জনগণের ঐক্যই সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:১৫
দেশ-বিদেশে প্রমাণ হয়েছে যে, দেশের জনগণ যখন স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই স্বৈরশাসক হয় পালিয়েছে অথবা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে আফগানিস্তানের আলখেল্লা পরা তালেবানদের ভয়ে শক্তিধর আমেরিকার সৈন্যবাহিনী রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেছে; সাথে সাথে ঐ দেশের স্বৈরশাসকরাও পালিয়েছে। তালেবানরা প্রায় অপ্রস্তুত অবস্থায় ক্ষমতায় বসে এবং ক্ষমতা আস্তে আস্তে সুদৃঢ় করে। আজকে আফগানিস্তানের অর্থনীতি দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান বলে জানা যায়। জনতার ঐক্যের কাছে আফগানিস্তান থেকে ব্রিটিশ, রাশিয়া সর্বশেষ পারমাণবিক শক্তিধর আমেরিকা পালিয়েছে। এভাবেই ভিয়েতনাম থেকে আমেরিকা পালিয়েছে।
কিছুদিন পূর্বে শ্রীলঙ্কা থেকে জনগণের তোপের মুখে সে দেশের শাসকরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে সিরিয়া থেকে স্বৈরশাসকরা মাত্র ১২ দিনের আন্দোলনে ক্ষমতা থেকে পালিয়েছে। বর্তমানে আহমদ আল সারা ক্ষমতা গ্রহণ করেই বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করে ঐ দেশের শাসনতন্ত্র স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ৫ বছর পর জাতীয় নির্বাচন হবে। শক্ত হাতে আহমদ আল সারা দেশ চালাচ্ছে।
আমাদের দেশে আন্দোলন অনেক পূর্ব থেকেই চলে আসছে। যেমন পাকিস্তান-ভারত আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তখন ভারত ও ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রে বৃহত্তর ভারত আর মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে হাজার মাইল দূরের দুটি অংশ নিয়ে পাকিস্তান নামে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটি দেশ গঠন হয়। কিছুদিন পরই ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯ গণআন্দোলন, ৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে বাংলাদেশের উদ্ভব হয়। এ আন্দোলন শেখ মুজিবের নামে হলেও তিনি কিন্তু পাকিস্তান ভাগ করতে চাননি। তিনি গোটা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ফলে তিনি পাকিস্তান আর্মির সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান। পশ্চিম পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় জেনারেল ও ভুট্টো সাহেবের ষড়যন্ত্রে দেশ ভাগ হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে রূপান্তর হয়। ভারতের ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশকে তাদের করদরাজ্যে পরিণত করার সব ফাঁদে আটকিয়ে দেয়। শেখ মুজিব যেহেতু স্বাধীনতা চাননি, তাই দেশে এসে তিনি তাজউদ্দীন সাহেবদের সাথে মতপার্থক্য জড়িয়ে পড়েন। শেখ মুজিব জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফাঁদ নিজেই তৈরি করেন। বাকশালের ভূত তার ঘাড়ে চাপে। সব দল নিষিদ্ধ হয়। ৪টি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়। একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়।
জনগণ ফুঁসতে থাকে। বাকস্বাধীনতার জন্য দেশ স্বাধীন করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করার কারণে দেশের সচেতন জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ¦লতে থাকে। সাড়ে তিন বছরের মাথায় ভারতের ষড়যন্ত্রেই তাকে হত্যা করা হয়।
