শহীদ ওসমান হাদী: আধিপত্যবাদ বিরোধী নির্ভীক কণ্ঠস্বর

সোনার বাংলা অনলাইন
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:১৩

ওসমান হাদি

মীর লুৎফুল কবীর সা’দী

শহীদ শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশেষ করে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীন অবস্থান তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

​​২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার অন্যতম কারিগর ছিলেন শরীফ ওসমান হাদী। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মুসলিম, দেশ প্রেমিক, ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র ও আগ্রাসী ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

​ইনকিলাব মঞ্চ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের রূপকার​ ওসমান হাদী বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে ভারতের আগ্রাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতেই হবে। এই লক্ষ্যেই তিনি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গঠন করেন, যা রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ​ওসমান হাদী মনে করতেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। ​তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন, গড়ে ছিলেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। ভারতীয় আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র। তিনি বলতেন,’আমাদের প্রয়োজন প্রতিবেশী, কোনো প্রভু নয়।’ ​তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাঁর কবিতার সংকলন ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ (সীমান্ত শরীফ ছদ্মনামে) তরুণদের মাঝে দেশপ্রেমের স্ফুরণ ঘটিয়েছিল। ​ওসমান হাদী কেবল আবেগ দিয়ে নয় বরং যুক্তি দিয়ে আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করতেন। তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে আগামী নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন যাতে সংসদীয় রাজনীতিতে ইনসাফ, ন্যায় ও সততার কণ্ঠস্বরকে জাতীয় সংসদে পৌঁছে দেওয়া যায়। তিনি ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগ সরকারের ‘একতরফা’ পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করতেন এবং বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্কের দাবি জানাতেন।

​গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হওয়ার পর ১৯ ডিসেম্বর তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর এই হত্যাকাণ্ডকে অনেক ছাত্রনেতা ও সমর্থক ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার অপচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাকে ‘হেজেমনি বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক অমর সৈনিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

একজন মানুষের নাম থেকে একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক চেতনার জন্ম নেয়। ইতিহাসে কিছু নাম থাকে যা শুধু কোনো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে না বরং একটি নৈতিক অবস্থান একটি আধ্যাত্মিক দায়িত্বকে প্রতিনিধিত্ব করে। ওসমান হাদী তেমনই এক নাম। হাদী কোনো একক দেহের পরিচয় নয়; হাদী হলেন সেই মানুষ যে সত্যকে দেখেও নীরব থাকে না, যে জুলুম বুঝেও আপস করে না। যে শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ভয়কে অতিক্রম করে চলে। কুরআন বলে,“যারা আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেয় এবং তাঁকেই ভয় করে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না।”
(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩৯)

তাঁর কণ্ঠে ছিল বজ্রধ্বনি কিন্তু সে বজ্র অহংকারের ছিল না, ছিল ঈমানের নিশ্চিততা। তাঁর চোখে যে আগুন তা ঘৃণার নয় তা ছিল হক ও বাতিলের পার্থক্য করার আগুন। কুরআন যাকে ‘ফুরকান’ বলে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করে দেখার ক্ষমতা। “হে মু’মিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান সৃষ্টি করে দেবেন।”
(সূরা আল-আনফাল, ৮:২৯)

ওসমান হাদীর বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে নয় বরং অন্যায়ের শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। তাঁর প্রতিবাদ ছিল ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন বলেছেন, “জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ।”
(সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি)

এই হাদিস যেন ওসমান হাদীর জীবনের ভাষ্য। হাদীর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর দ্বিধাহীন স্পষ্টতা। তাকওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ ছিল তাঁর মাঝে। তিনি জানতেন সত্যকে যদি কৌশলের নামে লুকানো হয়, তবে তখন তা আর সত্য থাকে না। তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক এলিটদের মুখোশ খুলে দিতে তাঁর কলম ও কণ্ঠস্বর কাঁপেনি, কারণ তিনি বুঝতেন, ‘সত্যের ওপর সত্যকে চাপা দেওয়া জুলুমেরই আরেক রূপ।’
কুরআন স্পষ্ট নির্দেশ, “সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন করো না।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:৪২)

এই স্পষ্টতা ছিল তাঁর ইবাদত। কারণ সত্য বলা কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক দায়িত্ব।
যে মৃত্যুকে ভয় পায় না, অত্যাচার তাকে ভয় পায়। একটি প্রজন্ম তাঁর কথায় জেগে উঠেছে, কারণ সে প্রজন্ম দেখেছে একজন মানুষ আছেন, যিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। আর কুরআনের ঘোষণা স্পষ্ট, “বলুন, যে মৃত্যুর হাত থেকে তোমরা পালাতে চাও, সে মৃত্যু অবশ্যই তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে।”
(সূরা আল-জুমুআহ, ৬২:৮)

হাদী এই সত্য বুঝতেন বলেই তাঁর কণ্ঠ কাঁপেনি বরং ফ্যাসিবাদী মসনদ টলে উঠেছিল। কারণ অত্যাচারী জানে, যে মানুষ আখিরাতকে সামনে রেখে কথা বলে, তাঁকে দমিয়ে রাখা যায় না। তাঁর তাকবীর ধ্বনি নিছক স্লোগান ছিল না। ‘আল্লাহু আকবার’ তাঁর কাছে ছিল ক্ষমতার সর্বোচ্চ মালিক মানুষ নয়, রাষ্ট্র নয়, কোনো আদর্শিক এলিটও নয় ক্ষমতার উৎস একমাত্র, শুধুমাত্র আল্লাহ। এই ঘোষণাই ছিল আধিপত্যবাদী চিন্তা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর সবচেয়ে বড় আঘাত।

