সমাজের অবক্ষয়

অতিথি লেখক
৮ মে ২০২৫ ১৪:৩৩

॥ শাহীন আহমদ ॥
জীবনের এই প্রান্তে এসে ভাবনার বাতায়নে দোলা দিয়ে ভাবছি আগামী দিনের কথা। আমরা আজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছি, কিন্তু মানবিকতার সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছি। আজ মানবতার কান্নায় ভুবনের আকাশ-বাতাস অমানিশাময় আঁধারে আচ্ছাদিত। আমাদের আগমনী প্রজন্মকে কী শিক্ষার আলোকে আলোকিত করছি? আজ তো ছুটছি পার্থিব ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যের মোহে। কাল তো কাঁদতে হবে আপন গৃহনির্জনে অথবা নিক্ষিপ্ত হতে হবে সমাজের আস্তাকুঁড়ে। ক্ষণ জীবনের প্রান্তরে আমরা আপন প্রয়োজনে কতই না মায়াময় কল্পনার জগৎ তৈরি করে নিই। তা তো ক্ষণিক হাওয়ায় বিলীন হয়ে যায়। ফিরে আসি জীবনের বাস্তবতায়। তখন আর স্রোতের প্রতিকূলে ভেসে জীবনের ঠিকানায় পৌঁছানোর সময় ও শক্তি থাকে কি?
আমাদের আগামী প্রজন্মকে সত্য জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে হবে। আজকের মা জাতিকেই এগিয়ে আসতে হবে আপন সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রত্যয় নিয়ে। আজ পরিবারের প্রয়োজনে নারী-পুরুষ ছুটছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে- তবুও পুরুষের চাইতে নারীরাই স্বাবলীল আপন সন্তানদের পাশে। মায়েদের মনে সন্তানদের প্রতি যে মায়া-মমতা ও স্নেহঘেরা ভালোবাসার আলোকচ্ছটা থাকে, তেমনি সন্তানদেরও ভালোবাসার মায়াময় সুপ্ত বন্ধন গড়ে ওঠে সৃষ্টি থেকে- তার তুলনা হতে পারে না। সন্তানদের প্রথম শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত মায়ের স্নেহ মায়া-মমতার শিক্ষায়। বাবাদেরও থাকতে হবে পাশাপাশি তাদের মাথার ওপর বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে। প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধ হৃদয়ের গহিন অরণ্যে তখনই জন্মায় ভালোবাসার প্রদীপ্ত আলোর বলয়ে। আগমনী সূর্যদয়কে আমরাই রূপান্তর করতে পারি আত্মতৃপ্তিভরা মায়ার সুপ্ত আলোয়। নারী জাগরণ আজ সময়ের দাবি সমাজের অবক্ষয় রোখার একমাত্র হাতিয়ার।
আজ সময় এসেছে আমাদের শিক্ষাকে বিচারিত সমাজে সততা ও মানবিক মূল্যবোধের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর। আমরা কি ভাবি আপন আপন ক্ষেত্রে আমরাই সেরা। আমরা যখনই আপন সীমানা অতিক্রম করে একে-অন্যের চাইতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, তখনই শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে মাকড়সার জালের মতো জড়িয়ে যাই। আমরাই ভোগের সাম্রাজ্য কায়েম করে আত্মতৃপ্তিতে বিভোর হয়ে পরীক্ষা ক্ষেত্রের কথাই ভুলতে বসেছি। তাই তো আজ মানবসভ্যতার বসুন্ধরায় জঙ্গলের রাজ প্রতিষ্ঠিত। আজ সময় এসেছে আপন বিবেককে জাগ্রত করে তোলার। বিবেকবান প্রজন্মই পারে মরা মৃত্তিকা হতে নতুন ফসলের বীজ উৎপন্ন করে তুলতে। একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের দুটি ধারায় প্রবাহিত হতে হয়। সংসার ও সমাজের সেতুবন্ধন ও জীবনের আনন্দ-বেদনার কাব্যগুলো সবই রচিত হয় প্রিয়জনের একে অপরের সম্পূরক হয়ে।
