‘বুনো তুমি বুনো আমি শিকারি’র অপকৌশলের অংশ
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:২৮
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। সত্য ও ন্যায়ের সর্বজনীন স্বীকৃত আদর্শ ইসলামের ভিত্তিতে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে দলটির নেতা-কর্মীরা। শত অত্যাচার-নির্যাতন-অপপ্রচার তাদের আদর্শ থেকে একবিন্দু সরাতে পারেনি। ফাঁসির রশি গলায় পরে হাসিমুখে শাহাদাতকে আলিঙ্গন করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, নায়েবে আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য পর্যায়ের শীর্ষনেতারা। আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের শাসকগোষ্ঠীর একটি অংশ এবং তাদের এদেশীয় দোসররা জামায়াতে ইসলামীর পথচলাকে বার বার প্রতিহত করতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও ষড়যন্ত্র বন্ধ করছে না। বরং বার বার কৌশল বদল করছে। পুরোনো ট্যাগগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর ‘বুনো তুমি বুনো আমি শিকারি’র অপকৌশলে মাঠে নেমেছে। এ অপকৌশল কী, সেই ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে পরে তুলে ধরা হবে। তার আগে পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের প্রয়োজন কেন, তা তুলে ধরা হলো।
জামায়াতে ইসলামীর কেন প্রয়োজন?
‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা (লোককে) কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর এসকল লোকই হবে সফলকাম।’ (সূরা আলে-ইমরান : ১০৪)। ইসলামী আদর্শের আলোকে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন একটি দল আমীর বা দায়িত্বশীল রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন। শূরার সদস্য এবং নাগরিকদের পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি এ আল জামায়াত পরিচালনা করবেন। মতপার্থক্য থাকলেও এ জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ইসলামী চিন্তাবিদরা। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের এ আয়াতকে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন, ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হইও না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেল। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বয়ান করেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)। অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ, রাসূল সা.-এর নেতৃত্ব বা রিসালাত, দুনিয়ার জীবনের ভালো ও মন্দ কাজের জন্য পরকালে আল্লাহর বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং পুরস্কার ও শাস্তি পেতে হবে এ বিশ্বাসের আলোকে গোটা মুসলিম বিশ্ব এক ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ছোট-খাটো মতপাথর্ক্যরে কারণে একে ওপরের বিরুদ্ধে লাগার মানে নিজেকে আগুনের গর্তে নিক্ষেপ করা।
এখন ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে অনেক দল, সংগঠন ও সংস্থা ইসলামের প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। তাদের মধ্যে ছোট-খাটো মতপার্থক্য থাকলেও একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো ঠিক নয় বললে কম বলা হবে বলে মনে করেন ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট আলেমগণ। তারা মনে করেন, মুসলিম দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট করা অপরাধ। এ প্রসঙ্গে শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, “জামায়াতে ইসলামী আছে, কওমি ওলামায়ে কেরামের মাদরাসা আছে, হেফাজতে ইসলাম আছে, আরো নানামুখী প্ল্যাটফরমে ইসলামের দাওয়াতের কাজ অব্যাহত আছে। এদের অনুসারীদের অনেকে অপরকে ঘায়েল করার জন্য আমার হাতে কিছু আলপিন তুলে দেন, যা ইসলামের দৃষ্টিতে ঠিক নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আশরাফ আলী থানবী (রহ.)-এর খলিফা হজরত মাওলানা আবরারুল হক (রহ.)-এর উক্তি উর্দুতে উদ্ধৃতি করেন, যার বাংলা অর্থ, ‘যারা দীনের কাজ করছে সবাইকে বন্ধু ভাবো, শত্রু নয়’।’’ রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, শত অপপ্রচার, বিরোধিতা মোকাবিলা করে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের কাজ করে যাচ্ছে। অপপ্রচারের জবাবে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা ছাড়া জামায়াতে ইসলামী বিদ্বেষ ছড়িয়েছে- এমন কোনো অভিযোগ প্রমাণ হয়নি। অথচ ‘বুনো তুমি বুনো আমি শিকারি’রা এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার নীলনকশা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
‘বুনো তুমি বুনো আমি শিকারি’রা
এদেশের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী- যারা শাপলা চত্বরের শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী করে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ ডেকে তার সাথে হাত মিলিয়ে ছিল, তারা আধিপত্যবাদী আগ্রাসী ভারতের অ্যাসাইমেন্ট বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে। এরাই হলো ‘বুনো তুমি বুনো আমি শিকারি’। মানে বন্যপ্রাণীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে একশ্রেণির শিকারি শিকার ধরতে ব্যবহার করে। বন্যপ্রাণীরা শিকারির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রাণীকে তার মতোই বন্যপ্রাণী মনে করে ফাঁদে ধরা পড়ে প্রাণ হারায়। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মাঠে নামা ‘কওমী জননী’র সন্তানরাও প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পছন্দের রূপধরে মাঠে নেমেছে। প্রশিক্ষিত বুনোপ্রাণীকে যেমন শিকারি খাওয়াসহ সকল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ‘কওমি জননী’র সন্তানরা তার চেয়ে একটু বেশিই পায়। তাদের বাণী প্রচারে সাথে আছে রাতারাতি রং বদল করা একটি দৈনিক পত্রিকা। পত্রিকাটি ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে ‘কওমি জননী’র সন্তানদের মুখপত্র হিসেবে মিথ্যার বিজ ছড়াচ্ছে। কওমি সন্তান ও তাদের মুখপত্রটির নাম বলার বা লেখার ইচ্ছে নেই। তবে প্রসঙ্গক্রমে আসবে তাই পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ‘কওমি জননী’র সন্তানদের মিথ্যাচারের জবাব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে, সরলপ্রাণ জনগণের বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করতে।
কী সেই জবাব?
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “গত ৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার একটি কমিউনিটি সেন্টারে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর দেওয়া এক বক্তব্যের বরাত দিয়ে দৈনিক ইনকিলাবের ৬ আগস্ট সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত সংবাদে ‘জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে যে কটূক্তিপূর্ণ ও অসত্য মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, আমি তার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ইসলামের প্রকৃত উৎস হলো কুরআন ও সুন্নাহ। জামায়াতে ইসলামী সেই ইসলামের অনুসারী। ‘মওদূদীর ইসলাম’ বলে কোনো স্বতন্ত্র ইসলাম নেই। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী অসত্য, মনগড়া ও অশোভন বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক। দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যখন ঐক্যের প্রয়োজন সর্বাধিক, তখন এমন মন্তব্য ইসলামী ঐক্য বিনষ্ট করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের বক্তব্য ইসলামী মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক শালীনতার পরিপন্থি এবং তা ইসলাম ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতকে শক্তিশালী করার শামিল। জামায়াতে ইসলামী ‘মওদূদীর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়’ মর্মে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা আদৌ সত্য নয়। এ ধরনের মনগড়া বিভ্রান্তিকর মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি জাতিকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করেছেন, যা তাঁর দায়িত্বশীলতার পরিপন্থি। যখন দেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐক্য খুব বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেই সময় মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মতো একজন প্রবীণ দায়িত্বশীল আলেমেদীনের কাছে জাতি এ ধরনের বক্তব্য আশা করে না। তাই এ ধরনের অসত্য, ভিত্তিহীন ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা তাঁর প্রতি বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাচ্ছি।” এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিনয়ের সাথে অনুরোধে ‘কওমি জননী’র সন্তান ও তার মুখপত্রের নাম উল্লেখ করায় পাঠকের আর তাদের চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
