গণতন্ত্রের সন্ধিক্ষণে ‘জুলাই সনদ’
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৩:১১
॥ ফারাহ মাসুম॥
২০২৪ সালের ৩৬ জুলাইয়ের ছাত্র-অভিভাবক সমন্বিত গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত তৈরি করে। সেই আন্দোলনের সূত্র ধরে সরকার প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ এখন হয়ে উঠেছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণের সম্ভাব্য ভিত্তি। এ সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৭ দফা অঙ্গীকার, যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নারী প্রতিনিধিত্ব, মানবাধিকার সুরক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার রূপরেখা।
এ সনদকে কেন্দ্র করে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত এক মাস ধরে দেশের ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপে বসছে। সংলাপ এখন সমাপ্তির পথে এবং কমিশন বলছে, তারা ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ করবে। সেটি দুয়েকদিন বাড়তে পারে।
তবে এ ঐক্য প্রক্রিয়া এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে গেছে, সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি বিষয়ে। বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো এতে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। আর এ নিয়েই জমেছে রাজনৈতিক উত্তেজনা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে গঠনমূলক ঐকমত্য
বিগত দেড় দশকে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রশ্নে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে মীমাংসার পথে এগিয়ে নিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংলাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। কমিশনের প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, একটি ৫ সদস্যবিশিষ্ট বাছাই কমিটি গঠিত হবে (প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, বিরোধী দলের ডেপুটি স্পিকার ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধীদলের প্রতিনিধি)। কমিটি ১২ জন সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টার নাম প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করবে। ঐকমত্যে পৌঁছানো না গেলে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট থেকে দুজন বিচারপতি যুক্ত হয়ে ৭ সদস্যে পরিণত হবে কমিটি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং পদ্ধতিতে।
বিএনপি এ র্যাঙ্কড চয়েস পদ্ধতির বিরোধিতা করে বলছে, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংসদকেই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি মনে করছে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পলিটিক্সের কারণে সেখানে ঐকমত্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে কমিশনের প্রস্তাবই বাস্তবসম্মত ও নিরপেক্ষ। সব পদ্ধতি ব্যর্থ হলে তখন শেষ উপায় হিসেবে সংসদে যাওয়া যেতে পারে।
জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘সংসদে ৫-৬টি দল থাকলেও এ সংলাপে ৩০টিরও বেশি দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। গণতন্ত্রের সত্যিকারের বহুত্ববাদ এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।’
নারী প্রতিনিধিত্ব : পথ অনেক বাকি
নারী প্রতিনিধিত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মৌলিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। তবে তা কীভাবে হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ আছে।
কমিশনের খসড়া প্রস্তাবনায় রয়েছে- বিদ্যমান ৫০টি সংরক্ষিত আসন অক্ষুণ্ন রাখা হবে। ধাপে ধাপে তা ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে। সরাসরি নির্বাচনেই নারীদের প্রতিনিধি করা হবেÑ এ দাবির পক্ষে মত দিয়েছে অধিকাংশ দল।
বিএনপি জানিয়েছে, তারা আসন্ন নির্বাচনে ৫ শতাংশ (১৫ আসন) ও পরবর্তী নির্বাচনে ১০ শতাংশ (৩০ আসন) নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। দলটির অবস্থান, ‘নারীদের ক্ষমতায়ন কোটা দিয়ে নয়, সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত হোক।’
সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি : রাজনীতির নতুন বিভাজনরেখা?
জাতীয় ঐকমত্যের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ প্রশ্নটি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির মতে, “জুলাই সনদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে একে কেউ কেউ ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে, যা ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের নতুন বিতর্ক তৈরি করবে।”
তারা আরো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ধারণা চালু হয়ে গেলে অতীত ও ভবিষ্যতের অন্য অভ্যুত্থান ও আন্দোলনগুলোও একই ধরনের স্বীকৃতির দাবি তুলতে পারে, যা সংবিধানের নিরপেক্ষতা ও স্থায়িত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে বিএনপি চায়
বিএনপি চায় সনদটি একটি রাজনৈতিক দলিল হিসেবে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষণ হোক। সংবিধানের ৪র্থ তফসিলে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ থাকুক (বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে)।
অন্যদিকে এনসিপি, ছাত্র জোট, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সনদের পুরোটা বা মূল দফাসমূহকে ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠার পুনঃঅঙ্গীকার’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে চায়।
কমিশনের ভূমিকা ও সংকট নিরসনে উদ্যোগ
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫০টি প্রস্তাবনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক ঐক্যের সূচনা। তবে কিছু জায়গায় মতবিরোধ থাকলেও সংলাপ বন্ধ হয়নি।’
তিনি নিশ্চিত করেছেন, কমিশনের তরফ থেকে একটি চূড়ান্ত খসড়া দলগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার পর ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ পেশ করা সম্ভব হতে পারে।
যেসব মৌলিক ইস্যু এখনও অমীমাংসিত
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এখনো বেশকিছু মূল কাঠামোগত ও সাংবিধানিক ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ (উচ্চকক্ষ) গঠন: উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠন হবে, এর সদস্যদের নির্বাচন বা মনোনয়ন পদ্ধতি কী হবে- এ বিষয়ে এখনো কোনো সমন্বিত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতি: সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে (৫০ থেকে ১০০) প্রাথমিক সমষ্টিগত সম্মতি থাকলেও তা সরাসরি ভোটে হবে, নাকি মনোনীত আসনে রাখা হবে- এ নিয়ে স্পষ্টতা নেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ ও মেয়াদ: প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া (র্যাঙ্কড চয়েস বনাম সংসদ নির্ধারণ) এবং মেয়াদের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি সমাধানে আসেনি।
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) বা নিয়োগ কমিটির কাঠামো: এনসিসি গঠন বা নিয়োগ পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কীভাবে কার্যকর থাকবে। তা জানা যায়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ক্ষমতা: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়নি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা : সংশোধনের প্রক্রিয়া, নিয়ন্ত্রণ এবং কতবার কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে- এগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ: উচ্চ আদালত ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিচার বিভাগ থাকলে তার কাঠামো কী হবে- সেটি এখনো আলোচনাাধীন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল সীমাবদ্ধতা: এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন বা মোট কত বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারবে- এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধান হয়নি ।
এমপি কী কী পদে থাকতে পারবেন: একজন সংসদ সদস্য কতগুলো সরকারি বা সাংগঠনিক পদজুড়ে রাখতে পারবেন- এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়নি।
নির্বাচনের সীমানা (আলোচনা : নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ) : সীমানা নির্ধারণের জন্য স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ- এগুলো এখনো সমাধান হয়নি।
নাগরিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ বিষয়ক বিধান: নাগরিক মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং অপরাধীদের সংসদীয় অংশগ্রহণ কঠোরভাবে সীমিত করার জন্য আইন সংশোধন- এক্ষেত্রে বিভিন্ন দলে মতবিরোধ রয়ে গেছে ।
ভবিষ্যতের পথ
৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সনদ চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রয়াস অব্যাহত আছে, কিন্তু এ ইস্যুগুলোর সমাধান না হওয়ায় ‘সামগ্রিক চূড়ান্ত ঐকমত্য’ কঠিন হয়ে পড়ছে।
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ গত ২৯ জুলাই মঙ্গলবার বলেছেন, আজ প্রাথমিক খসড়া দেওয়া হয়ে যাবে। তবে সব বিষয়ে ঐকমত্য আশা করা যায় না, যা বাস্তবধর্মী পরিকল্পনার অংশ।
বিরোধপূর্ণ ৯টি ইস্যু আগামী নির্বাচন এবং জাতীয় সংলাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, আলোচনায় উত্তরণের প্রতি আর সাধারণ বিষয়গুলোয় ইতোমধ্যে তৈরি ঐক্য জাতীয় সনদ উপস্থাপনার কাঠামো হতে পারে। বাকিগুলো পরবর্তী আইন ও নির্বাচিত সরকারের আলোচনায় যাওয়ার নির্দেশনা হিসেবে টেনে রাখা যেতে পারে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ইতোমধ্যে ১২টি বা তার বেশি বিষয়ে ঐকমত্য বা আংশিক ঐকমত্য গঠন করেছে, কিন্তু এখনো যে ৮-১০টি মূল মৌলিক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে, সে বিষয়গুলো মোকাবিলায় আরও গভীর আলোচনা, রাজনৈতিক নমনীয়তা ও সময় প্রয়োজন। সংলাপের মাধ্যমে এগুলো সমাধানে পৌঁছাতে পারলে সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।
জুলাই সনদ কি হবে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের রূপরেখা?
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ কেবল একটি নথি নয়; এটি একটি জাতির আত্মসমীক্ষার ফল। যারা রাস্তায় ছিল, যারা গুম-খুনের শিকার হয়েছে, যারা প্রতিবাদ করেছে এবং যারা আইনি কাঠামোর মধ্যে ফিরে আসতে চায়; সবার কণ্ঠ একত্রিত হয়েছে এ সনদে।
তবে সেই সনদের ভাগ্য এখন নির্ভর করছে একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নে- এটি কীভাবে গ্রহণ করা হবে? আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত একটি নীতিনির্দেশক রূপরেখা? নাকি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত একটি নতুন রাজনৈতিক আদর্শ?
বিএনপি ও তার মিত্ররা তাদের আপত্তি বাস্তব এবং সংবিধানের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে যুক্তিযুক্ত বলে দাবি করে। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম ও নাগরিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে গণতন্ত্রকে সাংবিধানিকভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার তাগিদ ক্রমেই প্রবল হচ্ছে।
৩৬ দিনের জুলাই বার্ষিকীর শেষ দিনগুলো হবে ইতিহাসের পরীক্ষার সময়। যদি রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে, তবে তা হতে পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম। আর যদি তা বিতর্কে থেমে যায়, তবে এটিও ইতিহাসের এক অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে।