ইসলামী সভ্যতার অবদানে বিনির্মিত আজকের অস্ট্রেলিয়া : নির্যাতিত মুসলিম

প্রিন্ট ভার্সন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:১১

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মহাদেশ, কিন্তু রাষ্ট্রের বিচারে ৬ষ্ঠ বৃহত্তম আজকের অস্ট্রেলিয়া। দেশটির রাজধানী শহর ক্যানবেরা, ভাষা ইংরেজি, প্রধান ধর্ম রোমান ক্যাথলিক, মুদ্রা অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং জনসংখ্যা ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে ২,৫৮,০০,৪৮৬ জন, যার মুসলিম সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।
অস্ট্রেলিয়ার মুসলমানরা শুধু একটি সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। তাদের ইতিহাস, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং অবদান থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় কিভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৃহত্তর সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং বৈষম্য, নির্যাতন ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক উপস্থিতি গঠন করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান : এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ওশেনিয়া অঞ্চলে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া। দেশটির আয়তন ৭৬,১৭,৯৩০ বর্গকিলোমিটার। দেশটির উত্তরে তিমুর সাগর, আরাফুর সাগর ও টরেস প্রণালী। এর পূর্বে রয়েছে প্রবাল সাগর ও তাসমান সাগর; দক্ষিণে ব্যাস প্রণালী ও ভারত মহাসাগর। দেশটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪০০০ কিমি এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দেশটির উত্তর-পূর্বে রয়েছে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ নামক বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর। প্রায় ২৫০০টি প্রাচীর ও অনেক ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে এ প্রবাল প্রাচীর তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস : জানা যায়, প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম মানুষের পদার্পণ হয়েছে যাদেরকে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করা হয়। পরে ১৬০৬ সালে ডাচ জাহাজ ‘ডুয়ুফকিন’ অস্ট্রেলিয়ার উত্তর উপকূলে এবং ব্রিটিশ নেভির ক্যাপ্টেন জেম্স কুক ১৭৭০ সালের নভেম্বরে জাহাজ নিয়ে আসে পূর্ব উপকূলে। ১৭৮৮ সালের দিকে ব্রিটিশরা আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের হত্যা করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট জ্যাকসনে রাজা তৃতীয় জর্জের নামে ব্রিটিশ ক্রিমিনালদের জন্য প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ সৃষ্টি করে। যদিও বলা হয়, ব্রিটিশ নেভীর ক্যাপ্টেন জেমস কুক ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন, খ্রিষ্টীয় ১৭ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত বহির্বিশ্বের কাছে দ্বীপটি অজানা ছিল। আদি এই উপনিবেশ পরবর্তীকালে বড় হয়ে সিডনি শহরে পরিণত হয়েছে। ১৯ শতকজুড়ে অস্ট্রেলিয়ায় ছোট ছোট ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে এগুলো একত্রিত হয়ে স্বাধীন অস্ট্রেলিয়া গঠন করে।
প্রশাসন : অস্ট্রেলিয়া ৬টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে গঠিত। এই অঙ্গরাজ্যগুলো হলো- নিউ সাউথ ওয়েল্স, কুইন্সল্যান্ড, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া। এছাড়া রয়েছে অস্ট্রেলীয় রাজধানী টেরিটরি এবং উত্তর টেরিটরি। এগুলো ছাড়া সাগরের ভিতরে রয়েছে অ্যাশমোর ও কার্টিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলীয় অ্যান্টার্কটিকা, ক্রিসমাস দ্বীপ, কোকোস দ্বীপপুঞ্জ, কোরাল সি দ্বীপপুঞ্জ, হার্ড দ্বীপ ও ম্যাকডনাল্ড দ্বীপপুঞ্জ এবং নরফোক দ্বীপ।
ইসলামী সভ্যতা : আফ্রিকার মুসলিম সালতানাতের সময়কার পাঁচটি তাম্র মুদ্রা পাওয়ার পর জানা যায় ব্রিটিশ নেভীর ক্যাপ্টেন জেমস কুকের অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের অন্তত ৬শ’ বছর আগে দেশটির সঙ্গে ইসলামী সভ্যতার পরিচয় ঘটে। পরবর্তীতে ম্যাকাসান ইন্দোনেশীয় ব্যবসায়ী এবং মুসলিম নাবিকরা ১৭০০-এর দিকে উত্তর অস্ট্রেলিয়ার আর্নহেম ল্যান্ডে মাছ ধরতেন এবং স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সাথে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময় করতেন।
২০০৬ সালের আদমশুমারি মতে, আফগান উটচালকরা (১৯ শতকের মধ্যভাগে) অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে উটচালনের মাধ্যমে ইসলামী অধ্যয়ন কেন্দ্র তৈরি এবং ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করেন। কালক্রমে ১৮৬১ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার মারিতে এবং ১৮৮৮ সালে অ্যাডিলেডে প্রথম মসজিদগুলো নির্মিত হয়। আর সিডনি শহরের প্রথম মসজিদ নির্মিত হয় ১৯৬০ সালের দিকে সারি হিলস এলাকায়। তবে সবচেয়ে বড় মসজিদ লাকেম্বা ও অবার্নে। অবার্ন মসজিদের নাম গ্যালিপলি মসজিদ। এটি তুর্কি ইমিগ্রান্টরা আর লাকেম্বা মসজিদটি লেবাননি মুসলমানরা তৈরি করেন। যদিও অস্ট্রেলিয়ায় নতুন মসজিদ ও মাদরাসা বা মুসলিম স্কুল তৈরিতে প্রবল বাধা আসে। সিডনির ডুরালং ভ্যালি রিসোর্টকে কিনে মুসলমানেরা স্কুল বানাতে গেলে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনির ক্যামডেনেও একই ধরনের বাধা আসে। অস্ট্রেলিয়ায় ‘উটচালক আফগানদের পর জার্মান, তুরস্ক, লেবানন, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানসহ বহুদেশ থেকে মুসলমানরা এসে অধিবাস গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি মতে, এই দেশসমূহের সংখ্যা ৬৭। মুসলমানদের সর্বাধিক অধিবাস নিউ সাউথ ওয়েলসে। দ্বিতীয়ত, ভিক্টোরিয়ায়। তৃতীয়ত, কুইন্সল্যান্ডে আর সম্ভবত চতুর্থ নম্বরে আছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া।
ইসলামের প্রসার : ১৯২০-১৯৩০ সালে আলবেনীয় মুসলিম অভিবাসীরা ভিক্টোরিয়া ও কুইন্সল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেন, যা অস্ট্রেলিয়ার ইসলামী অনুসারীদের পুনরুজ্জীবিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অভিবাসন নীতি সমন্বয় করে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বলকান অঞ্চল; বিশেষ করে বসনিয়া ও আলবেনিয়া থেকে আগত মুসলিম অভিবাসীরা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ১৯৭৩ সালের পরে বহু সংস্কৃতির মুসলিম অভিবাসীদের জন্য নতুন বহুসংস্কৃতিক নীতি কার্যকর হয়।
১৯৭০-২০০০ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ৪৫,২০০ জন লেবানিজের উপস্থিতি ইসলাম আরো প্রসারিত হয়। একসময় অস্ট্রেলিয়া বিনির্মাণে মুসলমানদের ইতিহাস ও অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলেও বর্তমান বেশিরভাগ অস্ট্রেলিয়ান ঐতিহাসিকরা তা স্বীকার করে। যেসব মুসলমানরা এ মহাদেশ গড়ার পেছনে অবদান রেখেছিলেন তাদের বের করে দেওয়া হলেও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত মুসলমান এবং সেখানে জন্মগ্রহণকারী মুসলমানদের মাধ্যমে আশাব্যঞ্জকভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।
অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমানদের অবদান : যারা ব্রিটিশ আইনে দেশান্তরের সাজা পেত, তাদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। ক্রমে ক্রমে দেশান্তরিত সেই লোকদের বংশধর এখানে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে বহু ব্রিটিশ অধিবাসী এ মহাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্যও এখানে এসে বসবাস শুরু করতে থাকে। যখন ব্রিটিশ অভিবাসীদের সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পেল এবং তারা এ অঞ্চলের সাথে নিজেদের ভবিষ্যৎকে জড়িয়ে ফেলল, তখন তাদের সামনে সেখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে সংযোগ স্থাপন ও মহাদেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলোয় খনি আবিষ্কার করার জন্য সড়ক নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু সমস্যা ছিল মহাদেশটির মধ্যবর্তী এলাকাগুলো ছিল মরুভূমি।
ব্রিটিশরা ঘোড়ায় চড়ে এ সমস্ত এলাকায় কাজ করার চেষ্টা করে চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে বুঝতে পারে যে, এ মরুভূমিতে যাতায়াত ও মালামাল আনা নেওয়ার জন্য উট ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। তাই নাবিকরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উট কিনে জাহাজে করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু তাদের যেহেতু উট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ছিল না তাই কয়েকবার বেশিরভাগ উট অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পৌঁছার পূর্বেই পথের মাঝে মারা যায়। ব্রিটিশরা বুঝতে পারে, উটের সাথে রাখালকেও আনা জরুরী। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে কিছু অস্ট্রেলিয়ান বণিক পাকিস্তানের করাচি বন্দরনগরীতে অবতরণ করে। তারা সিন্ধু, মাকরান, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের উটের মালিকদের সাথে চুক্তি করে যে, তারা উট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যাবে এবং সেখানকার মরুভূমি অতিক্রম করার কাজে সহযোগিতা করবে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘আফগান’ উটের প্রথম সফল কাফেলা করাচি বন্দর থেকে জাহাজে আরোহন করে ১৮৬৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে। উটচালকদের একটি বিরাট অংশ ছিল আফগান বংশোদ্ভূত। তাই অস্ট্রেলিয়ায় তাদের ‘আফগান’ বলা হতো।
আফগানদের পরিশ্রম ও প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার ফলে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মিত হয়, খনি আবিষ্কৃত হয় এবং সুচারুরূপে খনি থেকে মালামাল আনা নেয়ার কাজ সম্পাদিত হয়। আফগান উট আনার পর ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করে সমগ্র মহাদেশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এছাড়া Macassan sailboat অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম যে মুসলমানরা পদার্পণ করে তারা ছিল ব্যবসায়ী। ইন্দোনেশিয়ার ম্যাকাছান (Macassan) এবং বুগিস (Bugis) ব্যবসায়ীদের সাথে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সম্পর্ক ছিল এবং তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশটির উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
Ghan Town: Afghan নাম সংক্ষিপ্ত করে তাদের গান (Ghan) বলা হতো। এরা সবাই ছিল মুসলমান। এরা নির্দিষ্ট এলাকায় জনবসতি গড়ে তোলে। যেগুলোকে ‘Ghan Town’ অর্থাৎ ‘আফগান জনপদ’ বলা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিনির্মাণ ও উন্নতিতে এ সমস্ত উট মালিকদের মুখ্য ভূমিকা থাকলেও তাদের সাথে ব্রিটিশ অভিবাসীদের আচরণ প্রথম থেকেই ভালো ছিল না। ১৯২০ সালে যখন সড়ক নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যায় এবং খনিসমূহ আবিষ্কৃত হয়ে যায়, তখন উটেরও প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়, এ অবস্থায় সেই আফগানদের জন্য অন্য রোজগারের সুযোগ না দিয়ে তাদের অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। তাদের অনেকে দেশে ফিরে যায়।
আর যারা রয়ে যায়, তারা অসহায় অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করে। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস থেকে তাদের অবদানকে প্রায় বিস্মৃত করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একজন গবেষক ক্রিস্টাইন স্টিবেন্স Christine Stevens) ১৯৮৯ সালে অত্যন্ত পরিশ্রম করে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন। বইটির নাম- Tin Mosque And Ghantowns। বইটিতে তিনি সেই উটের মালিকদের ইতিহাস অনেক অধ্যবসায়ের সাথে সংকলন করেন।
সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া : সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্ডাই বিচে ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব হানুক্কায় হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনলাইনে; বিশেষ করে এক্সের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুমান, ইঙ্গিত আর সরাসরি অভিযোগের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে মুসলমানরা। কোনো যাচাইকৃত প্রমাণ না থাকলেও সহিংসতার সঙ্গে ইসলাম, অভিবাসন কিংবা ‘মুসলিমদের’-কে জড়িয়ে অসংখ্য পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও হামলা প্রতিহত করতে এগিয়ে এসেছিলেন বন্ডাই বিচে উপস্থিত ফল বিক্রেতা আহমেদ আল আহমেদ যিনি একজন সিরিয়া বংশোদ্ভূত মুসলিম। তার এ সাহসী পদক্ষেপ বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ যেভাবে অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, আহমেদ আল আহমেদের ভূমিকা সেভাবে আলোচনায় আসেনি।
কিন্তু হামলাকারী মুসলিম না হলে ভাষা বদলে যায়। তখন সহিংসতাকে ব্যাখ্যা করা হয় ‘মানসিক স্বাস্থ্য সংকট’, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ কিংবা ‘দুঃখজনক ব্যতিক্রম’ হিসেবে। ফলে সহিংসতার একটি বাছাই করা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে প্রমাণ নয়, পরিচয়ই মূল নির্ধারক হয়ে ওঠে।
আহমেদ আল আহমেদের কাজ এই আলোচনার গতিপথ বদলে দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো এক সত্য উন্মোচন করেছে। মুসলিমদের বীরত্বকে প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়। এ হামলার পরপরই মুসলিমদের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করা হয় যেটি বর্তমান অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ চিত্র। তবে আহমেদ আল আহমেদকে ‘অস্ট্রেলিয়ান জাতীয় হিরো’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ।
মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাব : ১৯ শতকের পূর্বাহ্নে ব্রিটিশ শাসন ও হোয়াইট অস্ট্রেলিয়া নীতি মুসলিম সম্প্রদায়ের রূপান্তরকে সীমিত করেছিল। এ নীতির অধীনে অ-শ্বেতাঙ্গদের অভিবাসন বাধাগ্রস্ত হতো। আফগান উটচালকদের স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবহনে অবদান থাকলেও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের তাদের সুযোগ ছিল সীমিত। তবে বর্তমান মুসলিমরা বৈষম্য বা নির্যাতন, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায় ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছেন। ফলস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২ জন মুসলিম বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একজন সিডনির এমপি এড হিউজিক এবং অন্যজন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ান এমপি ডক্টর অ্যান অ্যালি। এছাড়া ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ‘অস্ট্রেলিয়ান মুসলিম ফোরাম’ সম্মেলনে দেশব্যাপী মুসলিম নেতা ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি অংশ নেন। এ ধরনের সম্মেলন মুসলমানদের রাজনৈতিক সংহতি ও অংশগ্রহণ আরো শক্তিশালী করে। দাওয়াতে ইসলামী, ইসলামিক ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের মতো অস্ট্রেলিয়ার ইসলামিক সংগঠনগুলো স্থানীয় এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।
মুসলিম নির্যাতন বা বৈষম্য : বর্তমান ৮০%-এরও বেশি মুসলিম সমাজের সদস্য জীবনে কোনো না কোনো সময় নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হন। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর গেরি ডি বর্ডমা তার ‘মস্কস অ্যান্ড মুসলিম সেটেলম্যান্ট ইন অস্ট্রেলিয়া’ ১৯৯৪ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘অস্ট্রেলিয়া একটি খ্রিষ্টান মুলুক।’ (পৃষ্ঠা ৫৬)। প্রফেসর গেরি বহু মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করে তথ্য সংগ্রহ করে জানান, প্রায় অর্ধেক তথ্যদাতা মুসলমান বলে তারা হয়রানি, বিরোধিতা ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার। প্রফেসর গেরি বলেন, ‘পোশাকের কারণে মুসলমান মেয়েরা সমালোচনার শিকার ও ঘৃণার বস্তু। এ প্রতিক্রিয়া হলো অস্ট্রেলীয়দের অজ্ঞতার কারণে (আসলে বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের করিনথিয়ন অংশে নির্দেশ রয়েছে, মেয়েরা মাথা না ঢাকলে চুল কেটে নেড়ে হোক।’ তাই তো আমরা দেখি, মাদার মেরির ছবি বা মূর্তিতে হিজাব, আর নানেরা বা খ্রিষ্টান সন্ন্যাসিনীরা বোরকা পরেন।
প্রফেসর গেরি লিখেছেন, কোনো কোনো মুসলমান মহিলা বলেন, হিজাব পরিধানের জন্য তাদের চাকরি পেতে অসুবিধা হয়। এক তথ্যদাতা মন্তব্য তুলে ধরেন ‘আমরা পোশাকের কারণে কাজের স্থানে বৈরিতার শিকার।’ অস্ট্রেলীয়রা ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে অজ্ঞ। (পৃষ্ঠা ৮৪)।
গেরি বলেন, ‘ইসলামকে শুধু দানবরূপে চিহ্নিত করা হয়নি, একে বলা হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রু। বিশেষ করে গত শতকে গ্যালিপলি যুদ্ধে এ প্রচার চলেছিল। আর ইয়েলো মিডিয়া এ ধরনের চিত্রকে তরতাজা রেখেছে। ১৯৭০ সালের তেল সঙ্কটে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বে এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন বলয়ের মিডিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াতে থাকে ফলে অস্ট্রেলীয়রা ইসলাম, ইসলামের বিভিন্ন ফিক্হ, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় বিধিবিধান এবং মুসলিমদের কলা, দর্শন, বিজ্ঞান, স্থাপত্যবিদ্যা ও সাহিত্যের বিরাট অবদান বিষয়ে অজ্ঞ।
পাদ্রি প্রফেসর গেরি ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে মন্তব্য করেন : ‘মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তিতে বহু সাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, আর এতে অস্ট্রেলিয়া হবে শক্তিশালী। দেশটি ইতোমধ্যে মুসলমানদের কর্মপ্রচেষ্টা, জ্ঞান ও কলাকৌশল দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে এবং আরো সমৃদ্ধ হবে। উভয় সম্প্রদায়কে নতুন বিষয় জানতে হবে, সমঝোতা করতে হবে, সহিষ্ণুতা ও স্বীকৃতি জাগরূক করতে হবে। মুসলমানরা নতুন কিছু জানতে ও সৃজনশীল কিছু করতে আগ্রহী।’ তিনি ইসলামের প্রশংসায় বলেন, ‘বহু-সংস্কৃতির প্রতি সহিষ্ণুতা ইসলামে নতুন কিছু নয়। স্পেনে ৮০০ বছর, ইন্ডিয়ায় ৭০০ বছর এবং ফিলিস্তিনসহ অনেক দেশে ইসলাম বহু যুগ পর্যন্ত বহু সাংস্কৃতিক, বহুমাত্রিক সহিষ্ণুতা দেখিয়েছে। উসমানী সাম্রাজ্যে সাংস্কৃতিক বহুমাত্রা ছিল সমাজের মূল অবস্থান।’
অস্ট্রেলিয়ায় মুসলমান সম্প্রদায় সুদীর্ঘ ইতিহাস ধরে সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতিতে অবদান রেখেছে। প্রাথমিক আফগান উটচালক এবং মুসলিম নাবিকদের আগমনের সময় থেকে আজকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এবং সমাজে মুসলিমদের প্রভাব বিস্তার করছেন। বর্তমান অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক অধিকার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। মুসলিমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থেকে নিজেদের ঐতিহ্য, শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বজায় রাখে এবং ভবিষ্যতে তারা অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলে দেশটি একটি নিরাপদ ইসলামী জনপদে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র : সানডে মর্নিং হেরাল্ড, অ্যাসোসিয়েট প্রেস, আল্-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, ডেইলি সাবাহ, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]