পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ : ১৯০৫-১৯১১

বঙ্গভঙ্গ, হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম লীগ


২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫৪

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
ব্রিটিশরা বাংলা দখল করে ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পরপরই। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল দখল করে। সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৭ সালে দিল্লি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তখন ব্রিটিশরা ভারত শাসনের জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সির পাশাপাশি আরো দুটি প্রেসিডেন্সি গঠন করে, সে দুটি হচ্ছে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ও বোম্বে প্রেসিডেন্সি। তবে বাংলা প্রেসিডেন্সি ছিল সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্রিটিশরা রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কারণে বৃহৎ বাংলা প্রেসিডেন্সিকে দুই ভাগ করে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি প্রদেশ গঠন করে। এটাকেই হিন্দুত্ববাদীরা বাংলা মাকে ভাগ করা হয়েছে এবং এটাকে তারা বঙ্গভঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারা বঙ্গভঙ্গকে এমন একটি ন্যারেটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে যে ‘পূর্ববাংলা আসাম’ নতুন প্রদেশ করে হিন্দুদের যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনিভাবে তাদের মাকে দ্বিখণ্ডিত করে মহাক্ষতি করা হয়েছে। তারা এটাকে বঙ্গভঙ্গ নাম দিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে। নতুন প্রদেশ গঠনকেই তারা বঙ্গভঙ্গ নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ব্রিটিশ ভারতে বাংলা প্রেসিডেন্সি ছিল বিশাল এলাকা নিয়ে। এটি ছিল ভারতে সর্ববৃহৎ প্রদেশ। পূর্ব বাংলা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে এ বৃহৎ প্রেসিডেন্সি। এটির আয়তন ছিল এক লাখ ৭৯ হাজার বর্গমাইল, লোকসংখ্যা ছিল প্রায় আট কোটি। ব্রিটিশরা শাসনকার্যের সুবিধার্থে এ বৃহৎ প্রদেশকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর এ নতুন প্রদেশের কার্যক্রম শুরু করে। লর্ড কার্জন মনে করেছিলেন যে, পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি প্রদেশ হলে সেখানকার অনুন্নত অঞ্চলের অধিবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ব্যবসা প্রভৃতির উন্নতির পথ সুগম হবে। লর্ড কার্জনের আর একটি লক্ষ্য ছিল যে, হিন্দুদের থেকে মুসলিমদের আলাদা করতে পারলে হিন্দুগণ মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের দাবি করতে পারবে না। উল্লেখ্য, পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের আয়তন দাঁড়ায় এক লাখ ৬ হাজার ৫০৪ বর্গমাইল, লোকসংখ্যা তিন কোটি ১০ লাখ, তন্মধ্যে মুসলিম এক কোটি ৮০ লাখ আর হিন্দু এক কোটি ২০ লাখ। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা পুরাতন বাংলা প্রেসিডেন্সির অধীনেই থেকে যায়, যার আয়তন এক লাখ ৪১ হাজার ৫৮০ বর্গমাইল, লোকসংখ্যা পাঁচ কোটি ৪০ লাখ, তন্মধ্যে হিন্দু চার কোটি ২০ লাখ আর মুসলিম ৯০ হাজার মাত্র। নতুন প্রদেশটি কার্যক্রম শুরু করলে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুসহ পুরো অঞ্চলে একটি নবজাগরণ তৈরি হয়। অপরদিকে হিন্দু জমিদার শ্রেণি ও হিন্দুত্ববাদের ধারক বাহক একটি গোষ্ঠী নতুন প্রদেশ বাতিল তথা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে আন্দোলন শুরু করে।
মুসলিমদের জাগরণ ও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠনের পর এ অঞ্চলের মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুসহ পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যেই একটি নবজাগরণ তৈরি হয়। রাজনীতিকদের থেকে শুরু করে সব শিক্ষিত শ্রেণি ও পেশার লোকদের মধ্যে নতুন আশা সঞ্চার করে। পত্রপত্রিকাগুলোও বিভিন্ন নিবন্ধ ও ফিচার প্রকাশ করে। ১৯০৬ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের সাম্বাৎরিক উপলক্ষে ইস্টার্ন বেঙ্গল এন্ড আসাম ইরা পত্রিকা লিখেছে যে, ‘নতুন প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পূর্বাঞ্চলের নিম্নলিখিত সুবিধা হয়েছে— ১. ঢাকা নগরের পুনর্জন্ম ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি, ২. নদী ও খালগুলোর উন্নতি এবং রেল লাইনের সম্প্রসারণ ও চট্টগ্রামের সঙ্গে এদের সংযোগ স্থাপন, ৩. নতুন প্রাদেশিক পরিষদ গঠিত হওয়ার ফলে জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিদের পক্ষে জনসাধারণের অভাব-অভিযোগের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সুযোগ-সুবিধা, ৪. সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা ও জনসাধারণের জানমালের অধিকতর নিরাপত্তা, ৫. পূর্ব বাংলার শিক্ষিত ও সভ্য লোকদের সংস্পর্শে আসায় অনুন্নত আসামের অধিবাসীদের উপকার, ৬. পূর্ব বাংলার জন্য কর্মদক্ষ পুলিশ বাহিনীর ব্যবস্থা, ৭. প্রদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি, ৮. এক বছরের অভিজ্ঞতা হতে দেখা যাচ্ছে যে, জনসাধারণ এখন প্রদেশের প্রধান কর্মকর্তাদের সংস্পর্শে আসতে পারে এবং পূর্বে যা সম্ভব ছিল না।
বিশেষ করে ঢাকাকে রাজধানী করে নুতন প্রদেশ ঘোষণায় পূর্ব বাংলার মুসলিমদের মধ্যে একটি জাগরণ তৈরি হয়। বিশেষ করে মুসলিম জমিদার ও শিক্ষিত যুবকরা জেগে ওঠে এবং মুসলিমদের এগিয়ে নিতে কিছু একটা করতে হবে তার জন্য চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। তখন পুরো বাংলায় মুসলিমরা ছিল ৫৪ ভাগ আর পূর্ব বাংলায় ছিল আরো বেশি। ১৯০১ সালের আদমশুমারি ও বঙ্গভঙ্গকালীন হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব বাংলায় মুসলিমদের হার ছিল প্রায় ৭১ শতাংশ। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে যখন হিন্দুরা প্রবল আন্দোলন শুরু করে তখন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মুসলিম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ১৯০৫ সালে ১৬ অক্টোবর নতুন প্রদেশের জন্মদিনটিতে ‘প্রভিন্সিয়াল মোহামেডান ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে আসেন। নবাব সলিমুল্লাহ ১৯০৫ সালের জুলাই মাসে মুসলিম ইনস্টিটিউট পত্রিকায় ‘নতুন প্রদেশ এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভবনা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেন। এ নিবন্ধে তিনি নতুন প্রদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারপর নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ বাঙালি মুসলিমদের উদ্যোগে ১৯০৬ সালে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিমদের একটি সম্মেলন থেকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন ও ঢাকাকে রাজধানী করার পর ইর্ষান্বিত হয়ে হিন্দু নেতারা আরো জোরে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে আন্দোলন শুরু করে। এতে করে মুসলিমরা আরো সচেতন হয়ে ওঠে এবং মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলায় সংগঠিত হতে থাকে। একপর্যায়ে ঢাকায় জন্ম মুসলিম লীগ পুরো ভারতেই তার শাখা প্রশাখা খুলে সংগঠিত করে বিকশিত হতে থাকে এবং এ মুসলিম লীগের নেতৃত্বেই ভারতে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক স্বাধীন ও নিরাপদ আবাসভূমি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
বঙ্গভঙ্গ রদ ও হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলন
পূর্ববঙ্গবাসী প্রজারা তাদের কায়েমি স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্ত করতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার টাউন হলে কাশিমবাজারের জমিদার মহারাজা মহেন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে কলিকাতা প্রবাসী জমিদারদের এক সভা হয়। সভায় সভাপতি বলেন, নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবে, বাঙালি হিন্দুগণ সংখ্যালঘিষ্ঠে পরিণত হইবে। খ্যাতনামা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বঙ্গভঙ্গের তীব্র নিন্দা করে বলেন, বাংলাদেশ বিভক্ত করিয়া হিন্দুদেরকে অপমান ও অপদস্থ করা হইয়াছে। তারা ১৬ অক্টোবর জাতীয় শোক দিবস পালনের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য প্রবল আন্দোলনের সূচনা করেন।’
‘বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ ও বাংলার মুসলমান’ নিবন্ধে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আব্বাস আলী খান লিখেছেন, ‘বাঙালি হিন্দু সন্ত্রাস ও খুন খারাবির মাধ্যমে তাদের বিভাগবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে থাকে। এভাবে কয়েকবছর অতিবাহিত হয়। অবশেষে ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জ ডিসেম্বরের প্রথামার্ধে ভারত আগমন করেন এবং বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলো বলে ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার দ্বারা সরকারের প্রগলভতা, ডিগবাজি ও একটি অনুন্নত সম্প্রদায়ের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে আবার তা কেড়ে নেয়ার অন্যায়-অবিচারমূলক মনোবৃত্তি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।’
বঙ্গভঙ্গ রদ ও হিন্দুদের সন্ত্রাসী আন্দোলন
কলকাতার অধিকাংশ পত্রিকা বিশেষ করে প্রতিটি হিন্দু-সমর্থিত পত্রিকা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে হিন্দুদের সর্বাত্মক আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়ে খবর প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশ করতে থাকে। কলকাতার যুগান্তর পত্রিকা ১৯০৮ সালের ৩০ মে এক নিবন্ধে হিন্দুদের প্রতি এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গমাতার দ্বিখণ্ডকারীদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলে। যুগান্তর পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, ‘মা জননী পিপাসার্ত হয়ে নিজ সন্তানদের জিজ্ঞেস করছে একমাত্র কোন বস্তু তার পিপাসা নিবারণ করতে পারে। মানুষের রক্ত এবং হিন্দু মস্তক ব্যতীত অন্য কিছুই শান্ত করতে পারে না। অতএব জননীর সন্তানদের উচিত মায়ের পূজা করা এবং তার ইপ্সিত বস্তু দিয়ে সন্তুষ্টি বিধান করা। … যেদিন গ্রামে গ্রামে এমনিভাবে মায়ের পূজা করা হবে, সেদিনই ভারতবাসী স্বর্গীয় শক্তি ও আশীর্বাদে অভিষিক্ত হবে।’ ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রস্তাবকদের জন্য এক মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা গানটি লেখেন।
বিশেষ করে এ আন্দোলনে হিন্দুত্ববাদী নেতারা রাজনৈতিক আন্দোলনে বাংলায় বোমার ব্যবহার শুরু করে। হিন্দুদের রাজনৈতিক গোপন সংগঠন অনুশীলন বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে হেমচন্দ্র কানুনগো নামে এক বিপ্লবীকে প্যারিসে পাঠায়। তিনি প্রশিক্ষণ শেষে ১৯০৮ সালে মার্চ মাসে কলকাতায় বোমা তৈরির জন্য একটি স্কুল খোলেন। তার তৈরি করাই বোমাই নিক্ষেপ করেছিল ক্ষুদিরাম বসু। ক্ষুদিরামের এই ঘটনার পর ব্রিটিশ ভারতীয় পুলিশ বিভিন্ন স্থানে হানা দিয়ে ৩৪ জন বিপ্লবীকে গ্রেফতার এবং বোমা বানানো বিষয়ক বইপত্র ও সরঞ্জাম আটক করে। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুন কলকাতার মানিকতলা অঞ্চলে একটি বোমা প্রস্তুতের কারখানা আবিষ্কৃত হয়। এ ব্যাপারে অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেফতার করা হয়। অরবিন্দের ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, কানাই লাল বসুসহ ৪৭ জন চরমপন্থী ধরা পড়েন। বঙ্গভঙ্গ রদ করতে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী নেতাদের দ্বারা উদ্ধুদ্ধ হয়ে অনেক হিন্দু যুবক সন্ত্রাসবাদী কায়দায় আন্দোলনে জড়িয়ে আটক হন। হিন্দুত্ববাদের চরম আদর্শের মাধ্যমেই বাংলা অঞ্চলের রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
১৯০৫-এ শোক, ১৯৪৭-এ ভাগ হয়ে দিল্লির অধীনে
বাংলা প্রেসিডেন্সিকে ১৯০৫ সালে ভাগ করে পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে যখন আলাদা একটি প্রদেশ করা হলো, তখন বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা বাংলা মাকে ভাগ করার কারণে এত বেশি ব্যথা অনুভব করতে লাগল যে তারা শোকাহত হয়ে পড়ল। তার প্রতিবাদে হিন্দু সম্প্রদায় ১৬ অক্টোবর শোক দিবস পালন শুরু করল। তারা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করল। অথচ এ হিন্দু সম্প্রদায়ই আবার ১৯৪০-এর দশকে গিয়ে বাংলাকে ভাগ করে পশ্চিম বঙ্গকে ভারতের সাথে বিলীন করে দিতে উঠে পড়ে লাগল। ১৯৪৭ গিয়ে বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ই বাংলা মাকে ভাগ করে নিতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ল। এ নিয়ে বিশিষ্ট লেখিকা জয়া চ্যাটার্জি ‘বাংলা ভাগ হল, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭’ বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘দ্বিতীয় বারের বাংলা বিভাগ ১৯৪৫-৪৭’-এ ২৮৮-২৮৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘বাংলা ভাগের যৌথ আন্দোলনে কংগ্রেস স্পষ্টতই ছিল অধিকতর অগ্রণী অংশীদার। আর বিভক্তির আন্দোলনে এর ভূমিকা (যাকে বলে নেতৃত্বের মর্যাদায়) হিন্দু মহাসভার সাথে শুধু সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা বাংলায় মহাসভা ছাড়াই কংগ্রেস স্বতন্ত্রভাবে বাংলা ভাগের আহ্বান জানিয়ে জনসভার আয়োজন করে। কলকাতার বালিগঞ্জে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলার নেতৃস্থানীয় গান্ধীবাদি ড. প্রফুল্লজচন্দ্র রায়- এ ধরনের জনসভার মধ্যে এটাই ছিল বহুল প্রচারিত। বাংলা ভাগের জন্য ৭৬টি জনসভার আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়-এর মধ্যে কংগ্রেস একাই কমপক্ষে ৫৯টি জনসভার আয়োজন করে। বারোটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয় মহাসভার উদ্যোগে, আর মাত্র পাঁচটি জনসভা হয় যৌথ উদ্যোগে। ঘটনাচক্রে এক জায়গায় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে অথচ পুরোপুরি এককভাবে হয়নি এমন ঘটনাও স্পষ্ট গোচর হয়। এগুলো হয়েছে সেই সব জেলায়, যেখানে আন্দোলন অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল (অর্থাৎ কলকাতা, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হাওড়া ও বাকুড়া) এবং যেখানে কংগ্রেস অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। যুক্তিগ্রাহ্যভাবে এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল বর্ধমান জেলা। কংগ্রেস কমিটিগুলো এ জেলায় বাংলা বিভাগের পক্ষে শুধু কাটোয়া, কালনা আসানসোলর মতো শহরেই জনসভার আয়োজন করে। এ গ্রাম থেকেই স্বাক্ষর ও বুড়ো আঙুলের ছাপ দিয়ে একশটি দরখাস্ত প্রেরণ করা হয়। এটা স্পষ্ট যে, বেঙ্গল কংগ্রেসের সাংগাঠনিক শক্তি থেকে এই আন্দোলন যে শক্তি লাভ করে তা মোটেও কম নয়।
ভদ্রলোকেরা ছিল এ আন্দোলনের মূল শক্তি, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বস্তুত ভদ্রলোক রাজনীতির মূল স্রোত যে দিকে প্রবাহিত হয় তাতে বাংলা ভাগ ছিল তার যৌক্তিক পরিসমাপ্তি। প্রাদেশিক রাজনীতিতে ক্ষমতা হারিয়ে ও জমিদারি পদ্ধতির দ্রুত অবক্ষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হতাশ ভদ্রলোক গ্রুপ তাদের ঐতিহ্যগত সুযোগ-সুবিধা রক্ষায় স্বীয় শক্তি নিয়োগে তৎপর হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় তারা মূল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারা থেকে সরে যায়। কিছুটা হলেও প্রস্তাবিত বাংলা-বিভাগ তাদের আশ্বস্ত করে যে, প্রদেশের হিন্দুপ্রধান এলাকায় তারা তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। এসব এলাকায় মুসলিম শাসনের সম্ভাবনা ও অভিজ্ঞতা তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং এসব এলাকাতেই বিভক্তির আন্দোলন সবচেয়ে বেশি জোরালো সমর্থন পায়। একদা জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত ভদ্রলোক বাঙালিরা ১৯৪৭ সালে তাদের প্রদেশকে ভাগ করার দাবিতে প্রাপ্ত প্রতিটি কৌশল ও পদ্ধতিকে কাজে লাগায়।’ এককথায় একদা যারা তথা হিন্দুরা বাংলা ভাগ করার জন্য শোকাহত হয়েছিল, তারাই মাত্র চার দশক পর তাদের বাংলা মাকে ভাগ করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। ১৯৪৭-এ তারা বাংলাকে ভাগ করেই দিল্লির পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে যায়।
হিন্দুত্ববাদের পরিণতিতে বাংলা ভাগ
শুধু বাংলার হিন্দুরাই নয় ভারতে হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেস নেতারাও বাংলা প্রদেশকে ভাগ করে মুসলিমদের আলাদা করার জন্য নেতিবাচক বক্তব্য বিবৃতির মাধ্যমে অপকৌশল অবলম্বন করে। বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের তারা বিভিন্নভাবে উদ্ধুদ্ধ করে বক্তব্য দেন। তাদেরই অন্যতম কংগ্রেসের অন্যতম একজন হচ্ছেন বল্লভ ভাই প্যাটেল। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা বল্লভ ভাই প্যাটেল, বাঙালি হিন্দুদের বাংলা বিভাগের দাবির প্রতি তিনি জোর সমর্থন জানান। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন যে, ‘ভারতীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলা পৃথক হতে পারে না। স্বাধীন বাংলা সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের ধারণা হল বোকার মতো মুসলিম লীগের খপ্পরে পড়ার জন্য অপ্রত্যাশিত প্ররোচনাপূর্ণ একটা ফাঁদ। বাংলার এই অবস্থা কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সম্পূর্ণ সচেতন এবং আপনাদের ভয় পাওয়ার আদৌ প্রয়োজন নেই। অমুসলিম জনগণের বেঁচে থাকার জন্য বাংলাকে অবশ্যই বিভক্ত হতে হবে।’ তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার হিন্দুরা ১৯৪৭ সালে গিয়ে বাংলা ভাগ করতে উঠে পড়ে লাগে। যে হিন্দুরা ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ করার কারণে শোক দিবস পালন থেকে শুরু করে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলল সেই হিন্দুরাই ১৯৪৭ সালে গিয়ে বাংলা ভাগ করার জন্য নতুন আন্দোলন শুরু করে। মাত্র ৪২ পরে বাংলা আর তখন হিন্দু বাঙালিদের কাছে মা থাকল না, এ মাকে এখন ভাগ করা যায়। এই বিপরীতমুখী দুই ধরনের আন্দোলন দিয়ে বাংলা অঞ্চলের হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনা ও চেতনার প্রকৃত চিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বাঙালি হিন্দুদের আসল চেহারা হিন্দুত্ববাদের আসল রূপ প্রকাশিত হতে থাকে। তার পরিণতিতে তারা ১৯১১ সালে যেমন হারিয়েছে রাজধানী তেমনিভাবে হারিয়েছে পুরো ভারতে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান। ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে যেদিন বঙ্গভঙ্গ বাতিল ঘোষণা করা হয় সেদিনই একইসঙ্গে কলকাতা তথা বাংলা থেকে রাজধানী, দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। সেদিন থেকেই ভারতের রাজনীতিতে বাঙালিদের প্রভাব চিরদিনের জন্য ম্লান হয়ে যায়। দক্ষিণ ভারতের যে রাজনীতিক গোপাল কৃঞ্চ গোখলে বলতেন, ‘What Bengal thinks today rest of the India thinks tomorrow.’ অর্থাৎ বাংলা আজ যেটা চিন্তা করে পুরো ভারত সেই চিন্তা করে আগামীকাল। এমনই ছিল পুরো ভারতে বাংলা ও বাংলার রাজনীতিকদের অবস্থান। কিন্তু বাঙালি হিন্দুরা হিন্দুত্ববাদের বিষের বড়ি এমনভাবে গিলেছিল যে, তারা মুসলিমদের থেকে পৃথক হতে গিয়ে তারাই বাংলা ভাগ করে। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি স্থানান্তর হয় ১৯১১ সালে আর ১৯৪৭ সালে বৃহৎ বাংলার পশ্চিমাংশ পশ্চিমবঙ্গ নাম ধারন করে ভারতে একটি অবহেলিত প্রদেশে পরিণত হয়। আর এভাবে বাঙালি হিন্দুদের সেই গর্ব শেষ হয়ে যায়। বরং পূর্ব বাংলা প্রথমে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম প্রদেশ ও পরবর্তীতে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে অন্যতম দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com