রায়ে দেশব্যাপী উল্লাস ॥ ফিরিয়ে এনে কার্যকর দাবি

গণহত্যায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

প্রিন্ট ভার্সন
২০ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:০৫

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আদেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে দেশব্যাপী হতাহতদের পরিবার ও ছাত্র-জনতা মিষ্টি বিতরণ ও উল্লাস প্রকাশ করেন। দাবি উঠেছে এ রায় দ্রুত কার্যকর করতে হাসিনা-কামালকে দেশে ফিরিয়ে আনার।
একনজরে রায় : হাসিনার বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে তিনটি সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর মাঝে উসকানিদাতা হিসেবে শেখ হাসিনাকে একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি হিসেবে (গণহত্যার নির্দেশদাতা) এবং রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জন ও সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে নৃশংস কায়দায় পুড়িয়ে হত্যার দায়ে হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে হাসিনা ও কামালের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে জুলাই শহীদ ও আহতদের ক্ষতিপূরণে ব্যয় করার নির্দেশনাও দেয়া হয়।
গত ১৭ নভেম্বর সোমবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর আগে দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু হয়। রায় ঘোষণার সময় জনাকীর্ণ আদালতে উভয়পক্ষের আইনজীবী, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক, জুলাই শহীদদের স্বজন, জুলাইযোদ্ধা ও জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বের নজর ছিল এ রায়ের দিকে।
৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে তিন অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত
তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল মোট ৬ ভাগে ৪৫৩ পৃষ্ঠা রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করেন। গত সোমবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান। প্রথমে তিনি ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ও বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ধন্যবাদ জানান। রায়ের প্রথম দুই অংশ পাঠ করেন মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। দ্বিতীয় ও চতুর্থ অংশসহ অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল সদস্য মো. শফিউল আলম মাহমুদ। পর্যবেক্ষণসহ চূড়ান্ত রায় পড়েন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্তূজা।
শেখ হাসিনাসহ আসামিদের অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান গোলাম মর্তূজা উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি ও পাল্টাযুক্তি তুলে ধরেন। তিনি ১৯৭১ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ মুজিব সরকারের বাকশাল, উত্থান প্রভৃতি বিষয় প্রসিকিউটরের যুক্তি থেকে উদ্ধৃতি দেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের নানা কর্মকাণ্ড, পতন ও তার ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া পর্যন্ত ইতিহাসের পর্যালোচনা করেন।
আইনজীবী, সাক্ষী ও জুলাই শহীদদের স্বজনদের উদ্ধৃতিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের নির্যাতন ও নিপীড়নের বর্ণনাও দেওয়া হয়। শেখ হাসিনার সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশ ত্যাগে বাধ্য করাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে রায়ের পর্যবেক্ষণে।
একনজরে শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবরে পুনর্গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। নিয়োগ দেওয়া হয় ৩ বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত সংস্থা। প্রথমেই শুরু হয় শেখ হাসিনার অপরাধের অভিযোগের তদন্ত।
তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া মিলিয়ে ১৩ মাসের মধ্যেই শেষ হচ্ছে শেখ হাসিনাসহ ৩ আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কার্যক্রম। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজে সময় লেগেছে ১০৫ দিন। একে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা মনে করা হয়।
প্রায় ৭ মাসের তদন্ত শেষে গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। এতে ৮৪ জনের লিখিত এবং ৫৪ জনের মৌখিক জবানবন্দি নেয়া হয়। যাতে ১৪শ’ ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও ২৫ সহস্রাধিক মানুষকে আহত করার জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনও যুক্ত করা হয়।
এরপর গত ১ জুন শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দেয় প্রসিকিউশন। আসামিদের বিরুদ্ধে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশসহ ৫টি অভিযোগ আনা হয়। সেদিনই দেশের ইতিহাসে প্রথমবার সরাসরি সম্প্রচার হয় আদালতের বিচারকাজ।
আসামিদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরও আত্মসমর্পণ না করায় পলাতক হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের পক্ষে আমির হোসেনকে আইনজীবী নিয়োগ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
