সম্পাদকীয়

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্য সময়ের অপরিহার্য দাবি


২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৪

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রভাবনায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন, শোষণ, গুম, খুন এবং বিচারহীনতার কবল থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা দলবল নিয়ে পালিয়েছে। তার পতনের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট— ইতিহাসের পাতায় সেদিনই ৩৬ জুলাই হিসেবে রক্তের অক্ষরে লেখা আছে। দিনটিকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস হিসেবে মনে করেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
মুক্ত ও স্বাধীন দেশের প্রায় সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ ও বিভিন্ন অংশীজন একীভূত হয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও ফ্যাসিস্ট ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ করতে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করেছে। এই সনদের মূল লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে ফ্যাসিবাদের কোনো স্থান থাকবে না। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ও জোরালো অঙ্গীকার ছিল— নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারি দল কিংবা বিরোধীদল নির্বিশেষে সবাই এই সনদের চেতনা এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে কাজ করবে।
কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই জাতীয় ঐক্যের মূলে বর্তমানে গভীর ষড়যন্ত্র ও ভাঙন ধরানোর অপচেষ্টা চলছে। পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি এবং তাদের দোসররা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অর্থের লোভ ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে তারা জুলাই সনদের সাথে প্রতারণা করছে, যা দেশপ্রেমিক নাগরিকদের চরমভাবে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, জুলাই অভ্যুত্থানের শক্তির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে পতিত ফ্যাসিস্ট চক্র পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ খুঁজছে। প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সুবিধাভোগী চক্র এই অপচেষ্টায় নীরব বা পরোক্ষ সহযোগিতা করে দেশকে এক অনিশ্চিত গর্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিদেশি প্রভুদের পরামর্শ এবং প্রলোভনে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতিকে বিপন্ন করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং সরাসরি দেশদ্রোহিতার সমতুল্য। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু তাদের প্রতিহত করতে সরকার নীরব। অন্যদিকে যাদের রক্ত, আত্মত্যাগ এবং সাহসিকতার বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, সেই জুলাইযোদ্ধা ও আহত বিপ্লবীরা আজ নানাভাবে কোণঠাসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি। অথচ তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আমরা মনে করি, এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কোনো প্রকার দীর্ঘসূত্রতা না করে অবিলম্বে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করতে হবে। গণতন্ত্র ও বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সকল বিভেদ ভুলে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে একমঞ্চে দাঁড়াতে হবে। প্রতিবেশী দেশসহ বিদেশি সকল অপশক্তির যেকোনো ধরনের অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং আধিপত্যকামী চক্রান্ত কঠোরহস্তে প্রতিহত করতে হবে। প্রশাসনের ভেতর থাকা ফ্যাসিস্ট দোসরদের মূলোৎপাটন করে নিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
মনে রাখতে হবে, জুলাই সনদ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে না। তাই জাতীয় স্বার্থে দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিলম্বে ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হবে। অতএব সাবধান, আসুন আমরা সবাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়ের এ অপরিহার্য দাবি পূরণে যার যার অবস্থান থেকে ইতিবাচক কাজ করি।