ফ্যাসিবাদের প্রতিবিপ্লবের নীলনকশা প্রকাশ : রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিদায়! অন্তর্বর্তী সরকারে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব

রাষ্ট্র সংস্কারে ঐকমত্য

ফারাহ মাসুম
৩ জুলাই ২০২৫ ১১:৫২

অন্তর্ঘাত, অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেয়ার ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনার কারণে সরকার বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের পথে যেতে চাইছে। এক্ষেত্রে যেসব আভাস পাওয়া গেছে তা হলো- ১. ফ্যাসিবাদের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তার পদ থেকে বিদায় নিতে পারেন। ২. মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করতে সংবিধান স্থগিত করা হতে পারে। ৩. সংস্কারের পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রপতির ঘোষণা বা অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হতে পারে, যা পরবর্তী গণপরিষদ বা সংসদ অনুমোদন দান নিশ্চিত করবে।
একই সাথে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রচলিত সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্তকে নির্বাচিত ধরার একক পদ্ধতির পরিবর্তে এর সাথে আনুপাতিক নির্বাচনকে সমন্বয় করে মিশ্র পদ্ধতি চালু করার চিন্তা করা হচ্ছে। এখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি পক্ষ বিদ্যমান ব্যবস্থা পুরোপুরি বহাল রাখা এবং অন্য একটি পক্ষ পুরোপুরি আনুপাতিক ব্যবস্থা চালু করতে চাইছে। মিশ্র পদ্ধতি চালু করলে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যবর্তী একটি ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির বিদায় : ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তখন বিএনপির বিরোধিতার কারণে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। পরে সরকার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হলে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়। এখন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিবিপ্লবী পরিবর্তনের নীলনকশা প্রকাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে বহাল রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা যে ষড়যন্ত্র করছে, তা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ের কেন্দ্রে রয়েছেন রাষ্ট্রপতি চুপ্পু। আওয়ামী লীগ দাবি করছে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেননি। প্রেসিডেন্ট চুপ্পুও বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র পাননি। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, বাংলাদেশে বিক্ষোভ নাশকতার মাধ্যমে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নেতারা ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে অনুগতদের সহায়তায় দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। আর চুপ্পু শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। অথবা প্রফেসর ইউনূসের সরকারকে বাতিল করে রাষ্ট্রপতি চুপ্পু নতুন অন্তর্বর্র্তী সরকার নিয়োগ দেবেন, যারা স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করবে।
এ ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি বিএনপিও রাষ্ট্রপতির বিষয়ে আগের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছেন বলে জানা যাচ্ছে। পতিত স্বৈরাচারের এ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হলে বিএনপির পরের নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
রাষ্ট্রপতির পরিবর্তনের সাথে সাথে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব একই সাথে এটিও চাইছে রাষ্ট্র যেন নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচার প্রক্রিয়ার পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি বা উপদেষ্টা পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে সংস্কার ও বিচারের ধারা ব্যাহত হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য একসময় জাতীয় সরকারের ব্যাপারে বিএনপি বিরোধিতা করলেও এখন সে অবস্থান থেকে সরে আসার বিষয়ে চিন্তা করছে।
জানা গেছে, দ্রুত সংস্কার শেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান স্থগিত করে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এজন্য যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জুলাই সনদ গ্রহণ করা হবে। এর পরপরই পরিবর্তন সম্পন্ন করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। যদিও রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ জনরা বলছেন, সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এখনো রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে রয়েছেন, তিনি এ পদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন এমন কোনো তথ্য তাদের জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মতো রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের ব্যাপারে বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় স্পষ্ট কিছু নেই। ফলে আগের মতোই সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠানোর মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। ২৪ অক্টোবর ২০২৪ সালে জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর অপসারণ দাবির সংবাদ ছড়িয়েছিল; তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এখনো ‘কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি’।
রাষ্ট্রপতি বর্তমান অবস্থায় পদত্যাগ করলে এটি কীভাবে পূরণ হবে- এ প্রশ্ন নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, যদি বর্তমান রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন, তাহলে সংবিধানের ৫০ ও ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয় এবং তা পূরণ করা হয়। অনুচ্ছেদ ৫০(১)তে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ইচ্ছাকৃতভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে তিনি স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারের হাতে পৌঁছানোর পর থেকেই তা কার্যকর হয়।
অনুচ্ছেদ ৫৪ অনুসারে যদি রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়, অসুস্থতা বা অনুপস্থিতির কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। স্পিকার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে, সংসদের সদস্যদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত কেউ দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে স্পিকার ডেপুটি স্পিকার বা সংসদ না থাকায় এর কোনো বিধান প্রযোজ্য হচ্ছে না।
এ অবস্থায় অনুচ্ছেদ ৪৮(১) এ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে, তা অনুসরণের কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের মতোই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বৈধতার জন্য সুপ্রিম কোর্টের একটি রেফারেন্সের প্রয়োজন হবে। বৃহত্তর জাতীয় প্রয়োজন এবং রাজনৈতিক শক্তিসমূহের ঐকমত্য এর ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাষ্ট্রের চরম সংকট পরিস্থিতিতে যদি এ তিনটি শর্ত একসাথে মিলে যায় যে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ/মৃত্যু/অক্ষম হন, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার কেউই না থাকেন, সংসদ ভেঙে যায় (যেমন নির্বাচনের আগে বা সামরিক হস্তক্ষেপে), তাহলে কারও হাতে বৈধ সংবিধানিক ক্ষমতা থাকবে না রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য পথ হলো সংবিধানের ব্যাখ্যা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স প্রদান করা। অথবা সেনা বা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে একটি অন্তর্বর্তী ‘রাষ্ট্রপতি আদেশ’ জারি করা যেমনটি ১৯৮২ বা ২০০৭ সালে দেখা গেছে।
সংবিধান স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা
পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশে সংবিধান স্থগিত হওয়া সাধারণ বিষয় না হলেও এটি পুরোপুরি অস্বাভাবিকও নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেনা হস্তক্ষেপ বা জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো পরিস্থিতিতে এটি হতে পারে। তবে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা রয়েছে, তাতে সংবিধান স্থগিতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু প্রেক্ষাপটে এটি হতে পারে। প্রথমত, যদি কোনো রাজনৈতিক সংকট বা জাতীয় অস্থিরতা সেনা হস্তক্ষেপকে আমন্ত্রণ জানায়, তাহলে সংবিধান আংশিক বা পূর্ণভাবে স্থগিত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধ, বহিরাগত আগ্রাসন বা অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সময় জরুরি অবস্থা জারি করা হলে মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখা যেতে পারে। তবে তাতে পুরো সংবিধান নয়, নির্দিষ্ট ধারা-উপধারা স্থগিত হয়।
বর্তমান বাস্তবতায় সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকায় রয়েছে। সরকার রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে প্রশাসনিকভাবে, তাই সামরিক পথে যাওয়ার তাগিদ নেই। আদালত, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এখন সক্রিয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও দৃষ্টি থাকায় হঠাৎ সংবিধান স্থগিত করলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করেন। এ কারণে এ মুহূর্তে সংবিধান স্থগিতের কোনো আনুষ্ঠানিক বা প্রত্যাশিত পদক্ষেপ থাকাটা স্বাভাবিক নয়, তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জন্য নাশকতা বা চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হতে থাকলে এমন পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
জরুরি অবস্থা
সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ অনুসারে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ মূলত জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান। এ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয় জাতীয় নিরাপত্তা, যুদ্ধ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে। সংবিধানের ১৪১ ধারা তিনটি উপধারায় বিভক্ত- ১৪১(ক) ধারা জরুরি অবস্থা ঘোষণা যেখানে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিতে পারেন যে, দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবনের জন্য হুমকি। এ ঘোষণা সংসদে অনুমোদিত হতে হবে যদি সংসদ সচল থাকে।
জরুরি অবস্থা সর্বোচ্চ ১২০ দিন পর্যন্ত চালু থাকতে পারে, তবে তা সংসদের অনুমোদনে বাড়ানো যায়। সংসদ না থাকলে তা রাষ্ট্রপতির ঘোষণা জারি করে বাড়ানো যেতে পারে। ১৪১(খ) অনুচ্ছেদ মৌলিক অধিকার স্থগিত করণের জন্য। এ অনুচ্ছেদ অনুসারে জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্রপতি বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ইত্যাদির মতো সংবিধানের নির্দিষ্ট মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখতে পারেন।
১৪১(গ) ধারা জরুরি আইন প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট। এর অধীনে সংসদ বা রাষ্ট্রপতি জরুরি সময় বিশেষ আইন প্রণয়ন করতে পারেন, যা স্বাভাবিক সময়ের সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৪, ১৯৮২, এবং ২০০৭ সালে এ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।
আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন
বাংলাদেশে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন সাংবিধানিকভাবে সম্ভব হলেও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত জটিল ও আপেক্ষিকভাবে অস্বাভাবিক। কারণ এটি বর্তমান একক আসনভিত্তিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মডেল, যা প্রচলিত রাজনীতি ও দলীয় শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে।
বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় বাংলাদেশে প্রতিটি সংসদীয় আসনে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বিজয়ী হন। এতে বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে ৩০-৪০% ভোট পেলেও জয় সম্ভব। অনেক সময় অধিকাংশ ভোট না পেয়েও একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, ছোট দল বা বিকল্প মতাদর্শ বিশালভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থায় জাতীয় বা বড় আকারে ভোট গণনা করে প্রতিটি দলকে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন দেওয়া হয়, সাধারণত দলভিত্তিক ভোট হয় (ব্যক্তি নয়), সংসদে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়, জোট সরকার বেশি প্রচলিত হয়।
বাংলাদেশে আনুপাতিক নির্বাচন-পিআর প্রবর্তন আইনগত দিক থেকে সম্ভব। সংবিধানের ৬৬-৭০ অনুচ্ছেদ কিছু পরিবর্তন করে এবং নির্বাচনী আইন সংশোধনের মাধ্যমে এটি প্রবর্তন করা সম্ভব। সংবিধান আনুপাতিক ব্যবস্থাকে নিষিদ্ধ করে না, তবে বর্তমান কাঠামোকে অনুমানযোগ্যভাবে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ধরেই তৈরি। পিআর ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সহায়ক হয়। ক্ষুদ্র দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বেড়ে যেতে পারে, জাতীয় ঐকমত্যভিত্তিক সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হয়।
প্রচলিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিশেষ সুবিধাভোগী, তাই পিআর সমর্থনে অনাগ্রহী। তাদের যুক্তি- আনুপাতিক ভোটে জোট সরকার প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভঙ্গুর হতে পারে। পিআর ব্যবস্থা চালু করতে হলে ব্যাপক সাংবিধানিক ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তি থাকায় সরকার মধ্যবর্তী একটি ব্যবস্থা নিয়ে আসতে চাইছে। এ ব্যবস্থাকে বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য দল শেষ পর্যন্ত সমর্থন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বেশকিছু দেশ এ ধরনের মিশ্র পদ্ধতি চালু করেছে, যেখানে কিছু আসন এফপিটিপি (ঋরৎংঃ ঢ়ধংঃ ঃযব ঢ়ড়ংঃ) আর কিছু পিআর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, নেপাল পিআর ও এফপিটিপি ব্যবস্থায় নির্বাচন করে। বাংলাদেশেও এ ধরনের আংশিক পিআর ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বাংলাদেশে আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে ও আইনগতভাবে সম্ভব, তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং দলগুলোর ঐকমত্য ছাড়া তা বাস্তবায়ন হবে না। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংস্কার, যা বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিতে পারে।
জার্মানিতে দ্বৈত ভোট পদ্ধতিতে ভোটাররা দুটি ভোট দেন- প্রথম ভোট ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতিতে সরাসরি একজন প্রার্থীকে ভোট দেন স্থানীয় আসনে। দ্বিতীয় ভোট (পিআর)Ñ একটি দলকে ভোট দেন, যা জাতীয় আনুপাতিক আসন নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।
সংসদের মোট আসনের অর্ধেক সরাসরি প্রার্থী দিয়ে পূর্ণ হয়, বাকি অর্ধেক দলভিত্তিক আনুপাতিকভাবে পূর্ণ হয়। কোনো দল যদি সরাসরি এফপিটিপি বেশি আসন জেতে, তবে অতিরিক্ত ‘ওভারহ্যাং সিট’ যোগ হয়। এতে প্রতিনিধিত্ব ও ভারসাম্য রক্ষা হয়।
নিউজিল্যান্ডে ১৯৯৬ থেকে চালু ব্যবস্থায় ভোটাররা দুটি ভোট দেন।
এফপিটিপি ব্যবস্থায় ভোট দিয়ে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন করেন। পিআর ব্যবস্থায় একটি দলকে ভোট দেন। দেশটিতে মোট আসনের মধ্যে ৭২ আসনে স্থানীয় এমপি এফটিটিপি পদ্ধতিতে আসে আর ৪৮ আসন পার্টি লিস্ট বা পিআর এর মাধ্যমে পূর্ণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় দলগুলোকে সংসদে আসার জন্য ৫% ভোট বা অন্তত ১ আসন পেতে হয়। এ ব্যবস্থায় একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন, তাই জোট সরকার স্বাভাবিক।
নেপালের মিশ্র পদ্ধতিতে ভোটাররা দুটি আলাদা ব্যালটে ভোট দেন। এফপিটিপি পদ্ধতিতে ১৬৫ আসনে সরাসরি প্রার্থীকে ভোট দেয়া হয় যাতে প্রথম হওয়া ব্যক্তি বিজয়ী হন, পিআর পদ্ধতিতে ১১০ আসনের জন্য দলকে ভোট দেয়া হয়- যার ভিত্তিতে দল অনুযায়ী আসন ভাগ হয়। নেপালে জাতিগত ও লিঙ্গ ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পিআর তালিকায় নারী, দলিত, আদিবাসী, মুসলিম ইত্যাদি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। এর ফলে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ে, জোট সরকার বেশি হয়, তবে জাতীয় ঐক্য ও বহুত্ববাদের প্রতিফলন দেখা যায়।
বাংলাদেশ চাইলে এসব দেশ থেকে মিশ্র মডেলের রূপরেখা গ্রহণ করে একটি বাস্তবভিত্তিক মডেল তৈরি করতে পারে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশে যদি মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তাহলে সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এফপিটিপি এবং পিআরের সংমিশ্রণ হবে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
সম্ভাব্য এ ব্যবস্থায় ২০০-২৫০ প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন হবে। সংসদের মোট আসন সংখ্যা ১০০ বাড়িয়ে তালিকাভিত্তিক আসন (পিআর) ১৫০ থেকে ১৭৫ দলভিত্তিক ভোটের ওপর আসন বণ্টন করা যেতে পারে। মোট আসন সংখ্যা ৪০০ এর মধ্যে ২০%-২৫% আসন পিআর ভিত্তিতে রাখা যেতে পারে, বাকিটা প্রচলিত পদ্ধতিতে হতে পারে। এ ব্যবস্থায় ভোটাররা দুই ধরনের ভোট দেবেন- এলাকাভিত্তিক ভোট সরাসরি প্রার্থী নির্বাচনের জন্য, দলের পক্ষে ভোট, যা পিআর আসন বণ্টনের ভিত্তি হবে।
দলগুলো তাদের পছন্দসই প্রার্থীদের একটি তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেবে, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে তালিকা থেকে আসন বরাদ্দ পাবে, তালিকায় নারী, সংখ্যালঘু ও সামাজিক গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষণ থাকতে পারে।
এজন্য সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন হবে; বিশেষ করে নির্বাচনী বিধান ও প্রক্রিয়া সম্পর্কিত অনুচ্ছেদে। এজন্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বাড়ানোর দরকার হবে। এ ব্যবস্থা প্রবর্তন হলে ছোট দল ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে, ক্ষমতা একদল বা দুই দলের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়া কমবে, জোট সরকারের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে, গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে।
এর চ্যালেঞ্জসমূহ হলোÑ রাজনৈতিক দলগুলো পিআর ব্যবস্থায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট চিন্তা করতে পারে; বিশেষ করে প্রধান দলগুলো। ভোটারদের মাঝে দ্বৈত ভোট পদ্ধতির জটিলতা থাকতে পারে, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করা ও সাংবিধানিক সংশোধন কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশে মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর জন্য সংবিধানে এবং প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যাপক সাংবিধানিক ও আইনগত সংশোধন করতে হবে। সংশোধনীয় সাংবিধানিক ধারাসমূহের মধ্যে অনুচ্ছেদ ৬৬ রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত; মিশ্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাচনী ভূমিকা ও প্রক্রিয়া সামঞ্জস্য করতে হবে। অনুচ্ছেদ ৬৭, ৬৮ সংসদ সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতির জন্য। বর্তমান অনুচ্ছেদ সদস্য নির্বাচন ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) ভিত্তিক। দলভিত্তিক আসন বণ্টনের জন্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের জন্য বিধান যোগ করতে হবে।
অনুচ্ছেদ ৭০- দলত্যাগ ও নির্বাচনী বাধ্যবাধকতার জন্য সংসদ সদস্য পদত্যাগ ও দলত্যাগ সম্পর্কিত বিধান সংশোধন দরকার হতে পারে যাতে পিআরভিত্তিক আসনে নির্বাচিত সদস্যদের সম্পর্কিত স্পষ্ট বিধান থাকে। অনুচ্ছেদ ৯০, ৯১-এ নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিষয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পিআর ভোট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে হবে।
নতুন ব্যবস্থার জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন আইন, ২০০০ সংশোধন করতে হবে- যাতে ভোটের ধরন ও পদ্ধতি (দ্বৈত ভোট প্রবর্তন) যুক্ত করা যায়। পিআর পদ্ধতির জন্য আইনে নির্দিষ্ট বিধান ও প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দলভিত্তিক আসনের তালিকা জমা ও যাচাইয়ের নিয়মাবলি প্রণয়ন করতে হবে। ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা প্রক্রিয়া সংশোধন করতে হবে। ভোটার সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক নিয়মাবলি তৈরি করতে হবে। সংখ্যালঘু, নারী ও অন্যান্য সংরক্ষিত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করার নিয়ম প্রণয়ন করতে হবে। আসনে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য দলত্যাগে বাধা দিতে সাংবিধানিক নিয়ম রাখতে হবে।
পিআর ভোট ও আসন বরাদ্দ নিয়ে বিরোধিতার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা কমিটি গঠন। সাংবিধান সংশোধনের জন্য প্রস্তাব সংসদে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে (সংবিধান ১৪৭(১))। সংশোধনী বিল আনা ও রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ঐকমত্য গড়ে তোলা আবশ্যক। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রস্তুতি নিতে সময় ও অর্থ সম্পদ বরাদ্দ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যকর করতে বাংলাদেশের সংবিধান ও নির্বাচন আইনকে অবশ্যই সমন্বিত ও ব্যাপকভাবে সংশোধন করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা জরুরি।