পরে ১০ জুলাই ৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ওইদিনই নিজের অপরাধ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হতে আবেদন করেন সাবেক আইজিপি মামুন। পরে ৩ আগস্ট শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা পর্ব। জুলাই শহীদদের পরিবার, আহত, চিকিৎসক, সমন্বয়ক, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, গবেষক, তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন সাক্ষী মামলায় সাক্ষ্য দেন। ২৮ কার্যদিবসে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় গত ৮ অক্টোবর। গত ১২ অক্টোবর শুরু হয় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক। প্রসিকিউশন জানায়, আন্দোলন দমনে ৩ লাখ ৫ হাজার গুলি ব্যবহার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার মধ্যে শুধু ঢাকায় ৯৫ হাজার। ৫০ জেলায় মানুষ হত্যা করা হয় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে।
উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে ২৩ অক্টোবর সম্পন্ন হয় সব বিচারিক কার্যক্রম। আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ, হত্যায় উসকানি, প্ররোচনাসহ ৫টি অভিযোগ প্রমাণে মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার তথ্য প্রমাণ জমা দিয়েছে প্রসিকিউশন। আলামত হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬৯টি অডিও ক্লিপ, ৩টি মোবাইল নম্বরের সিডিআর এবং হত্যাকাণ্ডের ১৭টি ভিডিও।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রায় হয়েছে। এ রায়ে শহীদরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন, রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে, প্রসিকিউশনও ন্যায়বিচার পেয়েছে। শহীদদের প্রতি, দেশের প্রতি, এ দেশের মানুষের প্রতি, সংবিধানের প্রতি, আইনের শাসনের প্রতি এবং আগামী প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এ রায়। শহীদদের পরিবার, আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য একটি নির্দেশনা আদালত দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, পলাতক থাকা অবস্থায় আপিল করার সুযোগ শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের কোনো দেশে আছে বলে আমার জানা নেই।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া রায় প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির প্রতিজ্ঞা পূরণÑ এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. তাজুল ইসলাম।
তাজুল আরও বলেন, যে ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ এখানে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো আদালতের সামানে এ সাক্ষ্য-প্রমাণ উৎরে যাবে। পৃথিবীর যেকোনো আদালতে এ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে আজ যেসব আসামিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তারা একই শাস্তি পাবে। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমি মনে করি, এ রায় কোনো ধরনের অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির প্রতিজ্ঞা। এটা ন্যায়বিচারের জন্য যাত্রা। এ রায় প্রমাণ করেছে অপরাধী যত বড় হোক, যত ক্ষমতাশালী হোক, সে আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে যত বড় অপরাধী হোক, অপরাধের জন্য তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এটাও প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রথা, মান বজায় রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জটিল অপরাধের বিচার করতে সক্ষম। বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে সেটা করতে পেরেছে।
শহীদ পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আবু সাঈদের পরিবার। রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা পলাতক শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের দ্রুত দেশে এনে রায় কার্যকর করার দাবি জানান। ‎রায়ের প্রতিক্রিয়ায় শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, আমি রায়ে খুশি, কিন্তু বিচার দেখতে চাই। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ আমার ছেলেকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। আমি হুকুমদাতাসহ পুলিশের বিচার চাই। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই। হত্যা করার অনুমতি সে দিয়েছিল বলেই আমার ছেলের মতো হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে হাত পা হারিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন। কারো কারো চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতালে এখনো অনেকে কাতরাচ্ছেন। ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলার মাটিতে এনে রায় কার্যকর করতে হবে। আবু সাঈদের বড়ভাই আবু হোসেন বলেন, শুধু রায় ঘোষণা করলে হবে না বিচার কার্যকর করতে হবে। শেখ হাসিনা ও তার দোসররা দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী সিস্টেমে গুম খুন করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে গণহত্যা করে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। আজ প্রথম রায় হয়েছে। শুধু রায় নয়, এটি কার্যকর করতে হলে শেখ হাসিনাকে এদেশের মাটিতে এনে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না। ‎তিনি আরও বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা বুঝতেছেন ভাই হারানো, বোন হারানো, মা হারানো, স্বামী হারানো কত যন্ত্রণার। আমরা এমন বিচার দেখতে চাই, খুনিরা যে দেশেই পালিয়ে থাকুক তাদের ধরে এনে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। তাদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে বাংলার মানুষকে দেখাতে হবে এমন স্বৈরাচারের বিচার কী হতে পারে।
