আলোকে তিমিরে

ধর্ম ও মতবাদ এবং আমার বিশ্বাস


২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৬

॥ মাহবুবুল হক ॥
আলোচনার মাঝে ধর্ম থাকলেও স্থান, কাল ও পাত্রসহ বোধগম্য কারণে আমরা এখানে ইসলামের প্রসঙ্গ পরিপূর্ণভাবে উদ্ভাসিত করছি না। কারণ ইসলামের প্রসঙ্গ এখন অনেকটাই কুরআনকেন্দ্রিক। বিশ্ব ইতিহাসের কুরআনকেন্দ্রিক সত্য ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। সেই ব্যাখ্যাটি গত প্রায় ১০০ বছর ধরে বিশ্ববাসী গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এই কুরআনকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার কারণেই সারা দুনিয়ার বিভিন্ন ধর্মের ও জাত-পাতের মানুষ ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করছে। অর্থাৎ ফিরে আসছে। পূর্বে বলা হতো, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে অর্থাৎ ইসলামে কনভার্ট হচ্ছে। গত প্রায় ১০০ বছর ধরে বলা হচ্ছে রেভারড হচ্ছে।
তারপরও এই উপমহাদেশের সকল শ্রেণির ও সকল মাত্রার মুসলিম সরলভাবে কুরআনের ব্যাখ্যার ওপর পরিপূর্ণভাবে এখনো আস্থা স্থাপন করতে পারেনি। যারা পারেনি, তাদের অধিকাংশই আধুনিক সেকুলার শিক্ষায় শিক্ষিত। আধুনিক সভ্যতার তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। যদিও তা সত্যের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর পাকাপোক্তভাবে দণ্ডায়মান নয়।
আমরা এখানে আধুনিক সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার নড়বড়ে পাটাতনের ওপর পা রেখে আলোচনাকে এগিয়ে নিতে চাই।
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত বিশ্বাস, চিন্তা, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের ইতিহাস। মানুষ যখন থেকে সমাজবদ্ধ জীবন শুরু করেছে, তখন থেকেই তার মনে জন্ম নিয়েছে সৃষ্টির রহস্য জানার আকাঙ্ক্ষা, জীবনের অর্থ খোঁজার তাগিদ এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নির্ধারণের চেষ্টা। এই অনুসন্ধানের ধারায় ধর্ম ও মতবাদ— দুটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ধর্ম মানুষকে জীবনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, নৈতিকতা ও পরকালীন বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করে; অন্যদিকে মতবাদ মানুষকে সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামো বুঝতে এবং তা পরিবর্তনের পথ খুঁজতে সহায়তা করে। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় কোনটি বেশি টেকসই— ধর্ম, না মতবাদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস, দর্শন ও বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিচার করা প্রয়োজন।
ধর্ম ও মতবাদ : ধারণাগত পার্থক্য
ধর্ম বলতে সাধারণত স্রষ্টা, আধ্যাত্মিকতা, নৈতিক বিধান, উপাসনা, বিশ্বাস ও জীবনাচারের সমন্বিত ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিশ্বাস ও আচারের পার্থক্য থাকলেও মানুষের নৈতিক উন্নতি, আত্মিক প্রশান্তি, মানবিক দায়িত্ব এবং জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধানের বিষয়গুলো বহু ধর্মে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
অন্যদিকে মতবাদ হলো কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা নির্দিষ্ট দার্শনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক আদর্শ। কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও মার্ক্সবাদ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মতবাদ সাধারণত সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে, সম্পদ কীভাবে বণ্টিত হবে, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কোথায় সীমাবদ্ধ থাকবে এবং মানুষের অধিকার কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়।
তবে ধর্ম ও মতবাদকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে স্থাপন করাও যুক্তিসংগত নয়। ধর্মের মধ্যেও সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে, আবার কোনো মতবাদও নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবকল্যাণের ধারণা ধারণ করতে পারে। পার্থক্যটি মূলত তাদের ভিত্তি, লক্ষ্য এবং পরিবর্তনের পদ্ধতিতে।
ইতিহাসের দীর্ঘ পরীক্ষায় ধর্ম
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বহু ধর্ম শত শত বছর; এমনকি সহস্রাব্দ ধরে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে চলেছে। ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম ও ইহুদিধর্মের মতো ধর্মীয় ঐতিহ্য বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান-পতন, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্যেও টিকে আছে।
রাষ্ট্রের সীমানা বদলেছে, সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে, রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার বহু সমাজে ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এর একটি বড় কারণ হলো, ধর্ম কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা নয়; এটি মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়, পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, উৎসব, শোক, আশা ও সংকট মোকাবিলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
জীবনের অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, দুঃখ, ন্যায়বিচার এবং অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে মানুষের যে মৌলিক প্রশ্ন, ধর্ম তার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। এই প্রশ্নগুলো কোনো একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান বা পতনের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না। ফলে ধর্মের সামাজিক স্থায়িত্বের পেছনে মানুষের অস্তিত্বগত অনুসন্ধান ও প্রজন্মান্তরে বিশ্বাসের সঞ্চালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে ধর্মের দীর্ঘস্থায়িত্বকে তার প্রতিটি ব্যাখ্যা বা সামাজিক প্রয়োগের অপরিবর্তনীয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাখ্যা ও আচারও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ব্যাখ্যা, সংস্কার ও সামাজিক ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ইতিহাসে ধর্মের নামে সংঘাত, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। অতএব ধর্মের স্থায়িত্ব যেমন বাস্তব, তেমনি তার মানবিক প্রয়োগের মূল্যায়নও জরুরি।
মতবাদের উত্থান, পরিবর্তন ও পতন
মতবাদের ইতিহাসও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। সমাজতন্ত্র শ্রমিকের অধিকার ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নকে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। জাতীয়তাবাদ বহু জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করেছে।
কিন্তু মতবাদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে তার রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো মতবাদ একটি নির্দিষ্ট সময়ের অর্থনৈতিক সংকট, শ্রেণিসংঘাত কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরিস্থিতি বদলালে সেই মতবাদের ব্যাখ্যা, প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতাও বদলাতে পারে।
বিশ শতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দেখিয়েছে যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও তার প্রাতিষ্ঠানিক আদর্শও চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। একইভাবে পুঁজিবাদ কিংবা জাতীয়তাবাদও বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপে বিদ্যমান। অনেক মতবাদ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।
অর্থাৎ মতবাদের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু তার কিছু ধারণা সমাজে থেকে যেতে পারে। শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের মতো ধারণা কোনো একক মতবাদের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই কোনো মতবাদের একটি ঐতিহাসিক পরাজয়কে তার সব চিন্তার চূড়ান্ত পরাজয় বলা যায় না।
ধর্ম কি মতবাদের চেয়ে বেশি টেকসই?
ধর্মের দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে রয়েছে এর বহুমাত্রিকতা। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। কোনো রাজনৈতিক মতবাদ ক্ষমতায় আসতে পারে, আবার ক্ষমতা হারাতেও পারে; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় অনেক সময় রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাইরে থেকেও মানুষের জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।
মতবাদ সাধারণত কোনো সমস্যার ব্যাখ্যা এবং তার সমাধানের একটি কাঠামো প্রদান করে। ধর্মও সামাজিক সমস্যার ব্যাখ্যা দিতে পারে, তবে তার পরিসর অনেক ক্ষেত্রে জীবনের অর্থ, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও মৃত্যুচিন্তা পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই বিস্তৃত পরিসর ধর্মকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উপস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে : দীর্ঘদিন টিকে থাকাই কি কোনো ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ? উত্তর হলো, না। কোনো ধারণা দীর্ঘস্থায়ী হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত, মানবিক কিংবা সত্য প্রমাণিত হয় না। একইভাবে কোনো নতুন মতবাদ অল্প সময়ে আবির্ভূত হয়েছে বলেই তাকে অকার্যকর বলা যায় না। স্থায়িত্ব এবং নৈতিক উৎকর্ষ দুটি পৃথক বিষয়।
কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যদি মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে অস্বীকার করে, তবে তার দীর্ঘ ইতিহাস সেই আচরণকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। আবার কোনো মতবাদ যদি মানুষের দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নিপীড়ন কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে, তবে তার মূল্যায়ন শুধু তার বয়স দিয়ে করা যাবে না।
ধর্ম ও মতবাদের সংঘাত : সমস্যার উৎস কোথায়?
ধর্ম ও মতবাদের সংঘাতের পেছনে অনেক সময় তাদের মৌলিক ধারণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রশ্ন। যখন কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজের ব্যাখ্যাকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন ভিন্নমতের মানুষের অধিকার সংকুচিত হতে পারে। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক মতবাদ যখন নিজেকে প্রশ্নাতীত সত্য বলে ঘোষণা করে, তখন বিরোধী মত, স্বাধীন চিন্তা এবং নাগরিক অধিকার বিপন্ন হতে পারে।
ইতিহাসে ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে নিপীড়নের দৃষ্টান্ত রয়েছে; আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে পরিচালিত স্বৈরশাসনও মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দেয় যখন বিশ্বাস বা আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা, আধিপত্য এবং আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ধর্মের নামে সহিংসতা যেমন ধর্মের সব অনুসারীর প্রতিনিধিত্ব করে না, তেমনি কোনো মতবাদের নামে সংঘটিত অপরাধও তার প্রতিটি অনুসারী কিংবা সব ব্যাখ্যার মূল্যায়নের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। প্রয়োজন হলো নির্দিষ্ট মতবাদ, প্রতিষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডকে তাদের বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা।
টেকসই সমাজের জন্য কোন পথ?
আধুনিক বিশ্বে টেকসই সমাজ গঠনের জন্য শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা শুধু রাজনৈতিক মতবাদ যথেষ্ট নয়। একটি সমাজকে একই সঙ্গে নৈতিক ভিত্তি, ন্যায়সংগত প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সুযোগ, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়।
ধর্ম মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম ও পরোপকারের চেতনা জাগিয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে মানবিক ও গণতান্ত্রিক মতবাদ রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য হ্রাস, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সমস্যার প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান দিতে পারে। এই দুই ক্ষেত্রের ইতিবাচক অবদান পরস্পরের বিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই।
একটি বহুত্ববাদী সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী সবার সমান নাগরিক অধিকারও রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠান এমন হতে হবে— যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর জবরদস্তি করে চাপিয়ে দিতে না পারে। একইসঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বৈষম্য বা অবমাননার শিকার হতে দেওয়া যাবে না।
এখানে শিক্ষার ভূমিকাও অপরিসীম। মানুষকে শুধু নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি শেখালে চলবে না; অন্যের বিশ্বাস ও মতামত বুঝতে শেখাতে হবে। ইতিহাসের সমালোচনামূলক পাঠ, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিক শিক্ষা এবং যুক্তিনির্ভর বিতর্ক সমাজকে উগ্রতা থেকে দূরে রাখতে পারে। যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে, সে সমাজ নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগও পায়।
স্থায়িত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানবকল্যাণ
‘ধর্ম, না মতবাদ’— এই প্রশ্নের সরল উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা হয়তো ধর্মের দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব কিংবা মতবাদের পরিবর্তনশীলতার কথা বলব। কিন্তু গভীরভাবে বিচার করলে দেখা যায়, ধর্ম ও মতবাদ সম্পূর্ণ একই ধরনের বিষয় নয়।
ধর্ম প্রধানত বিশ্বাস, নৈতিকতা
আধ্যাত্মিকতার পরিসরে কাজ করে; মতবাদ মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝা এবং সংগঠিত করার নানা কাঠামো প্রদান করে। তাদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে মিল আছে, আবার মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে।
ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ধর্মীয় ঐতিহ্য বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতবাদ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে— কোনোটি দুর্বল হয়েছে, কোনোটি নতুন রূপে ফিরে এসেছে। কিন্তু এই পার্থক্য থেকে ধর্মের সর্বজনীন শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা মতবাদের অনিবার্য ব্যর্থতা প্রমাণিত হয় না।
প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত— কোনো বিশ্বাস, কোনো মতবাদ এবং কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষকে অধিক মর্যাদা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শান্তি দিতে সক্ষম?
যে ধর্মীয় ব্যাখ্যা মানুষকে মানবিক হতে শেখায়, যে মতবাদ বৈষম্য কমায়, যে রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষের অধিকার রক্ষা করে এবং যে সামাজিক চিন্তা ভুল স্বীকার করে নিজেকে সংশোধন করতে পারে তারাই টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
অতএব ধর্ম ও মতবাদের মধ্যে একটিকে চিরস্থায়ী বিজয়ী ঘোষণা করা এই বিতর্কের যথার্থ সমাধান নয়। ধর্ম মানুষের আত্মিক ও নৈতিক জীবনের গভীর চাহিদা পূরণ করতে পারে, আর মানবকল্যাণমুখী মতবাদ সমাজকে ন্যায়সংগতভাবে পরিচালিত করার পথ দেখাতে পারে। তবে উভয়ের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, সহাবস্থান ও কল্যাণের মানদণ্ডে।
শেষ পর্যন্ত টেকসই সেই চিন্তা, যা মানুষকে বিভক্ত না করে মানবিক করে; অন্ধ আনুগত্য সৃষ্টি না করে বিবেক জাগায়; ক্ষমতার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা না করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। ধর্ম হোক কিংবা মতবাদ— মানুষের কল্যাণই যদি তার কেন্দ্রবিন্দু না হয়, তবে তার দীর্ঘস্থায়িত্বও সভ্যতার জন্য যথেষ্ট আশ্বাস হতে পারে না।
এই আলোচনা থেকে আমরা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি যে, মানবরচিত ধর্ম ও মানবরচিত মতবাদ সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। অনেকটা একই ধরনের। দুটিই পরিবর্তনশীল। স্থান-কাল-পাত্র বিষয়গুলোকে প্রাসঙ্গিক ও উপযোগী করে গড়ে তোলে।
তাই আমার বিশ্বাসের জায়গা থেকে বলছি, মানবজীবনের সকল সমস্যা সমাধানের জন্য ধর্ম কিংবা মতবাদ সব বিচারেই ইসলামই একমাত্র বিধান। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, ‘ আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করবে, কখনোই তার সেই ধর্ম কবুল হবে না এবং আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা আলে ইমরান : ৮৫)।
তাই দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির জন্য সবাইকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে হবে।