সবচেয়ে গভীর সত্যটি এখানে ছিল যে, এই বজ্রকণ্ঠ মানুষটি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের সাধারণ। ফজরের আযান থেকে রাতের শেষ প্রহর দুঃখ দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের আবাস ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। কুরআন যাকে বলে, “তারা খাদ্য দান করে আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে।”
(সূরা আল-ইনসান, ৭৬:৮)

ঘরের মাঝে বসে বাংলা বঁটিতে বাঁধাকপি কাটার দৃশ্য তাই কোনো কাকতালীয় নয় বরং এটাই তাঁর দর্শন। বিপ্লব মানে বিলাস নয়; বিপ্লব মানে মানুষের কাতারে নেমে আসা। হাদী ছিলেন আন্তরিকভাবে মনে প্রাণে ধর্মপ্রাণ, কিন্তু কোনো প্রকার সংকীর্ণতায় আবদ্ধ ছিলেন না। কারণ তিনি জানতেন ইসলাম সংকীর্ণ নয় প্রশস্থ, ইসলামের মাঝেই রয়েছে প্রকৃত ইনসাফের বিস্তার। “হে মু’মিনগণ, তোমরা ইনসাফের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও যদিও তা তোমাদের নিজের বিরুদ্ধেই যায়।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৩৫) এই ইনসাফই ছিল তাঁর ইবাদত, তাঁর রাজনীতি, তাঁর মানবতা। আজ তিনি নেই কিন্তু কুরআনের ভাষায় “তোমরা আল্লাহর পথে নিহতদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৪)

শহীদ ওসমান হাদীর ভাষায়, “আমি যখন ইনসাফের লড়াই করি তখন তো সেখানে পরাজয়ের কিছু নেই। বেঁচে থাকলে গাজী হব আর মারা গেলে শহীদ হব”। তিনি বলতেন, “সবাই যখন মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পায় আমি তখন হাসতে হাসতে আল্লাহর কাছে সন্তুষ্টি নিয়ে পৌঁছাতে চাই। যে আমি ন্যূনতম ঐ জীবনটা লীড করতে পারলাম যে আমি ইনসাফের হাসি নিয়ে আমি আমার আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে চাই।”

আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা মাটি, মানুষের ও ইনসাফের পক্ষে কথা বলা ওসমান হাদীর সাথে আমার প্রথম দেখা হল ২৪শে অক্টোবর ২০২৫ জুমু’আবার ন্যাশনাল একাডেমি ফর এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট (নায়েম)-এ ‘ইয়ং এডুকেটরস লিডারশিপ সামিট ২০২৫’ এ। যা আয়োজন করেছিল শিক্ষা অধিকার সংসদ। সেদিন প্রথম সারিতে ওসমান হাদী আমার পাশেই বসেছিলেন। এই প্রথম তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ। তাই অনেক আগ্রহ নিয়েই কথা বলছিলাম ‘ফেইথ, ফ্যামিলি এন্ড ফিউচার অফ দ্য সোসাইটি’ আমাদের ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স ও ন্যাশনাল সেমিনার নিয়ে। এই বিষয়টির প্রতি ওসমান হাদীর যথেষ্ট আগ্রহ থাকলেও অনুষ্ঠান চলাকালীন আর কথা হলো না। ওসমান হাদীর মোবাইল ফোন নাম্বারটা তো এখনো সেভ করা আছে। তাঁর সাথে আবারও কথা হবে, দেখা হবে এরকমই তো আশা করছিলাম গভীরভাবে। কিন্তু মাত্র দু’মাস না হতেই ঘাতকের গুলিতে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে স্বীয় রবের কাছে চলে গেলেন ওসমান হাদী।

কি অসাধারণ, অসামান্য মাত্র ৩২ বছরের এক জীবন। মাত্র সোয়া এক বছরের রাজনৈতিক জীবন! কোন সরকারী পদ নেই, এমনকি কোন রাজনৈতিক দল‌ও নেই কিন্তু রয়েছে দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ব, ভালোবাসা। তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যায় জানাযায় লাখ, লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, হৃদয় নিংড়ানো গভীর ক্রন্দন। যা ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে শহীদ ওসমান হাদীকে। তাঁর খুনিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে এটাই দেশবাসীর একান্ত কাম্য।

একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হচ্ছে: তাকওয়া (আল্লাহ সচেতনতা), তাওয়াক্কুল (আল্লাহ নির্ভরতা) ও ইখলাস (আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা)। শহীদ ওসমান হাদী সম্ভবত এসব গূণগুলোই অর্জন করতে পেরেছিলেন। যে কারণে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে তরুণ প্রজন্মের জন্য আইকন হয়ে গেছেন। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ, আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা তাঁকে অনুসরণীয় মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তাঁকে যথাযথভাবে অনুসরণ কোন মসৃণ পথ নয় তবে এ পথেই রয়েছে নিশ্চিত সফলতা দুনইয়া ও আখিরাতে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক।

শহীদ ওসমান হাদী: আধিপত্যবাদ বিরোধী নির্ভীক কণ্ঠস্বর

সম্পর্কিত খবর