সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স ও গণভোটের সম্ভাবনা : বিএনপির সামনে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার শঙ্কা

জুলাই সনদেই নির্বাচন

ফারাহ মাসুম
১৪ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৩৩

শেষ পর্যন্ত জুলাই সনদ কার্যকর করেই নির্বাচন আয়োজনের উপায় বের হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ৫ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনার পর এ সম্ভাবনার কথা জানা যাচ্ছে। গত সপ্তাহের শেষে এ আলোচনা শুরু হলেও তা চলতি মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। সম্ভবত এ কারণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ এক মাস বাড়ানো হয়েছে। এ সময়ের মধ্যেই সংস্কারের আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে একটি উপায় বের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে গণভোটের সম্ভাবনা ও তা বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে। জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী দল সংস্কারের আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া নির্বাচনের বিরোধিতা করে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। এনসিপিপ্রধান নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তারা জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়ে ছাড় দিলেও জুলাই সনদ নিয়ে কোনো ছাড় দেবে না। এনসিপির আরেক নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে না বলেও উল্লেখ করেছেন।
তিন প্রস্তাব
জানা গেছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে সাম্প্রতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনায় তিনটি বিকল্প প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে- জুলাই সনদকে আইনি কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করতে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাওয়া; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট আয়োজন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্ডিন্যান্স বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন।
সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স, গণভোটের আয়োজন ও আইনগত আদেশ জারির এ ইস্যুতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে, তবে এটি সাংবিধানিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। ১৯৭৯ সালের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে গণভোটের বাধ্যবাধকতা ছিল, যা পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছেন। পরে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোটের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপরও বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং জনগণের স্বার্থে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে গণভোট আয়োজনের পরামর্শ আসতে পারে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠনে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা বা রেফারেন্স দেওয়া না হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত থাকলে এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্ডাম গণভোট আয়োজনের পরামর্শ আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সংবিধান ও আইন সংশোধন
সম্ভাব্য যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সের আলোকে সনদে উল্লেখিত সংস্কার ও প্রক্রিয়া সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব জাতীয় সংসদে আসতে পারে। অধ্যাদেশে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাচনী আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যেতে পারে, যা পরে সংসদে অনুমোদন করা হবে।
এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য আইনগত ভিত্তি মজবুত করতে পারে। নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে কমিশনের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধকরণ নির্দেশনা দিতে পারে। বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সুপ্রিম কোর্ট রেফারেন্স বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালত ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বাধ্যতামূলকভাবে অংশগ্রহণ করানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিতে পারেন, যাতে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু হয়।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ: এ বিষয়ে সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ হলো- সুপ্রিম কোর্টকে রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে বিরত থাকতে হয়; তাই তাদের ক্ষমতা বিচার ব্যবস্থার সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য সংসদের সমর্থন দরকার, যা রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া কঠিন। এছাড়া বিচার ও প্রশাসনিক সংস্কার সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া।
সার্বিক বিবেচনায় প্রথম ধাপে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা, নির্দেশনা চাওয়া যেতে পারে। পরের ধাপে আইন ও সংবিধান সংশোধন জাতীয় সংসদে প্রস্তাব আনা ও পাস করা যেতে পারে। সংস্কার নিশ্চিত করতে কমিশন ও বিচার ব্যবস্থা সংস্কার স্বাধীনতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সের রেসপন্সে সর্বোচ্চ আদালত রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠন সংলাপ ও ঐকমত্য বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দিতে পারেন। নির্বাচন আয়োজন করা হবে সংস্কার নিশ্চিত করে, যা হবে বিতর্কমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে জুলাই সনদ কার্যকর করে নির্বাচন আয়োজনের মূল উপায়গুলো হলোÑ
এক. সাংবিধানিক ও আইনগত সংশোধন: সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সের আলোকে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট আইন ও সংবিধানে পরিবর্তন আনা; যাতে জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্য এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক হয়।
দুই. নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় কমিশনের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখা ও তার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা।
তিন. বিচার ব্যবস্থা সংস্কার: বিচার ব্যবস্থায় কার্যকর ও দ্রুত সংস্কার চালানো; যাতে নির্বাচনকালীন বিরোধ নিষ্পত্তি সুষ্ঠুভাবে হয়।
চার. রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠন: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে ঐকমত্য কমিশন বা সংলাপ প্রক্রিয়া চালু রাখা, যা নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করবে।
এসব সংস্কার ও রেফারেন্স অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স কার্যকর হলে সংবিধান ও আইন সংশোধনসহ বিচার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে ফেব্রুয়ারিতে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হতে পারে।
গণভোটের কী ভূমিকা?
গণভোট (রেফারেন্ডাম) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত নিয়ে কোনো বিশেষ বিষয় বা সিদ্ধান্তের ওপর জাতীয় স্বীকৃতি বা অনুমোদন নেওয়া হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সংবিধান ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে, গণভোট একটি গণতান্ত্রিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গণভোটের ভূমিকা সংবিধান ও জুলাই সনদ কার্যকর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কারণে-
(ক) সাংবিধান সংশোধনের জন্য জনসমর্থন গ্রহণ: সংবিধান সংশোধনের জন্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে; বিশেষ করে যদি সংশোধনী দেশের মৌলিক কাঠামো বা শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যদি জুলাই সনদে উল্লেখিত সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়া গ্রহণ করে, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে।
(খ) রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐকমত্য বৃদ্ধিতে সহায়ক: ভোটারদের সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে রাজনৈতিক দলের ওপর জনগণের চাপ বৃদ্ধি পায়, যা ঐকমত্য ও সমঝোতা তৈরিতে সহায়ক। দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা বিভাজন কমাতে সাহায্য করে।
(গ) সরকারি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় জটিলতা কাটিয়ে ওঠা: অনেক সময় সংসদীয় বিরোধ বা রাজনীতির জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত হয়; গণভোট দ্রুত সমাধানের পথ হতে পারে। জনগণের সরাসরি সমর্থন থাকলে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা সহজ হয়।
গণভোটের সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি: বাংলাদেশে গণভোট করার সংবিধানগত ও আইনগত সুযোগ সীমিত; বিশেষভাবে মৌলিক সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এছাড়া গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা, বিভাজন বা মেরুকরণ বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি তথ্য ও সচেতনতার ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনগণের মধ্যে সঠিক তথ্য না পৌঁছালে ভুল বোঝাবুঝি বা পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত হতে পারে। এর বাইরে প্রশাসনিক ও আর্থিক খরচের প্রসঙ্গও আসতে পারে। বৃহৎ গণভোট আয়োজন সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
এত কিছুর পরও সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ কার্যকর করার জন্য শক্তিশালী ভোটার সমর্থন আনতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না থাকলে জনগণের সরাসরি মত নিয়ে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। আইনগত বাধা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, তথ্য সংকট ও খরচের কারণে ব্যবহার সীমিত।
মতের ভিন্নতা দেখা দিলে গণভোট: সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স বা আদেশে এমন নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে যেÑ যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু বা সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা বা ঐকমত্য গড়ে না ওঠে, তাহলে সেই পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট (রেফারেন্ডাম) আয়োজন করা হোক।
রেফারেন্সে এমন নির্দেশনার সম্ভাব্য কারণ ও উপকারিতা হলো- প্রথমত, এটি জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে পারে। রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে যে গরমিল হয়, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ জাতীয় ঐক্য তৈরিতে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সম্মান জানানো হবে এর মাধ্যমে। সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে জনগণের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার। তৃতীয়ত, অবৈধতা ও বিতর্ক কমানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গণভোটে জনগণের স্পষ্ট সম্মতি থাকলে পরবর্তীতে ঐ ইস্যুকে কেন্দ্র করে আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্ক কম হবে। চতুর্থত: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় এর ভূমিকা থাকবে। জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ও সম্মতি রাজনৈতিক অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে।
