আগে কার্যকর, এরপর নির্বাচন, শেষে সংবিধান সংশোধন বা অনুমোদন

নতুন পথরেখায় সংস্কার


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:১১

॥ ফারাহ মাসুম ॥
রাষ্ট্র সংস্কারে কার্যকর পরিবর্তনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগে সম্মত বিষয় কার্যকর, এরপর নির্বাচন এবং সব শেষে সংবিধান সংশোধন বা অনুমোদনের পথরেখা অনুসরণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এ ভাবনা অনুসারে, চলতি জুলাই মাসের মধ্যে সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হবে। এরপর জুলাই সনদ ঘোষণা করা হবে। তারপর সংস্কারের মধ্যে যেসব বিষয়ে বিধি সংশোধন করলে চলবে, সেসব বিষয়ে বিধি প্রণয়ন বা সংশোধন করবে। আর যেসব বিষয়ে আইন প্রণয়ন বা সংশোধন প্রয়োজন হবে, সেসব বিষয়ে অধ্যাদেশ আকারে নতুন আইন বা সংশোধন জারি করা হবে। সাংবিধানিক পরিবর্তন বা সংশোধনের বিষয়গুলোও রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ আকারে জারি করে তা কার্যকর করবেন আর সব শেষে ঐকমত্য অনুসারে নতুন সংসদ এগুলো অনুমোদন বা পাস করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরে অন্যান্য দেশেও রয়েছে। বিধি ও আইনগত সংস্কারের বাইরে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকার, দ্বিকক্ষ আইনসভা ও আনুপাতিক বা মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রধানত সামনে আসতে পারে। এসব বিষয় বাস্তবায়নের জন্য একটি কৌশলগত রোডম্যাপের কথা বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
বিবেচনা অনুসারে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনকালীন আস্থার সংকটের প্রেক্ষিতে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, দ্বিকক্ষ সংসদ চালু এবং আনুপাতিক বা মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা আংশিকভাবে কার্যকর করার বিষয় চূড়ান্ত হতে পারে। এ তিনটি সংস্কার দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করতে পারে।
সংস্কারের এ পদক্ষেপগুলো চারটি ধাপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে রয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতা ও অন্তর্বর্তী বাস্তবায়ন। এজন্য ১ থেকে ৩ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ সময়ে জাতীয় সমঝোতা ঘোষণা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে নির্বাহী আদেশ বা রুলস অব বিজনেসে অন্তর্বর্তী কাঠামোর বৈধতা প্রদান এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হতে পারে।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হবে এর অন্তর্বর্তীকালীন বাস্তবায়ন ও নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো আনুপাতিক ব্যবস্থায় সম্মত হলে সে ব্যবস্থা অনুযায়ী অথবা প্রচলিত ও আনুপাতিকের সমন্বয়ে মিশ্র ব্যবস্থায় সম্মত হলে সে পদ্ধতি অনুসারে নির্বাচন এবং সংসদ গঠন হবে। এজন্য ৪ থেকে ৬ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।
তৃতীয় ধাপ হবে সাংবিধানিক অনুমোদন ও স্থায়ীকরণের সময়। এ ধাপে ৭ থেকে ৯ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। সংস্কার জন্য আইন পাস করতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলে চলবে। আর সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন প্রয়োজন হবে। ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে গণভোটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে বলে মত দেয়ার গণভোট অনুষ্ঠানের পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও প্রজ্ঞাপনের এ ধাপটি হলো চতুর্থ ধাপ। স্থায়ী বাস্তবায়ন কাঠামো নির্মাণের এ ধাপে ১০ থেকে ১২ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। এ সময়ে ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ ও আসনকাঠামো চূড়ান্ত করা, দ্বিকক্ষ সংসদের নির্বাচন পদ্ধতি ও কর্তৃত্ব নির্ধারণ, নির্বাচনকালীন সরকারের সংবিধানিক স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রয়োগের পদক্ষেপগুলো পার হতে হবে।
এক্ষেত্রে সাধারণভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার অভাব, সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অনিশ্চয়তা, সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ (হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে রিট) প্রশাসনিক ব্যয় ও দক্ষতার ঘাটতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু একটি সর্বদলীয় সংলাপের মাধ্যমে লিখিত ঐকমত্য হয়ে নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কার্যকর করার ব্যাপারে দলসমূহের লিখিত অঙ্গীকার করলে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংসদ গঠনের পর দ্রুত সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করা গেলে এ ঝুঁকি ন্যূনতম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে অন্তর্বর্তী বাস্তবায়ন, পরে সাংবিধানিক বৈধতার এ মডেল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সম্মান করে এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ঐকমত্য কমিশনে গৃহীত ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে কয়েকটি মূল উপাদানের ওপর। যার মধ্যে রয়েছে কমিশনের কাঠামো, তার আইনগত ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণ ও প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার সক্রিয়তা। এর একটি অংশের কাজ এর মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে, বাকিটাও মসৃণভাবে পার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক্ষেত্রে প্রথমত, ঐকমত্যের বৈধতা ও দলিলীকরণ বিষয়ে কমিশনে গৃহীত ঐকমত্যের সিদ্ধান্তগুলো লিখিতভাবে প্রণয়ন ও স্বাক্ষরিত দলিল হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। এই দলিল সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কর্তৃক গ্রহণযোগ্যতা পেলে এটি বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
দ্বিতীয়ত, কমিশনের সুপারিশ/সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করলে মন্ত্রিসভা বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করতে পারে। এটি হলে সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
তৃতীয়ত, ঐকমত্যের বাস্তবায়নে সংবিধান, আইন বা বিধি সংশোধনের প্রয়োজন পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে সংসদে বিল পেশ করে তা পাস করাতে হবে। এটি একটি রাজনৈতিক ও আইনগত প্রক্রিয়া।
চতুর্থত, বাস্তবায়নকারী সংস্থা নির্ধারণ করে প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর বা কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। এসব সংস্থা সময়সীমা, বাজেট ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে।
পঞ্চমত, মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিরীক্ষণের জন্য একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি বা সেল গঠন করা হতে পারে। মিডিয়া ও নাগরিক সমাজও এ পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ষষ্ঠত, জনগণকে অবহিতকরণ ও স্বচ্ছতা ঐকমত্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, ওয়েবসাইট, সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে জনগণকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। এটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে। চূড়ান্তভাবে গণভোট আয়োজন হওয়ায় দেশের সব মানুষ এ সম্পর্কে মতামত জানাতে পারবে।
সংক্ষেপে স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে বিষয়টি এরকম হওয়ার কথা যে, ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে, নির্বাচনকালীন সরকার একটি নির্দিষ্ট নিয়মে গঠিত হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য হয়তো সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। এজন্য সংসদে বিল পাস করতে হবে। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিতে হবে। তারপর প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সেই অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কিন্তু বিবেচ্য ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার আগেই হয়ে গেছে। রাজনৈতিক ঐকমত্য অনুসারে জুলাই সনদ এ মাসেই হতে পারে। এ ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন এবং আইন ও সংবিধান সংশোধনীগুলো অধ্যাদেশ আকারে জারি করে কার্যকর করা হবে। আর সে অনুসারে নির্বাচন ও সংসদ গঠিত হবে। সংসদ আগের ঐকমত্যের সনদ অনুসারে সংবিধানের সংশোধনী ও আইন পাস করবে। পরে গণভোট এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এভাবে আগের পদক্ষেপগুলো সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কমিশনের ঐকমত্য হয় যে, “নির্বাচনের সময় একটি নির্দলীয় তদারকি সরকার গঠিত হবে”, তবে সংবিধানের ৫৮ ধারা সংশোধন প্রয়োজন হবে। সংসদে বিল আনতে হবে এবং ২/৩ ভোটে তা পাস করতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংসদীয় পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশে আইন বা সংবিধান পরিবর্তন করতে সংসদে বিল উত্থাপন, পাসকৃত হলে রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গেজেট আকারে প্রকাশ করতে হয়। এটি তখন একটি আইনগত ও বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।
প্রশাসনিক বাস্তবায়ন ও আমলাতান্ত্রিক প্রস্তুতি শেষে আইন পাসের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর (যেমনÑ নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) তা বাস্তবায়ন করে। বাজেট, জনবল, নির্দেশিকা সব ধরনের বাস্তবায়নের অংশ হবে। মনিটরিং ও নাগরিক পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়ন পর্যায়ে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নির্দলীয় বা সহায়ক নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের ধাপ অনুসারে সংবিধানের ৫৮খ-৫৮চ ধারা পুনঃস্থাপন/সংশোধন প্রয়োজন হবে। এরপর সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনী বিল উত্থাপন ২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে পাস করতে হবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক শর্ত হলো সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলকে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। তা না হলে এটি বাস্তবায়ন করা যাবে না।
দ্বিকক্ষ আইনসভার ক্ষেত্রে একইভাবে ধাপগুলো পার হতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি মাত্র আইনসভা রয়েছেÑ জাতীয় সংসদ (এককক্ষীয়)। দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা মানে দুটি সংসদীয় কক্ষÑ উপরকক্ষ ‘সেনেট’ বা ‘জাতীয় পরিষদ’ এবং নিম্নকক্ষ বর্তমান জাতীয় সংসদ। এটি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানে নতুন অধ্যায়/অনুচ্ছেদ সংযোজন প্রয়োজন হবে। সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনী বিল উত্থাপন ২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে পাস করতে হবে। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারি হবে। নতুন কক্ষ গঠনের জন্য আইন, নির্বাচন পদ্ধতি ও সাংবিধানিক ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে। কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্নে উপরকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হবে, না মনোনীত হবে, এর মেয়াদ, ক্ষমতা, ভূমিকা কী হবে- এ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও পলিসি আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
আনুপাতিক বা মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফার্স্ট-পাস্ট, দি-পোস্ট-এফপিটিপি ব্যবস্থা চালু আছে। যার আওতায় একটি আসনে যে বেশি ভোট পায়, সে জয়ী হয়। আনুপাতিক ব্যবস্থায় ভোটের শতকরা অনুপাতে দলগুলোর আসন বরাদ্দ হয়। এটি চালু হলে সংসদে বিচিত্র মতাদর্শ ও ছোট দলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়বে। আর মিশ্র ব্যবস্থা হলে সংসদের কিছু আসন প্রচলিত এবং কিছু আসন আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতে পারে। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনী আইন বা আরপিও এবং সংবিধান দুটিই সংশোধন করতে হবে। এজন্য সংসদে বিল উত্থাপন ও ২/৩ ভোটে পাস করতে হবে। নির্বাচন কমিশন নতুন নির্বাচনী নকশা তৈরি করবে। পিআর তালিকা প্রণয়ন ও দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো আনুপাতিক ব্যবস্থায় না গিয়ে প্রথমবারের মতো মিশ্র পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বস্তুত, বাংলাদেশে এ তিনটি সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠায় সংবিধান সংশোধন ও রাজনৈতিক সমঝোতা। ১০০ নারী আসন এবং সেগুলো কোন পদ্ধতিতে পূরণ হবে, সেটি চূড়ান্ত হলে একই পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো অনুসারে সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন (আর্টিকেল ৭)। সংবিধানের বাইরে বা পরিপন্থি কিছু রাষ্ট্রপতির আদেশেও কার্যকর নয়, যদি তা সংসদে অনুমোদিত না হয়। অতএব, নির্বাচনকালীন সরকার, পিআর বা দ্বিকক্ষ সংসদ সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে তা আগে থেকে অথবা পরে অনুমোদনের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে বৈধ হতে হবে।
আর বিশেষ রাজনৈতিক সংকটে সম্ভাব্য তিনটি বিকল্প পথ (রাজনৈতিক উপায়) রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রথমত, রাজনৈতিক সমঝোতায় অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক চুক্তি ও রুল অব বিজনেসের মাধ্যমে প্রশাসনিক বাস্তবায়ন (অস্থায়ী)। রাজনৈতিক দলগুলো একটি “জাতীয় সমঝোতা ঘোষণা” দিতে পারে, যেখানে নির্বাচনকালীন সরকার বা পিআর পদ্ধতি সাময়িকভাবে প্রয়োগের ঘোষণা থাকবে। এটি রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক পরামর্শে বা নির্বাহী আদেশে সাময়িকভাবে চালু হতে পারে। পরবর্তীতে নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধন করে এটি স্থায়ী ও বৈধ করা হয়।
এটি বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের পর ব্যবহৃত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় (১৯৯৪) নির্বাচনপূর্ব অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়েছে। নেপালে গণপরিষদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সংবিধান গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার (অনানুষ্ঠানিকভাবে আগে কার্যকর, পরে আইনি অনুমোদন করা) হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, রুলস অব প্রসিডিউরে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে অন্তর্বর্তী কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে ‘নির্বাচনকালীন প্রশাসনের জন্য বিশেষ নির্বাহী কমিটি’ গঠন করতে পারে। এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনের পরামর্শে দায়িত্ব ভাগাভাগি করা যায়। উদাহরণ হিসেবে, নির্বাচনকালীন সময়ে সচিবদের অধীনে প্রশাসন পরিচালিত হয়, যার জন্য আলাদা আইন ছাড়াও আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়।
তৃতীয়ত, বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যেই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে সংবিধান সংশোধন ছাড়াই একটি ‘সহায়ক সরকার’ মডেল তৈরি করতে পারে। একে প্রশাসনিক নির্দেশিকা বা মন্ত্রিপরিষদ নির্দেশনার মাধ্যমে কার্যকর করে, নির্বাচন শেষে সংবিধানে যুক্ত করে স্থায়ীকরণ করা যায়।
সংস্কার বাস্তবায়নের শ্রেষ্ঠ রোডম্যাপ কী হতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞদের মত হলো, আগে কার্যকর, পরে অনুমোদন দুর্বল ব্যবস্থা হলেও সম্ভব। যদিও আগে আইনি অনুমোদন, পরে কার্যকর করা নিরাপদ, সম্ভব এবং টেকসই। তবে অন্তর্বর্তী চুক্তি, নির্বাচন এবং পরে স্থায়ীকরণ দুইয়ের মাঝামাঝি বেশি সম্ভব বাস্তবতার দাবি এবং কার্যকর।
সার্বিক বিবেচনায় রাজনৈতিকভাবে অন্তর্বর্তী সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ও পিআর ব্যবস্থা আংশিক চালু করে নির্বাচন শেষ করা যেতে পারে। তবে নতুন সংসদ গঠনের পর দ্রুত সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে তা স্থায়ী ও বৈধ রূপ দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করা হচ্ছে।