রাশিয়ায় মুসলিমরা রাষ্ট্রীয় অংশীজন

চেচনিয়ায় শরীয়া আইন চালুর অনুমতি

প্রিন্ট ভার্সন
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৪৭

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল॥
রাশিয়া আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য ও ভেটো পাওয়ারের অধিকারী। খেলাফতের যুগেই রাশিয়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। বর্তমানে মুসলিমদের হার ১৫ শতাংশ এবং ২২টি প্রদেশের ৭টি প্রদেশে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ । পুরো রাশিয়ায় মুসলিমরা সংখ্যালঘু হলেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ভালো অবস্থান রয়েছে এবং অনন্য রাষ্ট্রীয় অংশীজন। এশিয়া ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন অমুসলিম দেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হিসেবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হলেও রাশিয়ার চিত্রটা অন্যরকম। যদিও মাঝে কমিউনিস্টের সময় মুসলিমদের দুর্দিন গেছে। বর্তমান সরকার তথা ভøাদিমির পুতিনের আমলেই আবার রাষ্ট্রীয় ছন্দে চলছে রাশিয়ার দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা।
জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থান
পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার মোট আয়তন এক কোটি সত্তর লাখ পঁচাত্তর হাজার চারশ’ বর্গকি.মি.। এটি দুই মহাদেশ ইউরোপ এবং এশিয়া অবস্থিত। রাশিয়া ১১টি সময় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং এখানে অনেক রকম ও বিস্তৃত পরিবেশের সমন্বয় ঘটেছে। রাশিয়া বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ। এখানে ১৪৩ মিলিয়নের বেশি লোক বসবাস করে যার ২০ মিলিয়নেরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যা। মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ হচ্ছে মুসলিম। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ হওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ, যার মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, খনিজ এবং অমূল্য বনভূমি।
বৃহত্তম দেশ রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব পর্যন্ত নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড, বেলারুশ, ইউক্রেন, জর্জিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, চীন, মঙ্গোলিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সাথে সীমান্ত আছে। দেশটির অখতস্ক সাগরের মাধ্যমে জাপানের সাথে ও বেরিং প্রণালীতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার সাথে সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে।
রাশিয়া বা রুশ প্রজাতন্ত্রের সরকারি ভাষা হলো রুশ ভাষা। রাশিয়ার প্রায় ৮০% লোক এই ভাষায় কথা বলে। রাশিয়ায় আরও প্রায় ৮০টিরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। এদের মধ্যে কতগুলো ভাষার আঞ্চলিকসহ সরকারি মর্যাদা আছে। চেচেন, চুভাশ, কালমিক, কাবার্দিয়ান, কোমি, মারি, মর্দভিন, ওসেটীয়, তাতার, তুভিন, উদমুর্ত, ইয়াকুত, অ্যাভার, বুরিয়াত, বাশকির ইত্যাদি। এছাড়া জার্মান, পোলীয় ভাষাও প্রচলিত। জিপসি বা রোমানি ভাষাতেও অনেকে কথা বলে।
রাশিয়ার ব্যাপক খনিজ ও জ্বালানিসম্পদ একে বিশ্বের বৃহত্তম মজুদদার হিসেবে তৈরি করেছে। রাশিয়া বিশ্বের সর্বোচ্চ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি পারমাণবিক শক্তি সম্পন্ন পাঁচটি স্বীকৃত দেশের মধ্যে অন্যতম এবং দেশটির বিশ্বের বৃহত্তম ধ্বংসাত্মক অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে।
রাশিয়ার ইউরোপিয়ান অংশ
রাশিয়ার ইউরোপিয়ান অংশ উরাল পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত এবং এর আয়তন প্রায় ২৩%। এ অংশটি রাশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং কাজান এর মতো বড় শহরগুলো এখানে অবস্থিত। ইউরোপিয়ান অংশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য প্রধানত সমতল ও নদীপ্রবাহিত, যা কৃষি ও শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্কো, রাশিয়ার রাজধানী, শুধু ইউরোপীয় রাশিয়ার কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
রাশিয়ার এশিয়ান অংশ
