আগামী সংসদ নির্বাচন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

একেএম রফিকুন্নবী
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১৩

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥

প্রিয় জন্ম ভূমি বাংলাদেশে নির্বাচনের হওয়া বইতে শুরু করেছে।   উপমহাদেশের শান্তিপ্রিয় মধ্যমপন্থী এদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার ৫৪ বছরে গণতান্ত্রিক শাসনের সুফল কমই পেয়েছে। স্বাধীনতার পর নতুন স্বাধীন দেশ দেখেছে  একদলীয় বাকশালী শাসন। তারপর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র। তারপর আবার সামিরক শাসন। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পর  ভাষাসৈনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক গোলাম আযমের কেয়ারটেকার সরকারের ফরমুলার মাধ্যমে পর পর কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে জাতি তাদের ভোটাথিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ২০০৮  এ সেনাশাসিত কথিত তত্বাবধায়ক সরকার মইন উ আহমদ ও ফখরুদ্দিনের নীলনকশার সাজানো নির্বাচনে     ক্ষমতা দখল করে হাসিনার নেতৃত্বে  আ’লীগ ও  বাম ১৪ দলীয় জোট। তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সহযোগিতায় নির্বাচন  ব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠায়।  দেড় দশক চলে ভারতের আধিপত্যবাদ, হাসিনার শাসনের নামে।   বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী দেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে অহরহ মুসলিমদের বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করে আমাদের দেশে পুশব্যাক থেকে শুরু করে ধর্মীয় কলহ লাগিয়েই রাখছে। মসজিদ ভেঙে মন্দির বানানোর উদাহরণও মোদি সরকারের রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও গণতন্ত্রের নামে ভারতে চলছে মূলত্ঃ উগ্রহিন্দুত্ববাদী দুঃশাসন।  ভারতীয় আধিপত্যবাদ আমাদের  জন্য এক অভিশাপ।

আমাদের ব্যর্থতা টেকসই গণতন্ত্র নেই । বিশেষ করে গত ৩টি নির্বাচনে আমরা-মামুরাই বিভিন্নভাবে কারচুপি করে ভোটের নামে প্রতারণা করে নামসর্বস্ব সংসদ গঠন করেছিল। লেডি হিটলার হাসিনা তার নিজস্ব কায়দায় যা খুশি তাই করে দেশটাকে আত্মীয়করণ, দলীয়করণ, দেউলিয়া করে ব্যাংকের টাকা, বিভিন্ন প্রজেক্টের টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আবিষ্কার করেছে। টাকা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আমরা এ উদ্যোগ আরো বাড়ানোর আবেদন জানাই।
টাকা লুট করা দলীয়করণের হিটলার হাসিনা ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের বিপ্লবের ফলে ৫ আগস্ট তার প্রিয় মোদির দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মাঝেমধ্যে হুমকি-ধমকি দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যা হাস্যকর। হাসিনা বা তার দল এ দেশে আবার ফিরবে- এটা অবাস্তব কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। এরই মধ্যে বিপ্লবের ১ বছর চলে গেল। কিন্তু বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সংস্কার, বিচার কোনোটাই দৃশ্যমান হয়নি। কথা উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকার বৈধ নয়। না সাংবিধানিক, না বিপ্লবী। অতিসত্বর হয় বিপ্লবী সরকার গঠন করা হোক অথবা গণভোটের মাধ্যমে এ সরকারের বৈধতা নেয়া হোক। কারণ হাসিনা তার দেশের সাংবিধানিক সব ব্যবস্থা লঙ্ঘন করে বিদায় নিয়েছে। তাই এ সংবিধানের আর কোনো বৈধতা নেই।
ইতোমধ্যেই জুলাই ঘোষণাপত্র গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জনতার সামনে পড়ে শোনান। আমার মনে হয়েছে, কেউ না কেউ এ ঘোষণাপত্র লিখে দিয়েছে। যাতে অনেক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ ঘোষণাপত্র আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়নি। প্রোক্লামেশনের মাধ্যমে এ ঘোষণাপত্র আইনের মধ্যে আনতে হবে। গণভোটের আয়োজন করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ও গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
দেশ যেহেতু আমাদের সবার, তাই চিন্তাভাবনা করে দেশের কল্যাণেই আমাদের সবার ঐকমত্য হতে হবে দলের বিচারে নয় দেশের বিচারে। জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র আইনের বৈধতা দিয়ে তার অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক, সৎ ও যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত ব্যক্তিদের সংসদে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু দল নয়, ব্যক্তির চরিত্র, সততা, চাঁদাবাজমুক্ত লোকের প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা আশাবাদী ছাত্র-জনতার ৩৬ দিনের বিপ্লবের সময়ের ঐক্য, দেশপ্রেম বৃথা যাবে না বা দেশের বা বিদেশের কোনো চক্রান্ত কার্যকর হবে না। ইতোমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের নির্বাচনে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই একদল ভালো লোককে নির্বাচিত করেছে, যারা সবাই জামায়াতে ইসলামীর সাথে জড়িত।
সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন। প্যানেল ঘোষণা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে ৪ জন ছাত্রীসহ বিভিন্ন গ্রুপের লোকের সমন্বয়ে প্যানেল ঘোষণা করেছে এবং ইতোমধ্যে দেশব্যাপী এ প্যানেল ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আশা করা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে ভূমিকা রাখবে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে আবারও প্রমাণ করবে, ইনশাআল্লাহ।
আমাকে এক অভিজাত অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয়েছিল- আপনারা কীভাবে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে জেতার চিন্তা করছেন। কারণ সেখানে তো প্রায় ৩৫% মেয়ে। মেয়েরা কি শিবির-সমর্থিত প্যানেেেল ভোট দেবে? আমি জোর দিয়ে বললাম, তারা শিবিরের প্যানেলে ভোট দেবে এজন্য যে, মেয়েরা শিবিরের কাছেই নিরাপদ। তারা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে না। তারা মেয়েদের মানসম্মান রেখেই চলাফেরা করে। উল্লেখ থাকে যে, জাহাঙ্গীরনগরের এক ছাত্রলীগ নেতা ১০০ মেয়েকে ধর্ষণ করে প্রকাশ্যে সেঞ্চুরির অনুষ্ঠান করে এখনো বিচারের আওতায় আসেনি। অতএব শিবিরের ছাত্ররা চরিত্রবান, ছাত্র হিসেবে মেধাবী, চাঁদাবাজিতে জড়িত নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা তাদের বিভাগে ভালো রেজাল্ট করে থাকে। এবারো ডাকসু প্যানেলে শিবিরের সমর্থিত প্রার্থীরা সবাই ভালো রেজাল্টের অধিকারী এবং জুলাই বিপ্লবের অংশীদার হয়ে চোখ হারানো জুলাই যোদ্ধাও অন্তর্ভুক্ত। মুখ ঢাকা ও খোলা- দুই ধরনের মেয়েদেরই শিবিরের প্যানেলে জায়গা দেয়া হয়েছে। উপজাতি চাকমাকেও প্রার্থী করা হয়েছে। তার মানে হলো বাংলাদেশে সব শ্রেণির মানুষকে নিয়েই আমরা চলতে চাই, তাই সবাইকে নিয়েই প্যানেল। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ রেখে সবার অংশগ্রহণে ডাকসু নির্বাচন করার আহ্বান জানাচ্ছি। ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ দেখাতে চাই। বলতে চাই, ইচ্ছা করলে ভালো নির্বাচন করা যায়। পাঠক সমাজকে অনুরোধ, যার যেখানে ডাকসুর ভোটার আছে তাদেরকে শিবিরের প্যানেলে ভোট দিতে।
আমরা অবশ্যই জাতীয় নির্বাচন করতে চাই। দেশের সব দল ও মতের লোকের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন উৎসবের মতো করতে চাই। চাই প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা যারা ভোট নেবেন, তাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ রেখেই নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা মালয়েশিয়ায় একটি মিডিয়াকে বলেই ফেলেছেন- সংস্কার, বিচার ছাড়া নির্বাচন করলে দেশে আরেকটি ফ্যাসিস্টের উত্থান হবে, যা আমরা চাই না। বিএনপির নেতা তারেক রহমান তো বলেই ফেলেছেন, তিনি দেশে মৌলবাদীর উত্থান দেখতে চান না। তারেক রহমানের পিতা ও মাতা মৌলবাদীদের সাথেই রাজনীতি করেছেন। বাম-রামদের এ দেশে আর খাওয়া নেই। আবার তাদের আরেক নেতা ফখরুল ইসলাম দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মনে রাখা দরকার ৯২% মুসলমানের দেশে মৌলবাদী বা দক্ষিণপন্থী বলে কিছু নেই। এ দেশের মানুষ ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে ওঠে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তারা পড়ে। জুমার নামাজে উপচেপড়া ভিড় হয়। দুই ঈদ দেশে আনন্দের সাথে জমজমাটভাবে পালন করে, তাই তাদের যারা স্বীকার করে, তারাই দেশ শাসনের উপযোগী মনে রাখতে হবে।
আমি আগেই বলেছি, এক উচ্চস্তরের লোকদের সাথে টকশোতে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, প্রায় অর্ধেক ভোটার মেয়ে। মেয়েরা কি জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবে? আমি তাদের বলেছি, মেয়েরা আমাদেরই মা-বোন-স্ত্রী-মেয়ে। তাই তারা পাশ্চাত্যের খোলামেলা শরীরে চলতে চায় না। তারাও ইসলামের পথেই চলতে চায়। আপনারা লক্ষ করবেন, রাজপথে যখন গার্মেন্টস শ্রমিকরা হেঁটে কর্মস্থলে যায়, তাদের সিংহভাগই মাথায় কাপড় দেয়। তাই ফখরুল সাহেবদের বাম রাজনীতি এ দেশে চলবে না। জামায়াতে ইসলামীকেই তারা ভোট দিতে চায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানে সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণমূলক হোক আমরা চাই। অমুসলিমরাও জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবে কারণ গত ৫৪ বছরে জামায়াতের কোনো লোক অমুসলিমদের জায়গা-জমি দখল করেনি, মেয়েদের অসম্মান করেনি। তারা মনে করেন, তাদের সম্পদ, মান-ইজ্জত জামায়াতে ইসলামীর লোকদের কাছেই নিরাপদ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কক্সবাজারের জেলা আমীর আওয়ামী আমলেও ৫ বার ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সবার ভোট পেয়েই। ব্যাপক জনসমর্থনের কারণে আ’লীগ সন্ত্রাসীরা কেন্দ্র দখলের সাহস দেখায়নি। এছাড়া দেশের অন্যান্য জায়গায়ও এর প্রমাণ আছে। জনগণ আর ঠকতে চায় না। এখন তারা এলাকার সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত লোকদের নেতা বানাতে চায়। স্থানীয় সরকারের মেম্বার থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান, মেয়র, সংসদ সদস্য হিসেবে ভালো লোকদের বসাতে চায়। ফেয়ার নির্বাচন দিলেই তা প্রমাণ হবে।
কোনো নির্বাচনই সারা দেশে একসাথে করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের লোকদের অংশগ্রহণ সবই ভাগে ভাগে করলে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সহজ হবে। প্রবাসীদের ভোটের আওতায় আনতে হবে। সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত লোক দ্বারা নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে হবেÑ যাতে করে দুষ্কৃতকারীরা ভোটকেন্দ্র দখল বা জাল ভোট দিতে না পারে। নির্বাচনে অবৈধ টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থাকে সক্রিয় করে ভুয়া ভোটার বন্ধ করতে হবে। এনআইডি কার্ড ও ভোটার কার্ড অনলাইনে যাচাই করে ভোট জালিয়াতি রুখতে হবে।
পিআর পদ্ধতিতে ভোটারদের প্রতিটি ভোট মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা জনগণের ভোটের মূল্য দিতে চায় না, তারাই পিআর পদ্ধতি মেনে নিতে চায় না। আমরা এলাকার অধিকাংশ লোকের ভোটের মর্যাদা দিতে চাই। কোনোমতে স্বল্পসংখ্যক ভোটের ব্যবধানে নয়, অধিকাংশ লোকের ভোট প্রাপ্তিদেরই আমরা নেতা বানাতে চাই।
অতিসত্বর জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র কার্যকর করে আইনের ভিত্তি দিয়ে অথবা গণভোট দিয়ে আইনের আওতায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের মর্যাদার গ্যারান্টি দিয়ে অসুস্থদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা দিয়ে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনে যেতে হবে। হাসিনা সরকারের সময় করা সব অবৈধ নির্বাচনের কুশীলব ও ফ্যাসিস্টের দোসরদের বিচার, শাপলা চত্বরের গণহত্যা, লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ মারা, বিডিআর হত্যার বিচারসহ সব অপকর্মের বিচার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আয়নাঘরের অমানুষিক নির্যাতনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রেখে আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনে যেতে হবে। আমরা দেশের ভালো চাই, মানুষের ভালো চাই। দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, সবার সহযোগিতায় ফ্যাসিস্ট প্রভুত্বের জাঁতাকল ভাঙতে চাই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।