গণভোটকে ব্যর্থ করে দিলে সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়া হবে : বিরোধীদলীয় নেতা
২২ জুলাই ২০২৬ ১৫:১৪
বরিশাল সংবাদদাতা : বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটে জনগণ প্রায় ৭০ ভাগ রায় দিয়েছে। ওই গণভোট না থাকলে এই সরকারও মানা হবে না। গণভোটকে ব্যর্থ করে দিলে আপনাদের ব্যর্থ করে দেয়া হবে। গণভোট মানতে জনগণ বাধ্য করবে।
তিনি বলেন, ধোঁকার পথে পা বাড়াবেন না। আমাদের সাফ কথা- গণভোটের গণরায় মানতেই হবে। যারা গণভোটের ভোট মানে না, তারা গণতন্ত্র মানে না, এরা গণতন্ত্রের শত্রু। আমরা চাই ফিরে আসুন, জনগণের রায়ের প্রতি আপনারা সম্মান করুন। বৈষম্যের জন্য জুলাই হয়নি, বৈষম্যের কবর রচনার জন্য জুলাই হয়েছিল। সময় থাকতে সচেতন হন, মানুষের ম্যান্ডেটের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন- বলেন আমীরে জামায়াত।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নের দাবিতে গত ২০ জুলাই শনিবার বিকেলে বরিশালের হেমায়েত উদ্দিন কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলের বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অথিতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে আয়নাঘরের সঙ্গী হয়েছে। মামলায় জেলে গিয়েছে, সন্তান হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের কাছে মাথানত করেনি। ফ্যাসিবাদকে বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনারা ডামি ফ্যাসিবাদ হতে পারবেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ হতে পারবেন না। যেসকল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, বিএনপি তার সবগুলো রেখে দিয়েছে। এটি জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। সংবিধান সংশোধন কমিটি বলে কিছু নেই। এটি অবৈধ। কোনো ভাঁওতাবাজি করলে জাতি তাদের ছেড়ে কথা বলবে না।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা অতীতের পচা রাজনীতি চাই না, পরিবর্তন চাই। নতুন শাসন ব্যবস্থা চাই। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। আপসোস! বর্তমান সরকারি দল বলেছিল অধিকাংশ জনগণ যদি হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে আমরা গণভোটের প্রত্যেকটি দাবি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করব। কিন্তু যখন হ্যাঁ বিজয়ী হলো এবং ম্যাকানিজম করে তারা ক্ষমতায় গিয়ে হ্যাঁ ভুলে গেলেন। তারা সংস্কারের কথা বলেননি বলে সরকারি দলের দাবিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন আমীরে জামায়াত।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে সংবিধান সংশোধন করার জন্য গঠিত কমিটিকে আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। তারা এই কমিটিকে এখন বিশেষ কমিটি বলছেন। জনগণের সাথে আর কত ছলচাতুরী, ধোঁকাবাজি করবে সরকার সেই প্রশ্নও রাখেন তিনি। পদে পদে মিথ্যা বলা ও ধোঁকাবাজির পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
তিনি বলেন, চব্বিশ টানতে গিয়ে ৭১ টানতে হবে কেন? চব্বিশ থাকবে চব্বিশের মর্যাদায়, ৭১ থাকবে তার মর্যাদায়। চব্বিশ হারিয়ে যেতে দেবো না আমরা। চব্বিশের বীরদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মানে সম্মানিত করতে হবে। সে শহীদ কিংবা গাজী হোক, চব্বিশ নিয়ে কোনো অবহেলা জাতি বরদাশত করবে না, সতর্ক করেন আমীরে জামায়াত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চব্বিশের ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে ওঠা জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে কোনো পরিবর্তন করা হলে আমরা আবার গর্জন করব। আমরা চুপ থাকবো না তার প্রতিবাদ করব। ঐতিহ্য গায়েব করা হয়ে থাকলে তার ষোলো আনা আদায় করে ছাড়ব। জুলাইকে ধামাচাপা দিতে কত কসরত!
তিনি আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের জাঁতাকলে জনগণ পিষ্ট। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি পরিবারে ট্যাক্স বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড দেবেন আড়াই হাজার, দাম বাড়িয়েছেন ৫ হাজার। সরকার কীভাবে এটি পুষিয়ে দেবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি।
সরকারের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় যদি মেনে না নেন, তাহলে ঢাকার মহাসবেশের জন্য প্রস্তুত থাকুন। জনগণ প্রয়োজনে চিড়ামুড়ি নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হবে। এর আগে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং গণভোটের রায় মেনে নেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন আমীরে জামায়াত।
তিনি আরও বলেন, ভোলা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। ভোলাবাসীর ন্যায্য পাওনা একটি সেতু। সেটি এখনো কেন একনেকে ওঠেনি, এর জবাব আমরা চাই। বরিশালবাসী রেললাইনের গল্প শুনেছে, রেললাইন দেখেনি। বরিশালে রেললাইন দিতে হবে। বরিশালকে বঞ্চিত রেখে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের পাওনা দিতে হবে, তাহলে সুষম উন্নয়ন হবে। আমরা সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকব। যেখানে বঞ্চনা সেখানে আওয়াজ তুলবো, ইনশাআল্লাহ।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা চব্বিশের তরুণ প্রজন্ম ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গণআন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব। আমরা এখনো হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দিইনি; তবে জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে, সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সংস্কারের পক্ষে কথা বললেও বাস্তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। জনগণ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায়কে উপেক্ষা করে শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না।
এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, আওয়ামী লীগের ফেরার কোনো সুযোগ নেই। তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যে আমরা কান দেবো না। আমরা চাই এদেশ থেকে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, মাস্তানি বন্ধ হোক। কিন্তু বিএনপি এসব শুনছে না। তারা আওয়ামী লীগের পতন থেকে শিক্ষা নেয়নি, বলেন তিনি।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি, নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। যারা নির্বাচনের আগে ওয়াদা দেন একরকম, আর কাজ করেন ভিন্ন, তারাই মুনাফিক। বরিশালের উন্নয়নে জাতীয় সংসদে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরায় প্রধান অতিথি ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রতি বরিশালবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল।
সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ও বরিশাল অঞ্চল জামায়াতের টিম সদস্য ফখরুদ্দিন খান রাজীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ডা. মাহমুদা আলম মিতু এমপি, ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নাল আবদীন, বরিশাল জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আবদুল জব্বার, বিএম কলেজের সাবেক এজিএস শেখ নেয়ামুল করিমসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয়, মহানগরী ও জেলা পর্যায়ের নেতারা।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির মুখ্য সংগঠন আরিফুল ইসলাম আদিব, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম ভূইয়া প্রমুখ।