ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গিনিপিগ টেস্ট শেষ হবে কবে?
২৫ জুন ২০২৬ ১০:২৯
# ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল করে সুদী ব্যাংকের পাশে দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একশ্রেণির কর্মকর্তা
২০১২: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জঙ্গি তকমা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা
২০১৭: বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জোরপূর্বক সৎ উদ্যোক্তাদের অপসারণ ও এস আলমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
২০১৭-২০২৪: এস আলম গ্রুপ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেনামি ঋণ আত্মসাৎ করে পাচার
২০২৪ (আগস্ট): আওয়ামী লীগ সরকারের পতন; স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে এস আলমমুক্ত হয়
২০২৫: দুর্নীতির সহযোগী মুনিরুল মাওলাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের পদ থেকে অপসারণ (বর্তমানে কারাগারে) ও ওমর ফারুক খানকে নিয়োগ
২০২৬ (এপ্রিল): এমডি ওমর ফারুক খানকে জোরপূর্বক ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ প্রেরণ
২০২৬ (মে): বিতর্কিত সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ
২০২৬ (জুন): আমানতকারীদের তীব্র রাজপথ আন্দোলনের মুখে সম্পূর্ণ পর্ষদ বিলুপ্তকরণ ও প্রশাসক হিসেবে চেয়ারম্যান নিয়োগ
॥ উসমান ফারুক ॥
দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এবং একসময়ের সবচেয়ে লাভজনক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এখন নজিরবিহীন অভিভাবকহীনতায় ভুগছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মালিকানা দখল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের একের পর এক বিতর্কিত ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ ও পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের কারণে ব্যাংকটি এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যাংকের সুশাসন রক্ষা ও সৎ ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ সাজানোর দাবিতে সাধারণ আমানতকারীরা গত দুই মাস ধরে রাজপথে নেমে তীব্র আন্দোলন করছেন। চরম আস্থার সংকট, ব্যাপক আমানত পতন এবং একের পর এক পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার খেলায় এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কী আসলে দেশে কোনো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা রাখতে চায় না? ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করে কী তবে দেশের বিশাল সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার একচেটিয়া ফায়দা করে দেয়ার পথ সুগম করা হচ্ছে। সেই প্রশ্ন এখন সর্বমহলে।
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ফের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে আরাস্তু খানকে দিয়ে ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ২০১৭ সালে রাষ্ট্র, আওয়ামী লীগ সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিকৃত চিন্তার কর্মকর্তাদের যৌথ ডাকাতিতে চেয়ারম্যান পদে আসে এস আলম গ্রুপ। সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বাদ না দেওয়ায় আরাস্তু খানকেও বিদায় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি আমানত কেলেঙ্কারি করে এস আলমমুক্ত হয় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর নতুন করে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে।
স্বাধীন দেশে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করলে সফলতা মেলে। কারো সাহায্য ছাড়াই দেশে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যাংক শুধু গ্রাহকদের আস্থা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস রচনা শুরু করে। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে ফের কুনজরে পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামবিরোধী শক্তির। ব্যাংক রক্ষায় প্রথমবারের মতো আমানতকারীরা সড়কে নেমে আসেন সৎ ও যোগ্য পরিচালক পর্ষদ নিয়োগের দাবিতে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গিনিপিগের অদৃশ্য পরীক্ষা এখনো শেষ করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। বারবার ভুল সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমানতকারী, ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ইসলামপ্রিয় বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংকের নাম না। আমানত, ঋণ, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ডলার ব্যবস্থাপনা, সর্ববৃহৎ নেটওয়ার্ক, কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক, হাসপাতাল সেবা ও পুঁজিবাজার মিলিয়ে এখন স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম স্তম্ভে পরিণত হয়ে গেছে। ইসলামী ব্যাংক বড় ধরনের কোনো সংকটে পড়লে বা ধসে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং বিপর্যয়কর। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার আত্মসাতের চাপ অর্থনীতি নিতে পারবে না।
প্রথমে জঙ্গি তকমা দিয়ে সৎ কর্মকর্তামুক্ত করা দিয়ে শুরু