তারা বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)-এর চিন্তা ও দর্শন সম্পর্কে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। যারা ইসলামী রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তিকে রাষ্ট্র গঠনকে বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারাই মূলত বিভ্রান্তি ছড়ায়। এর ঐতিহাসিক কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে বর্ণহিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি কংগ্রেসের সমর্থক। তারা মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)-এর দ্বি-জাতি তত্ত্ব, অর্থাৎ হিন্দু মুসিলম দুই জাতি তত্ত্বের বিরোধিতাকারী। অথচ এ তত্ত্বের মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী (রহ.) সাম্প্রদায়িকতা নয়, এ উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি জাতির স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মদিনা রাষ্ট্রের আদর্শে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতার রাষ্ট্রদর্শন উপস্থাপন করেছেন। নিখিল ভারতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে টেনে এনে কওমি জননীর সন্তানরা মূলত ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দুঃস্বপ্ন দেখছে। মিথ্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে কওমি জননীর সন্তানদের মুখপত্রটি। তারা সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখার সাথে সাথে প্রায় প্রতিদিন ফরমায়েশি প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তালেবান সরকার মাওলানার বই নিষিদ্ধ করেছে এমন প্রতিবেদন দেখে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মিডিয়া, আফগান সরকারের অনলাইন সার্চ করে প্রতিবেদকের চোখে তেমন কিছু পড়েনি। ইন্টারনেটে সার্চ করলে দেখা যায়, কয়েকজন নারী লেখক তারা পাশ্চাত্য দর্শনের আলোকে নারীদের কথা লিখেছেন এবং ইরানি কয়েকজন লেখকের বই নিষিদ্ধ করেছে এমন তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। অথচ কওমি জননীর সন্তানদের মুখপত্রটি লিখেছে ভিন্ন কথা।
দেশের সব ধারার আলেম; বিশেষ করে সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ওয়া সিদ্দিকী পীর সাহেব জৈনপুরী, আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের শায়েখ আহমাদুল্লাহ, ওলামা মাশায়েখ কমিটির ড. খলিলুর রহমান মাদানী, মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, বায়তুশ শরফের বর্তমান পীর মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী কওমি, আলীয়াসহ সর্বস্তরের দেশের লাখ লাখ হক্কানী আলেম ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, আমাদের মাঝে মৌলিক বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই। ছোট ছোট মতপার্থক্য, যা ইসলামের ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং ইসলাম সমর্থিত। এখানেই ইসলামের সৌন্দর্য ও উদারতা। চারটি স্কুল বা মাজহাবের স্কলাররা কেউ কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন না।
যারা জামায়াতে ইসলামীকে বাতিলের খাতায় ফেলছেন, তাদের প্রসঙ্গে সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর সরাসরি উত্তর, ‘এরা এটি করছে হিংসা ও ঈর্ষা থেকে। তাদের উচিত হিংসা বা ঈর্ষা পরিহার করে গঠনমূলক সমালোচনা করা। আমি নিজে গণতন্ত্র সমর্থন করি না, খেলাফতের পক্ষে। কিন্তু আমি মনে করি, দার্শনিক সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী সময়ের ‘জরুরি প্রয়োজন’ মেটাতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামী আদর্শের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছেন।
পর্যবেক্ষরা মনে করেন, কওমি জননীর সন্তানরা হিংসা ও বিদ্বেষ এবং ইসলামের শত্রুদের সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অপপ্রচারে মাঠে নেমেছেন। ইতোপূর্বে আফতাব স্মরণিকার মামলায় আদালতে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার পর তাদের শিক্ষা হয়নি।
আফতাব স্মরণিকায় মামলা
২০০৩ সালে আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম বরুড়া কুমিল্লা নামক প্রতিষ্ঠানটি আফতাব স্মরণিকা নামে একটি পুস্তক প্রকাশ করে এবং এতে ‘মওদূদী সাহেবের মতবাদ ও ইসমাতুল আম্বিয়া’ শিরোনামে প্রকাশিত দুটি প্রবন্ধে মাওলানা মওদূদী সাহেবের নামে কিছু আপত্তিকর মন্তব্য উল্লেখ করা হয়। জামায়াতের তরফ থেকে উপরোক্ত বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করা না হলেও তবে বরুড়ার একজন আলেমেদীন, যিনি জামায়াতের সহযোগী বা সদস্য কিছুই ছিলেন না, তিনি এর কঠোর প্রতিবাদ করেন এবং এ অপবাদ ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কারণে ৮ জনকে আসামি করে কুমিল্লা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন।
মামলা নং-২১৯/০৪। আদালতে বাদী মাওলানা আবদুর রহমান আফতাব স্মরণিকায় মাওলানা মওদূদীর নামে প্রকাশিত তথ্য মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে আসামিদের শাস্তি প্রদানের আবেদন করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় তদন্তপূর্বক বিশেষজ্ঞ মতামতসহ রিপোর্ট প্রদানের জন্য অভিযোগনামাটি ইসলামী ফাউন্ডেশনের নিকট প্রেরণ করেন। ইসলামী ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, ইসলামী বিশ্বকোষের প্রকাশনা কর্মকর্তা মাওলানা মুহাম্মদ মুসা, মুহাদ্দিস মুফতি ওয়ালিয়ুর রহমান খান, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য মাওলানা মুফাজ্জল হোসাইন খান, মুফাসসির মাওলানা আবু সালেহ পাটোয়ারী ও জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মহিবুল্লাহ বাকী নদভীর সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করেন এবং স্মরণিকায় উল্লেখিত অভিযোগ ও মন্তব্যগুলো মাওলানা মওদূদীর পুস্তকসমূহের সাথে মিলিয়ে তার সত্যতার বিষয়ে রিপোর্ট প্রদানের অনুরোধ করেন।
অবশেষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ৯/৬/২০০৮ তারিখে ৭৯৯নং স্মারকে কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জেলা প্রশাসক, কুমিল্লার নিকট সংশ্লিষ্ট সাতজন বিশেষজ্ঞের স্বাক্ষরসংবলিত তথ্য যাচাই প্রতিবেদন পেশ করেন। প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, স্মরণিকায় মাওলানা মওদূদীর নামে উল্লেখিত প্রত্যেকটি অভিযোগই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। নবী-রাসূল (সা.), খোলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবায়ে কেরামের বিরুদ্ধে মাওলানা মওদূদীর কোনো মন্তব্য বা মতামত তার কোনো গ্রন্থে নেই। এ রিপোর্টের পর বিবাদীগণ বিপাকে পড়ে যান এবং আপস-মীমাংসার জন্য বাদী মাওলানা আবদুর রহমান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে ধরনা দেন। তারা আপস-মীমাংসার জন্য আদালতে আবেদন করেন এবং বিবাদী মাওলানা বশিরুল্লাহ, মো. ইয়াকুব, আনোয়ার হোসাইন, মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন, মো. নোমান, সালমান, আলী আশরাফ প্রমুখ আরজীর ২নং অনুচ্ছেদে ‘আফতাব স্মরণিকার’ বিতর্কিত উক্তিসমূহ ‘ভুলবশত লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং এর জন্য বিবাদীগণ মর্মাহত এবং অনুতপ্ত’ মর্মে স্বীকারোক্তি দেন। আদালত বাদীর সায় অনুযায়ী আপসনামা গ্রহণ করেন। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত দলিল আমি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। এ মামলা ইসলামি ফাউন্ডেশন গঠিত ওলামাদের স্বীকার বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক মাওলানা মওদূদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো মিথ্যা আখ্যায়িত করে দেয়া রিপোর্ট ও অভিযোগকারীদের ভুল করে মর্মাহত ও অনুতপ্ত হয়ে আদালতে স্বীকাররোক্তি প্রদান করেন।
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, কওমি জননীর সন্তানরা এ ঘটনা জানার পরও মিথ্যাচার করেই যাচ্ছে। কারণ তাদের কাছে ইসলাম, উম্মাহ দেশ বড় নয়, তারা ব্যক্তিস্বার্থে অন্ধ। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের হেদায়েত না দিলে সুপথে ফিরতে পারবে না। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে তারা কওমি জননীর সন্তান হিসেবেই বেঁচে থাকবেন, যা লজ্জা ও অপমান ছাড়া আর কিছু নয়।