ফিরে দেখা জুলাই অভ্যুত্থান-২০২৪

যেভাবে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট হাসিনার


৩১ জুলাই ২০২৫ ১২:৫৬

সৈয়দ খালিদ হোসেন : সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসনের পর শেখ হাসিনাকে ‘একনায়ক’ হিসেবে বিদায় নিতে হলো অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে তাঁর শাসনের পতনের পেছনে দুর্নীতি, ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠা, একগুঁয়েমি, অহংকার ও অতি আত্মবিশ্বাস ছিল অন্যতম কারণ। টানা ক্ষমতায় থেকে একক কর্তৃত্বের শাসনে হাসিনার সরকারকে সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পশ্চিমা বিশ্বকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অবশেষে গণআন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। হাসিনার পতন হলেও সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নির্মূল হয়নি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল দ্রুত নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়াকে জরুরি মনে করায় প্রয়োজনীয় অনেক সংস্কারই বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারকে চাপে রাখায় অনেক উদ্যোগই থেমে যায়।
শুরুটা যেভাবে
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু। আর শেষটা হলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ স্বৈরশাসনের পতনের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম কোটার প্রবর্তন করা হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মোট কোটা ছিলো ৫৬ শতাংশ। যার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫ শতাংশ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ। তবে সমস্যা যেটা হয়, তা হচ্ছে বেশিরভাগ চাকরি প্রত্যাশীদেরই ছিল না কোনো কোটা। অর্থাৎ তাদের সবার প্রতিযোগিতা করা লাগতো মাত্র ৪৪ শতাংশ সিটের জন্য। এ বৈষম্যের কারণে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। তাদের দাবি ছিলো কোটা সংস্কার করা। যেন মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। এছাড়া তখন সরকারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগও ওঠে যে- এই কোটার ব্যবহার করে সরকার তার অনুগত লোকদের সব খাতে বসাচ্ছেÑ যেন সব ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। তাদের দাবির জবাবে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা কোটা পাবে না তো কি রাজাকারের বাচ্চারা কোটা পাবে?’ তার এ বক্তব্যের ফলে ফেটে পরে ছাত্রসমাজ। আরও জোরদার হয় আন্দোলন। কিন্তু সেই আন্দোলন দমাতে সরকার পুলিশ ও ছাত্রলীগকে দায়িত্ব দেয়। একদিকে পুলিশ টিয়ার শেল ছোড়ে ও লাঠি চার্জ করে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর। এ হামলায় বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হামলার ভিডিও ছড়িয়ে যায় দেশ-বিদেশে। সরকার ফেসবুকসহ বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইতোমধ্যেই এ হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে এবং অনেকটা চাপে পড়েই ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপনও জারি করে সরকার।
এরপর কেটে যায় ৬ বছর। ২০২৪-এর ডামি নির্বাচন শেষে ৪র্থ বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শপথ নেয়ার ৬ মাসের মাথায় ৫ জুন ২০২৪ তারিখে ২০১৮ সালের জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং কোটা পুনর্বহাল করা হয়। ফলে আবারও ফুঁসে ওঠে ছাত্রসমাজ। গত বছরের ৫ জুন হাইকোর্ট যখন সরকারি চাকরিতে কোটা বহালের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কেউ তখন ধারণাও করতে পারেনি যে- পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে তাদের টানা দেড় দশকের শাসনের পতন ঘটে যাবে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, “আমাদের কেউ ভাবেনি এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার উৎখাতের দিকে গড়াবে, হাইকোর্টের রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্দোলন শুরু করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রথমদিকে তাদের দাবিকে সেভাবে আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাস্তায় নামে। এবারও তাদের দাবি কোটা সংস্কারের। সরকারের বেশ কিছু মন্ত্রী বলেন তাদের দাবির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছে এবং বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরতে বলেন তারা। শুনানির দিন ধার্য করা হয় ৭ আগস্ট। কিন্তু ছাত্রদের বুঝতে আর বাকি ছিলো না যে, এটা সরকারের একটা কৌশল কোটা পুনর্বহাল করার। কারণ বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রশাসনের সব ক্ষেত্রই আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত। তাই তাদের দাবি ছিলো সংসদে আইন পাশ করে কোটা প্রথা সংস্কার করা।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই চীন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে অভিহিত করেন। তার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সেদিন রাতেই উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকেন, “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানকে ইস্যু করে একে একে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পতিত সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ‎মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ অনেকেই। ওবায়দুল কাদের তার এক বক্তব্যে বলেন, “এসব রাজাকারদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট”। তার এ উসকানিমূলক বক্তব্যের পর নিষিদ্ধ সংগঠন সভাপতি সাদ্দামের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঠিক ২০১৮-এর মতো এবারও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পরে ছাত্রলীগ। লাঞ্ছিত করা হয় নারী শিক্ষার্থীদেরও। তবে এবার আর শিক্ষার্থীরা চুপ থাকেনি। তারাও পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে পালাতে শুরু করে ছাত্রলীদের নেতাকর্মীরা। একে একে দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ছাত্রলীগমুক্ত’ ঘোষণা করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
নিরস্ত্র আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যায় আন্দোলনের গতি বাড়ে
ছাত্রলীগের চেষ্টা বিফলে গেলে মাঠে নামে পুলিশ। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে, টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে এমনকি ছররা গুলিও চালায়। একে একে সব বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। এমন অবস্থায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ নিরস্ত্র অবস্থায় খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পরে আবু সাঈদের হত্যার ভিডিও। এতদিন চুপ থাকলেও আবু সাঈদের মৃত্যুর পর মাঠে নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয় আন্দোলনে। রাজধানীর রামপুরা, উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ দেশের অনেক জায়গায় শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। ১৭ তারিখও ইস্টওয়েস্ট, ব্র্যাক, এমআইএসটি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইম্পেরিয়াল কলেজের ছাত্রসহ সারা দেশে অন্তত ১০ জন নিহত হয়।
পরদিন অর্থাৎ ১৮ জুলাইও চলে সংঘর্ষ। রামপুরায় বিটিভির ভবনে ধরিয়ে দেয়া হয় আগুন। হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া হয় গুলি। একের পর এক খবর আসতে থাকে ছাত্র হত্যার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পরতে থাকে এসব ভিডিও। অবস্থা ক্রমেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট
গত বছরের ১৮ জুলাই রাত থেকে বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্টারনেট। ফলে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বাংলাদেশ। জারি করা হয় কারফিউ এবং রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পতিত সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, শিক্ষার্থীরা ডেটা সেন্টারে আগুন দিয়েছে তাই বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে ছিলো এক ভয়াবহ পরিকল্পনা। সারা দেশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে শুরু হয় ক্র্যাকডাউন। বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা সরকারের অনুগত লোকদের নামিয়ে দেয়া হয় রাস্তায়। এবার আর ছররা গুলি না। চাইনিজ রাইফেল, অ্যাসল্ট রাইফেল ও পিস্তল নিয়ে একে একে গুলি করে মারা হয় নিরস্ত্র ছাত্রদের। শিক্ষার্থীদের বুকে ও মাথায় টার্গেট করে চালানো হতে থাকে গুলি। ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই চলে এ গণহত্যা।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকাশ্যে কম আসে গণহত্যা খবর
ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এ গণহত্যার খবর খুব একটা প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু ২৩ জুলাই ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চাপে ইন্টারনেট চালু করতে বাধ্য হয় সরকার। তবে বন্ধ থাকে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু ভিপিএন’র কল্যাণে সামাজিক মাধ্যমে একে একে প্রকাশ পেতে থাকে নৃশংস গণহত্যার ভিডিও ও ছবি। শুধু তাই নয়, প্রতি রাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাইট বন্ধ করে ব্লক রেইড চালিয়ে আন্দোলনের সাথে জড়িত শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। কারোই আর বুঝতে বাকি থাকে না কেন ইনটারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
৬ সমন্বয়ককে জিম্মি করে বাধ্য করা হয় আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে
তৎকালীন ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে নিরাপত্তার অজুহাতে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখে এবং একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করায় যাতে বলা হয়, তারা সব আন্দোলন প্রত্যাহার করছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বুঝে ফেলে এ বক্তব্য জিম্মি করে আদায় করা। তাই তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়া, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগ এবং সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ ৯ দফা দাবি প্রস্তাব করেন শিক্ষার্থীরা।
মেট্রোরেল পরিদর্শনে হাসিনার কান্নায় ক্ষোভ আরও বাড়ায়
ফ্যাসিস্ট হাসিনা একে একে বিটিভি ভবন, ভাঙচুর হওয়া মেট্রোরেলের স্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে কান্না করেন, যা শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে জন্ম দেয় চরম ক্ষোভ। তারা বলেন, এতগুলো মৃত্যুর চেয়ে মেট্রোরেল আর বিটিভির মূল্য বেশি? একে একে রাস্তায় নেমে আসেন মাদরাসার শিক্ষার্থীরা, অভিভাবক, শিক্ষক, অভিনয় শিল্পী, ব্যান্ড তারকাসহ সর্বস্তরের মানুষ। এমনকি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান রাজধানীর রিকশা চালকরাও। সরকার চাপে পড়ে আশ্বাস দেয় যে সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে এবং আটক ৬ সমন্বয়কদের ছেড়ে দিতেও বাধ্য হয়। নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে ৩১ জুলাই সরকারিভাবে শোক ঘোষণা করা হয়। সারা দেশের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ সেই শোক প্রত্যাখ্যান করে এবং কালোর বদলে লাল রং ধারণ করেন। ৩১ জুলাই সম্পূর্ণ ফেসবুক ছেয়ে যায় লাল রঙের প্রোফাইল পিকচারে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গণজোয়ার
২ আগস্ট বিকেলে প্রায় ২ লাখ লোক জড়ো হন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বয়ে যায় এক গণজোয়ার। অনেকেই একে বলেন, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণঅভ্যুত্থান। সেদিনই ৬ সমন্বয়ক ১ দফা দাবি তুলে ধরেন শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ৪ আগস্ট থেকে ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের। শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, গণভবনের দরজা খোলা আছে। তবে পরদিনই অর্থাৎ ৩ আগস্ট উত্তরা, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বেশ কিছু জায়গায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ হামলা চালায়। সেদিনও নিহত হয় বেশ কয়েকজন। ৩ তারিখ রাতেই ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন পরদিন থেকে প্রতি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। এদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এক জরুরি বৈঠকে বসেন সেনা কর্মকর্তাদের সাথে। সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেনাবাহিনী আর গুলি চালাবে না। তারা সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে। আর এ সিদ্ধান্তের পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায় ছাত্রদের পক্ষে।
৩ ও ৪ আগস্ট মরণ কামড় দেয় সরকার
৩ আগস্ট রাতেই ডিবির হারুন বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার হওয়া প্রায় ১৫০০টি অবৈধ অস্ত্র তুলে দেয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে। ৪ আগস্ট রোববার। সকাল থেকেই অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয় শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনকারীরা জড়ো হতে থাকে শাহাবাগ, সায়েন্সল্যাবসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। বেলা ১১টার পর থেকেই তাণ্ডব শুরু করে অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এবং এ দিন পুলিশ কোনো কোনো স্থানে কিছুটা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সম্পূর্ণ কোটা আন্দোলনে এ ৪ আগস্ট ছিলো সবচেয়ে রক্তাক্ত। এ দিন শিক্ষার্থীসহ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এইদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ কর্মীদের আক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষায় ভূমিকা রাখে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ফলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
লংমার্চ টু ঢাকা ৬ নয়, ৫ আগস্ট
৪ আগস্ট দুপুরে ঘোষণা আসে ৬ আগস্ট লংমার্চ টু ঢাকা অনুষ্ঠিত হবে। তবে সারা দিনে চলা তাণ্ডবের কথা বিবেচনা করে ৬ সমন্বয়ক ঘোষণা দেন পরদিনই অর্থাৎ ৫ আগস্ট হবে লংমার্চ টু ঢাকা। আরও ঘোষণা আসে, যদি সরকার আবার ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়, অথবা ৬ সমন্বয়ককে যদি হত্যা বা গুমও করে ফেলে, তবুও যেন এ লংমার্চ অব্যাহত থাকে। তারা সারা দেশের সাধারণ জনগণকে সেদিন রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাতেই ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে মানুষ। যে যেভাবে পেরেছে, কেউ ট্রাকে, কেউ সিএনজিতে তবে অধিকাংশই পায়ে হেঁটে আসতে থাকেন ঢাকার দিকে। এদিকে ৫ আগস্ট সকাল থেকেই থমথমে ছিলো রাজধানী ঢাকার পরিবেশ। সকাল সাড়ে ১০টায় শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া শুরু করলে আবারও অ্যাকশনে নামে পুলিশ। ছোড়া হয় টিয়ার শেল, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড। তবে ১১টার পর থেকেই শাহবাগে নামতে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঢল। বঙ্গভবন ও গণভবনে বাড়িয়ে দেয়া হয় নিরাপত্তা।
পতনের দিনও আন্দোলন দমানো কঠোর নির্দেশনা ছিল হাসিনার
৫ আগস্ট ১০টায় শেখ হাসিনা ৩ বাহিনীর প্রধান ও পুলিশের আইজিপিকে ডেকে আরও বেশি কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেন। যেকোনো মূল্যেই তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের উপদেশ দেন এবং বলেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আইজিপিও বলেন, পুলিশও বেশি সময় কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না। শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও পুত্র জয়ও বলেন পদত্যাগ করতে। পরে তিনি পদত্যাগে রাজি হন এবং জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ রেকর্ড করতে চান।
শাহবাগে তৈরি হয় জনসমুদ্র, হাসিনাকে সময় বেঁধে দেওয়া হয় ৪৫ মিনিট
৫ আগস্ট বেলা ১১টার পর থেকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, উত্তরা, সাভার দিয়ে কয়েক লাখো লোক ঢাকায় প্রবেশ করে। শাহবাগে তৈরি হয় এক জনসমুদ্র এবং সেই জনসমুদ্র যাত্রা শুরু করে গণভবনের দিকে। পরিস্থিতি ও দূরত্ব বিবেচনা করে সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে ৪৫ মিনিটের সময় বেঁধে দেন। তার ভাষণ রেকর্ডের পক্রিয়াও বাতিল করা হয়। কয়েকটি লাগেজ নিয়ে গণভবন থেকে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা চলে আসেন তেজগাঁও পুরান বিমানবন্দরে। সেখান থেকে তিনি বঙ্গভবনে এসে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়ে আবার চলে যান বিমানবন্দরে। বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে ছাত্র-জনতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর ২টায় সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে ভাষণের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। তবে ২টার কিছু পর থেকেই খবর প্রকাশিত হয়ে যায় যে- শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঢাকার প্রতিটি রাস্তায় নামে আনন্দ মিছিল। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় সারা দেশের সব রাজপথ। জনগণ সব বাধা উপড়ে পৌঁছে যায় গণভবনে। যদিও ততক্ষণে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। উচ্ছ্বাসে, আনন্দে গণভবন থেকে শেখ হাসিনার ব্যবহার করা জিনিসপত্র নিয়ে যেতে থাকে জনতা। যদিও সেদিন রাতের মধ্যেই প্রায় ৮০ ভাগ জিনিস ফিরিয়ে দেন সাধারণ মানুষ। বেলা ৩.৩০ এ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে- শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং শিগগিরই দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হবে এবং সেই সরকারের আধীনে হবে নির্বাচন। আর এভাবেই পতন হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরশাসনের।