রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধীদলকে দায়ী করার রাজনীতি
২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৯
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই হিসাবে সরকারের আট মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতি, জনজীবনের অভিজ্ঞতা এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগের অবকাশ রয়েছে।
একটি নির্বাচিত সরকারের সাফল্য শুধু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত রাখাই একটি সরকারের কার্যকারিতা বিচারের প্রধান মানদণ্ড। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকলে সরকারকে তার ব্যর্থতা পর্যালোচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
কিন্তু সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা ওঠার পর যদি সেই সমালোচনার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে বিরোধীদলের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে তা রাজনৈতিক জবাবদিহির পরিবর্তে দায় এড়ানোর সংস্কৃতিকেই উৎসাহিত করে। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের; বিরোধীদলকে সেই দায়িত্বের অংশীদার বানিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শুধু একটি দলের নেতা নন; তিনি সরকারের প্রধান, সংসদের নেতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি। তার বক্তব্যে রাজনৈতিক সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন প্রত্যাশিত।
অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সত্য আড়াল করা, বিরোধী মতকে হেয় করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানোর যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের আচরণে যদি তার অনুরূপ কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়, তাহলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। অবশ্যই প্রতিটি বক্তব্য ও ঘটনার মূল্যায়ন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমালোচনার মুখে আত্মসমালোচনা করার মানসিকতা এবং ভুল সংশোধনের সদিচ্ছা।
জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থান
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, বিরোধীদলকে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও তারা জুলাই-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে যোগ দেয়নি। কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে কি না, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। আমন্ত্রণের ধরন, অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক কাঠামো এবং বিরোধীদলীয় নেতার জন্য যথাযথ মর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
ওসমানী উদ্যানে জুলাই-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে একটি চিঠির মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থান কী, সেটি বিবেচনা করা জরুরি। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধীদল পরস্পরের প্রতিপক্ষ বা Adiversary Enemy গণ্য করা হয় না। হলেও উভয়ই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। সরকারি দল রাষ্ট্র পরিচালনা করে, আর বিরোধীদল সরকারের His Majesty’s Loyal opposition অর্থাৎ Alternative Government বা বৈধ অংশীদার। বিরোধীদলের কাজ সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিকল্প নীতি ও কর্মসূচি উপস্থাপন করা।
সুতরাং কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তার সংসদীয় মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অবস্থান নির্ধারণ করা প্রত্যাশিত। অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে যদি তার কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা বা সম্মানজনক অবস্থানের উল্লেখ না থাকে, তাহলে কেবল আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর মধ্য দিয়ে দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা যথেষ্ট নয়।
বিরোধীদলীয় নেতা কি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কেবল সাধারণ শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, নাকি তার সাংবিধানিক ও সংসদীয় অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা থাকবে— এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা এবং আমন্ত্রিত ব্যক্তির মর্যাদা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
অতএব বিরোধীদলীয় নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল— এই বক্তব্যের ভিত্তিতে তার অনুষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার জন্য তাকে নিঃশর্তভাবে দোষারোপ করা যায় না। আমন্ত্রণের প্রকৃতি ও অনুষ্ঠানে তার অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনা না করে বিরোধীদলের ওপর দায় চাপানো যুক্তিসংগত নয়।
বিরোধিতা করলেই কি স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ তৈরি হয়?
প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধিতা করতে গিয়ে যেন স্বৈরাচার ফিরে আসার পথ সুগম না হয়, সে বিষয়ে তিনি বিরোধীদলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সমকালের শিরোনামেও বিরোধিতা ও স্বৈরাচার ফিরে আসার প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানে মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, বিরোধীদল কীসের বিরোধিতা করছে এবং কেন করছে? সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করে, জনগণের সমস্যা সমাধান করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করে, তখন বিরোধীদলের দায়িত্ব কি শুধু সরকারের পাশে দাঁড়ানো? নাকি সরকারের ভুল, অনিয়ম, ব্যর্থতা ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সরকারকে সংশোধনের পথে পরিচালিত করা?
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিরোধীদল সরকারের সব সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হবে— এমন প্রত্যাশা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং গঠনমূলক সমালোচনা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক এবং বিকল্প প্রস্তাবের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র কার্যকর হয়।
যদি সরকারের বিরোধিতা করাকেই স্বৈরাচার ফিরে আসার সম্ভাব্য পথ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, তাহলে বিরোধীদলের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা সংকুচিত হয়ে পড়ে। সরকারকে সহযোগিতা করা এবং সরকারের ভুলের প্রতিবাদ করা পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা করা যেমন বিরোধীদলের দায়িত্বশীলতার পরিচয়, তেমনি জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করাও তার অপরিহার্য দায়িত্ব এবং এটিও এক ধরনের সহযোগিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা লেবার পার্টির ক্লেমেন্ট অ্যাটলির প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, তার গঠনমূলক কঠোর বিরোধিতার কারণেই চার্চিল বিজয়ী হয়েছিলেন। অন্যদিকে হিটলারের পরাজয়ের কারণ তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়ার মতো কোনো বিরোধীদল বা নেতা ছিলেন না।
সরকারের ব্যর্থতা, অসহিষ্ণুতা কিংবা বিরোধী মতের প্রতি অনুদার আচরণ যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাহলে সেই পরিস্থিতির দায়ও কি বিরোধীদলের ওপর চাপানো হবে? সরকার যদি বিরোধীদলের সমালোচনার কারণগুলো দূর না করে উল্টো সমালোচনাকেই স্বৈরাচার ফিরে আসার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে তা রাজনৈতিক বিতর্ককে বিভ্রান্ত করার শামিল হতে পারে।
স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর প্রকৃত উপায় বিরোধীদলকে নীরব রাখা নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের জবাবদিহি কার্যকর করা। যে সরকার এসব নীতি অনুসরণ করবে, তার পক্ষে গণতান্ত্রিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা সহজ হবে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাস
রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার পাশাপাশি দল হিসেবে বিএনপি অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কতটা সফল, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কোন্দল, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘাত, মব সন্ত্রাস এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এগুলো শুধু একটি দলের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুতর সমস্যা।
একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, অপরাধের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, দখলদারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের কর্তব্য।
সম্প্রতি মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র নিয়ে অভিযানে অংশগ্রহণের দৃশ্য গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। এ ঘটনাটি জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
মাদকের বিরুদ্ধে গোটা জাতির মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও শক্ত অবস্থান রয়েছে। মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ করা, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অর্থ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার অর্জন করা নয়।
অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত, গ্রেপ্তার ও বিচারের জন্য আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কোনো জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী কিংবা রাজনৈতিক নেতা— কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে যদি কেউ আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলে তার রাজনৈতিক পরিচয় বা উদ্দেশ্য যা-ই হোক, সংশ্লিষ্ট ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।
আইনের শাসনের মূলনীতি হলো— কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব এখতিয়ার নয়। অপরাধ দমন করতে গিয়ে আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে চায়, তাহলে তাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এ পর্যন্ত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। একইভাবে ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসে প্রায় ১৭১ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৬৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৯ এবং খুলনা বিভাগে ২২ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার জন্য এ চিত্র গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
গণপিটুনি, মব সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক সংঘাতের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হলে নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার হুমকির মুখে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার নীরব থাকতে পারে না। অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই থাকুক, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষা ও বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের জনগণ অতীতে সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, স্বেচ্ছাচারিতা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। সেই সংগ্রামের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং ক্ষমতাসীন দল বা তার সমর্থকেরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পারবেন না।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও যদি চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সংঘাত, মব সন্ত্রাস এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— আমরা কি আবারও সেই পুরোনো স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছি?
যে প্রবণতার বিরুদ্ধে জনগণ সংগ্রাম করেছে, সেই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি রোধে সোচ্চার হওয়া কি স্বৈরাচারকে পুনর্বাসনের চেষ্টা, নাকি গণতন্ত্র ও আইনের শাসন রক্ষার অপরিহার্য দায়িত্ব? এ প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে নয়, বাস্তব ঘটনা ও যুক্তির ভিত্তিতে দিতে হবে।
বিরোধীদলের সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সরকার যদি সেই সমালোচনাকে স্বৈরাচার ফিরে আসার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে তাকে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, বিরোধীদলের কোন কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করছে। কেবল বিরোধিতা করার কারণে বিরোধীদলকে দায়ী করা গণতান্ত্রিক রাজনীতির গ্রহণযোগ্য রীতি হতে পারে না।
সরকারের ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা যদি জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে, তাহলে সেই হতাশা দূর করার দায়িত্ব সরকারেরই। বিরোধীদলের সমালোচনার কারণগুলো দূর না করে সমালোচনাকারীদের দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং রাজনৈতিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলন : ইতিহাসের দায় কার?
বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে বিএনপির কোনো কোনো নেতাকর্মীর বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, ১৯৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী একই অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল এবং এর ফলে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এই বক্তব্যের ঐতিহাসিক যথার্থতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলো নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক মহলে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এসব অভিজ্ঞতা থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে থাকে।
জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থার ধারণা ও প্রস্তাব উত্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার উত্থাপিত ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায়।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরশাসনের পতনের পর রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তাদের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে। কিন্তু নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তখনো অমীমাংসিত ছিল। জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে বিএনপি সরকারের কাছে দাবি জানায়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ ব্যক্তির অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন বলে রাজনৈতিক আলোচনায় তার একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়— ‘পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়।’ তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিএনপি সরকারের সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য যে তীব্র হয়েছিল, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
জামায়াতে ইসলামীর কাছে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার দাবি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। আওয়ামী লীগও একই দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হয়। ফলে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিভিন্ন দলের এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছিল তাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন— একই দাবিতে বিভিন্ন দলের আন্দোলন করা মানেই তাদের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক ঐক্য বা অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে রাজনৈতিক অবস্থানের মিল থাকতে পারে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে দলগুলোর সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শ ও কর্মসূচি এক হয়ে গেছে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। প্রধান বিরোধীদলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনটি রাজনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হয় এবং এর মাধ্যমে গঠিত সংসদের স্থায়িত্বও সংকটের মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে। এরপর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়— যাতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
এখানেই মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটি নিহিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উপেক্ষা করা, আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার দায় কার? বিএনপি যদি প্রথম থেকেই নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবির বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাত, তাহলে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও পরবর্তী সাংবিধানিক সংকট এড়ানো সম্ভব হতো কি না, তা আলোচনার দাবি রাখে।
আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল— এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু সেই বিজয়ের রাজনৈতিক দায় এককভাবে জামায়াতে ইসলামীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নয়। বরং তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত, বিরোধীদলগুলোর আন্দোলন, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং পরবর্তী সাংবিধানিক পরিবর্তন— সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের সমস্ত দায় জামায়াতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিএনপির তৎকালীন সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা ইতিহাস বিকৃত করা।
গণতন্ত্র রক্ষার দায় সরকার ও বিরোধী উভয়ের
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কিন্তু সেই শিক্ষা গ্রহণের অর্থ নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ইতিহাসের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো নয়; বরং অতীতের ভুল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিণতি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা।
অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিরোধী মতপ্রকাশ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। ওয়াজ-মাহফিল, ইসলামী সম্মেলন, সিরাত মাহফিল এবং ধর্মীয় আলোচনা সভা আয়োজনের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমান সময়েও যদি ইসলামী সভা-সমাবেশ, ধর্মীয় আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের প্রতি বিরাগ থেকে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করা হলে তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হবে।
একইভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি, বক্তব্য কিংবা সমালোচনাকে কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক দলের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান অটুট থাকা উচিত।
আজকের বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। সরকারকে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, বিরোধীদলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সব রাজনৈতিক দলকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর দায় কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়। এই দায় সরকারের, বিরোধীদলের, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং সর্বোপরি জনগণের। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায়িত্বে যারা থাকেন, গণতন্ত্র রক্ষা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিরোধীদলের সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা, রাজনৈতিক ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো কিংবা অতীতের ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় সত্য স্বীকার করার সাহস, ভুল সংশোধনের সদিচ্ছা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার মধ্য দিয়ে।
দোষারোপ নয়, জবাবদিহিই হোক রাজনীতির ভিত্তি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা অর্জন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দলীয় নেতাকর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা। চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক সংঘাত ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
প্রধানমন্ত্রীরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন, বিরোধীদলকে নীরব রাখা গণতন্ত্র রক্ষার উপায় নয়। বরং বিরোধীদলের সমালোচনার জবাব যুক্তি ও তথ্য দিয়ে দেওয়া, ভুল থাকলে তা সংশোধন করা এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
একইসঙ্গে বিরোধীদলেরও দায়িত্ব রয়েছে সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনস্বার্থের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা।
গণতন্ত্র কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। যে সরকার এই সত্য উপলব্ধি করবে, সে সরকারই সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে আত্মসংশোধনের শক্তি অর্জন করবে। আর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা আইনের শাসন, জবাবদিহি ও নাগরিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে, সেই ব্যবস্থাতেই স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ সংকুচিত হবে।
বাংলাদেশের মানুষ আরেকটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। তারা চায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এবং বিরোধীদল স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারবে— এই প্রত্যাশা পূরণই বর্তমান সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট।