সংস্কার নিয়ে দরকার ঐকমত্য, বিরোধে অনিবার্য বিপর্যয়

সমঝোতা না হলে নির্বাচন পিছাবে

ফারাহ মাসুম
১৩ জুন ২০২৫ ০০:৩৫

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমঝোতার পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে। দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আলোচনার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার সাথে কোনো বিরোধ থাকলে তা মীমাংসা করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনার পর ১৩ জুন লন্ডনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূসের সাথে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন, সংস্কার, বিচারসহ অনেক কিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
এই বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনের দিনক্ষণ, সংস্কার ও জুলাই চার্টারসহ যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, এ বৈঠকের কোনো ফরমেট নেই। যেহেতু তারেক রহমান বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতা, তাই প্রধান উপদেষ্টার সাথে মিটিংটি হবে।
সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস ঘোষণা দিয়েছেন আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতে পারে। এর বিপরীতে, বিএনপি এপ্রিল ২০২৬-এর এ সময়সূচি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এ সময়সূচি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করছে না, তারা ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করে।
বিএনপি বলেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানে এ ধরনের বিলম্ব ‘জনগণের হতাশা বাড়িয়েছে।’ সেনাবাহিনী প্রধান, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর আগে ঘোষণা দেন নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে হওয়া দরকার, কারণ দীর্ঘসময় দেশে সেনা মোতায়েন রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। ঈদের দিনে প্রধান উপদেষ্টার সাথে তার শুভেচ্ছা জানাতে যাবার পর ধারণা করা হয় নির্বাচনের নতুন সূচি নিয়ে তিনি বড় কোনো আপত্তি করবেন না।
এছাড়া জামায়াতসহ অন্য কয়েকটি দল জরুরি সংস্কার ও বিচার শেষে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংস্কার ও বিচারের অগ্রগতি হলে এপ্রিলের নির্বাচনে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছে। সর্বশেষ অবস্থায় বিএনপি নিজ দাবি থেকে সরে না এলেও বেশ খানিকটা নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। সেনা ও প্রশাসনের মধ্যে টানাপড়েনে ইন্টারিম প্রশাসনের সার্বিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, দলটিকে সাসপেনশন করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে; বিএনপি এটা শেষ পর্যন্ত সমর্থনও করেছে।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
নির্বাচন ডিসেম্বর ২০২৫-এ না হলে, বিএনপি প্রশাসনের সাথে ‘সহযোগিতা কঠিন’ বলে হুঁশিয়ারি দেয়। বাইরের শক্তির মধ্যে ভারত আগেই ‘স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য নির্বাচন’ দাবি করছে। চীন ও অন্যান্য এশীয় দেশ (যেমন কানাডা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান) অন্তর্বর্তী সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং ‘সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা’তে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক মানুষের মৌলিক অধিকার ও বাক-স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে ২ বিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি মিলার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমর্থন দেবার আশ্বাস দিয়ে সরকার ও বিরোধীদেরকে “হিংসা পরিহার এবং সব পক্ষের মতামতকে সম্মান’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কানাডা সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বাস্তবতা হলো আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা বাড়লেও সেটি অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যাবার অবস্থায় নয়। আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো চাইছে, যাতে বাংলাদেশে নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করে দ্রুত নির্বাচন নিশ্চিত করা হয় ও মানবাধিকার সংরক্ষিত হয়। একইসঙ্গে তাদের অনেকেই ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম ও বিচার প্রক্রিয়ার মান বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
সংলাপ ও আপসের চেষ্টা
বড় দল বিএনপি সরাসরি কোনো ইন্টার পার্টির বা ‘প্রি-পোল’ জোটে অংশ নিচ্ছে না; বরং তারা ব্রডার রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিজ অবস্থান দৃঢ় রাখতে চায়। দলটি মনে করছে, নির্বাচন না হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়বে এবং তা দেশের জন্য ক্ষতিকর ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির জনসমর্থনের হার প্রায় ৪২%, যা একটি শক্তিশালী ভিত্তি । তবে দলটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, নেতৃত্বের অভাব ও ইতিবাচক সম্মিলিত কৌশল না থাকায়, এর রূপায়ণ কিছুটা জটিল হওয়া সম্ভব! দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বর ২০২৫ এ নির্বাচন হতে হবেÑ এটাই বিএনপির অটল দাবি। তবে ইন্টারিম সরকারের সহায়তা পেতে, তারা সংলাপের পথও ওপেন রেখেছে। তাদের কৌশল হলো দলীয় ঐক্য ও জনমত বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক মনোযোগ অর্জনের মধ্য দিয়ে সরকারকে চাপে রাখা।
বিএনপি ২০২৫ সালের মধ্যেই নির্বাচনের দাবি ধরে রাখতে চাইছে এবং সে লক্ষ্যে ১২ পার্টি ও অন্য সহযোগী দলগুলোর সাথে জোট বেঁধে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করছে । একগুচ্ছ বৈঠকের মাধ্যমে তারা সর্বদলীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে চায়, যাতে প্রি-পোল সময়সীমা, প্রতিষ্ঠান সংস্কার ইত্যাদি নিয়ে সমন্বয় সম্ভব হয়। জামায়াতের সাথে বিএনপির দূরত্ব নিয়েও গণমাধ্যমে মাঝে মাঝে ফোকাস করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে দুই দল একই শিবিরে ছিল। এবারের নির্বাচনগুলোতে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। কারণ তাদের মধ্যে সময়, সংবিধান সংশোধন এবং স্বাধীনতা ইস্যুতে পার্থক্য দেখা গেছে ।
বিএনপি এখন একটি সক্রিয়, বহুলগোষ্ঠী-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক লড়াই চালাচ্ছে, আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন পরবর্তী কাঠামো তৈরি করছে। তবে জামায়াতের মতো ঐতিহ্যবাহী সহযোদ্ধাদের অভাবে, এবং সময়সীমা বাস্তবায়নে সরকারি ভিন্নমতের কারণে প্রয়োগে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব, সাংবাদিক মারুফ কামাল খান। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ছে।’ তিনি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছেন ‘দূর হোক রাজনীতির ভ্রান্তিবিলাস, পরাজিত হোক চক্রান্তের কূটাভাস।’
মারুফ কামাল খান তার পোস্টে ‘টোকাইতন্ত্রের ফাঁপরবাজি’ এড়িয়ে ‘পরিণত নেতৃত্ব’কে সঠিক পথে ‘মঞ্জিলে মাকসুদের দিকে’ এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়েছেন যে ‘দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনিবার্য বিপর্যয় ডেকে আনবে’ এবং ‘সমঝোতাই সাফল্যের সিঁড়ি।’
তিনি বলেন, ‘আবেগে নয়, বাস্তবতার আলোকে পথ ও শত্রু-মিত্র চিনে নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করুন তারেক রহমান।’ একই সাথে ‘এখনো নির্ভুল পথের দিশারি হয়ে থাকায়’ বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তিনি ‘অপরিসীম কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করেছেন।
অন্য দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, বিএনপি যেকোনো সময়ই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। নির্বাচন করেই বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়। আমাদের পরিষ্কার কথা, আমরা কোনো বিপ্লবী দল নই, নির্বাচন করেই জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চাই। যখন সবাই চাইবে, একমত হবে, তখন নির্বাচন হবে অসুবিধা নেই।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দল বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন সম্ভব এবং এটা খুবই সম্ভব। আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেবও বলেছেন এ কথা। আমি বিশ্বাস করি, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া সম্ভব।
জামায়াতে ইসলামী বলেছে, এপ্রিলে নির্বাচন হতে পারে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপির বক্তব্য কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে ডেমোক্রেসির মূল কথা হচ্ছে, আপনি আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করবেন, আমি আপনার সাথে ভিন্নমত পোষণ করব। কিন্তু তাই বলে আমি মনে করব না, আপনি আমার শত্রু, আমি মনে করব না, আপনি দেশদ্রোহী হয়ে গেছেন, আপনি গণতন্ত্রবিরোধী হয়ে গেছেন। আমি মনে করব, এটাই গণতন্ত্রের বিউটি।’
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে তারেক রহমানের বৈঠক নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অনেক সুযোগ তৈরি হতে পারে। নতুন একটা দিগন্তের উন্মোচন হতে পারে।’ সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটা বিশেষ মুহূর্তে এসে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে তাদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গত ১৫ বছরের একটা ফ্যাসিস্ট শাসক আওয়ামী লীগ সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই ইনস্টিটিউশনগুলোকে নতুন করে বিল্ডআপ করা একটা ছেলে খেলা নয়। আমি এ কথাটা বার বার বলার চেষ্টা করি, এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ জাতির জন্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি ইজ অ্যা রিয়েলিটি। বিএনপি এমন একটা দল একে যত কিছুই বলুক, তাকে সহজেই শেষ করা যায় না, কখনই যায়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ‘জাতিকে বিভক্ত’ না করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একটা বিষয়ে জাতি ইউনাইটেড যে, আমরা গণতন্ত্র চাই, আমার ভোটটা আমি দিতে চাই, ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চাই। সংস্কার চাই।’
আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিষয়ে দলের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে পার্টিগুলোর কথা বলছেন সেগুলোর সাথে সবচেয়ে বড় বিরোধ বিএনপির। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বিএনপি। একইভাবে জাতীয় পার্টির কাছেও আমরা নয় বছর (এরশাদের শাসনামলে) নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছি। আমরা যেটা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রকে গণতন্ত্রের মতো চলতে দেয়া উচিত।’
অন্যদের ভাবনা ও এপ্রিলে নির্বাচনের যুক্তি
সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, দশকের পর দশক আমরা বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন দেখেছি। যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ পরিষ্কার এখন দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়া উচিৎ। এতে করে লোকালি যেসব প্রশাসনিক অচলাবস্থা বিরাজমান আছে, সেগুলো ফাংশন হয়ে যাবে। দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেওয়া অসম্ভব।
তিনি বলেন, বড় দলগুলো যতই তৃণমূল নেতাদের মনোনয়ন দিক, দিনশেষে স্থানীয় এমপিরা সব জায়গায় নিজেদের ‘মাই ম্যান’ দিয়ে তৃণমূল নেতাদের বিজয় ঠেকিয়ে দেবে। বিশেষ করে এমপিরা কাল্ট পলিটিক্স জিইয়ে রাখতে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেদের লোকেদের জিতিয়ে আনতে চায়।
সজীব উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র মানে শুধুমাত্র সংসদে ৩০০ জন সংসদ সদস্য পাঠানো নয়। বরং সকল সরকারি কাজে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর, পৌরসভার মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ইউপি চেয়ারম্যানরা কোটি কোটি মানুষকে শুধু সরাসরি প্রতিনিধিত্বই করেনা, জনগণকে রাষ্ট্রের স্টেক হোল্ডার বানায়।
২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথম ভাগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রস্তাবের পক্ষে যে যুক্তিগুলো কাজ করেছে বলে মনে হয়, প্রথমত, বিচার ও সংস্কার সম্পন্নের জন্য সময় প্রয়োজন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সম্পদ লুণ্ঠনের করেছে তার বিচার এবং চলমান কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করতে আরও সময় দরকার। তড়িঘড়ি করলে এসব অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, ফলে গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে না।
দ্বিতীয়ত, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও ভোটারদের আস্থা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি জরুরি। সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্যও আরো সময় দরকার।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সময় দিলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আনার প্রস্তুতির সময় ও সুযোগ থাকবে, যা নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি ও বৈধতা দেবে।
চতুর্থত, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি। এর ফলে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও রোডম্যাপ প্রস্তুতিতে নির্বাচন কমিশনের জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করা যাবে।
এ প্রসঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য এসেছে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলেও জনগণের অংশগ্রহণ সঠিকভাবে হলে নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হতে পারে বলে মন্তব্য করছেন ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস।
নির্বাচন, সংস্কার ও অলিগার্ক সংযোগ
একটিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের মতে, নির্বাচন হলে বিএনপি বেশি আসন পাবে- এ ধারণা শুধু তার না, অনেকেরই। কিন্তু সংস্কারের নামে যদি নির্বাচন পেছাতে থাকে, তাহলে সেটি বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণ হবে। কারণ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা একটি ভিডিওতে বলেছেন, বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি, দখলদারি ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত, আর দল এসব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, তারেক রহমানও স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন দলের কেউ দুর্নীতিতে জড়ালে সে ‘আউট’, কোনো আপস হবে না। কিন্তু নেতা কর্মীরা করেই যাচ্ছেন , নিউজ পেপার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব দেখছে দেশবাসী ।
এদিকে, পিনাকী ভট্টাচার্য বার বার দাবি করছেন, সালাহউদ্দিন সাহেবের ছেলে এস আলম গ্রুপের অফিসে বসেন। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে সালাহউদ্দিন সাহেবকে দোষ দেই না। দেশে ফেরার পর তিনি এস আলমের গাড়িতে আনন্দ উদ্যাপন করেছিলেন। তিনি বলেছেন, এত গাড়ি ছিল। কোনটা কার গাড়ি সেটা তিনি জানতেন না। এটা হয়তো সত্যি।
