আলোকে তিমিরে

রাষ্ট্রদর্শনের ভিত্তিতে জ্ঞান ও শিক্ষা সংস্কার


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৪৫

॥ মাহবুবুল হক ॥
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শেকড়, মূল শক্তি কেবল তার ভূখণ্ড, জনশক্তি, সামরিক সক্ষমতা, অর্থনীতি বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে না; রাষ্ট্রের সভ্যতা ও উন্নয়নের আধুনিক মানদণ্ড হলো মানব উন্নয়ন সূচক। শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র, নাগরিকের মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থা নির্মাণের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
রাষ্ট্রদর্শনের মৌলদৃষ্টিতে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে। দার্শনিক প্লেটো ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য সুশিক্ষিত নাগরিক ও যোগ্য নেতৃত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
দার্শনিক অ্যারিস্টটল রাষ্ট্রকে মানুষের উৎকর্ষ সাধনের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছেন। জন লক ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জ্যাঁ জাক রুশো নাগরিক স্বাধীনতা ও সাধারণ ইচ্ছার কথা বলেছেন। জন স্টুয়ার্ট মিল ব্যক্তি স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতাকে সভ্যতার অগ্রগতির শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাই শিক্ষার লক্ষ্য শুধু চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করা নয়; বরং স্বাধীনচেতা, বিবেকবান, যুক্তিবাদী, নৈতিক, দায়িত্বশীল ও দক্ষ নাগরিক তৈরি করা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জ্ঞান ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারকে দেখতে হলে শিক্ষা কী, রাষ্ট্রের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক কী এবং রাষ্ট্র কোন ধরনের নাগরিক তৈরি করতে চায়— এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
রাষ্ট্রদর্শন ও শিক্ষার সম্পর্ক
রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্র কেন এবং কার জন্য? যদি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয় নাগরিকের জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও সেই লক্ষ্য পূরণে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে।
শিক্ষা নাগরিককে শুধু তথ্য ও পরিসংখ্যান দেয় না; তাকে চিন্তা করতে শেখায়। ভাবনা করতে শেখায়, কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায়— এসব বিচার ও নির্ণয় করার সক্ষমতা তৈরি করে। ফলে শিক্ষার মান রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মানকেও প্রভাবিত করে।
একটি দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা এমন নাগরিক তৈরি করতে পারে যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর অর্জন করার জন্য মুখস্থ করবে, কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারবে না। বিপরীতে একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা এমন নাগরিক তৈরি করে— যারা প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে পারে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সমস্যা সমাধানে অংশ নিতে পারে।
অতএব শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত— জ্ঞানী, নৈতিক, ভালোবাসাপূর্ণ, উদার, মহৎ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।
জ্ঞানচর্চায় স্বাধীনতা প্রদান : রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো চিন্তার স্বাধীনতা। কোনো রাষ্ট্র যদি জ্ঞানচর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রশ্ন করার অধিকার সীমিত করে, তাহলে সেখানে প্রকৃত জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকশিত হতে পারে না।
শিক্ষার্থীকে শুধু নির্ধারিত উত্তর মুখস্থ করানো নয়, বরং তাকে উপলব্ধি করতে শেখাবে, অনুভব করতে শেখাবে, হৃদয়ঙ্গম করতে শেখাবে, প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। শিক্ষক যদি বলেন, ‘এই উত্তরটিই চূড়ান্ত’, তাহলে শিক্ষার পরিসর সংকুচিত হয়। বরং শিক্ষার্থীকে শেখাতে হবে, কেন এই উত্তর সঠিক, এর বিপরীত যুক্তি কী এবং নতুন তথ্য ও তত্ত্ব পাওয়া গেলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যায় কি না।
বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক স্বাধীনতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক ও গবেষককে তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে গবেষণা করার সুযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা অন্য কোনো অযৌক্তিক চাপ যেন গবেষণার স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে চিন্তানির্ভর শিক্ষা
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা। অনেক শিক্ষার্থী বইয়ের বিষয় বুঝে শেখার পরিবর্তে পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসতে পারে, তা কেন্দ্র করে পড়াশোনা করে। এতে জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে নম্বর অর্জন শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রদর্শনের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এমন নাগরিক দরকার, যারা সমস্যার লিগাল ও মোরাল বিশ্লেষণ করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তাই জ্ঞান ও শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে—
মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়াতে হবে;
প্রশ্নোত্তরের পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে;
বাস্তব সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কাজ করতে দিতে হবে;
বিতর্ক, আলোচনা ও উপস্থাপনার সুযোগ বাড়াতে হবে;
পরীক্ষায় শুধু তথ্য স্মরণ নয়, যুক্তি ও প্রয়োগক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
শিক্ষার সাফল্য কত পৃষ্ঠা পড়ানো হয়েছে, তা দিয়ে নয়; শিক্ষার্থী কতটা বুঝতে, অনুভব করতে, অনুধাবন করতে, উপলব্ধি করতে, বিশ্লেষণ করতে ও প্রয়োগ করতে শিখেছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।
বিজ্ঞান, আইন, মানবিকতা ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়
আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নতি ও বিকাশের জন্য আইন, সমন্বয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে একটি মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায় না। একজন প্রকৌশলী প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেন, একজন চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে পারেন, একজন অর্থনীতিবিদ অর্থনীতির বিশ্লেষণ করতে পারেন; কিন্তু তাদের প্রত্যেকের লিগাল মোরাল ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
তাই প্রকৃত ও বাস্তব জ্ঞান আহরণের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্ম, আদর্শ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিক বিদ্যা, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
দর্শন মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ইতিহাস অতীত থেকে শিক্ষা নিতে সাহায্য করে, সাহিত্য মানুষের অনুভূতি ও মানবিকতা বুঝতে শেখায়, বিজ্ঞান প্রমাণ ও যুক্তির ওপর নির্ভর করতে শেখায়। সংস্কৃতি ও কৃষ্টি মানুষকে উদার ও মহৎ হওয়ার গুণ অর্জন করতে শেখায়। এই সবকিছুর সমন্বয়েই একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক তৈরি হয়।
মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার
শিক্ষার্থীর মেধা একদিনের পরীক্ষায় সম্পূর্ণভাবে পরিমাপ করা যায় না। তাই পরম্পরাগত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন দরকার। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি প্রকল্প, ব্যবহারিক কাজ, উপস্থাপনা, সমস্যা সমাধান ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের সুযোগ থাকা উচিত।
তবে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও মানদণ্ডের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নেও জবাবদিহি থাকতে হবে— যাতে জ্ঞান ও শিক্ষা সংস্কার শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে।
জ্ঞান ও শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
জ্ঞান ও শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থের সঠিক ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, বই, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে বরাদ্দ অর্থ যেন অপচয় বা অনিয়মের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা প্রশাসনে পরিসংখ্যান ও তথ্যের স্বচ্ছতা, স্বাধীন নিরীক্ষা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশে জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা সংস্কারের একটি রাষ্ট্রদর্শন
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা সংস্কারের একটি কার্যকর দর্শন হতে পারে— ‘জ্ঞান, নৈতিকতা, দক্ষতা ও নাগরিক দায়িত্বের সমন্বিত শিক্ষা।’
এই দর্শনের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভ হতে পারে—
১. জ্ঞান— বিজ্ঞান, ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি,সাহিত্য ও প্রযুক্তির মৌলিক জ্ঞান।
২. গবেষণার স্বাধীনতা— প্রশ্ন, যুক্তি, বিতর্ক ও গবেষণার স্বাধীনতা।
৩. নৈতিকতা— সততা, মানবিকতা, উদারতা, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়িত্ব।
৪. দক্ষতা— কর্মমুখী, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।
৫. নাগরিকত্ব— সংবিধান, অধিকার, কর্তব্য, দায়িত্ব, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সম্পর্কে সচেতনতা।
এই পাঁচটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলে শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম থাকবে না; এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পুনর্গঠনের শক্তিতে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের চিন্তা ও মননের মান দিয়ে। আর নাগরিকের চিন্তার মান গড়ে ওঠে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে। তাই শিক্ষা সংস্কারকে কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন বা নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটি হতে হবে একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রদর্শনভিত্তিক সংস্কার।
রাষ্ট্রকে এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, শিক্ষক জ্ঞানচর্চায় স্বাধীন থাকবেন, গবেষক নতুন সত্য অনুসন্ধান করতে পারবেন এবং দরিদ্র ও ধনী— সব শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ থাকবে।
একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের শিক্ষা এমন নাগরিক তৈরি করবে— যারা অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে যুক্তিকে, বিভেদের পরিবর্তে সহাবস্থানকে, দুর্নীতির পরিবর্তে সুনীতি ও সততাকে এবং অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞানকে বেছে নেবে।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘শিক্ষিত মানুষ’ তৈরি করা নয়; জ্ঞানী, বিবেকবান, সহনশীল, পরমতসহিষ্ণু, উদার, স্বাধীনচেতা, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। কারণ রাষ্ট্রের আইন, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতি যতই উন্নত হোক, তার নাগরিকরা যদি জ্ঞান, নৈতিকতা ও যুক্তিবোধে দুর্বল হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আর যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে মুক্ত চিন্তা, জ্ঞান ও ন্যায়বোধের শিক্ষা দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী, মানবিক ও ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, আমরা এখনো আমাদের দেশকে রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারিনি। আমাদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে এই বোধ ও বিশ্বাস সংহত হয়নি। আমরা এখনো সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত রয়েছি। এই সংকীর্ণ স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা ও আশা নাগরিককে উন্নত নাগরিক বা বিশ্ব নাগরিককে পরিণত করতে পারবে না। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ। এই দেশের বোধ-বিশ্বাস হবে কবি ইকবালের ‘খুদি কো বুলন্ত কর’ এবং ‘ইনসানে কামিল হো যাও’!
মহাকবি ইকবালের একটি কবিতার দুটি স্তবক উদ্ধৃত করে এই আলোচনা এখানেই শেষ করছি—
চীন হামারা, হিন্দুস্তা হামারা,
মুসলিম হায় হাম, সারে জাঁহা হামারা।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক।