প্রসঙ্গ : মুসলিম দুনিয়ার নিরাপত্তা
২৬ জুন ২০২৫ ১০:৪৯
লেখক একেএম রফিকুন্নবী
ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, আন্তর্জাতিক জীবন পরিচালনার গাইডলাইন আল্লাহর শেষ নবী মুহাম্মদ সা.-এর জীবন থেকে আমরা পেয়ে থাকি। নবী মুহাম্মদের গোটা জীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয়।
এ নিবন্ধের আলোচনার বিষয় নিরাপত্তা। আমরা যারা গ্রামে বাস করি, তাদের ঘরবাড়ির নিরাপত্তার জন্য খুব একটা পয়সা খরচ করতে হয় না। সাধারণত কাঁটাওয়ালা গাছ বাড়ির সীমানায় লাগিয়ে অথবা বাঁশের কঞ্চিদ্বারা বেড়া দিয়ে বাড়ির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে থাকি। যারা একটু টাকাওয়ালা, তারা তারকাঁটার বেড়া দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি আর যাদের টাকার পরিমাণ আরো বেশি তারা ইট, বালু, সিমেন্টের ওয়াল দিয়ে বাড়ির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি।
আমাদের ঘরের নিরাপত্তায় প্রবেশপথে কাঠের দরজা বা স্টিলের দরজা লাগিয়ে আবার প্রত্যেক ঘরের জন্য আলাদা কাঠের দরজা লাগিয়ে বাড়ির নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি। বাড়ির বা গ্রামের নিরাপত্তার জন্য দিনে রাতে নিরাপত্তা প্রহরী রেখে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি।
দেশের নিরাপত্তার জন্য দেশের সীমানা ঘুরে কোথাও তারকাঁটার বেড়া, কোথাও নিরাপত্তা প্রহরী, নৌপথে নৌপ্রহরী দিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে আবার সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী দিয়ে দেশের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিবেশী দেশ যদি বন্ধুভাবাপন্ন হয়, তবে সীমানা রক্ষার জন্য উভয় দেশের খরচ কম করলেও হয়। আর যদি প্রতিবেশী দেশ শত্রুভাবাপন্ন হয়, তবে উভয় দেশেরই নিরাপত্তার জন্য ব্যয়বহুল ব্যবস্থা করতে হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে যদি পরস্পর দেশগুলো বন্ধুভাবাপন্ন হয়, তবে তাদেরও নিরাপত্তার জন্য খরচ কম করলেও হয়। কিন্তু যদি প্রতিবেশী দেশগুলো শত্রুভাবাপন্ন হয়, তবে নিরাপত্তার জন্য প্রচুর ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয় কম করলে দেশের না-খাওয়া মানুষের ভাত, কাপড়, চিকিৎসার জন্য খরচ করা যায়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত আমাদের সৎ প্রতিবেশী নয়। তারা শুধুই আমাদের থেকে নিতে চায়, দিতে চায় না। আন্তর্জাতিক নদী পদ্মা-তিস্তার পানিপ্রবাহ আটকিয়ে রেখে আমাদের দেশকে পানির উপকারিতা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। বার বার পানিচুক্তি করলেও চুক্তি অনুযায়ী আমরা পানি পাই না। বরং ফেনী নদী থেকে ভারত খাওয়ার পানির কথা বলে আমাদের পানি নিয়ে যাচ্ছে। ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পাচ্ছে না। আমাদের অর্থনীতির চাকা ঠিক রাখার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, পেঁয়াজ, ফলফলাদি মাঝেমধ্যেই আদান-প্রদানে বাধার সৃষ্টি করে স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত করে। সময় সময় সীমান্ত রক্ষীদের সাথে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে থাকে। ভারতের নাগরিকরা গরুর গোশত কম খায়। তাই তাদের গরু বিভিন্ন পথে আমাদের দেশে আসে। সুবিধাটা ভারতই বেশি ভোগ করে। তারপরও তারা গরু ব্যবসায়ীদের গুলি করে হত্যা করে।
গত ৫৪ বছর যাবত ভারত আমাদের থেকে শুধুই নিয়েছে। দেয়ার ব্যাপারে তাদের স্বার্থরক্ষা করেই আমাদের দেয়। দুঃখের সাথে বলতে হয়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালনকারী মেজর (অব.) আবদুল জলিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেয়ার কারণে তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক ওসমানী সাহেবকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানীদের স্যারেন্ডারের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। এভাবে মরহুম শেখ মুজিব ও শহীদ জিয়াউর রহমানের অকাল মৃত্যুর জন্যও ভারতই দায়ী বলে কথা আছে। বিডিআরের ৫৭ চৌকস অফিসারকে দিনে-দুপুরে হত্যা করা দেশের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল ষড়যন্ত্রের অংশ।
আমাদের পাশের ছোট্ট দেশ মালদ্বীপ, জনসংখ্যাও খুবই কম। তারপরও মইজ্জু সাহেব ঘোষণা দিয়ে ভারতের সৈন্যবাহিনীমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে নির্বাচন করে দেশের শাসনভার নিয়ে ভারতের সৈন্যমুক্ত করে দেশ চালাচ্ছে। তাই আমরাও পারব, আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমরাই পালন করতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ।
স্বৈরাচার মোদির দোসর হাসিনা ও তার দোসররা পালানোর পর ছাত্র-জনতার অনুরোধে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার অন্তর্বর্তীকালের জন্য ক্ষমতা নিয়ে সংস্কারের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। জুলাই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে হাসিনা ও তার দোসররা পালিয়ে গেছে। তাদের বিচারের আওতায় আনার সব চেষ্টা চলছে। স্বচ্ছ বিচার করেই তাদের ফাঁসি দিতে হবে। সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদ করে গণভোটের মাধ্যমে তা কার্যকর করার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং এর নিরাপত্তার দায়িত্ব আমরাই পালন করতে পারি, ইনশাআল্লাহ।
গোটা দুনিয়ার মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান, জনশক্তি, খনিজসম্পদ সবই অনুকূল। আমাদের ৫৭টি মুসলমান দেশ মক্কা-মদিনার খাদেম সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, ইরানসহ সব দেশ যদি তাদের সম্পদের সদ্ব্যবহার করে ঐক্যের মাধ্যমে আল্লাহর ওপর ভরসা করে গোটা দুনিয়ায় শাসন করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তবে তা সম্ভব হবে। আফগানিস্তান তার বড় উদাহরণ। ইরানের মতো তাদের অস্ত্রভাণ্ডার ছিল না, কিন্তু ঈমানের ভাণ্ডার ছিল অতুলনীয়। ফলে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হয়েও ব্রিটেন, রাশিয়া ও আমেরিকাকে তাদের দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করেছে। আলখেল্লা পরা ঈমানের বলে বলীয়ান আফগানরা তাদের দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে ফেলেছে। এখন সব দেশই তাদের কাছে মাথানত করছে। পারমাণবিক শক্তিধর আমেরিকা তাদের দখলদারিত্বে বাণিজ্যে ইসলামী দেশগুলোকে তাদের তাঁবেদার বানিয়ে রাখছে। লিবিয়ার গাদ্দাফিকে তারা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করেছে। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকেও তারা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করেছে। এখন লেগেছে ইরানের খামেনিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে।
মুসলিমদের অনৈক্যের কারণে আমেরিকা মুসলমানদের সম্পদ তাদের কাজে লাগাচ্ছে। এবার দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে জাতিসংঘের নীতিমালা ভঙ্গ করে ইরানের ওপর কাপুরুষের মতো রাতের আঁধারে আক্রমণ করেছে। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে সেনাপ্রধানসহ অনেক বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে। বর্তমানে আমেরিকাও জাতিসংঘের নিয়ম ভেঙে রাতের অন্ধকারে ইরানের ওপর জঘন্য আক্রমণ করেছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিচার দাবি করছি।
এবারের ভালো দিক হলো চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়াসহ পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো ইরানের পক্ষাবলম্বন করেছে। ৫৭টি মুসলিম দেশের ওআইসি ইতোমধ্যে তুরস্কে বৈঠক করে ইরানের পক্ষাবলম্বন ঘোষণা দিয়েছে।
আমরা মনে করি, সব দেশেরই নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার অধিকার আছে। দখলদার ইসরাইলের যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকে, তবে কেন অন্য দেশের থাকবে না? বলতে পারেন, এ অস্ত্র সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। জাতিসংঘের আওতায় এ অস্ত্র যাতে অন্যভাবে ব্যবহার না হয়, তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এবার আমেরিকার জনগণ ট্রাম্পের এ অমানবিক আক্রমণ সমর্থন করেনি। তাই এবার ইরানের পক্ষে দলমত-নির্বিশেষে একত্র হলে আমেরিকার দখলদারিত্ব থেকে দুনিয়াকে মুক্ত করা যাবে। এক্ষেত্রে মুসলিম দেশগুলো থেকে আমেরিকার ঔপনিবেশিক সামরিক ঘাটিগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। আমেরিকা কয়েকশত মাইল দূর থেকে আমাদের ওপর মোড়লিপনা করবে, তা সহ্য করা যাবে না।
দেশের ভেতর ও বাইরের চাপে ইতোমধ্যেই ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। কাতার ও ইরাকে আমেরিকার ঘাটিতে ইরানের আক্রমণের ফলে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। ইসরাইল ও ইরানের নেতাদেরকে যুদ্ধ বন্ধের তাগিদ দিয়েছে। প্রমাণ হয়েছে ইমাম খামেনির আল্লাহর প্রতি ঈমান, সাহস ও নেতৃত্বের দৃঢ়চেতা মনোবল দেখে দখলদার আমেরিকা ও ইসরাইলের মনোবল ভেঙে গেছে।
আমাদের সম্পদ, জনশক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আল-কুরআন এবং হাদীসের আলোকে আমরা মুসলিম শাসকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে গোটা দুনিয়ার নেতৃত্ব আমরাই দেব- এ প্রতিজ্ঞা করে ওআইসির মাধ্যমে সবার অধিকার নিশ্চিত করে আবার খেলাফতের দিকে আমরা নিয়ে যেতে চাই। আমাদের জনশক্তিকে বিজ্ঞান, মারণাস্ত্র থেকে শুরু করে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দুনিয়ার অনেক বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কার ও উদ্ভাবন মুসলমানরাই করেছে। আমরা আবার দুনিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করে মহান আল্লাহর শাসন কায়েম করে আখিরাতের পথ পরিষ্কার করতে চাই। আমাদের অভিভাবক মহান আল্লাহ আর তিনিই আমাদের সাহায্যকারী। তার কাছেই আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। ভালো কাজের জন্য আখিরাতে রয়েছে সীমাহীন জান্নাত, যার শেষ নেই। সেখানে কোনো অভাবও নেই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।