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণঅভ্যুত্থানে জামালগঞ্জ গোলামীপুরের শহীদ সোহাগের ভাই বিল্লাল হোসেন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আমরা আমাদের এক ভাইকে হারিয়েছি। আরেক ভাই এখনো আহত আছেন। আমি নিজেও ভাই হত্যার বিচার চেয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে রায় হয়েছে আমি এবং আমার পরিবার সন্তুষ্ট। আমরা এ রায় কার্যকর দেখতে চাই।
রাজধানী ঢাকার বাড্ডা এলাকায় হাসিনার পতনে বিজয় মিছিলে গোলামীপুর গ্রামের মো. সোহাগ মিয়া (২৩) ও তার ছোট ভাই শুভ মিয়া (২১) যোগ দেন। আর এ মিছিলেই পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সোহাগ।
একই দিন জেলার মধ্যনগর উপজেলার জলুষা গ্রামের মাদরাসা ছাত্র আয়াতুল্লাহ বড় ভাইয়ের সাথে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। গাজীপুরের শফিপুরে অবস্থিত আনসার ভিডিপি একাডেমির সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মো. আয়াতুল্লাহ। শহীদ আয়াতুল্লাহর বাবা সিরাজুল ইসলাম রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, আমি সন্তান হারানোর ব্যথা বুঝি। কেউ আমাকে বলে সান্ত্বনা দিতে পারবে না। আমি আমার পুত্রকে হারিয়েছি। তিনি বলেন, হাসিনার কারণে আমার মতো হাজারো বাবা সন্তানহারা হয়েছেন। এ রায়ে আমি অনেক খুশি। আমি জীবদ্দশায় এ রায়ের কার্যকর দেখে যেতে চাই। আয়াতুল্লাহর বড় ভাই সোহাগ মিয়া বলেন, আমার সামনে গুলি করে আমার ছোট ভাইকে হত্যা করেছে এবং তার লাশ গুম করে ফেলা হয়। শেখ হাসিনা পলায়নের ১১ দিন পর আমার ভাইকে গ্রামে এনে দাফন করি। এ রায়ে আমি খুশি। রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।
হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্টি জানিয়ে সুনামগঞ্জের প্রথম জুলাই শহীদ হৃদয়ের স্ত্রী শিরিনা আক্তার বলেন, আমার দুটি শিশু সন্তান এখনো তাদের বাবার জন্য অপেক্ষা করে। বাবা বলে কান্না করে। আমি তাদের সান্ত্বনা দিতে পারি না। তবে এ রায় শুনে শান্তি পাচ্ছি। যার কারণে স্বামী হারিয়েছি তার বিচার দেখতে চাই।
হাসিনাকে ফেরাতে ইন্টারপোলে আবেদনের প্রস্তুতি শুরু
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শিগগিরই এ রায়ের কপি জেলা প্রশাসকসহ কয়েকটি দপ্তরে পাঠানো হবে বলে সাংবাদিকের জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম।
এছাড়া ইন্টারপোলে পূর্বে জারি হওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার বদলে কনভিকশন ওয়ারেন্ট বা সাজার পরোয়ানা মূলে তার বিরুদ্ধে আরেকটি ইন্টারপোলে নোটিশ জারির জন্য আবেদন করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘গতকাল পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ের শেষ প্যারাতেই উল্লেখ আছে যে, এ রায়ের একটি সার্টিফাইড কপি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন পাবে এবং একটি সার্টিফাইড কপি এ মামলায় যে আসামি উপস্থিত ছিলেন তিনি পাবেন। যে আসামিরা পলাতক আছেন, তারা যদি ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন অথবা গ্রেফতার হন, তাহলে তারাও এ রায়ের একটি সার্টিফাইড কপি পাবেন ফ্রি অব কস্ট (বিনামূল্যে)।’ ‘আরেকটি কথা ট্রাইব্যুনাল বলে দিয়েছেন সেটা হলো এ রায়ের আরেকটি কপি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, মানে ঢাকার জেলা প্রশাসক যিনি এজ ওয়েল এজ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, উনার কাছে ফর কমপ্লায়েন্স এর জন্য যাবে- এটার কার্যকারিতার জন্য। এটাই হলো রায়, বলা আছে এবং এটাই হবে’-যোগ করেন তিনি।
প্রসিকিউটর তামিম আরও বলেন, ‘আমরা যেটা করব সেটা হলো- যে দুজন আসামি পলাতক আছেন, তাদের বিরুদ্ধে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপিসহ রেড নোটিশ জারির আবেদন করা আছে আমাদের আগেই। সেটাকে এখন মডিফাই করে গ্রেফতারি পরোয়ানার বদলে একটা কনভিকশন ওয়ারেন্ট- এই কনভিকশন ওয়ারেন্ট বা সাজার পরোয়ানা মূলে আমরা তার বিরুদ্ধে আরেকটি ইন্টারপোলে নোটিশ জারির জন্য আবেদন করব। এটা আমরা করব এবং এটার কাজ অলরেডি আমরা শুরু করেছি।’
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিষয়ে বিচারের রায় হয়েছে, শাস্তি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। কাজেই তার আওতায় আমরা তাদের ফেরত চাইবো।’ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা আছে কিনাÑ জানতে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আইনি বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারবো না। আমি যেটা বুঝি যে তাদের ফেরত আনতে হবে। আদালত শাস্তি দিয়েছে, সেজন্য আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে জানাবো।’ উপদেষ্টা বলেন, ‘দুজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, আমার দুজনকেই ফেরত চাইতে হবে।’

গণহত্যায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড