বর্জ্যে মৃতপ্রায় দাউদকান্দির কালাডুমুর
২২ জুলাই ২০২৬ ১৫:০৯
তৌফিক রুবেল, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : দাউদকান্দি-ইলিয়টগঞ্জ মহাসড়কের সেতুর নিচে যতদূর দৃষ্টি যায়, চোখে পড়ে শুধু প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা-আবর্জনা ও কচুরিপানার স্তূপ। তীব্র দুর্গন্ধে সেখানে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর। অথচ একসময় এই নদীপথেই চলত নৌকা, জেলেদের জালে ধরা পড়ত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। আজ সেই গোমতী নদীর শাখা কালাডুমুর নদ বর্জ্যের চাপে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহাসিক ইলিয়টগঞ্জ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিদিনের অধিকাংশ আবর্জনা নদীর তীরে কিংবা সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, নাব্য কমছে এবং ভয়াবহ পরিবেশদূষণের সৃষ্টি হয়েছে।
দাউদকান্দি, চান্দিনা, মুরাদনগর, দেবিদ্বার এবং চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ইলিয়টগঞ্জ বাজার। প্রতিদিন হাজারো মানুষের সমাগম হলেও এখানে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য গিয়ে জমা হচ্ছে কালাডুমুর নদে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ, নিয়মিত নৌযান চলাচল করত এবং দেশীয় মাছে ছিল সমৃদ্ধ। বর্তমানে নদীর বড় অংশ কচুরিপানা ও আবর্জনায় ঢেকে গেছে। পানির রং কালচে হয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দূষণের কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে।
গোমতী নদীর গৌরীপুর উৎস থেকে ইলিয়টগঞ্জ বাজার পর্যন্ত কালাডুমুর নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং ইলিয়টগঞ্জ থেকে পতনমুখ পর্যন্ত আরও প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রায় ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর পানি ব্যবহার করে এ অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। ফলে স্থানীয় কৃষি উৎপাদনে নদীটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নদীতীরের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ছোটবেলা থেকে এই নদী দেখে আসছি। একসময় এটি ছিল আমাদের গর্ব। এখন চোখের সামনে নদীটাকে মরে যেতে দেখছি।
নদীনির্ভর এক জেলে বলেন, আগে মাছ ধরেই সংসার চলত। এখন মাছ নেই বললেই চলে। নদীতে নৌকা চালানোও কঠিন হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে। স্থানীয় কৃষকরাও জানান, দূষিত পানির কারণে কৃষিকাজে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চারবার জাতীয় পদকপ্রাপ্ত এগ্রিকালচারাল ইম্পর্টেন্ট পারসন (এআইপি) অধ্যাপক মতিন সৈকত কালাডুমুর নদের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ অভিহিত করে বলেন, ‘ইলিয়টগঞ্জ বাজারের বর্জ্যে কালাডুমুর নদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নদটির পুনঃখনন, বর্জ্য অপসারণ এবং দখল-দূষণ বন্ধে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বাজার কমিটি ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
অন্যদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের জন্য উপযুক্ত জায়গার অভাবই সমস্যার মূল কারণ। ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের জায়গা না থাকায় সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় একাধিকবার উত্থাপন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক রেদওয়ান ইসলাম বলেন, ডাম্পিং স্টেশনের জন্য জায়গা সংকট রয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পর্যায়ক্রমে নদী ও খাল পুনঃখনন এবং পরিবেশদূষণ রোধে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।’