তখন মেজর জিয়ার নেতৃত্বে দেশদরদি সেনাবাহিনী ভারতের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে জনগণের সমর্থন নিয়ে তিনি দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে দেশের শাসনযন্ত্রে পরিবর্তন আনেন। বিভিন্ন চড়াই-উৎরাইয়ে দেশ এগোতে থাকে। ডান-বাম, ভালো লোকের সমন্বয় করে মেজর জিয়া এগোতে থাকেন। এ শাসন ভারতের মনঃপূত না হওয়ায় তাকেও অকাল মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়। তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি যে, তার অধীনের কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার তাকে হত্যা করতে পারে। যা হবার তাই হলো। হত্যাকারীরা রেহাই পায়নি। এরশাদ সাহেব ক্ষমতা দখল করেন। এটাও জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। তাকেও জনতার আন্দোলনে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। যদিও তিনি দেশ থেকে পালাননি।
ক্ষমতার পালাবদল শুরু হয়। বেগম জিয়া আবির্ভূত হন। বেগম জিয়াও শহীদ জিয়ার আদর্শে ইসলামী দলসহ সমমনা সবাইকে নিয়ে ক্ষমতায় আসেন নির্বাচনের মাধ্যমে। ভারত বসে থাকেনি। ষড়যন্ত্রের জালে দেশ চলে যায়। শহীদ জিয়ার দয়ায় শেখ হাসিনা তার প্রিয় মোদির দেশ থেকে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পায়। তাকে ভারত তাদের হয়ে কাজ করার জন্য সবক দিয়ে দেয়।
দেশের ইসলামপ্রিয় লোকদের ছলেবলে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর কূটচালে আবদ্ধ হয়ে যায়। জাতীয় সংসদে একসাথে বসে দেশ পরিচালনার কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। জোট সরকারে জামায়াতের দুই মন্ত্রী ৫ বছর ৩ মন্ত্রণালয় স্বচ্ছভাবে দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় দেশ চালিয়েছেন। তাদের মন্ত্রণালয়ে আজ পর্যন্ত কোনো দুর্নীতি পাওয়া যায়নি।
অথচ তাদের বিনা দোষে ৫০ বছর পূর্বের ভুয়া অভিযোগে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়। যাতে দেশ-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তুরস্ক তাদের দূতাবাসের লোক প্রত্যাহার করে প্রতিবাদ হিসেবে।
মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের নীতি-নৈতিকতাবর্জিত ভূমিকার ফলে শুরু হয় স্বৈরতান্ত্রিক যাত্রা। হাসিনার স্বৈরশাসনের এবং নির্বাচন পরিবেশ নষ্টের জন্য বিচারপতি খায়রুল হকই মূল দায়ী। তিনি কিন্তু এখনো জেলের বাইরে আছেন। ঐ সময় থেকে একে একে ৩টি ভুয়া নির্বাচনের কারণে হাসিনা লেডি হিটলারে পরিণত হয়। সর্বক্ষেত্রে হাসিনা বন্দনার লোক তৈরি হয়ে যায়। ব্যবসায়ী, আমলা, বিচার বিভাগ, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সবই হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়।
গত ১৬ বছরে দেশের ব্যাংক থেকে শুরু করে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করে বিদেশে সব টাকা পাচার করে, যা বর্তমান সরকার ফেরত আনার চেষ্টা করছে।
আমি আগেই বলেছি, দেশে দেশে সব স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের পতন হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে।
আমাদের দেশের এ লেডি হিটলার হাসিনা ও তার দোসরদের এমনভাবে দেশের টাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল যে, তার বাড়ির পিয়নেরও ৪০০ কোটি টাকা কামানোর পথ করে দিয়েছিল। বাকিরা তো হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।
ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে হাসিনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলেও তা ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রূপ নেয়। গুম, খুন, আয়নাঘরের নির্যাতনের কাহিনী হাসিনার পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। জুলাই-২৪ গোটা মাসটাই শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বক্ষেত্রে হাসিনার দেশদ্রোহী আচরণ প্রকাশ পেয়ে যায়। দেশের আপামর ছাত্র-জনতা প্রাণবাজি রেখে হাসিনার পুলিশ, ছাত্রলীগের গুণ্ডা, সামরিক বাহিনীর কিছু লোক সবাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন বন্ধ করার জন্য প্রকাশ্যে ও হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করে। স্বস্তির বিষয় সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার শক্ত ভূমিকা রেখে বলেন, দেশের জনগণের ওপর গুলি চালাতে পারবে না। সেনাপ্রধানও বিষয়টি আঁচ করতে পেরে হাসিনাকে জানিয়ে দেন। হাসিনা তার দোসরদের নিয়ে বৈঠক করে। কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে ভারতের সাহায্য চেয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। ছাত্র-জনতা মাঠে নামার পরিস্থিতিতে ‘র’ও ভয় পেয়ে যায়। তারা হাসিনার বাসভবন গণভবন থেকেও পালিয়ে জান বাঁচায় এবং হাসিনাকে দ্রুত গণভবন ত্যাগ করতে বলে যায়।
শেষ পর্যন্ত হাসিনা তার নিজস্ব আত্মীয়, সেনাপ্রধানের তত্ত্বাবধানে সামরিক হেলিকপ্টারে দ্রুত তার প্রিয় মোদির আশ্রয়ে চলে যায়। এখনো সেখানেই অপমানিত হয়ে বসবাস করছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করে দেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনে সচেষ্ট হয়’। আর রা’দ : ১১। আয়াতটি বড়, শুধুমাত্র একটি অংশ উল্লেখ করলাম। মহান আল্লাহর বাণীর আলোকে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেয়, মহান আল্লাহ ৫ আগস্ট আল্লাহর ফেরেশতা পাঠিয়ে ছাত্র-জনগণের আন্দোলন সফল করে দেন। শুরু হয় দেশের জন্য নতুন অধ্যায়। ছাত্রদের আহ্বানে বিদেশে অবস্থানরত ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজি হন এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে। প্রত্যক্ষ কোনো গাইডলাইন না থাকায় এনজিও মার্কা লোকদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। বড় ভুল হয়ে যায় বিপ্লবী সরকার না হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বানিয়ে হাসিনার দোসর রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেয়া। ফলে হাসিনার দোসর এবং বিএনপির ভারতীয় দালালরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে এখনো ড. ইউনূস সরকার গত ১১ মাসে যতটুকু সংস্কার, বিচারের পথ এগোনো দরকার ছিল, তা করা যায়নি।
এখনো ভারতপন্থি জাতীয়তাবাদী একটি গোষ্ঠী তড়িঘড়ি করে নির্বাচন দিয়ে তাদের লোকদের যেনতেনভাবে জিতিয়ে এনে দেশের ভেঙে পড়া প্রশাসনে বসিয়ে আগের স্বৈরাচারের কায়দায় দেশ চালানোর ষড়যন্ত্র করছে। গত ২৮ জুন শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী দলের যে মহাসমাবেশ হয়ে গেল, সেখানে বিএনপি ছাড়া ছোট-বড় সব দল উপস্থিত হয়ে লাখো জনতার সামনে বজ্রকণ্ঠে বলেছে, পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে। ভেঙে পড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন ও দোষী ব্যক্তিদের বিচার দ্রুত করতে হবে। দ্রুত জুলাই বিপ্লবের সনদ তৈরি করে প্রয়োজনে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই দেশের ছাত্র-জনতার মূল পরিকল্পনা।
এ ঘোষণায় ভারতপন্থি হিসেবে চিহ্নিত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহর-বন্দরের হাট-বাজার, নদী-নালা, ঘাট সবই দখল করে হাসিনার দোসরদের সহযোগিতা এবং তাদের চুরি করা টাকা কাজে লাগিয়ে প্রশাসনকে কাজ করতে দিচ্ছে না। চাঁদাবাজি আগের চাইতেও বেশি তারা করে বেড়াচ্ছে। ফলে তারা বুঝে গেছে, জনগণ তাদের ভোট দেবে না। তাই যেনতেন করে ভোট করা যায় কিনা, চেষ্টায় আছে।
আমরা দেশের ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে এ দুরভিসন্ধি মোকাবিলা করে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত ভালো মানুষের লোকাল প্রশাসন এবং জাতীয় সংসদের নেতা বানাতে চাই। যে আল্লাহ ৫ আগস্ট ঘটায়ে দিয়েছেন, সেই মহান আল্লাহ আমাদের ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশকে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ব্যবস্থা করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।