চাঁদাবাজি: রাজধানীর পরিবহন খাতেই মাসে ৬০ কোটি টাকা
১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:৩৬
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
চাঁদাবাজি এদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান না হওয়ার জন্য বিশ্লেষকরা সরকার; বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে দায়ী করছেন। সূত্রে প্রকাশ, শুধুমাত্র রাজধানীতে প্রতিদিন ২ কোটি টাকা এবং মাসে ৬০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও এর প্রমাণ মিলেছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের চার হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। তারা এজন্য সরকারকে দায়ী করেছে। কিন্তু সরকার বলছে, কৌশলগত কারণে তারা ধীরে চলো নীতি গ্রহণ করেছে। শিগগিরই সারা দেশে চিরুনি অভিযান চালানো হবে- যাতে কেউ আসামি ধরার পর থানা আক্রমণের সাহস না দেখায়।
তবে আশার কথা চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও বর্বরতা সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও জেগে উঠছে না সমাজপতি, দলনেতা ও প্রশাসনের অধিনায়করা। জুলাই বিপ্লবের পর কয়েকদিন চাঁদাবাজি বন্ধ থাকলেও এখন খোলস বদলিয়ে চলছে নতুন উদ্যমে চাঁদা আদায়। এবারের চাঁদাবাজির ব্যাপ্তি যেন আকাশছোঁয়া। কখনো নীরবে, কখনো-বা উৎফুল্লতার সাথে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। কোথাও পরিচিত, কোথাও-বা অপরিচিত মুখ এক্ষেত্রে নতুন সংযোজন। হয়তো কোথাও দলের সাইনবোর্ড বদল, আবার কোথাও-বা কোনোরকম সাইনবোর্ড ছাড়াই চলছে জোরসে চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজি যেন মানুষের রঙে মিশে গেছে। অপরদিকে চাঁদাবাজির শিকার মানুষ অনেকটা গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে এ সামাজিক দুষ্কর্মের সাথে।
জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়ন তৈরি করে নতুন এক বাংলাদেশ। জাগরণ তৈরি হয় চাঁদাবাজি, রাহাজানি আর বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে পলাতক আওয়ামী প্রেতাত্মাদের যোগসাজশে বিভিন্ন গ্রুপ-গোষ্ঠীর নানা অপকর্ম প্রশ্নবিদ্ধ করছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ভূলুণ্ঠিত করছে জুলাই-আগস্টের মহান চেতনাকে। ঘৃণা আর প্রতিবাদে সোচ্চারে উত্তাল সারা দেশ।
সড়কে বন্ধ হয়নি চাঁদাবাজি
চাঁদাবাজি বন্ধ করা নিয়ে যতই আলোচনা-সমালোচনা, গোলটেবিল আর লেখালেখি হোক না কেন, চাঁদাবাজি বন্ধ নেই কোথাও। গত ১৪ জুলাই সোমবার সরেজমিন ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে সদরঘাট রোডে চলাচলকারী হিউম্যান হুলার গাড়ি থেকে সকালে ৮০ টাকা চাঁদা নিয়ে গেল কথিত মালিক সমিতির নামের লাইনম্যান। গাড়ির হেলপার ৬০ টাকা দিতে চাইলেও অনেকটা জোর করে গাড়িতে উঠে লাইনম্যান এসে টাকাটি নিয়ে গেল। যাত্রীরা সবাই নেমে যাবার পর কথা হয় ড্রাইভার ফরিদুলের সাথে। তিনি জানান, যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে সদরঘাট রোডে চলাচল করতে তাদের ৫টি জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এসব জায়গায় সব মিলিয়ে প্রতিদিন তাকে গড়ে ৬৭০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। রোড খরচ নামে এসব চাঁদা না দিলে তাদের গাড়ি চালাতে দেয়া হয় না বা তারা চাঁদা দেয়া ছাড়া গাড়ি রাস্তায় নামানোর কথা চিন্তাও করতে পারে না। ১৭-১৮ বছর বয়সি এ কিশোর ড্রাইভার জানান, চাঁদা তোলার লাইনম্যানরা প্রায় সবাই আগের আমলের রয়ে গেছে। তবে তাদের পরিচালনাকারীরা পরিবর্তন হয়েছে। এসব লাইনম্যানদের রেখে দেয়া হয়েছে। কারণ তারা চাঁদা তোলার সব সিস্টেম জানে। কেন তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের কাছে অভিযোগ করছে নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এ টাকার ভাগ পুলিশের কাছেও যায়। ছাত্রদের আন্দোলনের পর নতুন সরকার আসার পর কয়েক মাস এ চাঁদা নেয়া বন্ধ ছিল। কিন্তু এখন আগের মতোই আবার শুরু হয়েছে। নতুন করে এ চাঁদা নেয়া শুরু হলে কয়েকজন এর প্রতিবাদ জানালে তাদের গাড়ি অনেকদিন রোডে নামতে দেয়া হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে সবাই চাঁদা দিচ্ছে। তাছাড়া তাদের গাড়িগুলোর কাগজপত্র ঠিকমতো নেই। তাই তাদের অনেকেরই সে ভয়ও আছে। তিনি জানান, আওয়ামী লীগের সময় সব মিলিয়ে দৈনিক এ চাঁদার পরিমাণ ছিল ৮০০ টাকা।