তাছাড়া উনার ছেলে যদি শিক্ষিত হয়ে যোগ্যতা দিয়ে চাকরি করে, তাহলে সেটা দোষের কিছু না। দেশে অনেক বিএনপি-সমর্থক আওয়ামী লীগ বা জামায়াতপন্থি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন- এটাই বাস্তবতা। তবে যেহেতু প্রশ্নটা উঠেছে, সালাহউদ্দিন সাহেব চাইলে পরিষ্কার করে বলতেই পারেন হ্যাঁ, আমার ছেলে ঐ কোম্পানিতে চাকরি করে। চাকরি করা অপরাধ নয়। আবার তিনি চাইলে এটাও বলতে পারেন না, আমার ছেলে সেখানে বসে না, এস আলম গ্রুপের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, পিনাকীর তথ্য ভুল।
পিনাকীর বক্তব্যের উত্তর দেওয়া সালাহউদ্দিন সাহেবের দায়িত্ব নয়। কিন্তু যখন তিনি পিনাকী ও ইলিয়াসের ভিডিওর পর নিজের গুম-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে গুম কমিশনে যান, তখন বোঝা যায় তিনি চাপ অনুভব করছেন। সেই জায়গা থেকে, সন্তানের চাকরি নিয়ে, সত্যটা স্পষ্ট করে বলাই ভালো। সৎ থাকলে সত্য বলতে সমস্যা কোথায়? বরং সত্য বললে মানুষের সম্মান আরও বাড়ে, কমে না।
বিশ্লেষক বলছেন, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি জুলাই চার্টার, ঐক্যমত কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী উচ্চ কক্ষে ভোটারের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টন এবং সাংবিধানিক পজিশনগুলোর নিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করে, অ্যাপয়েন্টমেন্টসহ প্রধান ৭/৮টি ইস্যুতে যৌক্তিক কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পারছেন? যদি পারে, তাহলে নাগরিক কোয়ালিশনের রিসার্চ টিমের মতে, রোজার পর এপ্রিল মাসের নির্বাচনের চেয়ে রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম দুই সপ্তাহ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে অনেক বেটার ও বাস্তবসম্মত বিকল্প। তবে বিএনপিসহ দলগুলো যদি সংস্কারের মৌলিক প্রস্তাবগুলোতে ঐকমত্যে আসতে না পারে, তাহলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং ২০২৬-এর এপ্রিল নয়, নির্বাচন তার থেকেও পেছাতে পারে। কারণ মূল প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারার কারণে, নির্বাচনের তারিখ ক্রমাগত পেছাতে থাকবে।
গত ১৫ মে শহিদুল আলম ও আইরিন খানের নেতৃত্বে নাগরিক কোয়ালিশন ৭টি প্রস্তাব ও দুটি রোডম্যাপের একটি প্রাথমিক খসড়া প্রকাশ করে। এই প্রস্তাবে স্পষ্ট করে বলা হয়, ‘সংস্কারের জন্যই নির্বাচন দরকার’ এবং একইসঙ্গে এ শর্তও রাখা হয় যে, যদি জুলাই চার্টার ও কিছু মূল বিষয়ে ঐকমত্য না হয়, তাহলে আগামী সরকার, গণ আন্দোলন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি থাকে না, দেশে একটা পারমানেন্ট অস্থিরতা তৈরি হয় ও গণ অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশার সাথে বেইনসাফি করা হয় ।
যেহেতু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কোনো কাঠামোগত সংস্কারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি, ধরে নেওয়া যায় সরকার স্ট্রাকচারাল রিফর্মের এজেন্ডা নিয়ে এগোচ্ছে না বরং সাংবিধানিক ও আইনি বিধান নিয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রধান লক্ষ্য।
বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সরকার ঘোষিত এপ্রিলের নির্বাচনের তারিখ প্রত্যাখ্যান করে ডিসেম্বরে ভোটের দাবি তুলেছে এবং একটি রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে কেউ কেউ নাগরিক কোয়ালিশনের খসড়া ১ ফেব্রুয়ারি ২৬-এর নির্বাচনের প্রস্তাব একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে বলে মনে করছেন। কারণ, আমাদের প্রস্তাবে কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম, নতুন ভোটারদের সুযোগ দেওয়া ও আইনি সংশোধনের বিষয়গুলো টেকনিক্যালি বাস্তবায়ন করার পূর্ণ ম্যাকানিজম দেখানো হয়েছে ।
তাদের মতে, ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করতে হলে, একদিকে যেমন সরকার প্রধান প্রফেসর ইউনূসকে এপ্রিল মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের টেকনিক্যাল সমস্যাগুলো অনুধাবন করতে হবে, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত বিএনপিকে ৩০ আগস্টের মধ্যে সংস্কারের মূল বিষয়গুলো, বিশেষত জুলাই চার্টার, উচ্চ কক্ষে আনুপাতিক আসন বণ্টন, দুদক প্রধান, কেয়ারটেকার সরকার প্রধানসহ অন্যান্য সাংবিধানিক পজিশনে দলনিরপেক্ষ নিয়োগ নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া ও প্রধান প্রধান দাবিগুলোতে নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে যেতে হবে।
এসব বিশ্লেষক মনে করেন, জুলাই রেভিউল্যুশানের পর পরিবর্তনের যে অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তারপর সংস্কারের প্রত্যাশা কমাতে কমাতে শুধুমাত্র সংবিধানিক স্বৈরাচার ঠেকানোর মূলনীতির ৭/৮টি দাবিতে নামিয়ে আনার পরেও যদি এসব দাবিতে গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতা না হয়, তবে ১ ফেব্রুয়ারি হোক বা ১ এপ্রিল হোক কোনো দিনের নির্বাচন অর্থবহ হবে না এবং এ নির্বাচনটি একটি অভ্যুত্থানে নিহত ২০০০ শহীদের লাশের প্রতি সরাসরি প্রতারণার শামিল হবে।