প্রতারণার জালে দেশ ছেয়ে গেছে, প্রতিরোধ জরুরি
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:১৮
আমাদের ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর আগে, কিন্তু ভালো শাসক না পাওয়ায় আমরা কাক্সিক্ষত দেশ গড়তে পারিনি। প্রতারণা আর প্রতারণায় দেশ ছেয়ে গেছে। ছোট ব্যবসায়ী থেকে বড় ব্যবসায়ী, ছোট আমলা থেকে বড় আমলা সর্বক্ষেত্রেই যেন প্রতারণার জালে আবদ্ধ।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতারণার শিকার একদল লোকের সাক্ষাৎকারে উঠে এলো এটিএন বাংলার সাংবাদিকের প্রতিবেদনে। উত্তরার একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল ক্রেতা ও বিক্রেতার সরাসরি সাক্ষাতে জানা গেল, কোম্পানির চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানসহ আরো কয়েকজন এই অনলাইন ব্যবসার মালিক। তারা ক্রেতাদের নিকট থেকে অগ্রিম চেক নিয়ে আর মালামাল সরবরাহ করেনি। আবার তারা মালামাল বিক্রেতাদের কাছে চেক দিয়ে মাল সরবরাহ নিয়ে চেক আর ভাঙানো যায়নি। একজন আদালতে চেকের মামলা করলে হাবিবুর রহমানকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পরের দিনই সে জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। বর্তমানে তাদের অফিস ও ফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে। এ এক আজব প্রতারণার জাল। আমাদের দেশের মানুষ এত সহজ-সরল যে, প্রতারকরা সহজেই প্রচার-প্রোপাগান্ডা করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালাচ্ছে। কোনো প্রতিকারের উপায় নেই।
প্রতারণা চলছে পবিত্র হজ ও ওমরাহর কাজেও। একদিকে বিমান ভাড়া সিন্ডিকেট করে টিকিটের দাম বাড়ানো, মক্কা-মদিনায় থাকার জায়গা মসজিদের কাছে বলে দূরদূরান্তে থাকার ব্যবস্থা করা। খাওয়ার মান ঠিক না রাখা সব ক্ষেত্রেই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের সাথে প্রতারণা করছে। কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা এই প্রতারকদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ব্যবসার সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
প্রতারণা করে আদম ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিম্নমানের চাকরি দিচ্ছে বিদেশে। যে টাকা দিয়ে তারা বিদেশে যাচ্ছে, তা ওঠাতে বহু সময় লাগছে। এখানে ভালো ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে চাকরি দেয়ার কথা বলে চাকরি না দেয়ায় না খেয়ে কোনোমতে বিদেশে জীবনযাপন করছে। বিদেশ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসও তাদের সহযোগিতা করতে পারছে না। এখানেও প্রতারণা করে পার পাচ্ছে।
প্রতারণার আরেক জাল সাংবাদিকতাকে কাজে লাগানো। আমরা জানি, সাংবাদিকরা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করবে। সংবাদপত্রের সাথে জড়িত হওয়ার সুবাদে অনেক ভালো সাংবাদিকদের সাথে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামগঞ্জে কোনো একটি পত্রিকার আইডি কার্ড সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে টাকা কামাই করছে অন্যায়ভাবে প্রতারণা করে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দলীয় প্রভাব-বলয় থেকে ভালো রোল প্লে করতে পারছে না। যখন যে দল ক্ষমতায় যায়, তাদের ভুলভ্রান্তি তুলে না ধরে শুধুই প্রশংসা আর ব্যক্তিবন্দনায় ব্যস্ত থাকে। স্বৈরাচার হাসিনা পালানোর কয়েকদিন পূর্বেই তার সামনে বড় বড় পত্রিকার সাংবাদিকরা হাসিনা-প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকার কথা বলেছে। তারাই আবার এখন মত বদলে বর্তমান সরকারের গুণগান গাইছে। আমরা সাধারণ মানুষ সবসময়ই প্রতারণার জালেই আটকে থাকছি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও স্বৈরাচারের দোসররা এখনো বসে থেকে ষড়যন্ত্র করে বেড়াচ্ছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টে উঠে এসেছে, কতজন শিক্ষক-কর্মচারী স্বৈরাচারের দোসর এখনো হাসিনার ফিরে আসার অপেক্ষায় আছে। কোনোদিনই সম্ভব হবে না এই জুলাই বিপ্লবের বাংলাদেশে, ইনশাআল্লাহ। সরকারের শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণাও দুর্নীতি আর প্রতারণার রাস্তা খুলে দেবে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।
চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কত যে প্রতারণা করা হচ্ছে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানদের সাথে। দেশে ও বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করে দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে অথবা ঠিকানা পরিবর্তন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা দেশের সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি। আসলেই আমরা সাধারণ মানুষ সহজ-সরল হওয়ায় প্রতারকরা সুযোগ নিচ্ছে। প্রতিরোধ করা জরুরি। অন্যদিকে প্রচার-প্রোপাগান্ডা করে এদের প্রতারণার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং সরকারের এজেন্টদের অবহিত করে তাদের জাল বিস্তার রোধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতারণার ফাঁদ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বেলায়ও ছড়িয়েছে। বিদেশে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয় নৌকায় মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে সমুদ্রপথে মানুষকে বিপদে ফেলে প্রতারণা করছে। অনেকে নৌকায় না খেয়ে বা নৌকাডুবিতে মারা যাচ্ছে। এ ঘটনা মোটেই কম নয়। এই প্রতারক চক্রের নরপশুরা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকা কামাই করছে। বড় প্রতারণার ঘটনা ঘটলো সরকারি দলের পক্ষ থেকে। মাসের পর মাস জুলাই সনদের বিষয় নিয়ে প্রায় ৩০টি দল দীর্ঘসময় ব্যয় করে প্রকাশ্য দিবালোকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জনতার সামনে সই-স্বাক্ষর করে এখন বলছে, নির্বাচন যাতে না পেছায়, তার জন্য বর্তমান সরকার জুলাই সনদ সই করেছিল; যা ছিল বড় প্রতারণা। জনগণ এ প্রতারণা মেনে নেবে না। আবার গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেয়ার জন্যই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক নেতা প্রকাশ্যে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গণভোটের রায় মেনে নিতে অস্বীকার করছে সরকারি দল। এটা কি প্রায় ৭০% জনগণের রায়ের প্রতি প্রতারণা নয়?
দেশের ছাত্র-জনতাকে ধোঁকা দেয়া কিন্তু সহজ হবে না। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। মিছিল-মিটিং শুরু হয়ে গেছে। সচিবালয় ঘেরাও পর্যন্ত চলছে। এটা কীসের আভাস। যে জনগণেল দাবির প্রেক্ষিতে স্বৈরাচার হাসিনা দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে, আবার সেই কায়দায় জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হাসিনরার পথে চললে তার পরিণতি কী হবে, তা সরকারকে আগেভাগেই বোঝা দরকার। প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের লোকেরা কী পরামর্শ দেয়, তা বুঝতে ভুল করলে স্বৈরাচারের ভূমিকায় চলে গেলে তাদের পথে এদেরও যেতে হবে। কোনো বিদেশি প্রভু বাঁচাতে পারবে না।
অসাধু ব্যবসায়ীরা সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনসহ এস আলম গ্রুপের সাথে যোগসাজশ করে ব্যাংকের লাখ লাখ কোটি টাকা ভুয়া কোম্পানি দেখিয়ে লোন নিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করে দেশের ক্ষতি করেছে আর প্রতারণার ফাঁদে ফেলে আমাদের দেশের অর্থনীতির ধস নামিয়েছে। অতিসত্বর তাদের বিচারের আওতায় এনে টাকা ফেরত আনা এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। উল্লেখ থাকে যে, বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যেই ৩৮ জনের নামে কোর্টে অভিযোগ দায়ের করেছে।
এদিকে আমেরিকার পতনের সুর ভেসে আসছে ইরান যুদ্ধে; অন্যদিকে সামরিক চুক্তি করল তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান মিলে। এর মধ্যে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আর তুরস্ক হলো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী; অন্যদিকে সৌদি আরব অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশাল সম্পদের মালিক এবং মক্কা ও মদিনার মসজিদের খাদেম। তাই মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা আর থাকছে না। এমনও হতে পারেÑ ইরানও এ জোটে যোগ দিতে পারে। তাহলে তো দুনিয়াটাই ইসলামী শাসনের আওতায় আসার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাই বাংলাদেশের সরকার ও জনতাকে কোনো প্রতারণার দিকে না গিয়ে আল্লাহর পথেই আমাদের মুক্তি।
মহান আল্লাহ আল কুরআনের সূরা জিলজালের শেষ আয়াতে বলেছেন, ‘তোমাদের অণুপরিমাণ ভালো কাজ এবং অণুপরিমাণ খারাপ কাজ খোলা কিতাবে লিখে রাখা হচ্ছে।’ তাই আমরা জনগণকে ফাঁকি দিতে পারবো, কিন্তু আল্লাহকে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতা কারোর নেই। এ কথা স্মরণ রেখেই আমাদের চলতে হবে এবং বলতে হবে। দুনিয়ায় কোনো স্বৈরশাসক বেশিদিন টিকতে পারেনি। যেমন নমরূদ মশার আঘাতে মারা গেছে। আবরাহাকে ছোট আবাবিল পাখির ছোট পাথরের আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে। এই তো সেদিন সিরিয়র নেতাকে দেশছাড়া হতে হয়েছে মাত্র ১২ দিনের গণঅভ্যুত্থানে। আবার নেপালের অবস্থা তেমনই। এখন তাদের বিপ্লবী সরকার প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ৩৬ বছরের তরুণ। তাই চারদিকে নজর রেখেই বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধীদলের ঐক্যের আলোকেই দেশ চালালে দলের লাভ, দেশের ছাত্র-জনতারও লাভ।
ইদানীং শুরু হয়েছে পূর্বের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দখলদারি। এটা মোটেই দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। আজকে আমাদের মেধা উৎপাদনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি দখল-বাণিজ্যে ছাত্রদের সময় যায়, তবে মেধাবিকাশের সময় কোথায় পাওয়া যাবে। যারা ভালো করে লেখাপড়া করবে, তারই দেশে ও বিদেশে ভালো চাকরি-বাকরি পাবে। উদ্যোক্তা হবে, দেশ চালাবে। দখলকারীদের কোনো স্থান থাকবে না।
প্রতারণার বড় একটি খাত আবাসিক খাত। এখানে জমি দেয়ার কথা বলে দেশ ও বিদেশে সাধারণ মানুষের টাকা এনে ঠিকমতো জমি বুঝিয়ে না দেয়া। ফ্লাট বুঝিয়ে না দেয়া যেন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবাসিক ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান রিহ্যাবের মধ্যে মতবিরোধ এ খাতে বড় আঘাত হেনেছে। ১৮ কোটি মানুষের আবাসন ব্যবস্থার বড় অংশ এই রিহ্যারের সদস্যরা সরবরাহ করে থাকে। এদের মধ্যে মতবিরোধের সমাধান না হলে কুচক্রীমহল সুযোগ নিয়ে জনতাকে প্রতারণায় ফেলতে পারে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে, অতিসত্বর ভালো ব্যবসায়ীরা ঐক্যের পথ বের করে রিহ্যাবের মতবিরোধ মিটিয়ে ফেলতে হবে। সবাই মিলেই আমরা দেশ গড়ার কাজে সময় দেব। কোনো মতভেদ নয়, ঐক্যেই হোক আমাদের চলার পথ।
হাসিনা ও তার দোসররা দীর্ঘদিন দেশের মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে বিচার বিভাগ, আমলা, সাংবাদিক, পুলিশ, ব্যবসায়ীসহ তাদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছিল। বিশেষ করে কুইকরেন্টাল বিদ্যুতের নামে বিদ্যুৎ না দিয়েই ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে জনগণকে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নিয়েছিল। স্বৈরাচার হাসিনা ও তার দোসররা দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করে ফেলেছিল। তার বিচার অতিসত্বর করতে হবে।
জনগণের সাথে প্রতারণা করে কোনো শাসকই টিকতে পারনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। সকল প্রতারণার ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের কল্যাণে আমরা সবাই ঐক্যের মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজ করব। ভালোর সাথে থকবো, মন্দের সাথে নেই। এই নীতিতে আসুন, দেশের সর্বোচ্চ পদ থেকে নিম্ন পদ পর্যন্ত সবাই প্রতারণাকে ঘৃণা করি, ভালোকে বেছে নিই পথ চলার। আর মহান আল্লাহকে ভয় করে চলে তার দেয়া জীবন আল কুরআনের আলোকে আমরা জীবন গড়ি। আমাদের দেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ইদানীং তার কাজকর্মে ইসলামের পথে চলার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, ভালো উদ্যোগ। আমরাও যারা নেতানেত্রী আছি, আমাদেরও সঠিক-সরলপথে চলেই দেশ চালানোর চিন্তা করতে হবে। কোনো প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া যাবে। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে থেকে জনগণের সাথে দেশ চালানোর উদ্যোগ নিলে মহান আল্লাহর সাহায্যের হাত আমাদের ওপর আসবে, কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com