গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট সরকারের
৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৪
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন আন্দোলন শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব নয়, পুরো উপমহাদেশে এমন জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বিরল। সরকারের সীমাহীন জুলুম ও আন্দোলন দমাতে গুলি করে সাধারণ মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। এই এক দফা ছিল সরকার পতনের এক দফা। যার চূড়ান্ত সফলতা আসে ৩৬ জুলাই, অর্থাৎ ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালানোর মধ্য দিয়ে। একটি নতুন বাংলাদেশ পায় মানুষ, যেখানে মুক্ত বাতাসে প্রাণখুলে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সরকার পতনের পর ৬ আগস্ট থেকে শুরু হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, যা ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। মানুষের আকাক্সক্ষা ছিল নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে, গণভোটের রায় মেনে নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে, দেশের একটি আমূল পরিবর্তন আসবে, কিন্তু আসেনি। এজন্য মানুষের মধ্যে হতাশার সাথে বাড়ছে ক্ষোভও। শহীদ পরিবারের সদস্যসহ অনেকেই বলছেন, কোনো পরিবর্তন আসেনি। অথচ মানুষ রাষ্ট্রে পরিবর্তনের জন্যই ঝুঁকি নিয়েছে, জীবন দিয়েছে।
৩১ জুলাই ২০২৪ : ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ প্রতিবাদ নতুন মোড় নিল : জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ নিয়েছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নে। ১৬ থেকে ২১ জুলাইয়ের সংঘর্ষে বহু প্রাণহানি, হাজারো আহত এবং দেশজুড়ে কারফিউ ও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের পর ৩১ জুলাই ছিল আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষণা করে ‘গধৎপয ভড়ৎ ঔঁংঃরপব (ন্যায়বিচারের জন্য পদযাত্রা)’ কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল নিহতদের হত্যার বিচার, গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জনসমক্ষে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা। শুধু শিক্ষার্থী নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিককর্মী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সংহতি জানান।
এদিন সকালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট দলে জড়ো হতে শুরু করেন। শাহবাগ, টিএসসি, কলা ভবন এবং আশপাশের এলাকায় পুলিশি উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় ধরনের জমায়েত এড়াতে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দিক থেকে এসে একত্রিত হন। একই সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও শিক্ষার্থীরা কালোব্যাজ ধারণ করেন, কোথাও নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয়। রাজধানীসহ কয়েকটি স্থানে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, কয়েকটি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
১ আগস্ট ২০২৪ : জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ, সমন্বয়কদের মুক্তি
৩১ জুলাইয়ের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির পর ১ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এদিন একদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন সমন্বয়ক গোয়েন্দা হেফাজত থেকে মুক্তি পান; অন্যদিকে সরকার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকে এবং আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাদের মূল দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা ও সমন্বয়ের সাথে যুক্ত কয়েকজন সমন্বয়ককে এর আগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। ১ আগস্ট তাদের মুক্তির খবর সামনে আসে। ডিবি কার্যালয়ে অবস্থানকালে আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে যে ভিডিওবার্তা প্রচার করা হয়েছিল, সেটি নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। মুক্তির পর সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ওই বক্তব্য দেননি এবং চাপের মুখে তা প্রচার করতে হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।
১ আগস্ট সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে সংগঠন দুটির বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার দাবি করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি জানানো হয়। তাদের দাবির মধ্যে ছিল- আন্দোলনে নিহতদের হত্যাকাণ্ডের বিচার, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার, হামলা ও সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা শহরে এদিন বিক্ষোভ, সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
২ আগস্ট ২০২৪ : গণমিছিল, সংঘাতের বিস্তার ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি
২ আগস্ট ছিল জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। আগের দুদিনের কর্মসূচির পর এদিন আন্দোলনকারীরা দেশজুড়ে গণমিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন তখন পরিণত হয়েছে নিহতদের বিচার, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে। এদিনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। একইসাথে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
‘প্রার্থনা ও গণমিছিল’ কর্মসূচি : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২ আগস্টকে ‘প্রার্থনা ও গণমিছিল’ কর্মসূচির দিন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। আন্দোলনকারীরা নিহতদের স্মরণে দোয়া ও প্রার্থনার পাশাপাশি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে মিছিল বের করেন। দেশের অন্যান্য শহরেও একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। ঢাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। শাহবাগ, উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে।
৩ আগস্ট ২০২৪ : শহীদ মিনারের জনসমুদ্র ও অসহযোগের পথে অগ্রযাত্রা
৩ আগস্ট ছিল জুলাই আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন শহীদ মিনারে গণজমায়েত কর্মসূচি পালিত হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ নানা শ্রেণির নাগরিক এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা নিহতদের স্মরণ করেন এবং তাদের হত্যার বিচার দাবি করেন।
৩ আগস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্দোলনের দাবির পরিবর্তন। এর আগে মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। কিন্তু সহিংসতা, প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দাবি পরিবর্তন করে বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবির দিকে এগিয়ে যায়। এদিন সমাবেশ থেকে সরকার পদত্যাগের দাবি সামনে আসে। আন্দোলনের নেতারা ঘোষণা করেন, তাদের আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী এক দফা দাবিতে রূপ নিচ্ছে। এই ঘোষণা জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বড় বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা
৩ আগস্টের সমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সরকারি কার্যক্রমে সহযোগিতা না করা, রাজপথে অবস্থান এবং গণআন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।
৪ আগস্ট ২০২৪ : সর্বাত্মক অসহযোগ, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
৪ আগস্ট ছিল জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। আগের দিন ৩ আগস্ট সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আন্দোলনের নতুন পর্যায়ের ঘোষণা দেওয়ার পর এদিন শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে। দিন গড়ানোর সাথে সাথে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
৩ আগস্টের ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি। আন্দোলনকারীদের আহ্বান ছিল- সরকারি কার্যক্রমে অসহযোগিতা করা, রাজপথে অবস্থান নেওয়া, বিক্ষোভ ও মিছিলের মাধ্যমে দাবি জানানো, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করার জন্য গণআন্দোলন জোরদার করা। এদিন সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন শহরে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে অবস্থান নেন তারা।
ঢাকায় সংঘাতের বিস্তার ঘটে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। ধানমন্ডি, শাহবাগ, উত্তরা, মিরপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যান। পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ব্যবহার করে। আন্দোলনকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, এদিন বহু মানুষ নিহত হন এবং শত শত মানুষ আহত হন। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এদিনের নিহতের সংখ্যা ৯০-এর বেশি বলে উল্লেখ করে।
৫ আগস্ট ২০২৪ : ‘ঢাকা চলো’, হাসিনার পতন
৫ আগস্ট, অর্থাৎ ৩৬ জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ও নাটকীয় দিনের সাক্ষী হয়ে থাকে। আগের দিন ৪ আগস্টের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীমুখী জনস্রোত তৈরি হয়। কয়েক সপ্তাহের আন্দোলন, সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর এদিন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। মুক্তি পায় জনগণ ও বাংলাদেশ। ৩৬ জুলাই হচ্ছে বাংলার জনগণের মুক্তির দিন।
‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি ছিল ৬ আগস্ট, কিন্তু ৪ আগস্টের সংঘর্ষের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একদিন এগিয়ে ‘৫ আগস্ট ঢাকা চলো’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এদিন সকালের পর থেকেই ঢাকার প্রবেশপথগুলোয় মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্দোলনকারীরা ঢাকার দিকে আসতে শুরু করেন। যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ গুলি চালায়, কিন্তু কোনো বাধাই তাদের আটকাতে পারেনি। সংঘর্ষ ও উত্তেজনার মধ্যেই ঢাকায় জনস্রোত তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ
দুপুরের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে দেশত্যাগ করেন এবং ভারতে পালিয়ে যান। তার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কোথাও উল্লাস, কোথাও বিজয় মিছিল দেখা যায়।
সেনাপ্রধানের ঘোষণা
শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি জানান, দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। তিনি জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সহিংসতা বন্ধের অনুরোধ করেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
গণভবন ও অন্যান্য স্থানে জনতার প্রবেশ
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরের পর বিপুলসংখ্যক মানুষ গণভবনে প্রবেশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণভবনের ভেতরের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ সেখানে আনন্দ প্রকাশ করেন। ক্ষমতার পরিবর্তনের এই দিনেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সহিংসতা বন্ধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়। আন্দোলনের সমর্থকদের একটি বড় অংশ এটিকে বিজয় হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের পর পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে।
৬ আগস্ট ২০২৪ : নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা, সংসদ বিলুপ্তি
৬ আগস্ট ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরবর্তী প্রথম পূর্ণ দিন। আগের দিনের নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশ প্রবেশ করে এক নতুন অনিশ্চিত অধ্যায়ে। একদিকে ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে নতুন সরকার কাঠামো তৈরির আলোচনা চলতে থাকে; অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল করা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর ৬ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ মূলত ছিল ক্ষমতার রূপান্তর, সাংবিধানিক পদক্ষেপ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন কাঠামো তৈরির প্রস্তুতির দিন। ৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। সংসদ বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচিত সংসদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ৬ আগস্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। এদিন থেকে সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে মাঠপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগে।
গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে যা বলছেন শহীদ পরিবার ও রাজনীতিকরা
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে দেশে বর্তমানে ‘নির্লজ্জ দলীয়করণ’ চলছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি-বেসরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, করপোরেশন, প্রশাসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের সরিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, প্রশাসন, ব্যাংক-বীমা ও করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ চলছে। যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অসৎ ও দুর্নীতিবাজদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। জামায়াত আমীর প্রশ্ন তুলে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা কি শুধু একটি দলকে সরিয়ে অন্য একটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন? তাদের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থা ও পুরো সিস্টেমের পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ আবার পুরোনো অন্ধকার পথে ফিরে যাচ্ছে। গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার ঢাকায় শহীদ পরিবারের সাথে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ সত্ত্বেও রাষ্ট্র ও প্রশাসনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি দেখছি কিছুই বদলায়নি।’ পুরনো প্রথার ধারাবাহিকতায় হতাশা প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, যারা আগে দুর্নীতিতে জড়িত ছিল, তারা এখনো ঘুষ নেওয়ার উপায় খুঁজছে, আর অতীতে যারা ভালো উদ্যোগে বাধা দিয়েছিল, সেই কর্মকর্তারা এখনো তা-ই করে চলেছে। ‘মানুষ শুধু তাদের রঙ বদলাচ্ছে। যারা রঙ বদলেছে, তারাই এখন সবচেয়ে বড় জুলাইযোদ্ধা হয়ে উঠেছে।’
মির্জা ফখরুল যোগ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি অর্থপূর্ণ পরিবর্তন দেখার আন্তরিকভাবে আশা করেছিলেন। ‘আমি আক্ষেপের সঙ্গেই এসব বলছি। আমি আক্ষেপের সঙ্গেই এসব বলছি, কারণ আমি বৃদ্ধ।’ ‘আমি এবার সত্যিই প্রকৃত পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে সেই পরিবর্তন দেখিনি।’ পুরনো প্রশাসনিক সংস্কৃতির টিকে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন যে, অর্থপূর্ণ সংস্কারের জন্য শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনই নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতার রূপান্তরও প্রয়োজন। অন্যথায় তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে।
শহীদ মীর মুগ্ধের ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ জাতির কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পর হলো। কিন্তু আমরা কী কোনো পরিবর্তন পেয়েছি? যারা জীবনের মূল্যে কোনো তোয়াক্কা না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল তারা কী তাদের সেই আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পেরেছে? পারি নাই। কবে পারবো, তাও আমরা জানি না। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, সেই শহীদ পরিবারের সদস্যরাই গত দুই বছরে যত আনন্দের দিন এসেছে, সেই দিনগুলোয় স্বজনহারা বেদনায় কেঁদেছে। তিনি বলেন, আমরা কোনো কথায় পরিবর্তন দেখতে চাই না। আমরা চাই দৃশ্যমান পরিবর্তন। স্নিগ্ধ বলেন, মানুষ রাস্তায় নেমে জীবন দিয়েছিল ‘পরিবর্তন’ এর জন্য, কিন্তু সেই পরিবর্তন আসেনি। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তন না আসে, ততদিনই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘এক দফা’ ছিল শুধু শেখ হাসিনার পতন নয়; বরং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা। তবে দুই বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি উল্লেখ করে এনসিপি আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, শহীদ পরিবার এখনো বিচার পায়নি, আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়নি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে দলীয়করণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার বিচার ও সংস্কারের প্রশ্নে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই গণহত্যার বিচার, গুম-খুনের বিচার এবং আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলার অগ্রগতি থমকে আছে। আহত ব্যক্তিদের জন্য দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সুবিধাও কার্যকর হয়নি। সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো বহাল রেখে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাহত হলে নতুন সংবিধানের দাবিতে আবারও আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অবসান ঘটানো। তবে সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
আমার বাংলা পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে বিএনপি। অথচ তারা জুলাইয়ের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নে নেই। মানুষ যে পরিবর্তনের আশা নিয়ে মাঠে নেমেছিল, বিএনপি সেই পরিবর্তন চায় না।