রাশিয়ার বৃহৎ অংশ এশিয় মহাদেশে অবস্থিত যা প্রায় ৭৭% আয়তন নিয়ে সাইবেরিয়া নামে পরিচিত। সাইবেরিয়া একটি বিশাল ভূখণ্ড, যা ইউরাল পর্বত থেকে পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ, বনভূমি এবং তাপমাত্রাগত বৈচিত্র্য রয়েছে। এ অংশে রয়েছে অত্যন্ত শীতল জলবায়ু, যেখানে শীতকাল দীর্ঘ এবং তাপমাত্রা অনেকটাই নিচে নেমে যায়। এশিয়ান অংশে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শহর ইরকুটস্ক যা শিল্প, শিক্ষামূলক কেন্দ্র। সাইবেরিয়ার বৃহত্তম শহর নভোসিবিরস্ক এবং ওমস্কের মতো শহর যা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কেন্দ্র।
দেশটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
রাশিয়ার ইতিহাস শুরু হয় তৃতীয় ও অষ্টম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব স্লাভদের মাধ্যমে যারা ইউরোপের একটি স্বীকৃত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ভারাঞ্জিয়ান যোদ্ধা ও তাদের বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও শাসিত হয় এবং নবম শতকে দেশটির উত্থান শুরু হয়। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য থেকে গোঁড়া খ্রিস্টানরীতি গৃহীত হয়। এর ফলে বাইজান্টাইন ও স্লাভ সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটে, যা পরবর্তী সহস্রাব্দ পর্যন্ত বহাল থাকে। রাশিয়া অনেকগুলো ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ জমি মোঙ্গলদের আক্রমণের পদদলিত হয় ও যাযাবরদের জন্য স্বর্গ হয়ে ওঠে। মস্কোর গ্র্যান্ড ডিউক শেষ পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী রুশ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেন ও যাযাবরদের কাছে থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেন। এছাড়া রাশিয়ার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে রয়েছে-
১. ১৫৪৭: রাশিয়ায় জারতন্ত্র চালু হয়। রুশ সাম্রাজ্যের প্রথম জার ছিলেন মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স চতুর্থ ইভান।
২. ১৬৮৯-১৭২৫: রুশ সাম্রাজ্যের সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রবর্তন করেন পিটার দ্য গ্রেট।
৩. ১৭৯৮-১৮১৫: ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় জোটে অংশ নেয় রাশিয়া। ১৮১২ সালে নেপোলিয়নকে পরাজিত করে।
৪. ১৮৫৩-৫৭: অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড দখল করতে গিয়ে ক্রিমিয়া যুদ্ধে পরাজিত হয়।
৫. ১৯০৪-০৫: মঞ্চুরিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে জাপানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
৬. ১৯০৫-এর বিপ্লবের কারণে রুশ পার্লামেন্ট ডুমা ও সংবিধান প্রবর্তন করতে বাধ্য হন জার দ্বিতীয় নিকোলাস।
৭. সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয় ১৯২২ সালে। তবে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, যা পরে ১৯২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের ইউনিয়ন (টঝঝজ) হিসেবে গঠিত হয়।
৮. বিংশ শতকের কিছু উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত সাফল্য পেয়েছিল যার মধ্যে ছিল বিশ্বের প্রথম মহাকাশযান ও প্রথম নভোচারী। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সোভিয়েতের রুশীয় প্রজাতন্ত্র রুশ ফেডারেশন হিসেবে গঠিত হয় এবং একক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হয়।
৯. ২০২২: রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করে যে যুদ্ধ এখনো চলমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপের সব চেয়ে বড় যুদ্ধ এটি। (৩০ মার্চ ২০২৩; বাংলা ট্রিবিউন)।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাশিয়া
পররাষ্ট্রনীতি বা বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাশিয়া মিত্রতার নীতি গ্রহণ করে। তবে বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন সম্পর্ক তিক্ত হয়ে যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পরাক্রমশালী রাষ্ট্র রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং জি-৮, জি-২০, দি কাউন্সিল অব ইউরোপ, দি এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিউনিটি, ইউরোপ নিরাপত্তা সংগঠন কাউন্সিল (ওএসসিই) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য।
