কিছুক্ষণের মধ্যেই সামরিক বাহিনীর খাকি পোশাক পরিহিত লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের অনুগত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার বেশকিছু সদস্য গান পয়েন্টে সেই কক্ষে প্রবেশ করে এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফসহ তিন সেনা কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে কক্ষের বাইরে এনে গুলি করে হত্যা করে। খালেদ মোশাররফ ও তার দুই সঙ্গীকে হত্যার জন্য লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের নির্দেশ পৌঁছে দেয় এবং কর্নেল আসাদুজ্জামান নিজে ওই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আসলে একটি রক্তাক্ত ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়েছিল জাসদের মাধ্যমে, আর তারই সমান্তরালে আরেকটি রক্তপাতহীন সফল বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল সিপাহি-জনতার সম্মিলিত প্রয়াসে, যার নেতৃত্ব এসেছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় ফিল্ড আর্টিলারি থেকে। ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্ট থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মাঝে সবার অলক্ষ্যে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের মোড় ফেরানো এক অনন্যসাধারণ বিপ্লব, যা আমূল পাল্টে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।
লেখক : বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা