জ্বালানি সংকটে শিল্প-কারখানাসহ সর্বত্র অস্থিরতা


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:২২

সাময়িক সমাধানে এলএনজি, স্থায়ী সমাধানে জরুরি দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট অনেকটাই চরমে। মানুষের জীবনযাত্রায় ও শিল্পোৎপাদনে জ্বালানি সংকটের প্রভাব সরাসরি ফেলছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, বাড়ছে লোডশেডিং। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা সরকারের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সংকটটি এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়; এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সর্বত্র সংকট চলছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি অবগত করতে ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এফবিসিসিআইসহ দেশের শীর্ষ ২০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ১৫ সেপ্টেম্বর রাত থেকে সংকটের আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশ্বস্ত করেন।
সংকটের মূল কারণ, চাহিদা ও মজুদের চিত্র
সর্বশেষ হিসাবে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০-২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার এমএমসিএফডি। বর্তমান সরবরাহের প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি দেশীয় উৎস থেকে এবং প্রায় ১ হাজার এমএমসিএফডি এলএনজি থেকে আসছে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সরবরাহ-চাহিদার ব্যবধান স্পষ্ট। সাম্প্রতিক হিসাবে এক দিনে দেশে প্রায় ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংকটের বড় কারণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
সংকট কাটাতে সরকারি উদ্যোগ
তাৎক্ষণিকভাবে সরকার বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি নতুন এলএনজি অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার স্থলভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকার আগামী কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনাও করছে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনার কথা সরকার জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় অস্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও চাহিদা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের অংশ বাড়াতে সরকারি অব্যবহৃত জমিতে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করার উদ্যোগ নিয়েছে।
স্থায়ী সমাধানে যা করণীয়র
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা আরও বাড়বে। স্থায়ী সমাধানে প্রথমেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে নতুন ক্ষেত্র দ্রুত অনুসন্ধান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি জমি ব্যবহারের পাশাপাশি শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। একইসঙ্গে কোন খাতে কত গ্যাস ও বিদ্যুৎ যাচ্ছে, তার স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা দরকার।
প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল— যেখানে দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আমদানির মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৭ থেকে ধীরে ধীরে স্বস্তি এনে ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকটমুক্ত হওয়া।