সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধন ফ্যাসিবাদ জিন্দা করার খায়েশ
১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৬
সোনার বাংলা রিপোর্ট : কথায় আছে, যে লঙ্কায় যায় সেই রাক্ষস হয়, কিন্তু এতেই হয় তার রাজ্য ক্ষয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে তাল মেলাতে নতুন নতুন আইন করছে। তাদের লক্ষ্য জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাকস্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ সেদিকে না তাকিয়ে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’র নামে বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার হরণের আয়োজনে ব্যস্ত। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এটি ফ্যাসিবাদ জিন্দা করার খায়েশ ছাড়া আর কিছু নয়।
গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগে করুণ পরিণতি দেখার পরও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইনে যেসব পরিবর্তন এনেছিল, বিএনপি সরকার তা বাতিল করে একটি নতুন সংশোধিত রূপ বা নতুন আইন পাস করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সরকারের এই পদক্ষেপ সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইনটি পাসের তোড়জোড় শুরু হতেই এর উদ্দেশ্য যে মহৎ নয়, তা বুঝতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এই প্রস্তাবিত আইন সংস্কার ও পাসের প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের অধিকারকে সংকুচিত করে যদি এই ধরনের কঠোর আইন পাস করা হয়, তবে তা সমগ্র দেশকে কার্যত এক বিশাল ‘কারাগারে’ পরিণত করবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই সাংবাদিকের মতে, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত চিন্তার ওপর এ ধরনের ডিজিটাল বা সাইবার কাঠামোর মাধ্যমে যে খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়, তা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে চরমভাবে ব্যাহত করে।
একই ইস্যুতে অসন্তোষ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের করা আইনটি বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গত ২১ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের কোনো কোনো আইন বা বিধান কেবল প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে, যা মুক্ত গণতন্ত্রের পরিপন্থী। সরকারের বয়স ৭ মাস। অন্তর্বর্তী সরকার যে আইন করেছে, সেই সাইবার সুরক্ষা আইনের বয়স ৪-৫ মাস। এ সময়ের মধ্যে এই আইন সংশোধন করতে হবে কেন?
তিনি বলেন, সরকারের মধ্যে এত অস্থিরতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে কেন? সাইবার সুরক্ষা আইনে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের হয়রানি হতে হবে। বিরোধী দল-মত দমন করতে এবং সরকারের দুর্নীতি, দলীয়করণ প্রকাশ যাতে না হয়, সেজন্য মিডিয়াকে দমন করতে সরকার সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের পথে হাঁটছে। সরকারকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতেই হবে।
এদিকে উদ্ভূত বিতর্ক ও উদ্বেগের মুখে সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই গাওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা দফায় দফায় গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের দাবি— আইনের অনুচ্ছেদ বা বিধিতে যাই থাকুক না কেন, অতীত সরকারের মতো এই আইনের অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হবে না। সরকার আশ্বাস দিচ্ছে যে, মূল উদ্দেশ্য দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধান এবং নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষা করা, বিরোধীদল বা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা নয়। তবে সরকারের এসব মৌখিক আশ্বাসে কোনোভাবেই আস্থা রাখতে পারছে না নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী ও বিরোধীদলগুলো। সমালোচকদের মতে, লিখিত আইনে যখন কোনো বিতর্কিত ও নিপীড়নমূলক ধারার অস্তিত্ব বজায় রাখা হয়, তখন কেবল প্রশাসনের ‘আশ্বাসের’ ওপর ভরসা করা বিপজ্জনক। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতাসীন দলগুলো আইনি সুযোগ হাতে পেলে তার প্রয়োগ নিজেদের সুবিধামতো করে থাকে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের নীতি ও আচরণের কারণে জনগণের এই অনাস্থা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের আগে বিএনপি ‘গণভোট’ ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। কিন্তু সরকার গঠনের পর টালবাহানা শুরু করেছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সরকারের মুখে ‘অপব্যবহার হবে না’ জাতীয় আশ্বাস আস্থা রাখা মানে সরকারের ফাঁদে পা দেয়া। তাই সংবাদপত্র সম্পাদক, আইনবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মী, বিরোধীদল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে এ নিপীড়নমূলক আইন না করার দাবি জানিয়েছে।
মুক্ত গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। অতীতে দেখা গেছে, ডিজিটাল ও সাইবার সংক্রান্ত কালো আইনগুলো গণমাধ্যমের হাতকে শৃঙ্খলিত করেছে এবং নাগরিক সমাজকে চরম আত্মনিয়ন্ত্রণের (Self-censorship) দিকে ঠেলে দিয়েছে। মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘দেশ কারাগারে পরিণত হওয়া’র হুঁশিয়ারি কিংবা রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষের অসন্তোষ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি সামগ্রিক জনআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। বিএনপি সরকারের উচিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পুরোনো ইতিহাসে ফিরে না গিয়ে, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো।
আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের মতামত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার না দিলে দেশের বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি আবার কোনো গণঅভ্যুত্থানেই খুঁজবে। অতএব সাবধান।