কথা হয় কুমিল্লার চান্দিনা থানার মাধাইয়া টু নবাবপুর রোডে চলাচলকারী সিএনজিচালক আব্দুর রউফের সাথে। রাস্তায় যেতে যেতে তিনি জানান, আপনি নিজেই দেখবেন একটু পর আমরা যখন মাধাইয়া বাজারে পৌঁছাবো কথিত লাইনম্যান এসে গাড়িপ্রতি ৫০ টাকা চাঁদা নিয়ে যাবে। কথামতো তাই দেখা গেল, সিএনজিটি মাধাইয়া বাজার স্ট্যান্ডে পৌঁছামাত্র কথিত লাইনম্যান সাথে সাথে ৫০ টাকা চাঁদা নিয়ে গেল। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর কয়েক মাস এসব চাঁদা বন্ধ ছিল। এতে আমরা অনেক শান্তি ও খুশিতে ছিলাম। কিন্তু এ শান্তি বেশিদিন টেকেনি। বর্তমানে এসব চাঁদাবাজির সাথে ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় বড় দলটি রয়েছে। তাদের ওপরের সারির নেতারা যতই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলুক, তাদের মাঠপর্যাযের নেতারা চাঁদাবাজির লোভ সামলাতে পারছে না।
একইভাবে রাজধানীর জেলা-আন্তঃজেলা এবং নগরের অভ্যন্তরীণ অর্ধশতাধিক পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর দলের নাম ভাঙিয়ে এসব পরিবহন টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ কোটি টাকার বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে। আওয়ামী লীগ আমলের চাঁদাবাজ চক্রটি যেন শুধুমাত্র খোলস পাল্টেছে। সুবিধাবাদী লোকদের কাজে লাগিয়ে নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে থেকে এসব চাঁদাবাজির পরোক্ষ সুবিধা নিচ্ছে তারা। ভুক্তভোগীরা জানান, রাজধানীর সায়েদাবাদে নবী উল্লাহ নবী গ্রুপ মালিক সমিতির নামে চাঁদা ওঠায়। এছাড়া ফকির হাসান নামে শ্রমিকদের আরেকটি গ্রুপ চাঁদা ওঠায়। গাড়িপ্রতি দৈনিক ৫০০-৭০০ টাকা শ্রমিক গ্রুপকে এবং মালিক সমিতির নামে আরো প্রায় ৬০০ টাকা দিতে হয়।
একইভাবে বিভিন্ন মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি ইত্যাদির নাম ব্যবহার করে গাবতলী, মহাখালী, ফুলবাড়িয়া স্ট্যান্ডগুলোয় প্রতিদিন চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। ভুক্তভোগীরা জানান, বর্তমানে এর নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় থাকা বড় দলের কিছু চিহ্নিত নেতাকর্মী। তারা জানান, এমন নয় যে নেতা বা দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা তোলা হচ্ছে, তারা তা জানেন না। বিগত আওয়ামী লীগের সময় চাঁদাবাজিতে টোকেন, রসিদ ও স্টিকার ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে প্রমাণ না রাখার ভয়ে কিছুই দেয়া হয় না, শুধু একটি খাতায় টুকে রাখা হয় অথবা কখনো কখনো টাকার পরিমাণ লিখে মেসেজ দিয়ে রাখা হয়।
ঢাকার ফুটপাত ও এলাকায় এলাকায় সতর্ক চাঁদাবাজরা
রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ডে ব্যবসায়ী সোহাগ চাঁনের নৃশংস হত্যার ঘটনার পর বর্তমানে জনবহুল বিভিন্ন বাণিজ্যিক সড়ক ও ফুটপাতে চাঁদাবাজ চক্র অনেকটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, চাঁদাবাজরা এখন তেমন জোরাজুরি করছে না। অনেকটা নীরবেই চাঁদা নিয়ে কেটে পড়ছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, এটি সাময়িক সময়ের জন্য। কারণ এরা অনেক সংঘবদ্ধ। হয়রানিমুক্ত ব্যবসা করতে হলে তাদের চাঁদা দিতে হবেই।
কথা হয় উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ের সামনে ফুটপাতের ব্যবসায়ী অনিকের সাথে। তিনি জানান, সুপার মার্কেটের সামনের ফুটপাতে নতুন মালিক এসেছে। তাদেরই এখন চাঁদা দিয়ে দোকান বসানো লাগছে। বর্তমানে এখানে কেউ মার্কেট করতে এলে কোনো ভিড় ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করে চলে যেতে পারছেন। আপাতদৃষ্টিতে খুবই ভালো কাজ হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুটপাত খালি করে দেয়া হয়েছে চাঁদা উঠানোর নতুন উদ্দেশ্যে। ফুটপাতের প্রতিটি ছোট দোকানিকে চাঁদা আদায়কারী নতুন মালিকদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে দিতে হবে। এরপর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি মাসে দোকানদারকে নতুন মালিকদের নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিয়েই দোকান চালাতে হবে। চাঁদার দাবিতে গত এক সপ্তাহ থেকে ফুটপাতের দোকানদারদের আর বসতে দেয়া হচ্ছে না সেখানে। ফুটপাতের এ দোকানগুলো সারা দিনই বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বেশ সরগরম থাকত বেচাকেনায়। তবে ফুটপাতের এ দোকানদারদের চাঁদা দেয়া ছাড়া আগেও বসতে দেয়া হয়নি। শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর ফুটপাতের আগের চাঁদাবাজ মালিকরাও পালিয়ে গেছে। ফুটপাতের পুরনো নিয়ন্ত্রণকারী বিদায় নিলেও নতুন নিয়ন্ত্রণকারীরা এসেছে।