ইসলামী ব্যাংকের শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হওয়ায় ব্যবসা বাড়তে থাকে ক্রমাগত। এক লাখ কোটি টাকার আমানত উন্নীত হওয়ার দিকে এগোতে থাকলে সর্বপ্রথম ২০১২ সালের দিকে ব্যাংকটির প্রতি কুনজর পড়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের। ‘জঙ্গি তকমা’ দিয়ে ও সৎ কর্মকর্তামুক্ত করার বিতর্কিত মিশন দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের সংকটের সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যাংকটির ওপর প্রথম আঘাত হানা হয়। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা এবং দীর্ঘদিনের দক্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ‘জঙ্গি অর্থায়নের’ তকমা দিয়ে এক ধরনের অঘোষিত উচ্ছেদ অভিযান বা সৎ কর্মকর্তামুক্ত করার মিশন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবুল বারাকাত ব্যাংকটির পেছনে লেগে যায়।
তাদের ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণা ও ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস করার সেই চেষ্টা এখনো চলছে। আবুল বারাকাত প্রথমে জঙ্গি তকমা দেয়ার প্রাণান্তকর ব্যথ চেষ্টা করেও ৫ বছরে সফল হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও ব্যাংকের বাইরে অন্য কোথাও অর্থায়নের তথ্য পায়নি। উপায় না পেয়ে দক্ষ শীর্ষনেতৃত্বকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিতর্কিত ভূমিকার কারণে ব্যাংকটির ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিনের পেশাদার ব্যাংকিং কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে।
২০১৭ সালের শুরুতে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রহসনের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয় তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’-এর হাতে। এই রূপান্তরের প্রথম ধাপে সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অদৃশ্য শক্তির অতি-হস্তক্ষেপের কারণে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হন। আরাস্তু খানকে দিয়ে সকল সৎ কর্মকর্তাদের সরানোর পরিকল্পনা শুরু করে। কিন্তু আরাস্তু খান ঋণ কেলেঙ্কারিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে সরিয়ে সরাসরি এস আলম গ্রুপের ব্যক্তি বসিয়ে শুরু হয় আত্মাসাৎ। আরাস্তু খানের বিদায়ের পর ইসলামী ব্যাংকে শুরু হয় এস আলম গ্রুপের একচ্ছত্র ও অন্ধকার অধ্যায়। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছরে এস আলম গ্রুপ এবং তাদের সহযোগী কাগুজে ও বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে তুলে নিয়ে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করে। এই নজিরবিহীন কর্পোরেট লুটের সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। পুরো সমর্থন ও সহযোগী হয়ে গ্রুপটির পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক। উল্টো বিধিবদ্ধ জমা ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ তারল্য সুবিধা দিয়ে এবং চোখ বন্ধ করে রেখে এই লুটপাটে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে। ইসলামী ব্যাংকের নামে অর্থ ধার দেয় গ্রুপটিকে ঋণ পাইয়ে দিতে।
ফ্যাসিস্টের পতনে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে ইসলামী ব্যাংক
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হয় শেখ হাসিনার সরকার ও আওয়ামী লীগের। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে দেশের ব্যাংকিং খাতেও বড় পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। এরপর ইসলামী ব্যাংক মুক্ত হয় এস আলম গ্রুপের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ দেয়। প্রথম দিকে সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয়। সুুদী ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে এনে চেয়ারম্যান করা হয় দেশের সবচেয়ে বড় শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের। কয়েক মাসের ব্যবধানে ওবায়েদ উল্লাহর দুর্নীতি সামনে চলে আসে। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে ব্যাংকটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা হয়। স্বতন্ত্র পরিচালকদের অধীনে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা শুরু হয় তখন থেকে। দুর্নীতিগ্রস্ত ও এস আলমের সহযোগী মুনিরুল মাওলাকে বাদ দিয়ে এই সময় ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক খানকে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওমর ফারুক খানের যোগ্য নেতৃত্বে ও সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর পরিশ্রমে ব্যাংকটি গ্রাহকদের হারানো আস্থা ফিরে পেতে শুরু করে। আমানতকারীরা আবার ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে শুরু করেন এবং ইসলামী ব্যাংক নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে থাকে।
ফের বাংলাদেশ ব্যাংকের বিতর্কিত ও ভুল সিদ্ধান্ত
যখনই ব্যাংকটি একটু একটু করে সংকট কাটিয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক আবার এক আত্মঘাতী পরীক্ষায় নামে। ভালো পারফর্ম করা সত্ত্বেও এমডি ওমর ফারুক খানকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অদৃশ্য ইশারায় ৪৯ দিনের জন্য ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা ব্যাংকিং মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর পরপরই মে মাসে তৎকালীন চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের আরেক বিতর্কিত সাবেক কর্মকর্তা ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বসিয়ে দেয়।
ইসলামবিরোধী ও ফ্যাসিস্টের দোসর হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া কর্মকর্তা খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের হোয়াটসঅ্যাপে খুরশীদ আলমের বায়োডাটা পাঠানো হয়। তারপরই নিয়োগ দেওয়া হয় দাড়ি-টুপিহীন খুরশীদ আলমকে। যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একজন বিতর্কিত ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিকে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করায় সাধারণ গ্রাহকদের মনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয় এবং মাত্র কয়েকদিনে ব্যাংকটি থেকে ৪ হাজার কোটিরও বেশি টাকার আমানত তুলে নেওয়া হয়।
আমানতকারীদের অভূতপূর্ব আন্দোলন ও পর্ষদহীন ইসলামী ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ক্রমাগত খামখেয়ালিপনা ও পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবার রুখে দাঁড়ান সাধারণ আমানতকারীরা। ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের এর ব্যানারে হাজার হাজার আমানতকারী ও গ্রাহক গত দুই মাস ধরে ঢাকার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সুশাসন ও সৎ পর্ষদের দাবিতে আমানতকারীদের এমন সড়ক আন্দোলন এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এবারই প্রথম সৎ নেতৃত্বের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন আমানতকারীরা। এটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য একটি লজ্জাকর বিষয় যে, ভালো নেতৃত্ব চাইতে হচ্ছে। যেখানে অসৎ ব্যক্তি সরিয়ে ভালো নেতৃত্ব দেয়ার কাজটি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের।
গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ, ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম এবং নতুন করে তারল্য সংকটের মুখে পড়ে গত ১৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ঢাকতে বাধ্য হয়। খুরশীদ আলমসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। বর্তমানে ব্যাংকটিতে কোনো পরিচালনা পর্ষদ নেই। এটি সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক ব্যবস্থায় চলছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংক কী ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস করতে চায়? আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার এবং আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বদল হলেও ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আমলাতান্ত্রিক ও ভুল নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও পরীক্ষামূলক পর্ষদ গঠন প্রমাণ করে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকটিকে একটি ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিতে গুরুতর কিছু প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। তা হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কী দেশে কোনো ইসলামী ব্যাংক চায় না? বছরের পর বছর ধরে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও লাভজনক ব্যাংককে যেভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ নিয়ন্ত্রক সংস্থার আচরণ হতে পারে না।
ইসলামী ব্যাংক ধ্বংস হলে কাদের লাভ
বাংলাদেশে মোট ব্যাংকিং আমানত ও রেমিট্যান্সের একটি বিশাল অংশ শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের দখলে। ইসলামী ব্যাংক যদি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেই বিশাল আমানত ও ব্যবসা দেশের প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর পকেটে চলে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি কি তবে পরোক্ষভাবে সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে লাভবান করার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা? বারবার ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন এবং যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করার এই আত্মঘাতী খেলা বাংলাদেশ ব্যাংক কবে বন্ধ করবে, তার কোনো সদুত্তর নেই।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘সিস্টেমিক্যালি ইম্পর্টেন্ট’ বা অতি-গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই ব্যাংকটি ভেঙে পড়লে দেশের পুরো রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ধসে পড়বে। আমানতকারীদের চলমান সড়ক আন্দোলন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, জনগণ আর কোনো কাগুজে পর্ষদ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাপিয়ে দেওয়া বিতর্কিত কোনো ব্যক্তিকে মেনে নেবে না। ইসলামী ব্যাংককে রক্ষা করতে হলে অনতিবিলম্বে ২০১৭ সালের আগের মূল শরিয়াহ-সচেতন উদ্যোক্তা, দেশের স্বনামধন্য ও সৎ ব্যবসায়ী এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের আমলাতান্ত্রিক ও পক্ষপাতদুষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে ব্যাংকটিকে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে; অন্যথায় গ্রাহকদের আস্থার এই শেষ দেওয়ালটুকু ধসে পড়লে তার মাশুল দিতে হবে পুরো দেশের অর্থনীতিকে। দ্রুত ২০১৭ সালে যাদের কাছ থেকে ব্যাংকটি ডাকাতি করা হয়, তাদের ফিরিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের পরিচয় হবে।