ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা কি আরেকটি ধোঁকাবাজি

স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্নের কবর


২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৬

হামাসকেও সরে যেতে হবে

॥ ফেরদৌস আহমদ ভুইয়া ॥
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ বন্ধে ২০ দফার ‘যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব’ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ কথিত ‘শান্তি পরিকল্পনায়’ সায় দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ প্রস্তাবে বেশকিছু ধারা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে, যা শুধু ফিলিস্তিন নয়, পুরো অঞ্চলটির ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস গাজার শাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকবে। এতে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ আছে, যদিও নেতানিয়াহু পরবর্তীতে তা নাকচ করেছেন। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকেও নেতানিয়াহু মেনে নিচ্ছে না; অপরদিকে হামাসকেও গাজা থেকে সরে যেতে হবে এ ধরনের শর্ত দিয়েই গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ২০ দফা প্রস্তাব সংবলিত একটি পরিকল্পনা করেছে।
মি. নেতানিয়াহু এ পরিকল্পনায় সমর্থন জানালেও গাজায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) শাসন ফেরার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্টভাবে বলেছেন, গাজার শাসনের ভার হামাসের হাতে যাবে না, পিএ’র হাতেও না।
এদিকে হামাস জানিয়েছে, তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা নিয়ে শান্তি পরিকল্পনা এখনো পায়নি। হামাসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ কথা বলেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনো ট্রাম্পের প্রস্তাব পাইনি। প্রস্তাবটি হাতে পেলে আমরা তা পর্যালোচনা করব এবং তারপরই জবাব জানাব।’
আল-জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা এবং এটা আরেকটি ধোঁকাবাজি নয়তো। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে লেখক-বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন মন্তব্য করে বলেছেন, গাজাকে ইসরাইলের কাছে বর্গা দেয়ার জন্যই ট্রাম্প এ পরিকল্পনা দিয়েছে। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে গাজাকে ইসরাইলের করদরাজ্যেই পরিণত করা হবে। এর মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নই শেষ হয়ে যাবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর তারেক ফজল তার ফেসবুক পেজে এক মন্তব্যে লিখেছেন, “মি. ট্রাম্পের ‘গাজা ২০ দফা’ ভাঁওতাপূর্ণ, অস্পষ্ট, অগ্রহণযোগ্য। ফিলিস্তিনের স্বীকৃতি ও কার্যকর প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর অপকৌশল। প্রত্যাখ্যান করুন।”
বাংলাভাষার বিশিষ্ট লেখক আলী আহমদ মাবরুর তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে গাজা পরিকল্পনা দিয়েছেন, তা মূলত গাজাকে ইসরাইলের কাছে বর্গা দেয়ার নামান্তর। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। যদি কিছু হয়ও, তাহলে তা ইসরাইলের করদরাজ্যই হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে কিছু পুতুল।
হামাসসহ স্বাধীনতাকামীদের নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবনা দেয়ার মাধ্যমে মূলত ফিলিস্তিনের আকাক্সিক্ষত স্বাধীনতাকে হরণ করা হয়েছে। এটা অনেকটা হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়ার মতো অবস্থা। ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত স্বাধীনতাকামী আন্দোলন ও দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য বড়ো ধরনের হুমকি। জানি না, কে কতটুকু আমলে নেবেন।
সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, এ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনকে দেয়া হয়েছে কম, কিন্তু কেড়ে নেয়া হয়েছে অনেকটাই। অথচ এ প্রস্তাবের পৃষ্ঠপোষকতায় নেমেছে আরব নেতারা। সাথে যোগ দিয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশ। লাখো শহীদ যে ভূমির জন্য জীবন দিয়ে গেলেন, কত সস্তায় সেই পবিত্র ভূমিকে এই সো কলড মুসলিম নেতারা তাদের কাছে বিক্রি করে দিলেন।’
হোয়াইট হাউস বলছে, যদি উভয় পক্ষ (ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস) প্রস্তাব মেনে নেয়, তবে যুদ্ধ মুহূর্তেই থেমে যাবে। গাজায় আটক সব জীবিত ও মৃত জিম্মিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, আর ইসরাইলে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে। নতুন ব্যবস্থায় গাজা শাসনের দায়িত্ব নেবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার। সেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ইসরাইলও গাজা দখল বা একে তার সঙ্গে যুক্ত করবে না।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। এক ফিলিস্তিনি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, হামাস কর্মকর্তাদের হোয়াইট হাউসের ২০ দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হামাস গাজার শাসন ব্যবস্থায় কোনোভাবেই যুক্ত থাকতে পারবে না। একইসঙ্গে একটি ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার দরজা খোলা থাকবে।

স্বাগত জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় নেতারা
ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় নেতারা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হামাস এ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিশর, জর্ডান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান। তারা বলেন, এই চুক্তি ‘দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ তৈরি করবে, যেখানে গাজা ও পশ্চিমতীর মিলিত হয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করবে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেন, নেতানিয়াহুর ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তাকে উৎসাহিত করেছে। তিনি সব পক্ষকে এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার বলেছেন, সব পক্ষকে একসঙ্গে বসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে এ চুক্তিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। হামাস এখনই অস্ত্র ফেলে সব জিম্মিকে মুক্তি দিয়ে কষ্টের অবসান ঘটানো উচিত।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ফ্রান্স শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে প্রস্তুত। এ প্রক্রিয়া অবশ্যই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি একে ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে সব পক্ষকে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানান।

২০ দফা পরিকল্পনা
১. গাজাকে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করা হবে, যাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি কোনো হুমকি না থাকে।
২. গাজাকে পুনর্গঠন করা হবে, যাতে বহু কষ্ট সহ্য করা গাজার জনগণ উপকৃত হন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা মেনে নিয়েছেন। তবে আল-জাজিরাকে হামাসের কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাভি বলেছেন, তাঁরা এখনো গাজার জন্য কোনো লিখিত শান্তি পরিকল্পনা পাননি।
৩. উভয় পক্ষ প্রস্তাবে রাজি হলে যুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হবে। ইসরাইলি বাহিনী জিম্মি মুক্তির প্রস্তুতির জন্য নির্ধারিত সীমারেখায় সরে যাবে। এ সময় সব সামরিক অভিযান- বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ বন্ধ থাকবে। যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা স্থির থাকবে, যতক্ষণ না ধাপে ধাপে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত পূরণ হয়। অর্থাৎ দুই পক্ষই তাদের জায়গা বদলাবে না। সব শর্ত যেমন, জিম্মি ও বন্দীমুক্তি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিক করা ইত্যাদি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
৪. ইসরাইল প্রকাশ্যে এ চুক্তি মেনে নেওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব জিম্মিকে (জীবিত ও মৃত) ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৫. সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে। এতে ওইসময় আটক সব নারী ও শিশুও থাকবে। প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির মরদেহের বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন গাজাবাসীর মরদেহ ফিরিয়ে দেবে।
৬. সব জিম্মি ফেরত আসার পর, হামাসের যেসব সদস্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেনে অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি হবেন, তাঁদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হবে। হামাসের যেসব সদস্য গাজা ছাড়তে চান, তাঁদের নিরাপদে অন্য দেশে যেতে দেওয়া হবে।
৭. চুক্তি মেনে নেওয়ার পরই গাজায় পুরোপুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে। ন্যূনতম সহায়তা সেই মাত্রায় থাকবে, যা গত ১৯ জানুয়ারির মানবিক সহায়তা চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে অবকাঠামো (পানি, বিদ্যুৎ, নর্দমা ব্যবস্থা), হাসপাতাল, বেকারি মেরামত এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা খোলার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮. জাতিসংঘ ও এর সংস্থাগুলো, রেড ক্রিসেন্ট এবং অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যারা কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নয়, তারা গাজায় সহায়তা সরবরাহ ও বিতরণ করবে। রাফাহ সীমান্ত দুই দিকে খোলার বিষয়টি ১৯ জানুয়ারির চুক্তির অধীনে একই ব্যবস্থায় চলবে। অর্থাৎ সীমান্ত খোলা ও বন্ধ হবে পুরোনো চুক্তির নিয়মে, দুই পক্ষের সম্মতি ও তত্ত্বাবধানে।
৯. গাজার প্রশাসন সাময়িকভাবে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে থাকবে। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এ কমিটি গাজার মানুষের জন্য দৈনন্দিন সেবা পরিচালনা করবে। কমিটিতে যোগ্য ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ থাকবেন। তাঁদের তত্ত্বাবধান করবে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’; যার প্রধান থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সংস্থার সদস্য হিসেবে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের নাম পরে ঘোষণা করা হবে। এ সংস্থা গাজা পুনর্গঠনের জন্য অর্থ ও কাঠামো ঠিক করবে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করে আবারো কার্যকরভাবে গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত সংস্থা কাজ চালাবে। সংস্থাটির লক্ষ্য হবে গাজায় আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা।
সব জিম্মি ফেরত আসার পর ইসরাইল যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেবে। এর সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর আটক করা ১ হাজার ৭০০ গাজাবাসীকেও মুক্তি দেবে। এতে ওইসময় আটক সব নারী ও শিশুও থাকবে। প্রত্যেক ইসরাইলি জিম্মির মরদেহের বিনিময়ে ইসরাইল ১৫ জন গাজাবাসীর মরদেহ ফিরিয়ে দেবে।
১০. অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সফল আধুনিক শহরের পরিকল্পনায় কাজ করা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিনিয়োগ-প্রস্তাব ও উন্নয়ন-পরিকল্পনা বিবেচনা করা হবে; যাতে কর্মসংস্থান, সুযোগ ও ভবিষ্যতের আশা তৈরি হয়।
১১. গাজায় একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে শুল্ক ও প্রবেশাধিকারের বিষয়ে আলোচনা হবে।
১২. কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যাঁরা যেতে চাইবেন, যেতে পারবেন এবং ইচ্ছা করলে ফিরে আসতেও পারবেন। তবে মানুষকে গাজায় থাকতে উৎসাহ দেওয়া হবে; যাতে তাঁরা নতুন গাজা গড়ে তুলতে পারেন।
১৩. হামাস ও অন্যান্য সংগঠন প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার প্রশাসনে অংশ নেবে না। সব সামরিক অবকাঠামো টানেল, অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণের অনুমতি থাকবে না। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে সরিয়ে ফেলা হবে। অস্ত্র জমা দেওয়ার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক তহবিল দিয়ে এটির ক্রয় কার্যক্রম চালানো হবে। নতুন গাজা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
১৪. আঞ্চলিক অংশীদাররা নিশ্চয়তা দেবে যে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি মানবে এবং নতুন গাজা প্রতিবেশী দেশ বা নিজের জনগণের জন্য হুমকি হবে না।
১৫. আরব ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র গাজার জন্য একটি অস্থায়ী বাহিনী ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ)’ গঠন করবে। এটি দ্রুত গাজায় মোতায়েন হবে। আইএসএফ গাজার জন্য বাছাই করা ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে এবং জর্ডান ও মিশরের সঙ্গে পরামর্শ করবে; যাদের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। আইএসএফ ইসরাইল ও মিসরের সঙ্গে মিলে সীমান্ত সুরক্ষার কাজও করবে। মূল লক্ষ্য হবে, গাজায় অস্ত্র প্রবেশ ঠেকানো এবং দ্রুত পুনর্গঠনের জন্য পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে একটি সমন্বয়প্রক্রিয়ায় উভয়পক্ষ রাজি হবে।
১৬. ইসরাইল গাজা দখল বা সংযুক্ত করবে না। আইএসএফ স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করলে ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজা ছাড়বে। এজন্য নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়সূচির ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা হবে। উদ্দেশ্য হবে এমন এক গাজা গড়ে তোলা, যা ইসরাইল, মিশর বা তাদের নাগরিকদের জন্য আর হুমকি হবে না। ইসরাইলি সেনারা ধাপে ধাপে গাজার নিয়ন্ত্রণ আইএসএফের হাতে তুলে দেবে। পুরো সেনা সরানোর পরও শুধু নিরাপত্তা রক্ষায় সামান্য সৈন্য থাকবে; যতক্ষণ না গাজা পুরোপুরি নিরাপদ হয়।
১৭. যদি হামাস এ পরিকল্পনা মানতে দেরি করে বা মেনে না নেয়, তবুও ইসরাইল যে জায়গা ছাড়বে (যেগুলো ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ করা হয়েছে) সেই জায়গাগুলো আইএসএফের হাতে তুলে দেবে এবং ওই নিরাপদ এলাকায় সাহায্য ও পুনর্গঠনের কাজ চালু হবে।
১৮. গাজায় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি আন্তধর্মীয় সংলাপ চালু হবে। এর লক্ষ্য হবে, ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্ণনা বদলানো; যাতে তারা শান্তির সুফল বুঝতে পারেন।
১৯. গাজা পুনর্গঠনের কাজ চলাকালে ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এটাই ফিলিস্তিনি জনগণের আকাক্সক্ষা।
২০. যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করবে; যাতে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সহাবস্থানের জন্য একটি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় তারা একমত হতে পারে।
ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র ও জনগণের স্বাধীনতার পক্ষে নয়। বরং ফিলিস্তিনিদের ক্ষমতাহীন করে একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তরের একটি ঘৃণ্য পরিকল্পনা মাত্র। ফিলিস্তিনের একটি বৃহৎ অংশ এখনও পিএ ও হামাসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এ কথিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ফিলিস্তিন থেকে পিএ ও হামাসকে সরে যেতে হবে। ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি ও এএফপি।