কারা এসব মার্কেটের ফুটপাতের দোকান নিয়ন্ত্রণ করেÑ জানতে চাইলে এক দোকানদার বললেন, এটা না বোঝার তো কিছু নেই ভাই। কারা এখন ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক এক দোকানদার বললেন, বর্তমানে পুরো এলাকার চাদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে কালা মানিক গ্রুপ। যার সাথে স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতাদের সম্পর্কের কথা সবাই জানে।
রাজধানীর অন্যতম জনবহুল এলাকা মুগদাপাড়া। বর্তমানে সরকারি একটি হাসপাতাল হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগের সময় সরকারি হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে সরকারি এ হাসপাতালটি ঘিরে শুরু হয় চাঁদাবাজ চক্রের তৎপরতা। হাসপাতালের সামনের ফুটপাত, চারপাশের দেয়াল ঘিরে টং দোকানগুলো থেকে স্থানীয় আওয়ামী-যুবলীগ দীর্ঘদিন হতে চাঁদা আদায় করে আসছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের পর থেকে হাসপাতাল ঘিরে অর্ধশতাধিক টং দোকান থেকে মাসে প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হয় বলে জানা গেছে। পূর্বে আওয়ামী লীগের রাজা গ্রুপ এবং যুব লীগের নূর আলম গ্রুপ এসব দোকান ও ফুটপাত থেকে চাঁদা উঠালেও বর্তমানে আরেকটি বড় রাজনৈতিক গ্রুপের স্থানীয় কয়েকজন নেতার নামে চাঁদা ওঠে বলে জানা গেছে। ছোট ছোট এসব টং দোকান থেকে মাসে ভাড়া বাবদ প্রতিটির জন্য দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে নেয়া হয়। সব মিলিয়ে হাসপাতালের আশপাশের এসব অবৈধ দোকান থেকে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা উঠানো হয়।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অঞ্চল ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। যাদের পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন নেতাদের এবং পলাতক বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ভাঙানো হচ্ছে।
এর মাঝে ইমনের ইশারায় চলে নিউমার্কেট এলাকা, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন এবং তার রাজনৈতিক গুরুর নাম শোনা যায়। আজিমপুর, ইডেন কলেজ, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবনসহ আশপাশের এলাকার ফুটপাতের প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার দোকানের নিয়ন্ত্রণ এখন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন গ্রুপের হাতে। আগে এসব এলাকায় ১৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম ইবু, নুর ইসলাম, সাত্তার মোল্লা, মনির, সৈয়দুর চৈয়্যা, কালা সিরাজ চাঁদা উঠানোর দায়িত্বে ছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের নিয়ন্ত্রকরা পালিয়ে গেলে আগের লাইনম্যানরাই রাজনৈতিক খোলস পাল্টে দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোডের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন নিউমার্কেট থানা যুবদলের এক নেতা। এছাড়া কফি হাউসের গলি ও বাটা সিগন্যাল এলাকাও তাঁর নিয়ন্ত্রণে। নিউমার্কেট থানা আরেক যুবদল নেতা সায়েন্স ল্যাব ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন।
নগরীর গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত লাইনম্যান ছিলেন যুবলীগের হান্নান। এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আরেক নেতা। বঙ্গবাজার থেকে সিটি প্লাজা হয়ে গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত তাঁর কব্জায়।
আর বর্তমানে ফার্মগেট এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সুইডেন আসলামের লোক। আর ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল থেকে তেজগাঁও কলেজ পর্যন্ত প্রায় তিন থেকে চার হাজার হকার প্রতিদিন বসে। বর্তমানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন সাবেক এ কাউন্সিলর।