দুই মহাদেশে প্রভাব
রাশিয়ার অবস্থান দুটি মহাদেশে বিস্তৃত হওয়ায়, এটি বিশ্ব রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তার অবস্থান তাকে বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রাশিয়াকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার জন্য এতবড় বিশাল ভূখণ্ডের সুসংহত রাখাও একটি চ্যালেঞ্জও।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া
ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক বেশ জটিল। যদিও তারা একে অপরের সাথে ব্যবসা করে, তবে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তাদের সম্পর্ক একটু ভিন্ন।
চীন ও রাশিয়া
চীনের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আরও গভীর হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শক্তি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছে।
রাশিয়ায় ইসলামের আলো
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের মাত্র ২২ বছর পর রাশিয়ার মাটিতে ইসলামের আলো পৌঁছে যায়। বর্তমান রাশিয়ার দাগিস্তান অঞ্চল সর্বপ্রথম মুসলিম শাসনাধীন হয়। এরপর ইতিহাসের নানা পর্যায়ে উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানীয় ও সেলজুক শাসকরা বর্তমান রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল বিজয় করেন। ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়ান ও তুর্কি বাহিনী রাশিয়ার রাজধানী মস্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু খেলাফত তথা কেন্দ্রীয় মুসলিম শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর রুশ অঞ্চলে একাধিক স্বাধীন মুসলিম রাজ্য গড়ে ওঠে। আঠারো শতকের শুরু থেকে রুশ সাম্রাজ্য প্রতিবেশী এসব রাজ্য দখল করে নেয়। তবে রাশিয়ায় ২২টি স্টেটের বা প্রদেশের মধ্যে বিশাল অংশ তথা ৭টি স্টেটেই রয়েছে মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় রাশিয়ায় মুসলিমদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ইতিবাচক।
দাগিস্তান
২০ হিজরিতে ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সাসানিদের পরাজিত করে দাগিস্তানের ‘বাবুল আবওয়াব’ শহর জয় করেন সাহাবী সুরাকা ইবনে আমর (রা.)। এরপর থেকে দাগিস্তান ওই অঞ্চলে ইসলামের দুর্গ হিসেবেই ভূমিকা পালন করে আসছে। ‘দাগিস্তান প্রজাতন্ত্রে’ জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তি স্বাধীনতা সংগ্রামী ইমাম শামিল। রুশ বিপ্লবের পর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে দাগিস্তানকে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত করা হয় এবং রুশ ফেডারেশন গঠিত হওয়ার পর স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রাখা হয়। তবে স্থানীয় মুসলিমরা কখনোই রুশ আগ্রাসন মেনে নেয়নি। ১৯৯৯ সালে দাগিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে। দাগিস্তানের আয়তন ৫০ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যার ৮২.৬০ শতাংশ মুসলিম। রাজধানী শহর মাকাসকালা। রুশ বিপ্লবের আগে দাগিস্তানে ১ হাজার ৭০০ মসজিদ ও ৭৬৬ মাদরাসা ছিল, যা পরিচালনা করতেন আড়াই হাজার আলিম ও কাজি। সোভিয়েত সরকার তা বন্ধ করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দাগিস্তানে মুসলিম জাগরণ হয়। সেপ্টেম্বর ২০০৩-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, বর্তমানে দাগিস্তানে ৫৫৭টি সাধারণ মসজিদ, ১ হাজার ৯১টি সালাত কক্ষ, ১৬টি ইসলামী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪১টি মাদরাসা এবং ৩২৪টি মসজিদভিত্তিক মক্তব রয়েছে।
ইঙ্গোশেটিয়া
ইঙ্গোশেটিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘ইঙ্গোশেটিয়া প্রজাতন্ত্র’। এটি রাশিয়ার একটি স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক অঞ্চল। ৩ হাজার ৬২৮ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট ইঙ্গোশেটিয়ার ৯৬ শতাংশ অধিবাসী মুসলিম। মাগাস তার রাজধানী। বেশিরভাগ মানুষ ইঙ্গোশ ভাষা ব্যবহার করে। উনিশ শতকে এটি রুশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। ১৯৩৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইঙ্গোশেটিয়াকে চেচনিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে ‘দ্য চেচেন-ইঙ্গোশ অটোনমাস রিপাবলিক’ ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালে চেচনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করলে ইঙ্গোশেটিয়া নবগঠিত রুশ ফেডারেশনে যোগদান করে। প্রচুর খনিজ সম্পদের অধিকারী হলেও এটি অন্যতম দারিদ্র্য অঞ্চল। বর্তমানে ইঙ্গোশেটিয়ায় চারশর বেশি মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
চেচনিয়া
চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রও রাশিয়ার একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। চেচনিয়ার ৯৫ শতাংশ নাগরিক মুসলিম। ১৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চেচনিয়ার রাজধানী শহর গ্রোজনি। ধারণা করা হয়, ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে চেচনিয়ায় ইসলামের আগমন হয়। তবে ইসলামী শাসন স্থিতিশীল হয় ৭৩০ খ্রিস্টাব্দের পর। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে চেচনিয়ায় রুশ আগ্রাসন শুরু হয়। এরপর তিন শতাব্দীকালেও শেষ হয়নি চেচেন মুসলিমদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। নিকট-অতীতেও চেচনিয়া দুটি ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। ১৯৯৪-৯৬ প্রথম রুশ-চেচেন যুদ্ধ এবং ১৯৯৯-২০০০ দ্বিতীয় রুশ-চেচেন যুদ্ধ। ২০০১ সালে রাশিয়া ও চেচনিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০০৩ সালে রাশিয়া চেচনিয়ার জন্য নতুন সংবিধান রচনা হলে চেচনিয়ায় শান্তি ফিরতে শুরু করে।
বাশকোরতুস্তান
রুশ সংবিধান অনুযায়ী, এটি রুশ ফেডারেশনের অধীন একটি সার্বভৌমত্বহীন স্বাধীন রাষ্ট্র। আয়তন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার। রাজধানী উফা। এটি রাশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল ও খনিজসমৃদ্ধ এলাকা। বাশকোরতুস্তানকে সংক্ষেপে বাশখিরও বলা হয়। বাশখিরের জনসংখ্যার ৫৮.৬২ শতাংশ মুসলিম। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় দশম শতকে এখানে ইসলামের আগমন হয় এবং মোগল মুসলিমদের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়। তবে ষষ্ঠদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রুশ আগ্রাসনে তারা স্বাধীনতা হারায়। বাশখির সোভিয়েত রাশিয়ার প্রথম গঠিত প্রজাতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১১ অক্টোবর ১৯৯০ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তবে রহস্যজনক কারণে তা প্রত্যাহার করে বাশখির নেতারা রুশ ফেডারেশনে যোগদান করে।
কারচে-চের্কেসিয়া
হিজরি দ্বিতীয় শতকে মুসলিমরা আর্মেনিয়া জয় করার পর ওই অঞ্চল মুসলিম শাসনাধীন হয়। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতক থেকে চের্কেসিয়ায় রুশ আগ্রাসন শুরু হয়।
কারচে-চের্কেসিয়ার আয়তন ১৪ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার। চের্কেসিয়ার জনসংখ্যার ৬৪.২ শতাংশ মুসলিম। ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত হয় এবং ১৯২৮ সালে স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর চের্কেস নেতারা রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়।
তাতারস্তান
রাশিয়ার একটি স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় অঞ্চল। খ্রিস্টীয় দশম শতকে এখানে ইসলামের বিস্তার ঘটে এবং দ্বাদশ শতকে ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ১৪৩৮ খ্রিস্টাব্দে চেঙ্গিস খানের একজন বংশধর কাজানকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে রুশ সাম্রাজ্যের কাছে স্বাধীনতা হারায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পরও তাতার মুসলিমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৯৪ সালে তাতার জনগণ গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়। কিন্তু তাতার নেতারা ১৯৯৪ সালে সম্পাদিত এক চুক্তির অধীনে রুশ ফেডারেশনে যোগদান করে। তাতারস্তানের আয়তন ৬৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যার ৫৩.৮ শতাংশ মুসলিম।
কাবার্ডিনো-বালকারিয়া
কাবার্ডিনো-বালকারিয়া অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে। মুসলিমরা খাজার রাজ্য জয় করার পর সেখানে ইসলামের অগ্রযাত্রা শুরু হয় এবং তা অব্যাহত থাকে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, যখন রুশ সাম্রাজ্যের কাছে অত্র অঞ্চল স্বাধীনতা হারায়। কাবার্ডিনো-বালকারিয়ার মোট আয়তন ১২ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার। রাজধানী শহর নলচিক। ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এলব্রাস এখানে অবস্থিত। কাবার্ডিনো-বালকারিয়ার জনসংখ্যার ৫৫.৪ শতাংশ মুসলিম।
মুসলিমদের প্রতি রুশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
সারা পৃথিবীতে অধিকাংশ রোমান ক্যাথলিক খৃস্টান হলেও রাশিয়াতে অর্থোডক্স খ্রিস্টান। ‘ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, ক্যাথলিক ধর্মের চেয়ে অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্ম ইসলামের অনেক কাছাকাছি’। প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের এই বিখ্যাত উক্তি রুশ সরকারের মুসলিমদের প্রতি বন্ধুত্বের বহিঃপ্রকাশ। ভøাদিমির পুতিন আরো বলেন, ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিদ্রƒপ করা মানেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়। নবীকে বিদ্রƒপ করার অর্থ ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন এবং যারা ইসলাম ধর্মকে বিশ্বাস করে তাদের বিশ্বাসের প্রতি আঘাত। রাশিয়া অমুসলিম দেশ হলেও সরকারী ভাবে দেশের মুসলিমের জন্যে একজন প্রধান মুফতি আছেন। শরিয়া বোর্ড আছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ৭৬% রাশিয়ান নাগরিক তাদের দেশে মুসলমানদের প্রতি অনুকূল ভালো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। অনেক দেশে হিজাব, আজান নিষিদ্ধ সেখানে রাশিয়ার চেচনিয়ায় শরিয়া আইন বাস্তবায়িত করার অনুমতি দিয়েছেন। রাশিয়াতেই ইউরোপের ‘সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সুন্দর’ মসজিদ নবী মুহাম্মদের (সা.) নামানুসারে, মার্বেল-সজ্জিত মসজিদটির ধারণক্ষমতা ৩০,০০০ এরও বেশি লোক। এছাড়া রাশিয়ায় চার্চ আর মসজিদ দেখতে অনেকটাই একই রকমের। চার্চের ফাদাররাও লম্বা দাড়ি জুব্বা পরে মেয়েরা হিজাব বোরকার মতো জামা পরে।
রাশিয়ান সরকারে মুসলিমদের শক্ত অবস্থান
রাশিয়ান সরকারে অনেক মুসলিম সদস্য আছেন। এ সদস্যরা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী এবং অন্যান্য সরকারি পদে কর্মরত আছেন। রাষ্ট্রপতি ভøাদিমির পুতিনের মতে, রাশিয়া একটি আংশিকভাবে মুসলিম দেশ এবং ইসলাম রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধর্মগুলোর মধ্যে একটি। চেচনিয়ার মুসলিম নেতা রমজান কাদিরভ রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত।
ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিমদের ওপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে নির্যাতন চলছে, তা বন্ধ করে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের দেশ রাশিয়া দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বিশ্বমানবতার যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, সেটি অন্যান্য অমুসলিম ভূখণ্ডের সরকারের জন্য অনুসরণ করা আবশ্যক।
রাশিয়া সরকার তথা বর্তমান রাশিয়ান প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিমদের প্রতি রাশিয়ান ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রতিফলিত হয়, তেমনি রুশ প্রজাতন্ত্র কর্তৃক চেচনিয়ার স্বায়ত্তশাসন প্রদান, চেচেন নেতা রমজান কাদিরভের ইউক্রেন যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন প্রমাণ করে রাশিয়ান সরকার এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের পরস্পরের পরস্পরের সঙ্গে রয়েছে গভীর সম্পর্ক এবং দায়বদ্ধতা যা দেশটিকে বিশ্বের অন্যান্য অমুসলিম সরকার থেকে পৃথক করেছে।
রাশিয়া সরকার এবং মুসলিম সম্প্রদায় এভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চললে রাশিয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামরিক সাফল্য যেমন নিশ্চিত, তেমন অন্যান্য অমুসলিম রাষ্ট্র এমন উদাহরণ তৈরি করতে পারলে তাদের জন্যেও এটি একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা, আল মিসবার, আল মাআরিফা, বিবিসি, উইকিপিডিয়া।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।