ভৈরব-ময়মনসিংহ রুটে সকল লোকাল ট্রেন বন্ধ, চরম ভোগান্তি যাত্রীদের
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২০
আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ : ভৈরব বাজার ময়মনসিংহ সেকশনে গরিবের বাহন বলে পরিচিত লোকাল ট্রেন একে একে সব বন্ধ হয়ে গেছে। চরম ভোগান্তিতে পড়েছে রেলওয়েতে চলাচলকারী যাত্রীগণ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের মার্চে করোনাকালে চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট সোমবার বন্ধ হয়ে যায় ময়মনসিংহ মেইল। স্থানীয়ভাবে যা নাসিরাবাদ মেইল নামেও পরিচিত। এই ট্রেনটি চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাতায়াত করত। নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা ফেনী চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য সড়কপথে কয়েক দফা বিকল্প যানবাহন বদল করে ভৈরব রেলস্টেশনে এসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের অপেক্ষায় থাকে শ্রমজীবী মানুষ।
রেল সূত্রে জানা গেছে, ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ৪টি লোকাল ও দুইটি মেইল ট্রেন চলাচল করত। ৫ থেকে-২০ টাকা ভাড়া দিয়ে এ সকল লোকাল ও মেইল ট্রেনে মানুষ পৌঁছে যেতেন দূরের হাটবাজারে, কর্মস্থলে কিংবা আপন গন্তব্যে বা বাড়িতে।
২০২০ সালের করোনাকালে এই পথের চারটি লোকাল ও একটি মেইল ট্রেন ইশা খাঁ এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে যায়। ইশা খাঁ এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা কমলাপুর থেকে ছেড়ে ভৈরব বাজার গৌরীপুর হয়ে ময়মনসিংহ যেত। বাকি ছিল শুধু চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ মেইল যার স্থানীয় নাম নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস। নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনটিও গত ২৪ আগস্ট সোমবার থেকে বাংলাদেশের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব রেলস্টেশন থেকে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। ভৈরব বাজার থেকে ময়মনসিংহ সেকশনে সর্বমোট রেলস্টেশন রয়েছে ২২টি। এই পথে ভৈরব বাজার হতে ময়মনসিংহ লোকাল ট্রেনের ভাড়া ৪০ টাকা, মেইল ট্রেনে লাগে ৫৫ টাকা। লোকাল মেইল সব ট্রেন বন্ধের পর এখন চলছে শুধু একমাত্র আন্তঃনগর বিজয় এক্সপ্রেস। এই ট্রেনটি প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত চলাচল করত। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে জামালপুর পর্যন্ত চলাচল করে। আন্তঃনগর ট্রেনে ভৈরব বাজার থেকে ময়মনসিংহ যেতে এই পথের ভাড়া ১২৭ টাকা। সেটিও আবার সব স্টেশনে থামে না। ১১৬ কিলোমিটারের ২২টি স্টেশনের মধ্যে শুধুমাত্র ভৈরব বাজার সরারচর, কিশোরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, গৌরীপুর ময়মনসিংহ থামে। নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এই সেকশনের বেশ কয়েকটি রেলস্টেশন সম্পূর্ণরূপে অকেজো হয়ে পড়েছে। কারণ সেগুলোতে কোনো প্রকার ট্রেন থামবে না। এদিকে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ হারিয়ে এই রেলপথের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষকে এখন বেশি টাকা খরচ করে গন্তব্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
রেল সূত্রে জানা গেছে লোকোমোটিভ বা রেলের ইঞ্জিনের তীব্র সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেন আপাতত বন্ধ রাখার কথা বলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আবার কবে নাগাদ ট্রেনটি চালু হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই রেলওয়ের কাছে।
জানা গেছে, যমুনা সেতুর পূর্ব তীরে টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার ইব্রাহিমাবাদ স্টেশন থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ হয়ে চট্টগ্রামে চলাচল করে ময়মনসিংহ মেইল বা নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস। ইব্রাহিমাবাদ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দূরত্ব ৬৩১ কিলোমিটার। ট্রেনটি ৫০টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর দাপ্তরিক সময় ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট। ইব্রাহিমাবাদ থেকে ট্রেনটি ছাড়ার সময় ভোররাত ৩টা। চট্টগ্রামে পৌঁছানোর সময় রাত ৮টা ২০ মিনিট। বিপরীতে চট্টগ্রাম থেকে ছাড়ে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে। ইব্রাহিমাবাদ স্টেশনে পৌঁছায় পরদিন সকাল ৯টায়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, তিনটি রেক (ইঞ্জিন-বগিসহ ট্রেনের সেট) দিয়ে নাসিরাবাদ ট্রেনের চলাচল স্বাভাবিক রাখা হতো। এক মাস ধরে দুই দিন চলার পর এক দিন বন্ধ রাখা হচ্ছিল। পরে কোনো ঘোষণা ছাড়াই ট্রেনটির চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ভৈরব-ময়মনসিংহ সেকশনে রেলপথটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রেলপথের সঙ্গে যুক্ত। এই পথ ব্যবহার করে ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটের ট্রেন চলাচল করে। একই পথ দিয়ে চট্টগ্রামের ট্রেনও যায়। ঢাকা-কিশোরগঞ্জ পথে তিনটি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। জামালপুর ও চট্টগ্রামের মধ্যে চলাচল করে বিজয় এক্সপ্রেস একমাত্র আন্তনগর ট্রেন।
