বাংলাদেশ কি মহাসংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে?

হারুন ইবনে শাহাদাত
১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:১৫

লেখক: অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ

বাংলাদেশ আজ এক গভীর বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। রাজনীতি, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মানুষের মৌলিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অপরাধপ্রবণতা, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও জননিরাপত্তার সংকট
নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি, জমি দখল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ জনমনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে। সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকা যখন অপরাধীদের হুমকির মুখে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অপরাধের শিকার হয়ে থানায় মামলা করতে গিয়েও কেউ যদি বাধার সম্মুখীন হন, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রাথমিক পথটিই সংকুচিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের হয়রানির অভিযোগও উদ্বেগজনক। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব অপরাধ দমন করা এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংকট ও অর্থনীতির দুরবস্থা
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থাকলেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অর্থনীতির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকার ওপরে। খেলাপি ঋণ পরিমাণ বাড়লে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়, নতুন উদ্যোক্তারা অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত গোটা অর্থনীতিকে বহন করতে হয়। ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু ঋণ আদায়, অনিয়মের তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে থাকার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রবৃদ্ধির গতি কমলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হয়; অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। ফলে অর্থনৈতিক সংকট কেবল জাতীয় প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
দুর্নীতি দমন ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থতা
অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার। জনগণের আমানত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা অপরিহার্য। একইসঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু বক্তব্য কিংবা প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান, আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ উদ্ধার এবং অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কেউ জবাবদিহির বাইরে থাকলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হবে। অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর।
জ্বালানি সংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সংকট শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জীবনযাত্রাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছিল। কর্ম সংস্থান তো দূরের কথা, ৬২ হাজার লোক নতুন করে বেকার হয়েছে। শিল্প খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক শান্তি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা অপরিহার্য। মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যদি প্রতিহিংসা, ভয়ভীতি, দমন-পীড়ন কিংবা সংঘাতের রূপ নেয়, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সরকারের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীদলের রাজনৈতিক অধিকার, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
‘গুপ্ত’ রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতা নিয়ে অভিযোগ তোলা হলে তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ থাকা উচিত। প্রমাণহীন অভিযোগ কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্য রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস গভীর করতে পারে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন দল ও মতের মানুষ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তাদের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তথ্য, ইতিহাস ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত।
রিকনসিলিয়েশনের নামে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিতর্ক
রাজনৈতিক পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুনর্মিলনের নামে অতীতের অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উপেক্ষা করা হলে তা ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আইন, সাংবিধানিক অধিকার এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের দায় নির্ধারণে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। জাতীয় ঐক্যের নামে অপরাধের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ যেমন থাকা উচিত নয়, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভিত্তিতে অধিকার হরণও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রকৃত পুনর্মিলনের ভিত্তি হতে হবে সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অন্যায় প্রতিরোধের নিশ্চয়তা। ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লাঞ্চিত করার ঘটনার তদন্ত প্রয়োজন
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার হয়েছেন । বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।
যদি কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে অপমান কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে তার যথাযথ তদন্ত হওয়া উচিত। দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও নাগরিকের মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা সংশ্লিষ্ট সবার কর্তব্য।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একইসঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব অগ্রগতিও দেখাতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও জনগণের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বস্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রত্যাশা করে। এসব প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সুশাসন, জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সংকট উত্তরণের পথ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশকে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হলে জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। এখন প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং জনগণের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট।

উপ-সম্পাদকীয় মতিউর রহমান আকন্দ

সম্পর্কিত খবর