প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২১
॥ পাঁচ ॥
রাষ্ট্রপতির অভিষেক : যে স্বপ্ন নিয়ে মুরসির যাত্রা শুরু হয়েছিল : মিশরের ইতিহাসে ড. মুহাম্মদ মুরসির রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষেক নিছক একজন রাজনীতিকের ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণের ঘটনা ছিল না। এর সঙ্গে মিশে ছিল একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষা, একটি গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের দীর্ঘ ছায়া থেকে মুক্তির স্বপ্ন এবং গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু করার এক ঐতিহাসিক প্রত্যাশা। ২০১২ সালের ৩০ জুন। মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি যেন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মোচন করেছিল। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ড. মুহাম্মদ মুরসি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর এই প্রথম মিশরের জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের সুযোগ পেল। ফলে মুরসির বিজয় ছিল একইসঙ্গে একজন ব্যক্তির বিজয়, একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্য এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার এক প্রতীকী বিজয়। কিন্তু বিজয়ের সেই মুহূর্তেই তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক অসাধারণ কঠিন বাস্তবতা।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ তিনি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা তার হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল না। পুরোনো শাসনব্যবস্থার প্রভাব তখনো রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাকাঠামোর গভীরে প্রোথিত। সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী; আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত; বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরও দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রকাঠামোর ধারাবাহিকতা বহন করছিল।
অন্যদিকে বিপ্লব-পরবর্তী মিশর ছিল গভীর রাজনৈতিক বিভাজনে আক্রান্ত। ইসলামপন্থী, উদারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, বিপ্লবী তরুণ, কপটিক খ্রিস্টান এবং সাবেক শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকÑ প্রত্যেকের ছিল নিজস্ব প্রত্যাশা, আশঙ্কা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ-ভাবনা।
এই বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যেই শুরু হয় মুরসির রাষ্ট্রপতিত্ব। তার প্রথম দিককার রাজনৈতিক বার্তার অন্যতম প্রধান সুর ছিলÑ তিনি কোনো একটি দল, সংগঠন কিংবা মতাদর্শের রাষ্ট্রপতি নন; তিনি সমগ্র মিশরের রাষ্ট্রপতি হতে চান।
তাহরীর থেকে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ : রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে এবং অভিষেকের পর মুরসির দুটি ভাষণ বিশেষভাবে ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে। ২৯ জুন ২০১২ তিনি কায়রোর তাহরীর স্কয়ারে সমবেত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পরদিন ৩০ জুন সাংবিধানিক আদালতে শপথ গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল গণতন্ত্র, জনগণের ইচ্ছা, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার।
তার বক্তব্যের বহুল উদ্ধৃত ভাবার্থ ছিল, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণই ক্ষমতার উৎস। জনগণের ইচ্ছার ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি, কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো কর্তৃত্ব থাকতে পারে না।’ আরেকটি বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মিশরের সকল নাগরিকের প্রেসিডেন্ট যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি, তাদেরও।’ এই ঘোষণার মধ্যে ছিল তার রাষ্ট্রপতিত্বের একটি মৌলিক রাজনৈতিক দর্শন। নির্বাচনে জয়ী হওয়া এক বিষয়, আর বিজয়ের পর পরাজিতদেরও আপন করে নিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মুরসি অন্তত তার ঘোষিত রাজনৈতিক অবস্থানে সেই দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেনÑ তিনি সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন এবং স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। তাহরীর স্কয়ারের ভাষণে তার একটি প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি বিশেষভাবে মানুষের মনে দাগ কাটে। তিনি নিজের জ্যাকেট খুলে দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেনÑ তিনি জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাসাদবন্দি শাসক নন; জনগণের শক্তিই তার শক্তি।
তার বক্তব্যের মর্মার্থ ছিল, ‘আমার কাছে কোনো বুলেটপ্রুফ ভেস্ট নেই। আল্লাহ ছাড়া আমি কাউকে ভয় করি না। আমার শক্তি আপনারাÑ এই জনগণ।’ আরও একটি বার্তায় তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, ‘কর্তৃত্ব কোনো একক ব্যক্তির নয়; কর্তৃত্ব থাকবে আইন ও জনগণের।’ মুসলিম ও খ্রিস্টান, নারী ও পুরুষ, তরুণ ও প্রবীণÑ মিশরের সমাজের প্রতিটি শ্রেণি ও সম্প্রদায়কে তিনি নতুন মিশর নির্মাণের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান।
তার অঙ্গীকারের মূল সুর ছিল- ১. ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা; ২. আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্মান; ৩. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা; ৪. সকল নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন; ৫. দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম; ৬. এবং তাহরীর বিপ্লবের মূল আকাক্সক্ষাÑ স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা বাস্তবায়নের চেষ্টা। এই ভাষণগুলো তাই নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না; এগুলো ছিল বিপ্লব-পরবর্তী মিশরের নতুন রাষ্ট্রচিন্তার একটি প্রাথমিক ঘোষণাপত্র।
নাজলা আলী : প্রাসাদের বাইরে এক নীরব উপস্থিতি
মুরসির রাষ্ট্রপতিত্বের আলোচনায় তার স্ত্রী নাজলা আলীর উপস্থিতিও একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য ছিলেন না, ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক বৃত্তে প্রবেশের আকাক্সক্ষাও তার মধ্যে দৃশ্যমান ছিল না। বরং তিনি স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের নেপথ্যে থেকে পরিবার, নৈতিক সমর্থন এবং ব্যক্তিগত সাহস জোগানোর ভূমিকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মিশরের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় রীতিতে রাষ্ট্রপতির স্ত্রীকে ‘ফার্স্টলেডি’ হিসেবে অভিহিত করার প্রবণতা থাকলেও নাজলা আলী এই পরিচয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। তার বক্তব্যের মর্মার্থ ছিলÑ ইসলাম একজন নারীকে অন্য মানুষের চেয়ে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে না; প্রত্যেক নাগরিকের মতো তারও মূল পরিচয় একজন মিশরীয় এবং দেশের সেবাই তার অগ্রাধিকার। তিনি আরও যে ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন, তার সারকথা ছিলÑ শাসকের মর্যাদা ক্ষমতা ভোগে নয়, মানুষের সেবায়। রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবেও তিনি নিজেকে কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণির অংশ হিসেবে দেখতে চাননি; বরং জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চেয়েছিলেন। প্রাসাদের জাঁকজমকের প্রতিও তার অনাগ্রহের কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে ক্ষমতার প্রাসাদ যদি মানুষকে মানুষের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তবে সেই দূরত্ব নেতৃত্বের মানবিকতাকেই ক্ষয় করে। নাজলার এই অবস্থানকে কেবল একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ছিল ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের অনাসক্তি এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখার একটি নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি কোনো সরকারি পদ গ্রহণ করেননি, প্রকাশ্য নীতিনির্ধারণে আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেননি এবং প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও কোনো প্রকাশ্য দাবি করেননি। তার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। পরিবার ও স্বামীর প্রতি নৈতিক সমর্থন দেওয়াই ছিল তার প্রধান ভূমিকা। এই নীরব উপস্থিতিও মুরসির রাজনৈতিক জীবনের একটি মানবিক অধ্যায়।
রাষ্ট্র : ক্ষমতার কাঠামো নয়, মানুষের আমানত
মুরসি এসেছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসর থেকে। ফলে তার বিজয়ের পর মিশরের সমাজের একটি অংশের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা জন্মেছিলÑ রাষ্ট্র কি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে?
মুরসির প্রথম দিককার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারে এই আশঙ্কা দূর করার চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। তিনি বারবার মিশরের সকল নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের কথা বলেছেন। তার কাছে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতা পরিচালনার একটি কাঠামো নয়; রাষ্ট্র ছিল মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও অধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান। তিনি এমন একটি মিশরের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের অনুগ্রহের বিষয় হবে না; বরং তা হবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাহরীর স্কয়ারে যে মানুষগুলো স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল, সেই আকাক্সক্ষাকে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই ছিল তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাতীয় ঐক্য। মুরসি জানতেন, একটি স্বৈরশাসককে সরিয়ে দেওয়া আর একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এক কথা নয়। বিপ্লব একটি শাসককে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে; কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভয় ও বিভাজন দূর করা অনেক কঠিন।
তাই তার রাজনৈতিক ভাষণে জাতীয় ঐক্য, সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন মিশরের মুসলমান ও খ্রিস্টান, ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ, বিপ্লবী ও রক্ষণশীল, শহর ও গ্রামের মানুষÑ সবাই যেন নিজেদের এই রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে।
অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা : রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব উন্নয়ন নিশ্চিত করাও ছিল মুরসি সরকারের অন্যতম প্রধান পরীক্ষা। বিপ্লবের অভিঘাতে মিশরের পর্যটন, বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি ও জনজীবনের নানা সংকট মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছিল। ফলে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট ছিল না। মানুষের ঘরে খাদ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনাও ছিল অপরিহার্য। মুরসি সরকার এই পরীক্ষায় কতটা সফল হয়েছিলÑ ইতিহাসের বিচারে তার একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তার প্রশাসনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো, রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতার ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সমাজের একটি অংশের আস্থার সংকট তার সরকারের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছিল।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সামনে একটি আরও গভীর প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, একটি নির্বাচিত সরকার ব্যর্থ হলে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সাংবিধানিক পথ কী? গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিধান হলো- একটি সরকার ব্যর্থ হলে জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে তাকে প্রত্যাখ্যান করবে। সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক বিরোধীরা সাংবিধানিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের দাবি তুলবে। কিন্তু মিশরের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত সেই পথে এগোয়নি।
৩ জুলাই : স্বপ্নের ওপর নেমে এলো সামরিক ছায়া
২০১৩ সালের মাঝামাঝি রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিরোধী আন্দোলন ক্রমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। অবশেষে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ঘোষণা দেন। সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি আদলি মানসুরকে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সামনে আনা হয়। এই ঘটনাটি মিশরের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি।
প্রতিপক্ষের কাছে এটি ছিল জনবিক্ষোভের পরিণতি এবং একটি ব্যর্থ সরকারের অপসারণ। মিশরের ও বিশ্বের গণতন্ত্রাকামী মানুষের কাছে এটি ছিল নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপÑ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর রাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ। এই বিতর্কের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা কতটা ছিল, কারা মুরসি সরকারের পতনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছিলÑ এসব প্রশ্ন আজও ইতিহাস, গবেষণা ও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। তবে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে একদিকে যেমন মুরসি সরকারের রাজনৈতিক ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করতে হবে; অন্যদিকে তেমনি একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে অপসারণের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। অতএব ইতিহাসকে দুটি প্রশ্ন করতেই হয়Ñ মুরসি কোথায় ব্যর্থ হয়েছিলেন? এবং তাঁকে কেন তার সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ করার কিংবা জনগণের কাছে পুনরায় যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না? এই দুই প্রশ্নের মধ্যবর্তী বিস্তৃত পরিসরেই লুকিয়ে আছে মিশরের সেই অস্থির সময়ের প্রকৃত ইতিহাস।
রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা : মুরসির রাষ্ট্রপতিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার পররাষ্ট্রনীতি। মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক পটভূমি থেকে উঠে এলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করেছিলেন। ইসরাইলের সঙ্গে মিশরের বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তির ব্যাপারে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো একতরফা বিচ্ছেদ ঘটাননি। ১৯৭৯ সালের মিশর-ইসরাইল শান্তিচুক্তিসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অবস্থান তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তববাদী দিকটি প্রকাশ করে।
তৎকালীন প্রতিবেদনে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেসের সঙ্গে তার চিঠিপত্রের কথাও উঠে আসে। সেখানে কূটনৈতিক সৌজন্য এবং দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়Ñ আদর্শিক অবস্থান আর রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা সবসময় এক পথে চলে না। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁকে আন্তর্জাতিক চুক্তি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক শক্তির বাস্তবতা সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। মুরসি সেই কঠিন সমন্বয়ের পথেই এগোতে চেয়েছিলেন।
বন্দিত্বের অন্ধকারে এক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি
কিন্তু ইতিহাস তাঁকে সেই পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য খুব বেশি সময় দেয়নি। ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছর ৩ দিনের মাথায় তার সরকার উৎখাত হলো। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বন্দি হলেন। তার রাজনৈতিক সংগঠন কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়ল। তার সমর্থকরা রাজপথে নেমে এলেন। কায়রোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুরসির সমর্থকদের দীর্ঘ অবস্থান শুরু হয়। তারা তার মুক্তি এবং রাষ্ট্রপতি পদে পুনর্বহালের দাবি জানাতে থাকেন। ২০১৩ সালের ৮ জুলাই কায়রোর রিপাবলিকান গার্ডের সদর দপ্তরের কাছে মুরসি-সমর্থকদের সমাবেশে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণে বহু মানুষ নিহত হন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। মিশরের রাজনৈতিক সংকট তখন আর কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা রূপ নেয় রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী, জনগণের অধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার এক গভীর সংঘাতে।
পরবর্তী সময়ে রাবা আল-আদাবিয়া ও নাহদা স্কয়ারে মুরসির সমর্থকদের অবস্থান আরও দীর্ঘায়িত হয়। ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন। এই ঘটনাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে। মুরসি-সমর্থকদের ওপর এই দমন-পীড়ন মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত রেখে যায়। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও ছিল জটিল ও দ্ব্যর্থপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্র ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও মুরসির অপসারণকে কেন্দ্র করে তাদের অবস্থান নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ সামরিক হস্তক্ষেপকে জনআন্দোলনের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখেছিল, কেউবা একে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেছিল। এই দ্বন্দ্বই মুরসি-অধ্যায়কে আরও জটিল করে তুলেছে।
একটি আন্দোলনকে কি বন্দুক দিয়ে থামানো যায়?
মুহাম্মদ মুরসি শুধু একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একজন প্রতিনিধি। সেই আন্দোলন প্রায় নয় দশক ধরে নানা সময়ে নিষেধাজ্ঞা, কারাবরণ, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে টিকে ছিল। তাই মুরসির পতনের পরও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মুছে যায়নি। কারাগারের দরজা বন্ধ করা যায়; রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা যায়; সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা যায়, কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে কেবল শক্তি প্রয়োগ করে চিরতরে বিলুপ্ত করা যায় কি না, সেটিই হয়ে উঠেছিল পরবর্তী ইতিহাসের একটি মৌলিক প্রশ্ন। মুরসির পতনের পর মিশরের রাষ্ট্রব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। সেনাবাহিনী ও নতুন ক্ষমতাকাঠামো রাষ্ট্র পরিচালনায় আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে এবং মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা হয়।
এদিকে মুরসির প্রতি সমর্থনকারী জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে তার প্রতি আনুগত্য আরও গভীর হয়। কারণ তাদের কাছে মুরসি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন ব্যালটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এবং বন্দুকের মুখে ক্ষমতা হারানো এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতীক।
শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায় : ২০১৯ সালের ১৭ জুন আদালতে বিচারকার্য চলাকালে ড. মুহাম্মদ মুরসি শাহাদাতবরণ করেন। দীর্ঘ কারাবাসের সময় তার স্বাস্থ্য, আটক অবস্থার পরিবেশ, চিকিৎসাসেবা এবং রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তার মৃত্যুকে ঘিরে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও উঠেছিল। তার মৃত্যু তাই মুরসি-অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে ওঠেনি; বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ড. মুহাম্মদ মুরসির জীবন আজ কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির জীবনকাহিনী নয়। এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার ইতিহাস। এটি ক্ষমতা ও বৈধতার দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এটি জনগণের ভোট বনাম রাষ্ট্রের শক্তিকাঠামোর সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং সর্বোপরি এটি সেই চিরন্তন প্রশ্নের ইতিহাস। একটি রাষ্ট্রে জনগণ যদি ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তবে সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিকে ক্ষমতায় রাখার কিংবা অপসারণের চূড়ান্ত অধিকার কার? মুরসি তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়তো এই প্রশ্নের রাজনৈতিক উত্তর দিতে পারেননি। কিন্তু তার জীবন, তার রাষ্ট্রপতিত্ব এবং তার মৃত্যু প্রশ্নটিকে ইতিহাসের কাছে রেখে গেছে। এ কারণেই মুরসির রাষ্ট্রপতিত্বকে বুঝতে হলে তার পতনের দিন থেকে ইতিহাসের পাঠ শুরু করা যথেষ্ট নয়। ফিরে যেতে হবে তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষেকের দিনেÑ সেই দিনে, যেদিন বিপ্লব-পরবর্তী মিশরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নের কথা বলেছিলেন।
সেই স্বপ্ন কী ছিল? কী ছিল তার রাষ্ট্রদর্শন? কীভাবে তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন? কোথায় তার রাজনৈতিক ভুল ছিল? কোথায় ছিল তার প্রশাসনিক দুর্বলতা? আর কেন সেই ভুল সংশোধনের জন্য তাকে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না দিয়ে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে মুরসির রাষ্ট্রপতিত্বের প্রথম দিনগুলোয়, তার প্রথম সিদ্ধান্তে, প্রথম রাজনৈতিক সংকটে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের জটিলতায়।
সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে মুরসি-অধ্যায়ের সেই বিস্ময়কর ও বেদনাময় ইতিহাসÑ যেখানে স্বপ্ন ছিল, ভুল ছিল; আকাক্সক্ষা ছিল, প্রতিরোধ ছিল; জনসমর্থন ছিল, জনঅসন্তোষও ছিল; ছিল রাজনৈতিক মেরুকরণ, রাষ্ট্রীয় শক্তির দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অদৃশ্য প্রভাবের প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নগুলোর ভেতর দিয়েই একসময় সামনে এসে দাঁড়ায় মুরসির জীবনের সবচেয়ে করুণ অধ্যায় একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পৌঁছে গেলেন?
তার উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আরও একবার ফিরে তাকাতে হবে সেই দিনটির দিকেÑ যেদিন তাহরীরের জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে মুরসি বলেছিলেন, তার শক্তি জনগণ; তার কাছে কোনো বুলেটপ্রুফ ভেস্ট নেই; আর আল্লাহ ছাড়া তিনি কাউকে ভয় করেন না। সেদিন তার কণ্ঠে ছিল একটি নবজাত গণতন্ত্রের স্বপ্ন। পরবর্তী ইতিহাসে সেই স্বপ্ন কতখানি বাস্তব হয়েছিল, তার উত্তর হয়তো মুরসির সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটির মধ্যেই নিহিত।
কিন্তু একটি বিষয় অনস্বীকার্য : মুরসির রাষ্ট্রপতিত্বের গল্প কেবল একজন মানুষের উত্থান-পতনের গল্প নয়; এটি জনগণের ভোট, রাষ্ট্রের ক্ষমতা, সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক বৈধতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর ঐতিহাসিক উপাখ্যান। (চলবে)
লেখক : কলামিস্ট, আইনজীবী।
প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি মতিউর রহমান আকন্দ