বাস্তবায়ন সংক্রান্ত কিছু দিক: রেফারেন্সে সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরির নির্দেশ দিতে পারেন। গণভোট আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন তৈরি ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নির্ধারণের নির্দেশনা থাকতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য জাতীয় সংসদ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদারকি করতে বলবেন।
অন্য দেশের উদাহরণ
বিশ্বের অনেক দেশে গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধন বা জাতীয় সিদ্ধান্তে গণভোটের ব্যবস্থা রাখা হয়- যাতে মতের ভিন্নতা হলে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। বাংলাদেশের জন্যও সুপ্রিম কোর্ট এমন নির্দেশনা দিতে পারেন, যদি বিষয়টি যথেষ্ট জাতীয় ও সংবিধানিক গুরুত্ব বহন করে।
সুইজারল্যান্ড: সুইজারল্যান্ডের সংবিধান অনুযায়ী, দেশীয় ও স্থানীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা বা সংবিধান সংশোধনে জনগণের সরাসরি ভোট বাধ্যতামূলক। সুইস ফেডারেল কোর্ট কখনো কখনো রাজনৈতিক পক্ষের মতদ্বৈধতার কারণে জনগণের রেফারেন্ডাম আয়োজনের নির্দেশনা দেয়Ñ যাতে গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকার কনস্টিটিউশনাল কোর্ট কখনো সংবিধান সংশোধনে জাতীয় ঐক্যের অভাব থাকলে রেফারেন্ডাম বা গণভোট আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে রায় প্রদান করেছে।
ইসরাইল: ইসরাইলের বর্ণবাদী শাসনের জন্য দেশটিকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে গণতন্ত্রচর্চা হয় বলে দেশটির উদাহরণ অনেক ক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট কখনো কখনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতি পরিবর্তন বা সংবিধান সংশোধনে গণভোট বা জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে আদেশ দেয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকলে আদালত সরকার ও সংসদকে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিতে পারে।
বাংলাদেশের বাইরের কিছু দেশের উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স ও রায়ের মাধ্যমে গণভোটের আইনি ভিত্তি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। নিচে কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে।
কানাডা: রেফারেন্স রি সেকশন অব কেবেক (১৯৯৮) মামলায় কানাডার সুপ্রিম কোর্ট কুইবেক প্রদেশের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নের ওপর রায় প্রদান করে। রায়ে বলা হয়- কুইবেক একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারবে না। গণভোটের ফলাফল যদি স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট হয়, তবে ফেডারেল সরকারকে আলোচনা শুরু করতে হবে। গণভোটের প্রশ্ন স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ হতে হবে। গণভোটের ফলাফলকে গণতান্ত্রিকভাবে বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হবে। এ রায় কানাডার সংবিধানিক কাঠামোয় গণভোটের গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে।
যুক্তরাজ্য: স্কটিশ স্বাধীনতা রেফারেন্স (২০২২) এ ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা রেফারেন্ডাম আয়োজনের আইনি অধিকার নিয়ে রায় প্রদান করে। রায়ে বলা হয়, স্কটিশ পার্লামেন্টের স্বাধীনতা রেফারেন্ডাম আয়োজনের ক্ষমতা নেই। এমন রেফারেন্ডাম আয়োজনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি প্রয়োজন। গণভোটের প্রশ্ন রাজনৈতিক, তবে আইনি প্রেক্ষাপটে তা বিশ্লেষণ করা হয়। এ রায় যুক্তরাজ্যের সংবিধানিক কাঠামোয় গণভোটের আইনি সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে।
আয়ারল্যান্ড : এ ক্রটি বনাম টয়সিক (১৯৮৭) মামলায় বলা হয় আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য সংবিধান সংশোধন জরুরি। সংশোধনের আগে জনগণের সরাসরি সম্মতি (গণভোট) আবশ্যক। এতে আয়ারল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি সংশোধন সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নের ওপর এ রায় প্রদান করে।
বাংলাদেশের বাইরের উচ্চ আদালতের গণভোট নিয়ে রায়ের মূল দিকগুলো হলো- কানাডার কুইবেকের বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত মামলা (১৯৯৮) অনুসারে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা আইনগত নয়; গণভোটের ফল স্পষ্ট হলে কেন্দ্রীয় সরকার আলোচনায় বসবে। যুক্তরাজ্য স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার গণভোট রায় (২০২২) অনুসারে স্কটিশ পার্লামেন্ট স্বাধীনতা রেফারেন্ডাম করতে পারবে না; কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
এ রায়গুলোয় দেখা যায়, গণভোট আয়োজনের জন্য স্পষ্ট আইনি কাঠামো, জনগণের সম্মতি এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধারণা
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনে গণভোট বাধ্যতামূলক নয়, তবে জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য সুপ্রিম কোর্ট এমন নির্দেশনা দিতে পারেন।
যদি জুলাই সনদ বা জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় মতভিন্নতা থেকে যায়, তবে সুপ্রিম কোর্ট ঐ ইস্যুতে জনগণের সরাসরি মত নেওয়ার পক্ষে নির্দেশ দিতে পারেন। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চাইবেন।
সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্সে জুলাই সনদ কার্যকর করার জন্য যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হয়, তখন সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিতে পারেন যে, দেশের জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট (রেফারেন্ডাম) আয়োজন করা হোক।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে সরাসরি গণভোটের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও, বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট এমন নির্দেশনার মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার পথ খুলে দিতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বা রেফারেন্স আসেনি, কিন্তু ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রাসঙ্গিক কিছু রায় ও রেফারেন্স: বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্টের কাছে জুলাই সনদ’ বা তার মতো রাজনৈতিক ঐকমত্য বিষয়ক প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো রেফারেন্স বা আদেশ পাওয়া যায়নি, যেখানে গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। তবে নিম্নলিখিত কিছু সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় ও রেফারেন্স রয়েছে, যেগুলো সাংবিধানিক সংকট ও জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলে, যেগুলো থেকে ধারণা পাওয়া যায়:
পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী নিয়ে রেফারেন্স (২০১১): এ রায়ে সংবিধানের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। রায়ে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনে গণভোটের বাধ্যবাধকতা নেই এবং তা সংসদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সংশোধন কঠিন, তাই জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংক্রান্ত রায় (২০০৭): বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও নির্বাচন পরিচালনায় নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও নির্বাচনকালীন সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা বলা হয়।
জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র রক্ষায় বিভিন্ন আদেশ: বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেছে। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় সংকট নিরসনে রেফারেন্সের মাধ্যমে নির্দেশনা দিতে পারে। এতে দেখা যায়, সরাসরি গণভোটের নির্দেশনা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তবে সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় ঐক্য ও সংবিধান রক্ষায় রেফারেন্সের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ এবং ঐকমত্য গড়ে তোলার পরামর্শ দেয়। ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক সংকট ও অসঙ্গতি থাকলে সুপ্রিম কোর্ট গণভোটের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে পারে, তবে তা নির্ভর করবে নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ ও আইনি কাঠামোর ওপর।
ধারণা করা হয়, সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স বা সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মতানৈক্য দূর করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। বিএনপির সামনে আগামী নির্বাচনে সরকার গঠনই যেহেতু মূল বিষয় তাই নির্বাচনী আয়োজন ব্যাহত হয়ে নতুন কোনো পরিস্থিতি বা সরকার আসুক, দলটি চাইবে না সেটি। ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি ঘটনাস্থলে আবির্ভূত হলে সেক্ষেত্রে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি একেবারে অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এটি কোনোভাবেই বিএনপি চাইবে বলে মনে হয় না।