এক মানব-মানবী থেকে সৃষ্টি মানবজাতি- আজ আমাদের সবাই প্রয়োজনে ধনী-গরিবের বিভাজন সৃষ্টি করেছি। আবার আপন প্রয়োজনে প্রতিটি সমাজে ভিন্ন ভিন্ন জাতের সৃষ্টি করেছি। সবাই এলাম আপন জ্ঞানের আলোকে পরীক্ষা দিয়ে অনন্ত জীবনে সাফল্য লাভের আশায়, কিন্তু আমরা ক্ষণ জীবনের ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যঘেরা বিলাসিতার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। আপন রাজ কায়েমের প্রয়োজনে স্রষ্টার দেয়া বিধান ভুলে আমরা প্রতিষ্ঠা করছি ধর্মনিরেপক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্রের মতো আরো অনেক মতবাদ। আপন ক্ষমতাকে জমিনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে জীবন বিলায়ে দিচ্ছি, স্রষ্টার দেয়া বিধান অনুসরণ করছি না। শূন্যতাঘেরা মায়াময় জমিনে শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে হিংসা-বিদ্বেষের বীজ বপন করে দিচ্ছি জাতিতে জাতিতে তাই তো আজ এত হানাহানিতে ভরে যাচ্ছে সমাজটা।
জীবনের চলার পথে কত না চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আপন জীবনের পথ রচনা করতে হয়। মানবসভ্যতার আম্রকাননে প্রতিনিয়ত ফুটছে হাজারো পদ্মগোলাপ। আমাদের উচিত হৃদয়ের সব ভালোবাসায় তাদের ফুটিয়ে তোলা। আমাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তাদের সম্মুখে উপস্থাপন করা- যেন তার জীবন চলার পথের প্রতিটি ফাঁদকে আবিষ্কার করতে পারে। আজ শয়তান ক্ষণে ক্ষণে ভ্রান্তির ভেড়াজাল সৃষ্টি করে বিজয়ীরূপে সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ করছে। তাই তো আজ মানবীয় ভালোবাসাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের অন্তরের অন্তস্তল হতে। আমাদের হৃদয় আজ সাহারা মরুভূমির মতো- তাতে না আছে সবুজের স্নিগ্ধতাভরা মায়াময় উর্বরতা, না আছে সাগরের জোয়ার-ভাটার মতো উত্তাল জলরাশির স্নিগ্ধ দৃপ্ত।
নারী জাগরণেই সম্ভব মানবসভ্যতার আম্রকাননে ঘুণপোকামুক্ত মুকুল ফুটানো। প্রতিটি জনপদে আজ নারীরা নির্যাতিত ও অবহেলিত। কেন এত বৈষম্যমূলক সমাজের উত্থান? নারীরা আজ আধুনিকতার নামে অর্ধালঙ্গ হয়ে সমাজে বিচরণ করছে, মিশে যাচ্ছে পরপুরুষের সাথে বাজারে-রেস্টুরেন্টে। তাই তো সমাজটা পাপাচারে ডুবে যাচ্ছে। নারীদের রূপ-যৌবনের প্রদর্শনীতে ও শয়তানের প্ররোচনায় কত যে পুরুষ লালসায় প্রলুব্ধ হয়ে ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠে- আমরা তো সমভাবে সেই অপরাধে অপরাধী। একশ্রেণির বিপথগামী পুরুষের কলুষিত অন্তরের আত্মতৃপ্তিকে নারীদের উচিত আপনাকে স্বযতনে গোপন করে রাখা পরপুরুষের সামনে। কাপড়ের অন্তরালে আড়াল করে রাখলেই সম্ভব নিজেকে হেফাজত রাখা। শয়তান ক্ষণ অবসরে হৃদয়ের গভীর সাগরে অনুপ্রবেশ করে ধ্বংসের সুনামি সৃষ্টি করে তা তো আমরা অনুভব করতে পারি না। যখন অনুভূত হই, তখন তো আপন সাজানো বাগান ধ্বংসযজ্ঞে হয়ে যায় সম্পূর্ণ সুনসান।
পরকীয়া আজ প্রতিটি সমাজে অভিশাপরূপে আবির্ভূত হয়েছে- কত না সংসার ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আজ সমাজের সিংহভাগ সংসারে স্নেহ-মায়া-মমতাঘেরা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ আকাশে পরকীয়া নামক কালবৈশাখী ঝড় হানা দিচ্ছে। শয়তানের প্রবঞ্চনাময় ধূম্রজাল ছিন্ন করে মানুষরূপি হায়েনাদের কাছ থেকে হেফাজত থাকাটাই বর্তমান মানবসভ্যতার কঠিনতম অগ্নিপরীক্ষা। দিনের আলোর অথবা রাতের আঁধারে চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আমরা ডুবছি পাপাচারে-ভাবছি কি শেষ বিচারের দিন কী জবাব দেব সৃষ্টিকর্তাকে। আমাদের পাপাচারে জন্ম নেয়া আগমনী প্রজন্মের কাছে কতটুকু মানবীয় ব্যবহার আশা করতে পারি। আপন অস্তিত্বের স্বার্থে অন্ধকার জীবন থেকে ফিরে এসো আলোকিত মশালের ছায়াতলে।
আজ সুদ ও ঘুষের ছড়াছড়ি- প্রতিটি রক্তকণিকার সাথে মিশে গেছে। তাই তো আমাদের সমাজের এত অবক্ষয়।
আমরা আরাম-আয়েশের জীবনযাপনের জন্য টাকার পাহাড় গড়ি, কিন্তু প্রকৃত সুখের সন্ধান পাই কি? অশান্ত মন নিয়ে খুঁজে বেড়াই শান্তির ঠিকানা। মহান সৃষ্টিকর্তা ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদ কে করেছেন হারাম- আমরা আজ হারাম সুদের সাম্রাজ্য কায়েম করেছি। তাই তো আমাদের ধনসম্পদে আজ কোনো বরকত নেই। আমরা অন্যের কাছ থেকে একপ্রকার জোরপূর্বক ঘুষ নিয়ে থাকি, কিন্তু ভাবি কি কতই না কষ্টে অর্জিত সেই টাকাগুলো ওরা আনন্দচিত্তে দিচ্ছে নাকি বিপদের সুযোগে আমরা হাতিয়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দিচ্ছি।
আমরা আজ মানবরচিত জ্ঞানের সাগরে ডুব সাঁতার কেটে মুক্তার সন্ধানে আত্মনিয়োগ করি, কিন্তু প্রকৃত মুক্তাকে আবিষ্কার করতে পারি কি? আজ জীবনের এ প্রান্তে এসে মনে হয় ধু-ধু মরুভূমিতে উচ্ছৃঙ্খল সমাজ সাজাতে আমরা ব্যস্ত। আমরা সমাজে বিচরণ করে সামাজিক হতে পারিনি? আমরা ভালো মানুষের মুখোশ পরে সমাজে বিচরণ করি ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি। কিন্তু প্রকৃতি তারই আপন মহিমায় তা ঠিকই উদ্ভাসিত করে দেয় সঠিক সময়ে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিনৈপুণ্য দেখেও মাথানত করে তারই দিকে ফিরে যেতে পারি নি? ঐশ্বর্য-প্রাচুর্যময় জীবন গড়ার প্রত্যাশায় আমরা ছুটছি পাগলা ঘোড়ার মতো। তাই তো আজ ডুবে যাচ্ছি চোরাবালির অতলগহিনে।
আজকে আমাদের মানবসভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছে। কিন্তু মানবীয় মূল্যবোধে জঙ্গলের পশুকেও হার মানিয়ে দিচ্ছি। আত্মাহংকারী হয়ে আমরা একে অন্যের অনিষ্ট করতে ব্যস্ত, আজ আপনজনদের হক আত্মসাৎ করে হয় তো সম্পদের পাহাড় গড়তে পারি। কিন্তু অনন্ত জীবনে কি সাথে নিয়ে যেতে পারবো। আজ আমরা আমাদের সম্পদগুলো আরাম-আয়েশের পেছনে ব্যয় করছি। কিন্তু প্রতিবেশীরা অনাহারে-অর্ধাহারে দিনের পর দিন ডুকরে কাঁদছে, তাদের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি কি?
আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার সময় এখনই। জীবন ফুরিয়ে যাবে ভালোবাসা ফুরাবে না জীবনে- রয়ে যাবে ভুবনে প্রিয়জনের স্মৃতির এলবামে।
আজ তরুণরা নিজেদের নেশায় আচ্ছন্ন করে আপন আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সমাজের শৃঙ্খলতাকে উচ্ছৃঙ্খলতাপূর্ণ করে সমাজে অন্যায়-অত্যাচারের রাজত্ব কায়েম করছে। আমাদের তরুণ সমাজকে নেশায় আসক্ত করে- আগামী পৃথিবীকে শয়তানের রাজ কায়েমের সুযোগ করে দিচ্ছে। আজকের মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীরা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে ব্যস্ত। আমাদের চাহিদার কি কোনো সীমা আছে? আপন আত্মাকে অনাকাক্সিক্ষত হারাম চাহিদা হতে হেফাজত রাখার একান্ত প্রয়োজন। আজ সময় এসেছে ভাবার- ক্ষণ জীবনে কতটুকু সময় নিয়ে এলাম অনন্ত জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করে কি পাড়ি জমাতে পারব অনন্তের পথে? ক্ষণ জীবনের প্রান্তরে বেঁচে থাকার সংগ্রামে আমরা বিলিয়ে দিই স্বর্বস্ব- আপন পরীক্ষা ক্ষেত্রের কথাটাই ভুলে যাই।
আত্মকেন্দ্রিক এ ক্ষণ জীবন যখনই সমষ্টিকেন্দ্রিককে রূপান্তরিত করতে পারব, তখনই আমাদের সমাজের সকল অবক্ষয় আমাদের মাঝে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে। আমাদের জীবনের ভুলগুলো শুধরে নেয়ার একটা সুযোগ হয় তো পাব। ভ্রান্তির ভেড়াজালে জড়িয়ে আছি, এভাবেই কি একদিন হারিয়ে যাব। নাকি সংশোধিত হয়ে সমাজের প্রয়োজনে বিলাব জীবন। ক্ষণ জীবনটাই যদি অনন্ত জীবনের সাফল্যের আশায় বিলানোর স্পৃহা আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করে আগমনী প্রজন্মকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি। তবেই ভুবনের বাগিচাগুলো হয়ে উঠবে জান্নাতের বাগিচার মতো। জীবনের প্রতিটি প্রান্তরে ভোগ-বিলাসিতায় ভরা মায়াময়তার হাতছানিতে ভরপুর, আমরা কি পারব ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নিতে?
এ ভুবন ঘুরছে আপন বৃত্তে- আমরাও ছুটছি জীবনের প্রয়োজনে শূন্যতাভরা মায়াময় জগতে। জন্ম থেকে যে মা-বাবা আমাদের পাশে থেকে প্রস্ফুটিত করেছেন, জীবনবাজি রেখে তাদের কথা ভেবে তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষণে পাশে থাকি কি? জীবন তো ছুটে চলেছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদীর মতো আপন গতিতে। জীবনে চলার পথে আমরা কতটুকু আনন্দ-বেদনাগাথা স্বপ্ন স্মৃতি সংগ্রহ করব, তার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যদি পথ চলতে গিয়ে তাদের ভুলে যাই- যারা আমাদের এ ভুবনের আলোয় নিয়ে এলেন, তাহলে আমাদের সন্তানরাও আমাদের কথা ভুলে যাবে। আমরা আজ তাদের একাকিত্বের মাঝে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে দিই- কাল তো আসছে আমাদের পালা- আমরা কি পাব বিদায়বেলা বৃদ্ধাশ্রমে একটু আশ্রয়?
আজ নতুন প্রজন্ম সঠিক সময়ে সংসার বাঁধছে না- আপন কর্মজীবনে সাফল্যমণ্ডিত হয়ে তবেই জীবনে জুটিবদ্ধ হতে চায়। আপন ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়ে যখন সংসার গড়ি, তখনই বেধে যায় কর্তৃত্বের লড়াই। প্রতিদিনের সাংসারিক জীবনে নেমে আসে অনাকাক্সিক্ষত দুর্যোগের কালো ছায়া। একে অন্যের দিকে কাদা ছোড়াছ্ুিড় করেই জীবনে নেমে আসে দূরত্বের দেয়াল। জীবনকে সাজাতে গিয়ে আপন হাতে ধ্বংস করি আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখানোর দায়িত্ব আমাদের- আমরা তা না করে তাদের হাতে ছেড়ে দিই জীবনের পথ চলার দায়িত্ব। জন্ম থেকে যৌবনে পদার্পণ করে ওরা তো সহজ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথটাকেই বেছে নেয়। আমরা আমাদের জীবনের শিক্ষাটাই তাদের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারি না। তাই তো ওরা প্রকৃত বাস্তবিক জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত। যৌবনের শুরুতেই সংসার বাঁধাই একান্ত প্রয়োজন, তাহলে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণে পাপের ছোঁয়ায় কলুষিত হবে না। আত্মসংযমের বাস্তব শিক্ষায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে নেবে নবীনরা।
আজ শিশু কি কিশোর- সকলের হাতে মোবাইল ভিডিও গেমসহ যান্ত্রিকতায় আসক্ত করে তুলি আমরা তো তাদের সময় দিই না। তাদের জ্ঞান আজ যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে- ভালোবাসা ঘেরা মায়াময় মনটা তো আজ রুক্ষ মরুভূমির মতো হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কান্নার নোনাজলের ধারায় যদি পদ্মা-মেঘনার মতো স্রোতধারা তাদের হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। তবুও মনে হয় একটুও স্নিগ্ধ হবে না। আমরা আজ ধ্বংসের খেলায় মেতেছি- যান্ত্রিকতার মাঝে আকুণ্ঠ ডুবে আরাম-আয়েশের নেশায় আসক্ত। তাই তো যন্ত্রের ছোঁয়ায় আমরা আজ শরীর খাটিয়ে কাজ করি না। আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। তাই তো সেখানে বাসা বাঁধছে ঘুণপোকাদের দল। সারাটা জীবন টাকার পেছনে ছুটে সেই টাকাই খরচ করি ঘুণপোকাদের নির্মূলের প্রয়োজনে।
আপন জীবনের শুরুটা কেমন স্নিগ্ধ মায়াভরা ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল আর আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে হিংসা-বিদ্বেষের কালো মেঘ। জীবনের প্রবহমান স্রোতধারায় ছুটে চলছি পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে। আপন অন্তরের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ঐশ্বর্য-প্রাচুর্ষের নেশায় আজ অন্ধ হয়ে গেছি ভাবছি কি আগামী দিনের কথা। আমরা তো আজ পরিবারে সময় দিই না। স্ত্রী-সন্তানদের জন্য টাকার পাহাড় গড়তে ব্যস্ত। স্নেহ-মায়া-মমতা ঘেরা ভালোবাসায় তাদের নিয়ে এলাম ক্ষণ ধরণীর পরীক্ষাক্ষেত্রে, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা কি দিতে পেরেছি? এই ভুবনের চলার পথের প্রতিটি বাঁকে আছে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে ভরা অনেক চোরাবালির গহিন গহ্বর। একটু অসাবধান হলেই বিলীন করে দেয় আপন অস্তিত্বকেই। আমরা কি আমাদের আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের আস্তাকুঁড়ে একাকী ছেড়ে দিয়ে আপন জীবনকে ক্ষণিকের বিলাসিতায় ভরিয়ে তুলবো।
আমরা আজ আপন ক্ষুদ্র জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নেশায় আবিষ্ট হয়ে স্রষ্টাকেই চ্যালেন্স করে বসেছি। আমরা আজ মানুষ তৈরিতে আমাদের মেধা ও জ্ঞান খরচ করছি। সমাজের ভারসাম্যকে ধ্বংস করে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ কায়েম করতে চাই। আমাদের প্রয়োজনে জঙ্গলের গাছপালা-পাহাড় কেটে উজাড় করে দিচ্ছি। তাই তো প্রকৃতির ভারসাম্য আজ ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মহাকাশের মহাশূন্যতায় নিত্যনতুন গ্রহ-নক্ষত্র আবিষ্কারের নেশায় বিলিয়ে দিচ্ছি কোটি কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিটি জনপদের পথের ধারের পথকলিদের কান্নার আওয়াজ আমাদের মানব অন্তর আন্দোলিত করে তোলে না প্রকৃত রূপে। একই রক্ত-মাংসে গড়া এক স্রষ্টার সৃষ্টি হয়ে আমরা কি আমাদের মনুষ্যত্ববোধ বিসর্জন দিয়ে সুশৃঙ্খলিত সমাজ তৈরি করতে পেরেছি?
এরূপ লোকদের অস্তিত্ব অট্টালিকার অভ্যন্তরে উইপোকায় অস্তিত্বের মতোই বিপজ্জনক। এরা পার্থিব স্বার্থ এবং ব্যক্তি ও জাতির স্বার্থে নিত্যনতুন নীতিমালা তৈরি করে। এদের মগজে না আছে আল্লাহর ভয়, না পরকালের। বরং তাদের সমগ্র চেষ্টা তৎপরতা এবং নিত্যনতুন পলিসির মূলকথা হচ্ছে কেবলমাত্র পার্থিব লাভ লোকসানের ধান্দা।