দেশ নিয়ে বহুমুখী ষড়যন্ত্র
১০ জুলাই ২০২৫ ০৮:০১
॥ ফারাহ মাসুম॥
রাষ্ট্রের নানা কার্যক্রমে হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। এ প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ তৎপরতায় বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ‘নরম অভ্যুত্থান’ ঘটানোর আলোচনা ও সম্ভাব্যতা নিয়ে রাজনৈতিক গুজব নতুন করে অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ধরনের যে কোনো প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আমেরিকার গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্টের আওতায় রাজনৈতিক বা সামরিক ব্যক্তির ওপর চাপ বাড়বে বলেও মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে অন্তর্বর্তী সরকারের পতন ঘটানোর জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও বলা হচ্ছে। এ প্রচারণায় ভারতীয় মিডিয়ার পাশাপাশি কিছু ইউটিউবার নানা সম্ভাবনার কথা বলে যাচ্ছে। দেশের বাইরে থেকে এ ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
এসব প্রচারণায় বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ বৈদেশিক শক্তির আক্রমণ অথবা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন মনে করলে প্রধান উপদেষ্টার সুপারিশ ছাড়াই জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১(ক)-তে জরুরি অবস্থা জারির বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, “যুদ্ধ, বহিঃআক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবনের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রাষ্ট্রপতি ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে পারেন।” অন্যদিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রপতি তার সব কার্যাবলি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উপদেশপ্রাপ্ত হয়ে করবেন, সেসব ব্যতীত যেসব বিষয়ে এ সংবিধানে অন্যত্র (প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ) বলা হয়েছে।” অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির কার্যক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর। জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়েও সংবিধানে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সিদ্ধান্তের কোনো “ব্যতিক্রম” উল্লেখ নেই।
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা যেহেতু এখন প্রধান উপদেষ্টার ওপর অর্পিত, সেহেতু বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরাসরি বা এককভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন না বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি শুধু প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শে এ পদক্ষেপ নিতে পারেন। রাষ্ট্রের বিশেষ পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স অনুসারে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা প্রধান উপদেষ্টার ওপর অর্পিত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, বাংলাদেশে বাস্তব ক্ষেত্রে এক্সট্রা সাংবিধানিক ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী এ প্রসঙ্গে বলেন, জুলাই সনদ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। এর সাথে সাংবিধানিক সংকটের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সাংবিধানিক সংকট হয়নি, হবেও না। সংবিধান বিলুপ্ত বা বাতিলের কথাও কেউ কেউ বলছেন। কিন্তু আদৌ সংবিধান যে নেই, তারা তা ভাবছেন না বা স্বীকার করছেন না। সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া, জুলাই ঘোষণার পর সব মিলে একটা সংবিধান দাঁড়াবে।
আবু হেনা রাজ্জাকীর মতে, দেশে এখন সংবিধান নেই। সংবিধান ছুড়ে ফেলে গেছেন শেখ হাসিনা। তিনি সংবিধান বিলুপ্ত করে গেছেন। প্রথমত, তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি। আর দুই নম্বর হচ্ছে, এ সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যেহেতু সংবিধান নেই, সংবিধানের বাইরের সরকার এবং অলিখিত সংবিধান দিয়ে দেশ চলছে।
রাজ্জাকী আরো বলেন, এখন দেশ চলছে ব্রিটেনের মতো অলিখিত সংবিধানে। দেশ চলছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, সাংবিধানিক সরকারের অধীনে নয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান। সাংবিধানিক সরকারপ্রধান নন। সংবিধানে দুইটা সরকারের কথা বলা আছে, একটা হলো সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে সরকারটা গঠন করবে, সেটি হলো একটা সরকার। আরেকটা সরকারের কথা বলা আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যেটা বাতিল হয়েছিল আবার সাম্প্রতিককালে হাইকোর্ট বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত দেবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কথা সংবিধানে নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো মেয়াদ নেই। তার কর্মকাণ্ড কী, সে ব্যাপারেও বলা নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের আগের সংবিধানে বলা ছিল- প্রধানমন্ত্রীর কার্যাবলি কী? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যাবলি কী? কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু সংবিধানে নেই, তার কার্যাবলিও নেই। বর্তমান সরকারের স্ট্যাটাস হলো একটা অলিখিত সংবিধানে চলছে। ধরে নিতে পারেনÑ দেশ ব্রিটেনের মতো একটা অলিখিত সংবিধানে আছে। কারণ সে যদি মূল সংবিধান ফলো করে, তাহলে তো কোনো স্ট্যাটাসের সরকারই না, সংবিধান মোতাবেক। তাহলে সে ওইটা ফলো করবে কেমনে?
সুপ্রিম কোর্টের এ সিনিয়র এডভোকেট বলেন, রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো এখতিয়ার নেই। সংবিধানই যেহেতু নেই, উনি কীভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, অলিখিত সংবিধানে চলছে দেশ। রাষ্ট্রপতি ‘ব্যক্তিত্বহীন’ বলেই বসে আছেন। সংবিধানে প্রধান উপদেষ্টার পদও নেই। আছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সুতরাং তিনি প্রধান উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান বা এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। রাষ্ট্রপতি যদি ভাবেন যে, তিনি সাংবিধানিক সরকারপ্রধান, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা কিন্তু কোনো সাংবিধানিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই এ রাষ্ট্রপতি এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য প্রযোজ্য নয়। সুপ্রিম কোর্ট ১০৬ ধারা হিসেবে একটা রেফারেন্স দিয়েছেন, সেই রেফারেন্সের ভিত্তিতে দল-মত নির্বিশেষে, আমলা, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানসহ সবাই বঙ্গভবনে উপস্থিত ছিলেন। সুতরাং এ নিয়ে কে কী বলল তা ইম-ম্যাটেরিয়াল; বরং রাষ্ট্রপতি যিনি আছেন বর্তমানে, তিনি যদি ওই সংবিধানের অধীনে হন, তো ওই সংবিধান এখন নেই, তাই তিনি রাষ্ট্রপতিও এখন নেই। কারণ রাষ্ট্রপতি তাকে শপথ পড়িয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রপতি একটি আনুষ্ঠানিক বা প্রটোকলিক পদ; নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত (অনুচ্ছেদ ৫৫)। সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স ও জাতীয় ঐকমত্য অনুসারে প্রধান উপদেষ্টাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নিজে নিজে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন না। প্রধান উপদেষ্টা বললেই তিনি তা করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির নিজস্ব মতামত কার্যকর নয়। ইউটিউবার নবনীতা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি এককভাবে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন বলে উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন পেলে প্রধান উপদেষ্টা অপ্রাসঙ্গিক হতে পারেন বলে এতে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে।
নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের চাপে রাষ্ট্রপতির এককভাবে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে ২০০৭ সালের উদাহরণ সামনে আনা হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। তবে তা ছিল বিরাট রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে এবং অনেকেই সেটিকে নরম অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেন। বলা হয়, সেই সময়ের দৃষ্টান্ত সংবিধানসম্মত ছিল না, বরং একটি ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল।
বিতর্কের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১(ক)-তে জরুরি অবস্থা ঘোষণার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে যুদ্ধ, বহিঃআক্রমণ, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সঙ্কট পরিস্থিতি হতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন, তবে বাস্তবে তা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে হতে হয় (অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুসারে)। ঘোষণাটি গেজেটে প্রকাশ করতে হয়। জরুরি অবস্থা দেশব্যাপী বা দেশের কোনো অংশবিশেষে জারি হতে পারে। জরুরি অবস্থায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬-এর চলাফেরার স্বাধীনতা, ৩৭-এর শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, ৩৮-এর সংঘ গঠনের অধিকার, ৩৯-এর বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ৪০-এর পেশা বাছাইয়ের স্বাধীনতা, ৪২-এর সম্পত্তির অধিকার এবং ৪৩-এর গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যায়।
এ সময় এমন আইন প্রণয়ন বা অধ্যাদেশ জারি করা যাবে, যদি তা সংবিধানের উল্লিখিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনও করে তবুও। অর্থাৎ তখন এমন আইন পাস করতে পারবে, যা সাধারণ সময়ে অসাংবিধানিক হতো। তখন আদালতের সীমিত হস্তক্ষেপ থাকবে। অনেক মৌলিক অধিকারের বিচারযোগ্যতা সেই সময়ে স্থগিত থাকে। জরুরি অবস্থা প্রথমে জারি করা হয় ১২০ দিনের জন্য, পরে সংসদে অনুমোদনসাপেক্ষে প্রতি ১২০ দিনে একবার করে তা নবায়ন করা যায়। নবায়ন চলবে জরুরি অবস্থা চলাকালীন যতদিন প্রয়োজন হবে ততদিন।
ভারতীয় মিডিয়ার প্রচার অনুসারে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ও সেনা নেতৃত্ব মিলে বাংলাদেশের জরুরি অবস্থা জারি ও নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নেই রাষ্ট্রপতি এককভাবে সেটি করতে পারেন। এমনকি শেখ হাসিনা যেহেতু তার পদে থেকে পদত্যাগ করেননি, তাই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চাইলে হাসিনাকে আবার স্বপদে বহাল করতে পারেন। আর এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সমর্থন দিলে সেটি সম্ভব। এ ধরনের চিন্তাভাবনা থেকে রাষ্ট্রপতিকে সম্প্রতি আবার সক্রিয় করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই লাইনে পতিত আওয়ামী লীগের সমর্থক বিভিন্ন ইউটিউবেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পতিত স্বৈরাচারের প্রতি রাষ্ট্রপতির আনুগত্য বহাল থাকাটাই স্বাভাবিক। সেনা নেতৃত্বে নিয়োগও শেখ হাসিনাই দিয়েছেন। এ কারণে ফ্যাসিবাদ সমর্থকরা মনে করছেন তারা শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবেন। এ অবস্থায় দ্রুততম সময়ে জুলাই সনদ গ্রহণ এবং সংবিধান স্থগিত করে গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে এনসিপি। তারা এর আগে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন করার জোরালো দাবিও উত্থাপন করেছিল। সেটি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান স্থগিত হয়ে যায়।
ধারণা করা হয় দরবারে সেনা নেতৃত্বেও বহুল আলোচিত বক্তব্যের সময় নমনীয় অভ্যুত্থান ঘটানোর একটি প্রচেষ্টা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আমেরিকার গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্টের আওতায় রাজনৈতিক বা সামরিক ব্যক্তির ওপর চাপ বাড়বে মর্মে বার্তা আসার পর সে পথ থেকে সরে দাঁড়ানো হয়। সেনা নেতৃত্ব একজন চাকরিজীবী কর্মকর্তা হিসেবে সংবিধান ও সরকারের অধীনে কাজ করেন। তিনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আর সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করলে তা অভ্যুত্থান হিসেবে গণ্য হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, এখন নতুন করে সেই নমনীয় অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য নানা ধরনের প্রেক্ষিত বানানো হচ্ছে। মাঠের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের বিশেষভাবে রয়েছে, তারা তথ্য ও সক্ষমতা থাকার পর চাঁদাবাজি ও দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাহত হয়। এজন্য অজ্ঞাত সূত্রের বিপুল অর্থও খরচ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ও সেনা নেতৃত্ব মিলে একসাথে জরুরি অবস্থা জারি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তবে যদি তারা সংবিধান ভেঙে এমন কিছু করার চেষ্টা করেন, তা হবে সেনা-সমর্থিত অভ্যুত্থান, যা গণতান্ত্রিকভাবে অবৈধ, রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে বহুমাত্রিক চাপে ফেলবে দেশকে।
বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঝুঁকির ম্যাপ দিতে বললে এআই চ্যাটজিপিটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় ২০২৫-২৬ সময়ের জন্য একটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঝুঁকির ম্যাপ উপস্থাপন করে। এতে মূল ঝুঁকি অঞ্চলগুলো, সম্ভাব্য ট্রিগার, প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফলগুলোর বিশ্লেষণ উল্লেখ করা হয়। এই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঝুঁকির ম্যাপ (২০২৫-২৬) এ ঝুঁকির ক্ষেত্র সেনা-সমর্থিত জরুরি অবস্থা বা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এ সম্ভাব্য ট্রিগার বলা হয়, রাষ্ট্রপতি বা সেনাবাহিনীর তরফে অসাংবিধানিক পদক্ষেপ (সরকার এড়ানো, জরুরি অবস্থা, নতুন সরকার), আর এতে অংশগ্রহণকারী শক্তি বলা হয় রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, বিচার বিভাগ। এক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বলা হয়, উচ্চ আর সম্ভাব্য ফলাফল বলা হয় আন্তর্জাতিক অবরোধ, গণআন্দোলন, রাজনৈতিক সহিংসতা, বৈদেশিক সাহায্য স্থগিত হওয়া।
চ্যাটজিপিটির মতে, ঝুঁকির ক্ষেত্র বিরোধীদলের সহিংস আন্দোলন এর সম্ভাব্য ট্রিগার বলা হয় বিএনপি বা বিরোধী জোটের সরকার পতনের ডাক বা সহিংস মিছিল, এক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বলা হয়, মাঝারি-উচ্চ আর সম্ভাব্য ফলাফল বলা হয় সংঘর্ষ, হরতাল, ট্রান্সপোর্ট ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া। ঝুঁকির ক্ষেত্র আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা, সম্ভাব্য ট্রিগার ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে পশ্চিমা দেশের আপত্তি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন আর তাতে অংশগ্রহণকারী শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, আইএমএফ এবং এখানে ঝুঁকির মাত্রা বলা হয় উচ্চ আর সম্ভাব্য ফলাফল বলা হয়, ভিসা নিষেধাজ্ঞা, সাহায্য স্থগিত, ব্যবসায়িক সম্পর্ক খারাপ হওয়া।
এআই চ্যাটজিপিটি উল্লেখ করেছে, ঝুঁকির ক্ষেত্র নির্বাচনকালীন সহিংসতা (২০২৬ স্থানীয়/জাতীয় নির্বাচন ঘিরে) আর সম্ভাব্য ট্রিগার নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও সংঘাতময় প্রচারণা এবং অংশগ্রহণকারী শক্তি রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হলে ঝুঁকির মাত্রা হবে মাঝারি আর এর সম্ভাব্য ফলাফল হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ভোটার অনুপস্থিতি, ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া।
চ্যাটজিপিটি ঝুঁকির ঘনীভবন টাইমলাইন প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করেছে, ২০২৫ মাঝামাঝি সময়ের প্রধান ঝুঁকি হতে পারে রাষ্ট্রপতি/সেনা নিয়ে গুজব ও রাজনৈতিক উত্তেজনা, ২০২৫ শেষ/২০২৬ শুরুতে প্রধান ঝুঁকি হতে পারে অর্থনৈতিক সংকট গভীর হওয়া ও বিরোধী পক্ষ মাঠে নামা, ২০২৬-এর নির্বাচনকালে প্রধান ঝুঁকি হতে পারে সহিংসতা, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া এবং ২০২৬ পরবর্তী সময়ের প্রধান ঝুঁকি হতে পারে ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন বনাম বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস।
চ্যাটজিপিটির নীতিপরামর্শ হলো, সংবিধান রক্ষা এবং রাজনৈতিক সংলাপের পথ উন্মুক্ত রাখা, সেনাবাহিনীর প্রতীকী নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নিশ্চয়তা বিধান, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী কাঠামো ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার, বিচার বিভাগের পুনরুদ্ধার ও অরাজনৈতিকরণ, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার স্বাধীনতাকে কার্যকরভাবে রক্ষা করার পদক্ষেপ নেয়া।