নির্বাচনী ঢেউয়ে বিনিয়োগে ভাটা
১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১০
তবে প্রভাব পড়বে না অর্থনীতিতে
॥ উসমান ফারুক॥
প্রায় দেড় বছরের চেষ্টায় খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে নীরব অর্থনৈতিক দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচানো বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন জাতীয় নির্বাচন এসে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির বাঁকবদলে দেওয়ার এ সময়ে দেশের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ছিল ধীরে ধীরে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়েও সাড়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা দেয় গত অক্টোবরে। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন চলে আসায় বিনিয়োগে কিছুটা ভাটার টান দেখা যাচ্ছে ক্ষত সেরে ওঠা অর্থনীতির সামনে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। অতীত ইতিহাস বলছে, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা সংযত হয়। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন নতুন সরকারের নীতি বুঝতে। এবারও তেমন ইঙ্গিত দিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত খুব একটা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না উদ্যোক্তরা। বিদ্যমান ব্যবসা চালিয়ে নিতে পুরো মনোযোগ দেবেন। এবার নির্বাচন, পবিত্র রোজা ও ঈদ একই সময়ে হওয়ায় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগে যে ভাটার টান দেখা দিচ্ছে তার কোনো প্রভাব পড়বে না সার্বিক অর্থনীতিতে।
নির্বাচনের সময়ে প্রেস, কাগজ ও প্রিন্টিংয়ের মতো ব্যবসা সর্বোচ্চ ব্যস্ত থাকবে। নির্বাচনের সময়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়তি ব্যয় করবেন প্রার্থীরা। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোয় বাড়তি কেনা-বেচা হবে। মাইক ভাড়া, রিকশাসহ প্রচার মাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। রোজা ও ঈদকে ঘিরে পুরো অর্থনীতিতে যে ঝড় তৈরি হয়, তাতেও অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করবে। অন্য কোনো উৎসব বা সময়ে অর্থনীতির চাকা এতটা সচল হয় না। আমদানি-রপ্তানি বেড়ে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য চাঙা রাখবে। রোজার পণ্য তিন মাস আগ থেকেই আমদানি হয়। ইতোমধ্যে নিত্য পণ্যসহ বাড়তি কাজের চাপে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়ে গেছে। তাতে ডালারের দরও একটু বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৮ শতাংশের ঘরে ওঠে। ঈদের সময়ে প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়ে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াবে। সবচেয়ে গরিব থেকে শুরু করে শীর্ষ ধনীদের মধ্যে টাকার হাতবদল এ সময়ে সবচেয়ে বেশি হবে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায়। সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে চাঙাভাব তৈরি হবে, তাতে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে।
সংযত অর্থনীতিতে নির্বাচনের আগে সতর্ক ব্যবসায়ীরা
গত ১৫ বছর লুটপাট ও দুর্নীতির ওপর ভর একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিল জনরোষে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বতী সরকার আগের সরকারের নেওয়া উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে কাটছাঁট করে। বাতিল করা হয় লুটপাট ও আওয়ামী লীগ নেতাদের পছন্দের প্রকল্পগুলো। আর্থিক সংস্কারের উদ্যোগ শুরু করলে বাংলাদেশ খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসে। সেই সংস্কারের পদক্ষেপে অর্থনীতির ক্ষতগুলো একটু একটু করে সারতে শুরু করে। নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে আনার চেষ্টায় অনেকটা সফলতাও পায় সরকার। পোশাক খাতের আন্দোলন ও ক্ষোভ প্রশমন করে স্থিতিশীল করে। লুটপাট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার উদ্যোগে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার কমে যায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এডিপি কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে কি না, তেমন প্রশ্ন উঠলে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অযথা ব্যয় কমিয়ে আনছে সরকার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাদের নিয়োগ দেওয়া ঠিকাদাররাও দেশ ছেড়ে চলে যায়। অনেকে আত্মগোপনে রয়ে যায়। এমন অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু চলমান জরুরি কাজগুলো করার পক্ষে অবস্থান নেয় সরকার।
আবার ব্যাংক ঋণ করে ব্যয় করলে মূল্যস্ফীতি ফের উসকে যেতে পারে। সরকারের সেই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইতোমধ্যে দুই অঙ্ক থেকে এক অঙ্কে ফিরেছে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ধার কমে যাওয়ায় গত ছয় মাসে সরকার ব্যাংক ঋণ করেছে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা। এতে সরকারের সুদ ব্যয় কমে আসার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প খরচ বেচে গেছে।
এতে অর্থনীতি অনেকটা সংযত হয়ে কৌশলী পদক্ষেপে চলছে সরকারের সিদ্ধান্তে। এর ফলে অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা একটু কমলেও ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সার্বিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের মতো। সেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশের কাছে। গত বছরের এ সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ ও বেসরকারি খাতে ছিল ৮ শতাংশের ওপরে।
তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামান্য কমলেও তা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের অতীত বলছে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে খুব একটা করতে চান না। বিনিয়োগ একটু কম হবে এমনটা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ এখন কম হবে এটাই বাস্তবতা। নির্বাচনে কে ক্ষমতায় আসে, কোন মন্ত্রী দায়িত্ব নেয় সরকারের কোন খাতে কেমন নীতি হয়, তা পর্যালোচনা করেই ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত নিবেন বিনিয়োগের। এটি যেমন সত্য, এর আরো একটি দিক আছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের যে সংকট আছে তার উন্নতিও দেখতে চাইবেন ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ একটু কম হবে।
এতে দেশে কর্মসংস্থানের ওপর একটু চাপ পড়বে তা সত্য মন্তব্য করে তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন, ঈদ ও রোজা এ তিনটি একসঙ্গে আসায় খেটে খাওয়া মানুষের একটা আয়ের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু চাকরিজীবী ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের একটু চাপের মুখে পড়তে হবে। কারণ হলো, সার্বিকভাবে মজুরি কিন্তু বাড়েনি। সেটা না বৃদ্ধি পাওয়া পর্যন্ত মধ্যবিত্তের ওপর সেই চাপ একটু থাকবে।
নতুন সরকারের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত না দেখে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করবে না এটাই নিয়ম মন্তব্য করেন দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে খ্যাত তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাতেম। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী তারা একটু সতর্ক হন শুধু। কিন্তু দেশের বাস্তবতায় ব্যবসায়ীদের দেখতে হয় নতুন সরকার অর্থনীতির সিদ্ধান্তগুলোয় কোনটা কোনটা অগ্রাধিকার দেয়। সেই তালিকা দেখে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিবেন। কিন্তু চলমান ব্যবসা সে টিকিয়ে রাখবে। নতুন ব্যবসা স্থাপন না করলে তো কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। সেটা নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
অর্থনীতিতে ঝড় উঠবে রমজানে
আগামী ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান মাস শুরু হবে। এ মাসে ভোগ্য পণ্য ও পোশাকের চাহিদা বেড়ে যায়। যার ফলে তিন মাস আগ থেকেই পণ্য আমদানি বেড়ে যায়। সরকারও ৯টির বেশি পণ্য আমদানিতে ব্যাংক ঋণ ও এলসি সুবিধা বাড়িয়ে দেয় ব্যবসায়ীদের।
এবারও তা হওয়ায় গত ডিসেম্বর থেকেই পণ্য আমদানির পরিমাণ বেড়ে গেছে। তার ওপর ভর করে সার্বিক আমদানি সূচকগুলো বেড়ে গিয়েছে। শুধু পণ্য নয়, ঈদের সময়ে কর্মীদের বেতনের পাশাপাশি বোনাস দিতে হয় উদ্যোক্তাদের। এ কারণে এ সময়টিতে অতিরিক্ত উৎপাদনে যায় শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। তাতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বেড়ে যায়। যার প্রভাব চলে তিন মাসের অধিক সময় পর্যন্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত অক্টোবর পর্যন্ত নিত্যপণ্য আমদানি হয় ১৯২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। পরের মাস নভেম্বরে তা আরো বেড়েছে। এ বাড়তি চাপের কারণে বৈদিশক বিনিময় হার প্রতি ডলারে বেড়েছে ১০ পয়সার মতো। সর্বশেষ প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সায় কিনতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। শিল্পের কাঁচামাল আমাদানি হয় ৭৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলারের। এ খাতে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয় ২ শতাংশ। নতুন এলসি খোলার সঙ্গে নিষ্পত্তির হার আরো বেশি বেড়েছে।
ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন, রোজা ও ঈদের সময়ে অর্থনীতিতে এক ধরনের ঝড় বয়ে যায়। ধর্মীয় বিষয় হওয়ায় মানুষ সওয়াবের আশায় হাত খুলে খরচ করে। দান বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া ঈদের পোশাক কেনাকাটাও বেড়ে যায়। মূলত পোশাক ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকে এ মৌসুমের। তাই এ সময়ে টাকার হাতবদল যেভাবে হয়, তা অনুমানও করা যায় না। সমাজের সবচেয়ে গরিব থেকে শুরু করে শীর্ষ ধনীও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায়। তাই টাকার হাতবদল সবচেয়ে বেশি হয়। এ সময়ে মানুষের কষ্ট বলতে থাকে না। অস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
তিনি বলেন, এবার নির্বাচনও ফেব্রুয়ারি মাসে হতে চলেছে। সংসদীয় আসনের সিংহভাগ গ্রামকে কেন্দ্র করে। প্রার্থীরা এলাকায় খরচ করবেন নানাভাবে। তাতে গ্রামে টাকার ছোটাছুটি বেশি হবে তুলনামূলক বেশি। যাতায়াত, প্রচার ও খাবারের দোকানগুলোয় মানুষের অতিরিক্ত ভিড় হবে। তাই বলা যায়, সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে চাঙাভাবই থাকবে। ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ না করার চাপ খুব একটা পড়বে না অর্থনীতিতে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, পৃথিবীর উন্নত দেশে নির্বাচনের সময়ে ব্যবসায় খুব একটা প্রভাব ফেলে না। কিন্তু আমাদের দেশে গত অর্ধ দশকেও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থা গুণগত মানে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো পরিচালিত হওয়ায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠরাই ব্যবসা করেছে। নতুন বিনিয়োগে গিয়েছে। এ সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠরা হাত গুটিয়ে থেকেছেন। এভাবে অর্থনীতি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি।
গত বছরের জুলাই বিপ্লবের পর শীর্ষ পর্যায়ের শিল্পপতিরা এ কারণেই পালিয়ে গেছেন দেশ ছেড়ে। এবারও মানসিক সেই অস্থিরতায় রয়েছেন কিছু ব্যবসায়ী। নতুন বাংলাদেশে নতুন কাঠামোয় অর্থনীতি পরিচালিত করতে পারলে ব্যবসায়ীদের শুধু উৎপাদন থেকে আয় করার পথ খোলা থাকবে। সামনের তিন মাস নতুন বিনিয়োগে একটু মন্দা থাকলেও নির্বাচন, রোজা ও ঈদকে ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য থাকবে অর্থনীতিতে। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ বিকল্প আয়ে চলতে পারবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ শুরু করলে আগামী এপ্রিল থেকে অর্থনীতির চাকা আরো গতি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।