২০২০ সালের ২৪ মার্চ ভৈরব-ময়মনসিংহ পথে চলাচল করা চারটি লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সালের ১২ মার্চ বন্ধ হয় ঈশা খাঁ মেইল (৩৯/৪০)। ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব হয়ে ঢাকায় চলাচল করতো এই ঈশা খাঁন ট্রেন। এই ট্রেনটি ছিল সাধারণ এবং গরিব মানুষের এবং সস্তা কম ভাড়ায় চলাচলের ট্রেন।
টাঙ্গাইলের ইব্রাহিমাবাদ থেকে ভৈরব পর্যন্ত দূরত্ব ৩৩৩ কিলোমিটার। এই পথে নাসিরাবাদ ট্রেনটি ২৭টি স্টেশনে থামে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রেনটি বন্ধ হওয়ায় এসব স্টেশনের যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। বিশেষ করে ছোট স্টেশন, যেখানে আন্তঃনগর ট্রেন থামে না।
রেলস্টেশন এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এলাকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রধান ভরসা ছিল লোকাল ও মেইল ট্রেন। এই রেলপথ ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও জামালপুরের মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এসব এলাকার বড় অংশের মানুষের জীবিকার সঙ্গে কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা জড়িত। কাপড়, জুতা, কসমেটিকস, চাটাই, ধান, দুধ, ডিম, কলা, মুরগি, ফল, শাকসবজিসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এক বাজার থেকে অন্য বাজারে নেওয়া হয়।
কম ভাড়ার লোকাল ও মেইল ট্রেন এসব পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। লোকাল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা। মেইল ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা। আন্তঃনগর ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৫ টাকা বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।
এলাকার করগাঁও ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা বজলুর রহমান, মানিক খালি এলাকার আব্দুর রহিম, যশোদল এলাকার সজীব ভূঁইয়া বলেন, ট্রেন বন্ধ হওয়ায় এসব পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয়ও বাড়ছে। এর প্রভাব পড়বে খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে। রেলস্টেশন কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র অর্থনীতিও অচল হয়ে পড়েছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক মানুষ ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি ও কর্মস্থলে যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল নাসিরাবাদ ট্রেন। ট্রেনটিতে কখনো যাত্রীর সংকট হতো না।
আবার ভৈরব বাজার কুলিয়ারচর বাজিতপুর নিকলী কঠিয়াদি নান্দাইল কেন্দুয়া করিমগঞ্জ এলাকার জনসাধারণ এই লোকাল ট্রেনগুলোর মাধ্যমে ময়মনসিংহ জেলা শহরের বিভিন্ন ক্লিনিকে এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য অল্প করেছে যাতায়াত করতে পারতেন। ট্রেনগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে এই সকল এলাকার বাসিন্দাদের ময়মনসিংহ শহরে চিকিৎসা নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
গত ২৯ আগস্ট শনিবার দুপুরে ভৈরব রেলস্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষকে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের একটি দলে ছিলেন আব্দুর রহমান, মানিক মিয়া, আলী হোসেন, মোবারক আলী ও করম আলী। তাঁদের সবার বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। তারা ফেনী জেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বাড়ি যাতায়াত করেন মাসে একবার। এক সপ্তাহ আগে তারা নাসিরাবাদ ট্রেনে বাড়ি এসেছিলেন। শনিবার ফেনী ফেরার পথে সকাল সাতটায় আঠার বাড়িয়া স্টেশনে গিয়ে জানতে পারেন ট্রেনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাধ্য হয়ে কয়েকবার যানবাহন বদল ওরে বাসে সড়কপথে ভৈরব রেলস্টেশনে আসেন। এখান থেকে কর্ণফুলী ট্রেনে ফেনী যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।
রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করোনাকালীন সময়ে বন্ধ হওয়া দেশের অনেক রুটের ট্রেন পরে চালু হয়েছে। কিন্তু ভৈরব-ময়মনসিংহ সেকশনে লোকাল ট্রেনগুলো অজ্ঞাত কারণে আর চালু হয়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, মূলত লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংকটের কারণে নাসিরাবাদ ট্রেনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এটি সাময়িক। লোকোমোটিভের সমস্যা কমে এলে ট্রেনটি আবার চালু করা হবে। মালামাল পরিবহনের সমস্যা কিছুটা কমাতে বিজয় এক্সপ্রেসের সঙ্গে আপাতত একটি লাগেজ বগি যুক্ত করা হয়েছে। কবে নাগাদ ট্রেনটি চালু হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অপেক্ষা করতে হবে।’