মতিঝিল ব্যাংকপাড়ার ফুটপাত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাসির উদ্দিন ওরফে ফেন্সি নাসিরের কব্জায় আর তাকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় দিচ্ছেন ব্রাদার্স ক্লাব সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা। রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় হকার বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। অভিযোগ স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলালের হাতে মোহাম্মদপুরের ফুটপাত। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ আর আদাবরে পিচ্চি হেলালের হয়ে চাঁদাবাজি করেন শফিক, টাউন হলের সামনে আলাউদ্দিন, বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডের সামনে হাবীব।
আর সদরঘাটের সাম্রাজ্য সন্ত্রাসী ফিরোজের। সদরঘাট থেকে রায়সাহেববাজার মোড় আর ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে সোহরাওয়ার্দী কলেজ পর্যন্ত সবজি, ফার্স্টফুড, জামাকাপড়, জুতাসহ নিত্যপণ্যের প্রায় তিন হাজার দোকান আছে। এসব দোকান থেকে সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা ওঠে। লাইনম্যান ফিরোজ আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়ে থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের পর এখন স্থানীয় বিএনপি ও কলেজ ছাত্রদল নেতাদের পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করেন।
কারা কী বলছেন
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম জানান, ‘ফুটপাত মানেই টাকার খেলা। যেখানেই হকার, সেখানেই আছে লাইনম্যান-চাঁদাবাজ। আর লাইনম্যানদের অধিকাংশই চাঁদাবাজ আর পুলিশের সোর্স। গণঅভ্যুত্থানের পরও এ ধারা পাল্টাইনি। লাইনম্যান বেশিরভাগ জায়গায়ই আগের জনই আছেন, শুধু রাজনৈতিক শক্তির বদল হয়েছে।’
বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাসিম কবির জানান, ‘অভ্যুত্থানের পরও ফুটপাতে যে যার মতো করে নতুন দোকান বসাচ্ছে। আগের চেয়েও দোকানের সংখ্যা বেড়েছে। আর এতে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছে কয়েকটি পক্ষ।
এসব বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ফুটপাতের দোকানের এখন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যে যার মতো করে দোকান বসাচ্ছে। আগে পুলিশের সঙ্গে মিলেমিশে চাঁদাবাজি করলেও এখন পুলিশের চাঁদাবাজির অভিযোগ নেই। আমরা সড়ক, ফুটপাত দখলমুক্ত করছি। কিন্তু পুলিশের সহযোগিতা তেমন পাই না।’
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, চাঁদাবাজদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে পুলিশ। ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে পুলিশ এখন অনেক সক্রিয়। তিনি জানান, সকলে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে পুলিশের প্রতি জনগণের পূর্ণ আস্থা ফিরে আসবে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, থানায় জিডি করার এক ঘণ্টার মধ্যে রেসপন্স করতে হবে এবং সে সংক্রান্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করতে হবে। চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘ফুটপাতে একদিকে উচ্ছেদ করলে তারা আরেকদিকে দোকান বসায়। ফুটপাতে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপিতে চাঁদাবাজদের কোনো জায়গা নেই। কেউ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়ায়, তার দায় বিএনপি নেবে না।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাঁদাবাজি, অসততা, দখলদারি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। কুরআনের আলোকে দরদি সমাজ গঠনের লক্ষ্যে লড়ছি আমরা। ক্ষমতার লড়াই নয়, মানবতার লড়াই করছি। মানবিক বাংলাদেশ চাই আমরা।’
গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশে দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর। তিনি বলেন, আমরা আর আওয়ামী জামানার ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাই না। সময় এসেছে, এবার যদি পরিবর্তন করতে না পারেন, পরে আফসোস করবেন।