অপরিকল্পিত উন্নয়নে প্রতি বছর কমছে চলনবিলের আয়তন


২২ জুলাই ২০২৬ ১৫:১৪

মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, নাটোর : ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’ একসময় এ প্রবাদ বাক্যের মতো সুন্দর ছিল এ বিল। যতদূর চোখ যায় বিশাল জলরাশি আর শত মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ দেখা যেত। বর্ষায় নদীর স্রোতের মতো বড় বড় ঢেউ, চোখ যেন সীমানায় পৌঁছায় না। নানারকম মাছ আর জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল। বিলের দেশীয় নানান প্রজাতির মাছ রফতানি হতো বিদেশেও। তবে যুগ যুগ ধরে মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অপরিকল্পিত বাঁধ, জাতীয় মহাসড়ক, ব্রিজ নির্মাণ এবং পুকুর খননসহ মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে চলনবিল হারিয়েছে তার জৌলুস। এতে দিনে দিনে কমছে বিলের আয়তন, প্রবাহ ও গভীরতা।
একসময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে এ চলনবিল। বিলটির আয়তন ১০০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি থাকলেও, বর্তমানে পলিমাটি জমে তা কমে বর্ষাকালে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ বর্গকিলোমিটারে।
চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। তবে পলি জমে ভরাট এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদীই তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এসব নদনদী, খালে মাছ শিকারের সঙ্গে এক লাখ ৭৭ হাজার জেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চলনবিলের মিঠাপানির বোয়াল, রুই, কাতল, চিতল, গজার, শোল, দেশি পুঁটি, টেংরা, খলসা, চেলা, বাতাসী, মলা, জিয়ল, দেশি শিং, মাগুর, কই, টাকি, বাইন, কাঁকলা, আইড়, পাবদা খুব জনপ্রিয় ছিল। নদনদীর পানি বিলে পর্যাপ্ত প্রবেশ না করা, অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের ফলে দিনে দিনে বিলুপ্তের মুখে এসব দেশীয় মাছ। ফলে এ পেশা ছেড়ে অনেক জেলে অন্য পেশায় চলে গেছেন। জেলেদের উৎপাদিত দেশীয় শুঁটকি মাছ রফতানি হয় বিদেশেও। এ শুঁটকি তৈরির সঙ্গে হাজারো পরিবার সম্পৃক্ত। বর্ষায় মাছ বিক্রির টাকায় চলতো জেলেদের সারা বছরে খোরাক। তবে মাছ কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদন অনেক অংশে কমেছে। কমেছে শুটকি উৎপাদনকারীদের সংখ্যাও।
উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব
১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ী-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক নিমার্ণের ফলে বড় বাধা পড়ে চলনবিলের ওপর।
১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইসগেট নির্মাণ হয়েছে। চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় হাইটেক পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চলনবিলের বুকচিড়ে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই রাস্তা। অন্যদিকে পুকুর খনন করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে বিস্তীর্ণ চলনবিলে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। ফলে পানির গতিপথ নষ্ট হয়েছে। কমছে বিলের আয়তন।
চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম বিল এবং একটি সমৃদ্ধ জলাভূমি, যা নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত হলেও এর বড় অংশ পড়েছে নাটোর জেলায়। এটি আত্রাই ও বড়াল নদীর সংযোগস্থল এবং যমুনা নদীর সাথে সংযুক্ত। একসময়ের বিস্তীর্ণ এই জলাভূমিতে সারা বছর পানি থাকতো এবং চলন্ত বিল নামে পরিচিত ছিল, যা পরবর্তীতে চলনবিল নামে রূপ নেয়।
বিভিন্ন গবেষকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়। সে সময়েই চলনবিলের সৃষ্টি। ধারণা করা হয়, গঠিত হওয়ার সময় চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এর আয়তন অনেক কমে এসেছে। ১৯১৯ সালে ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়ার হিসাব মতে, চলনবিলের আয়তন ৫০০ বর্গমাইল বা প্রায় ১৪২৪ বর্গকিলোমিটার। অপরদিকে ১৯৬৮ সালের জরিপ মোতাবেক চলনবিলের আয়তন ৮০০ বর্গমাইল বা প্রায় ২০৭২ কিলোমিটার।
ইম্পিরিয়াল গেজটিয়ার অব ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এই আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। হিসাব অনুযায়ী, ৮২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ৪০৮ বর্গমাইল।
উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। এই হিসাবে ১৯০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ১৯৯ বর্গকিলোমিটার। প্রতিবছর গড়ে বিলের আয়তন কমছে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার।
বর্তমানে চলনবিল অনেকখানি হ্রাস পেয়ে আয়তন দাঁড়িয়েছে ১১৫০ বর্গ কিলোমিটারে। বিশেষ করে চলনবিলের বুক চিরে দীর্ঘ জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত কালভার্ট ও বসতি স্থাপনসহ বিভিন্ন মনুষ্যসৃষ্ট কারণে চলন বিলের আকার ক্রমান্বয়ে ছোট হচ্ছে। নাটোর জেলার সিংড়া, নলডাঙ্গা এবং গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম থানার বেশ কিছু অংশ জুড়ে রয়েছে চলনবিল। এসব এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে পুকুর খননে সৃষ্ট হয়েছে জলাবদ্ধতা। ফলে বিলের নিজস্ব পানিপ্রবাহ গতিপথ বাধাগ্রস্ত করেছে। এতে মারাত্মকভাবে কমছে বিলের আয়তন।
চলনবিলে পানির প্রধান উৎস হচ্ছে বড়াল নদ, গুমানী ও আত্রাই। পদ্মা-যমুনার পানি এ তিন নদনদীর মাধ্যমেই বিলে প্রবেশ করে। ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রথম এই পানি কমে। ১৯৮৫ সালে বড়াল নদের উৎসমুখ রাজশাহীর চারঘাটে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বড়াল নদ পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এরপর থেকে চলনবিলও পানিশূন্য হতে থাকে।
কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্যানুসারে, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদনদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে বড়াল নদ। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। কৃষকরা এসব খাল ও নালা থেকে ফসল উৎপাদনে সেচের পানি পেতেন। বর্তমানে ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, যা মোট নালা ও খালের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাকি ৪২ কিলোমিটার নালা ও খাল পুনরায় খনন করে নাব্য ফেরানোর কাজ চলছে।
সিংড়া পরিবেশ ও প্রকৃতি আন্দোলনের সভাপতি মোল্লা মো. এমরান আলী রানা জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্যতা হ্রাস চলনবিলের আয়তন দিনে দিনে কমছে। অন্যদিকে অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে কমছে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ। সরকারের উচিত চলনবিলকে রক্ষা করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা। তা না হলে একসময় চলনবিল হারাবে তার জৌলুস।
নাটোর বিএডিসি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের আয়তন কমার মূল কারণই হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদনদীর নাব্য কমে যাওয়া, পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষ করে অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দিয়ে পানির প্রভাব বন্ধ করা। চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি।
তিনি আরও বলেন, চলনবিলের ভিতরে অসংখ্য খাল রয়েছে, সেই খালগুলোর নাব্য ফেরাতে নিয়মিত পলি অপসারণ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণে দৃষ্টি দিতে হবে। তাহলেই কেবল আমাদের এই বিল রক্ষা করা সম্ভব হবে।