স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সমন্বয়হীনতা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:০০
স্টাফ রিপোর্টার : স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের তালগোল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার ইসি জানিয়েছিল, সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর। পরদিনই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানালেন, ভোটের তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না। এরপর ইসি আবার বলল, ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়; ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হবে। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা আসলে কার এবং সরকারের ভূমিকা ঠিক কতটুকু?
গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর। এরপর ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে আরও চার ধাপে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখও জানানো হয়। প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়। তার এ বক্তব্যের পর গণমাধ্যমগুলো ১২ নভেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর খবর ব্যাপকভাবে প্রকাশ করে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা না যেতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। ভোটের তারিখ ঘোষণা নিয়ে সরকার কিছুই জানে না। এর কিছুক্ষণ পর নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আগের দিনের ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। ইসি সচিব আখতার আহমেদও জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সংস্থাগুলোর মতামত নিয়ে কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসি কোনো সময়সূচি দিলেও সরকারের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তা এগিয়ে নেওয়া, পিছিয়ে দেওয়া বা পরিবর্তন করা সম্ভব। সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব সরাসরি নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ওই অনুচ্ছেদের ২ উপ-অনুচ্ছেদে সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের মাধ্যমে কমিশনের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণের সুযোগ রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্বের ব্যাখ্যায় বলছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত অন্যান্য নির্বাচন-সংক্রান্ত দায়িত্বও তারা পালন করে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত আইনগত দায়িত্বই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন-২০০৯ এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন বিধিমালার অধীনেই ইউপি নির্বাচন পরিচালিত হয়। সরকারি গেজেটেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা-২০১০-এর বিধি ১০-এর অধীনে নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি ঘোষণার নজির রয়েছে।
অর্থাৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল বা ভোটের দিন নির্ধারণের আইনগত ক্ষমতা সরাসরি সরকারের হাতে— এমন কোনো বিধান নেই। বরং নির্বাচন কমিশনই সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ ও নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। তবে এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচন কমিশন প্রশাসনের অন্য অংশের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই নির্বাচন আয়োজন করবে।
একটি নির্বাচন শুধু ব্যালট, ভোটকেন্দ্র ও প্রার্থীর বিষয় নয়। মাঠপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, জনবলসহ নানা সরকারি কাঠামোকে নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। এ কারণে বাস্তব আয়োজনের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন অনুযায়ী হবে এবং এর জন্য সরকারের সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতা তৈরি হয়েছে বক্তব্যের অসামঞ্জস্য থেকে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার একজন নির্বাচন কমিশনার যখন সাত ধাপে সম্ভাব্য ভোটের তারিখ প্রকাশ করলেন, তখন পরদিন সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী জানালেন, সরকারই এ বিষয়ে কিছু জানে না। এরপর ইসির আরেক কমিশনার বললেন, তারিখ চূড়ান্ত নয়। আবার সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা বললেন, সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এতে সাধারণ ভোটারের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে— ইসি কি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তফসিল দেবে, নাকি সরকার সিদ্ধান্ত দিলে ইসি তা বাস্তবায়ন করবে?
সরকার নির্বাচনের প্রশাসনিক পরিবেশ ও প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও নির্বাচন কমিশনের আইনগত দায়িত্বকে সরকারের সিদ্ধান্তের অধীন হিসেবে দেখানোর আগে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি দেখানো প্রয়োজন। অন্যদিকে ইসির পক্ষেও সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব প্রস্তুতি উপেক্ষা করে চূড়ান্ত নির্বাচনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়।