আলোকে তিমিরে

জিন্নাহ : ইতিহাস ও কিংবদন্তির এক অনন্য সত্তা


৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:০২

॥ মাহবুবুল হক ॥
ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল একটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা নন, তারা হয়ে ওঠেন একটি যুগের প্রতীক। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তেমনই এক ঐতিহাসিক চরিত্র। পাকিস্তানে তিনি কায়েদে আজম— মহান নেতা; আর উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তার জীবনকে ঘিরে রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতিচারণ, কাহিনী, কিংবদন্তি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের অসংখ্য অধ্যায়।
জিন্নাহকে বুঝতে হলে শুধু ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিকে তাকালে চলবে না। তাঁর জীবনের গল্প শুরু হয় করাচির এক বণিক পরিবার থেকে পেশাজীবনে একজন অসাধারণ ব্যারিস্টার হিসেবে উত্থানের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি প্রবেশ করেন রাজনীতিতে। প্রথম জীবনে তিনি সাংবিধানিক রাজনীতি, আইনসভা এবং হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে ছিলেন। পরে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তার রাজনীতির কেন্দ্রে আসে। শেষ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন।
১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর করাচিতে জন্ম নেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার পিতা জিন্নাহভাই পুঞ্জা ছিলেন ব্যবসায়ী। পরিবারের সাত সন্তানের মধ্যে জিন্নাহ ছিলেন জ্যেষ্ঠদের একজন। তার শৈশবের সঙ্গে করাচির বন্দরনগরীর পরিবেশ এবং ব্যবসায়ী পরিবারের শৃঙ্খলা ও কর্ম সংস্কৃতির সম্পর্ক ছিল। পাকিস্তানের কায়েদে আজম একাডেমির জীবনীতে তার শৈশব, শিক্ষা এবং পারিবারিক পরিবেশের নানা তথ্য পাওয়া যায়।
শৈশবের জিন্নাহ সম্পর্কে এমন অনেক গল্প প্রচলিত আছে, যেখানে তাকে একটু একগুঁয়ে, স্বাধীনচেতা এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল একজন কিশোর হিসেবে দেখানো হয়। এসব গল্পের সবকটি সমানভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে পরবর্তী জীবনের জিন্নাহকে দেখলে একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট— নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকা তার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
কৈশোরেই জিন্নাহ পাড়ি দেন লন্ডনে। সেখানে তার উদ্দেশ্য ছিল আইন শিক্ষা গ্রহণ করা। লিঙ্কনস ইন থেকে তিনি ব্যারিস্টার হন। লন্ডনের জীবন তার চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থা, আইনের শাসন, সাংবিধানিক রাজনীতি এবং বিতর্কের সংস্কৃতি তার রাজনৈতিক মানস গঠনে ভূমিকা রাখে।
কথিত আছে, লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি অত্যন্ত মিতব্যয়ী ও নিয়মানুবর্তী জীবনযাপন করতেন। তার পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা এবং আচরণে ছিল এক ধরনের পরিমিতি। পরবর্তী জীবনে তার পরিচ্ছন্ন পোশাক, নিখুঁত সময়জ্ঞান এবং সংক্ষিপ্ত অথচ ধারালো বক্তব্য তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
এই তরুণ ব্যারিস্টার পরে বোম্বাইয়ের আদালতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তার যুক্তি, প্রস্তুতি এবং আদালতে আত্মবিশ্বাস তাকে দ্রুত খ্যাতি এনে দেয়। আইনজীবী জিন্নাহর একটি বৈশিষ্ট্য পরবর্তী রাজনৈতিক জিন্নাহর মধ্যেও দেখা যায়— তিনি আবেগের চেয়ে যুক্তি ও নথিপত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম পর্যায় ছিল সাংবিধানিক ও সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে ব্রিটিশ সরকারের কাছে সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন।
১৯১৬ সালের লক্ষেèৗ চুক্তি তার রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ইতিহাসের একপর্যায়ে জিন্নাহ ছিলেন হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সহযোগিতারও প্রবক্তা।
এই তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী সময়ে তিনি যে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের দাবির প্রধান নেতা হয়ে উঠবেন, তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক জীবন ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। ইতিহাসের মানুষকে তার পুরো যাত্রাপথে দেখতে হয়; শুধু শেষ অধ্যায় দিয়ে তাকে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
জিন্নাহকে ঘিরে প্রচলিত অসংখ্য স্মৃতিচারণের একটি বড় অংশ তার সময়ানুবর্তিতা নিয়ে। বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক লেখায় তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে. যিনি সময়ের মূল্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের স্মৃতিতে নিয়ম, শৃঙ্খলা ও নির্ভুলতার বিষয়টি বারবার এসেছে। জিন্নাহকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক সংকলনগুলোয়ও তার সময়বোধ ও ব্যক্তিগত অভ্যাসের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
তার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেও এই বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখা যায়। সভা, বৈঠক, আইনসভা কিংবা রাজনৈতিক আলোচনায় তিনি প্রস্তুতি নিয়ে উপস্থিত হতেন। তার বক্তৃতা সাধারণত দীর্ঘ আবেগঘন বক্তৃতার পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর ও লক্ষ্যভেদী ছিল।
জিন্নাহকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় অসংখ্য কিচ্ছা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, আবার কিছু গল্প লোকমুখে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে মূল ঘটনা ও পরবর্তী অলংকরণ আলাদা করা কঠিন।
একটি বহুল প্রচলিত গল্পে তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয়, যিনি অপমান বা উসকানির জবাব উত্তেজনা দিয়ে নয়, নীরবতা ও আত্মসংযম দিয়ে দিতেন। আবার কিছু গল্পে তার তীক্ষè বুদ্ধি ও তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার ক্ষমতার কথা বলা হয়।
এ ধরনের গল্পের মূল্য ইতিহাসের দলিল হিসেবে নয়, বরং মানুষের স্মৃতিতে একটি ব্যক্তিত্ব কীভাবে কিংবদন্তিতে পরিণত হয় তা বোঝার ক্ষেত্রে। জিন্নাহর ক্ষেত্রেও বাস্তব মানুষটির চারপাশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি কিংবদন্তির আবরণ তৈরি হয়।
জিন্নাহর পোশাক নিয়ে অসংখ্য স্মৃতিচারণ রয়েছে। তার নিখুঁত স্যুট, টাই, টুপি, পরিচ্ছন্নতা এবং ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি সমকালীন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত।
তিনি ছিলেন লম্বা, রোগা, পরিপাটি এবং গম্ভীর চেহারার মানুষ। জনসভায় তার উপস্থিতি ছিল আলাদা। তার পোশাক ছিল কেবল বাহ্যিক সাজ নয়; তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এর একটি সম্পর্ক ছিল। তিনি নিজেকে একজন আধুনিক, শিক্ষিত ও সাংবিধানিক রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করতেন।
এখানেই জিন্নাহর ব্যক্তিত্বের একটি বৈপরীত্য দেখা যায়— একদিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যারিস্টার; অন্যদিকে তার রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
কায়েদে আজমকে অনেক সময় শুধু কঠোর, গম্ভীর এবং অনমনীয় নেতা হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণে অন্য একটি জিন্নাহর সন্ধান পাওয়া যায়— যিনি রসিকতা করতেন, হাস্যরস বুঝতেন এবং কখনো কখনো ঘনিষ্ঠ পরিবেশে গল্প বলতেন।
‘ঞযব ঞবংঃধসবহঃ ড়ভ গৎ ঔরহহধয’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক উপাদানে তার রসবোধ এবং ব্যক্তিগত পরিবেশে গল্প-কৌতুক করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ জনসমক্ষে যে জিন্নাহ ছিলেন কঠোর ও সংযত, ব্যক্তিগত পরিসরে তিনি সবসময় ততটা কঠিন ছিলেন না। ইতিহাসের মহান ব্যক্তিদের মানবিক করে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের স্মৃতিচারণের মূল্য এখানেই।
জিন্নাহর শেষ জীবনের একটি স্মৃতিচারণে তার স্বপ্ন দেখার প্রসঙ্গ এসেছে। জিয়ারাতকে সুন্দর শহরে রূপ দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে নিজের একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে।
এই ছোট্ট কাহিনীর মধ্যে একজন রাজনৈতিক নেতার মানসিকতার একটি দিক ফুটে ওঠে— রাষ্ট্র নির্মাণকে তিনি শুধু রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখেননি; ভবিষ্যৎ নিয়ে তার একটি কল্পনাও ছিল।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে যে দাবি উত্থাপিত হয়, পরবর্তী সময়ে সেটিই পাকিস্তান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ভিত্তিতে পরিণত হয়। এখানে জিন্নাহর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংগঠন ও রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা। তিনি মুসলিম লীগকে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হন, যা ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস— দুই পক্ষের কাছেই উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। জিন্নাহ হলেন নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল।
কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে এলো রক্তপাত, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং বিপুল মানুষের বাস্তুচ্যুতি। নতুন পাকিস্তানকে একইসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা, শরণার্থী পুনর্বাসন, অর্থনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
এই জায়গায় ইতিহাসকে শুধু বিজয়ের কাহিনী বানানো যায় না। দেশভাগ ছিল একইসঙ্গে রাজনৈতিক সাফল্য, মানবিক বিপর্যয় এবং একটি নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনা। জিন্নাহ এই কঠিন বাস্তবতার মাঝখানেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে জিন্নাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ ইতিহাসে বিশেষ স্থান পেয়েছে। তিনি গণপরিষদের সামনে সংবিধান প্রণয়ন ও আইনসভা হিসেবে কাজ করার দায়িত্বের কথা বলেন।
এই ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত অংশ নাগরিকত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে। তার বক্তব্য পরবর্তী দশকগুলোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্সে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নথিতে এই ভাষণ সংরক্ষিত রয়েছে। একই সময়ে গণপরিষদে নাগরিক ও সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার নিয়ে একটি কমিটিও গঠিত হয়েছিল।
জিন্নাহর জীবনের শেষ অধ্যায় খুব দীর্ঘ ছিল না। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মাত্র এক বছরের রাষ্ট্রনির্মাণের অভিজ্ঞতাই তাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী প্রতীকে পরিণত করে।
তার মৃত্যুর পর তাকে ঘিরে আরও অসংখ্য কাহিনী জন্ম নেয়। তার খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সময়ানুবর্তিতা, কর্মপদ্ধতি, রসবোধ, কঠোরতা— সবকিছুই ধীরে ধীরে স্মৃতিচারণের উপাদানে পরিণত হয়।
কেউ তাকে দেখেছেন মহান রাষ্ট্রনির্মাতা হিসেবে, কেউ সাংবিধানিক রাজনীতির অসাধারণ কারিগর হিসেবে, কেউ মুসলিম রাজনৈতিক অধিকারের নেতা হিসেবে। আবার ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনামূলক মূল্যায়নও রয়েছে।
জিন্নাহকে নিয়ে লেখার সময় একটি সতর্কতা জরুরি। কিচ্ছা, গল্প বা লোকমুখে প্রচলিত ঘটনা পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হলেও সব গল্পকে ইতিহাসের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
উদাহরণ হিসেবে তার শৈশব, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা রাজনৈতিক জীবনের কিছু চটকদার গল্প বহু বছর ধরে প্রচলিত। কিন্তু কোনো গল্পের জনপ্রিয়তা তার সত্যতার প্রমাণ নয়। ইতিহাসের কাজ হলো দলিল, প্রত্যক্ষ স্মৃতি, সমকালীন সংবাদ, সরকারি নথি এবং গবেষণার আলোকে ঘটনাকে বিচার করা।
অন্যদিকে কিংবদন্তিরও একটি সামাজিক মূল্য রয়েছে। একটি জাতি তার নেতাকে কীভাবে স্মরণ করে, কী ধরনের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বলে— তার মধ্যেও সেই জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় থাকে।
জিন্নাহকে একমাত্রিকভাবে দেখলে তার ইতিহাস বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন ব্যারিস্টার, সংসদীয় রাজনীতিক, মুসলিম লীগের নেতা, পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান মুখ এবং স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল।
তার জীবনের শুরুতে ছিল সাংবিধানিক ভারতীয় রাজনীতি; মাঝখানে ছিল হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা; পরে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথই জিন্নাহর সবচেয়ে বড় কৃতি।
কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে কিচ্ছা আছে, কাহিনী আছে, কিংবদন্তি আছে; আছে কঠিন দলিলের ইতিহাসও। কোনোটি সম্পূর্ণ বাদ দিলে জিন্নাহর পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও রাজনৈতিক ছবি পাওয়া কঠিন।
তবে ইতিহাসের জিন্নাহ এবং কিংবদন্তির জিন্নাহকে আলাদা করে দেখা জরুরি। ইতিহাস আমাদের জানায় তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক সংগ্রাম, মুসলিম লীগের নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ। স্মৃতিচারণ আমাদের দেখায় তার ব্যক্তিত্ব, অভ্যাস, রসবোধ ও দৈনন্দিন আচরণের কিছু ঝলক। আর কিংবদন্তি দেখায়— একজন রাজনৈতিক নেতা কীভাবে সময়ের সঙ্গে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠেন।
জিন্নাহর জীবন তাই শুধু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি একজন মানুষের রাজনৈতিক বিবর্তনের গল্প। করাচির এক কিশোর থেকে লন্ডনের ব্যারিস্টার, সেখান থেকে আইনসভার রাজনীতিক, মুসলিম লীগের নেতা এবং শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা— এই দীর্ঘ পথচলাই তাঁর জীবনের আসল আলেখ্য।
কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই। বোম্বের একজন নামকরা সাংবাদিক সন্ধ্যার দিকে যে পথ দিয়ে সংবাদপত্রের অফিসে যেতেন, সেই পথের উল্টো দিক দিয়ে গভীর রাতে বা ভোরের দিকে তার বাসার দিকে ফিরতেন। তিনি দেখতেন, গান্ধীর ঘর অন্ধকার। আলোহীন। কিন্তু জিন্নাহর ঘর আলোময়। ফেরার পথেও সাংবাদিক প্রবর লক্ষ করতেন একই দৃশ্য। অর্থাৎ সন্ধ্যাকালের মতো জিন্নাহর ঘর আলোময় আর গান্ধীর ঘর আলোহীন, অন্ধকার। নিয়মিতভাবে একই দৃশ্য দেখতে দেখতে সাংবাদিক প্রবরের অন্তরে দারুণ এক কৌতূহল সৃষ্টি হয়। তিনি সংকল্প করেন, যে করেই হোক এই আলো-আঁধারের রহস্য তিনি উদ্ঘাটন করবেন। তিনি প্ল্যান করেন, প্রথমে তিনি এই বিষয়ে জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে আলাপ করবেন। পরবর্তীতে গান্ধীর সঙ্গেও এ বিষয়ের সত্য উদ্ঘাটনের জন্য যোগাযোগ করবেন। স্বপ্ন দেখা যায়। পরিকল্পনা করা যায়। কিন্তু সময়টা ছিল বড় জটিল। দেশ বিভাগের কিছু আগের। কোনোভাবেই দুই বড় নেতার কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। জিন্নাহ সাধারণত প্রেসকে ফেস করতেন না। খুব জরুরি হলে তার পক্ষ থেকে তার সহকারীরা প্রেস কে ফেস করতো। কিন্তু বক্ষ্যমাণ সাংবাদিকজন ভায়া মিডিয়ায় দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সরাসরি জিন্নাহ সাহেবের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করতে চেয়েছিলেন।জিন্নাহ সাহেবের সময় হচ্ছিল না। এক মাস-দুই মাস করে অনেক ক’টা মাস পাড়ি জমালো। অবশেষে অনেক কাঠখড় পুড়ে শেষ পর্যন্ত সামান্য কয়েক মিনিটের জন্য সাক্ষাতের একটা ব্যবস্থা হলো। সাংবাদিকজন তার দীর্ঘকালের কৌতূহলের কথা তাকে জানালেন। জিন্নাহ খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘ও এই কথা!
আরে ভাই, গান্ধীর কওম জেগে আছে বলে গান্ধীজি সন্ধ্যা থেকে রাতভর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। আমার কওম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে বলে আমাকে রাতভর জেগে থাকতে হয়।’ কী সাংঘাতিক কথা, তাই না?
আরেকটি গল্প সম্ভবত শুনেছিলাম, সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসফউদ্দৌলাহ ভাইয়ের ফ্যামিলির কারো কাছ থেকে। গল্পটি এরকম। হঠাৎ পার্টির জন্য অর্থাৎ মুসলিম লীগের জন্য তিন লাখ টাকার প্রয়োজন পড়ে। জিন্নাহ সাহেব কলকাতায় আইন ব্যবসায়রত খানবাহাদুর ইসমাইল হোসেনকে ফোনে জানান, পার্টির গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে আগামীকালের মধ্যেই তিন লাখ টাকার প্রয়োজন পড়বে। পার্টির ফান্ডে এক লাখ টাকা রয়েছে।
অবশিষ্ট ২ লাখ টাকা আগামীকালের মধ্যে আপনাকে পাঠাতে হবে। খানবাহাদুর সাহেব দিশামিশা না পেয়ে ফরিদপুরের বাড়ির কাছের কিছু মূল্যবান জমি হিন্দু জোদ্দারের কাছে কম দামে বিক্রি করে সময়মত সেই অর্থ জিন্নাহ সাহেবের কাছে পাঠিয়েছিলেন। বোঝা যায়, পার্টির নেতা ও কর্মীদের ওপর জিন্নাহ সাহেবের কী ধরনের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিদ্যমান ছিল। এটা গল্প না কাহিনী সেটা আমার জানা নেই। স্থান-কাল-পাত্র চিন্তা করে বিষয়টা আমার কাছে সত্য বলেই প্রতিভাত হয়েছিল।
ইতিহাস তাকে নিয়ে বিতর্ক করবে, গবেষণা নতুন তথ্য সামনে আনবে, তার বক্তব্যের নতুন ব্যাখ্যা হবে। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, দক্ষিণ এশিয়ার বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এমন এক চরিত্র, যাকে বাদ দিয়ে ১৯৪৭-এর রাজনৈতিক মানচিত্র, পাকিস্তান আন্দোলন এবং উপমহাদেশের বিভাজনের ইতিহাস সম্পূর্ণ করা যায় না।
আর সেই কারণেই জিন্নাহ আজও শুধু একটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা নন; তিনি ইতিহাস, স্মৃতি, কাহিনী ও কিংবদন্তির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনিবার্য ঐতিহাসিক চরিত্র।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক।