ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ

বিদেশি মিত্রদের পছন্দ জামায়াতে ইসলামী

হারুন ইবনে শাহাদাত
২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০৪

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে দেশবাসীর কাছে তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ায় সহযোদ্ধা হিসেবে পাওয়ার আহ্বান ; ফাইল ছবি

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥

‘একটি ভালো খবর আছে’- এ কথাটি বাংলাদেশ সরকারের স্বায়ত্তশাসিত একটি সংবাদমাধ্যমের এক সাংবাদিক তিন মাস আগে এ প্রতিবেদককে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন। সুখবরটি কীÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশে একটি শুভ পরিবর্তন ঘটবে। তখন আবার আমারে ভুলে যাইয়েন না।’
তিনি শুভ খবরটি দিলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে। ইসলামফোবিয়া; বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিগত দেড় দশকের কার্যক্রম, ২০২৪-এ জনতার সাথে নিরস্ত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে ৩৬ জুলাই বিপ্লবে সফল ভূমিকায় পশ্চিমা বিশ্লেষকদের বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছে- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নীতি ও আদর্শ বিশ্বসভ্যতার জন্য হুমকি নয়, বরং ইতিবাচক।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের আর যে তিনটি কারণ, তা হলো- ১. ৩৬ জুলাই বিপ্লবের পরপরই জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ইউরোপ এবং ১১ ও ১২ এপ্রিল যুক্তরাজ্য সফর, ২. দেশে অবস্থিত বিভিন্ন মিশনপ্রধান ও রাষ্ট্রদূতদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময়, ৩. পশ্চিমা মিত্ররা এখন আর ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখছে না। নিজের চোখে দেখছে।
তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে তারা অপপ্রচারগুলো শনাক্ত করতে পারছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তারা কোন রাজনৈতিক দল কেমন আচরণ করছে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিভিন্ন দলের বক্তৃতা-বিবৃতি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আচরণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিমুক্ত কোনো দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের টেন পার্সেন্ট সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা হবে।
উল্লেখিত দিকগুলো বিবেচনায় তারা জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে রেখেছেন। তারা মনে করেন, জনগণের ভোটে জামায়াত ক্ষমতায় এলে সেই সরকারের সাথে কাজ করতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
কূটনৈতিকদের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ওপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এত বেশি নির্যাতন হয়েছে, যা নজিরবিহীন। জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, প্রভাবশালী নির্বাহী কমিটির সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে। সাবেক আমীর, নায়েবে আমীরসহ প্রথম সারির নেতাদের কারা নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছে। খুন-গুম, জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মতো নির্মমতা দেখার পরও জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছে। পতিত সরকারের পক্ষ থেকে দেশের প্রচলিত আইনের বেআইনি প্রয়োগের পরও ধৈর্যধারণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছে। উল্লেখিত বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের পরই পশ্চিমাদের জামায়াতফোবিয়া দূর হয়েছে।
সম্প্রতি নাম উল্লেখ না করে ভারতের পত্রিকা ‘এই সময়’ এক মার্কিন কূটনীতিকের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীকে ৫টি কারণে যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করে।
মার্কিন কূটনীতিক আরও বলেন, ‘যে দেশের ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান, সেখানে জামায়াত যদি সরকারে আসে ক্ষতি কী? তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ দল। তাদেরও উচিত একবার সুযোগ পাওয়া। কী আছে, ফেল করলে মানুষ সরিয়ে দেবেন!’
এমন মন্তেব্যর পর ভারতীয় সাংবাদিক অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রতিবেদন ‘পূর্বের হাওয়া : পর্ব-৩ ইসলামী জোট গড়ে জয়ী হতে কি পারবে জামায়াত’- শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কাজ করা মার্কিন কনস্যুলেটের এক কূটনীতিক জামায়াতে ইসলামীকে আমেরিকা পাঁচটি কারণে ক্ষমতায়ও দেখতে চায়- এক. তাদের নেতারা উচ্চশিক্ষিত; বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফল। দুই. তাদের আচরণ (ম্যানারস) খুব ভদ্র-সভ্য; কথা বলা যায় তাদের সঙ্গে। তিন. তারা ফেলে আসা ইতিহাসের কোনো একটি সময়ে ভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের শাসকদলের হাতে নির্যাতিত ও মানবাধিকার বঞ্চিত। চার. জামায়াত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। পাঁচ. ইসলামী শক্তি হলেও জামায়াত তালেবানের মতো পিছিয়ে পড়া নয়, বরং প্রগতিশীলই বলা যায়। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত-বন্দেগির মতো অনুশাসন নয়, জামায়াতে ইসলামী ‘মাকাসিদ আল শরিয়াহ’র আলোয় আলোকিত জীবন অনুশীলন করে কূটনীতিকের বিশ্লেষণে তারই প্রতিফলন উঠে এসেছে।
‘মাকাসিদ আল শরিয়াহ’র অনুশীলন
ওপরের পাঁচটি কারণ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রতিটি কারণই প্রমাণিত সত্য। ‘মাকাসিদ আল শরিয়াহ’র উদ্দেশ্য হলো ‘ইসলামের সৌন্দর্যের প্রকাশ’। ‘মাকাসিদ আল শরিয়াহ’র অনুসরণ করলে সেই ব্যক্তি ও দলের মধ্যে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো আসবেই। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ দেশের প্রেক্ষাপটে এগিয়ে আছে, কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণেই সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীই পারবে একটি আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্র উপহার দিতে। ভারত এ বিষয়টির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এতদিন আমেরিকা-ইউরোপসহ মিত্রদের ধোঁকা দিয়ে আসছিল। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে এমন ধোঁকা দেয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই মিত্ররাও আজ সত্য উপলব্ধি এবং স্বীকার করছেন।
‘ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখবে না’
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গবেষণার কারণে আমেরিকার কূটনীতিকদের মধ্যে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম, জন ড্যানিলোভিজ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান। তারা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।
সাবেক দুই রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম, জন ড্যানিলোভিজকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। কারণ উড্রো উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার মাইলাম ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করায় তিনি আওয়ামী লীগকে হাড়ে হাড়ে চিনতেন। এছাড়া বাংলাদেশে রাজনীতির পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িবহরে আওয়ামী ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীদের জঙ্গি হামলা, আ’লীগ মন্ত্রী; এমনকি হাসিনার পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে কাজের মেয়ে মর্জিনা, হাঁস জবাই করে খাওয়াসহ নানা কুরুচিপূর্ণ ও সন্ত্রাসী বক্তব্য করেছে। অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্র হত্যা করে ক্ষমতায় টিকে থাকাই ছিল আ’লীগের লক্ষ্য। এ সত্য আওয়ামী লীগ গোপন রাখতে পারেনি। তাই মিত্ররা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেছে।
অন্যদিকে মিত্ররা তাদের চেয়ে শতগুণ নম্র-ভদ্র জামায়াতে ইসলামীকেই পছন্দ করেছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ও বিনিয়োগের কোনো চুক্তির জন্য জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা টেন পার্সেন্ট অবৈধ সুবিধা চাইবেন না- এমন আস্থা ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন দলটির নেতারা।
এতদিন আমেরিকা ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখে যে ভুল করেছে, ২০২৪ পরবর্তী বিপ্লবের পর এ কথা স্বীকার করে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিজ বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে একটি তথ্য যুদ্ধের সম্মুখীন। এর বড় অংশটি চালানো হয় ভারত থেকে। ভারত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করছে, তা ভারতের স্বার্থের জন্য অনুকূল নয়। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আলোচনা সভায় ড্যানিলোভিজ সরাসরি বলেছেন, ‘ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখা যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক হবে না।’ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ড্যানিলোভিজের কথায় মিত্ররা অটল থাকলে উভয়ই লাভবান হবে।

৩৬ জুলাই বিপ্লবের পরপরই জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ইউরোপ এবং ১১ ও ১২ এপ্রিল যুক্তরাজ্য সফর বিদেশি মিত্রদের পছন্দ জামায়াতে ইসলামী