পায়ে হেঁটে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতেন মাস্টার মসিহ-উল আযম


৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৯

তরিকুল ইসলাম তারেক. যশোর : যশোরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক মাস্টার মো. মসিহ-উল আযম। অসংখ্য ছাত্রের প্রিয় শিক্ষক তিনি। তার ছাত্র-ছাত্রীরা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে আছেন। যারা এখনো সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে তাদের প্রিয় ‘স্যার’ মসিহ-উল আযমকে স্মরণ করেন।
প্রখ্যাত রাজনীতিক মাওলানা আব্দুর রহীমের সময় ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। বড় ছেলে রওনাকুল হক বলেন, ‘আব্বা ১৯৬৯ সালে খুলনা থেকে যশোর জেলা জামায়াতের আমীর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন’। তার সময় জেলা সেক্রেটারি ছিলেন মরহুম নুরুল ইসলাম বাদশাহ।
১৯৮৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যশোর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি, পরবর্তীতে জেলা নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ঝিকরগাছার আনোয়ার হোসেন। ৮৭ বছর বয়সের এই রাজনীতিক এখন বাড়িতেই অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘মাস্টার মসিহ-উল-আযম যখন জেলা আমীর, তখন মরহুম নুরুল ইসলাম বাদশাহ জেলা সেক্রেটারি ছিলেন। ওইসময় অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন জামায়াতের আমীর। যশোর জেলা কমিটিতে মাওলানা শুয়াইব হোসেন, এডভোকেট আনছার উদ্দিন ও মোস্তানুর রহমান বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। আর কে কে ছিলেন, তা স্মরণ নেই আমার।’
তিনি বলেন, ‘ওইসময় জেলার বিশাল এলাকার রাস্তাঘাট বর্তমান সময়ের মতো এত উন্নত ছিল না। কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির সময় কাদাপানি ও শুকনো মৌসুমে ধুলার পথ পায়ে হেঁটেই সফর করতে হতো। যানবাহন বলতে সহজলভ্য ছিল বাইসাইকেল। ক্ষেত্রবিশেষ প্যাডেল ভ্যান, রিকশা ব্যবহার করতেন। দূরের পথে যাতায়াত করতেন বাস, টেম্পুযোগে। তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম ছিল চিঠিপত্র’। ১৯৮৬ সালে যশোর জেলা জামায়াতের উদ্যোগে প্রথম একটি মোটরসাইকেল কেনা হয় বলে জানান আনোয়ার হোসেন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ছিলেন। সেই সময়কার কার্যক্রমের বিষয়ে কথা বলেন জেলা জামায়াতের আরেক সাবেক আমীর, বর্তমান কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমানও।
১৯৭০ সালের কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এডভোকেট রওশন আলীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মাস্টার মসিহ-উল আযম। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরাজিত হন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-সদরের একাংশ) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহ হাদিউজ্জামানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মসিহ-উল আযম। সেবারও তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াত সারা দেশে ১০টি আসন পায়। এলাকায় ভোটের রাজনীতিতে জড়িত থাকায় মানুষের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি ছিল মাস্টার মসিহ-উল আযমের।
৯৪ বছর বয়সের এই মানুষটি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের আজমেহেরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ১৯৩২ সালের ১৭ জানুয়ারি বাঘারপাড়া উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মৌলভী মোজাহারুল হক। শিক্ষাজীবন শুরু হয় বাঘারপাড়া উপজেলার বহরামপুর স্কুলে। সেখানে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পিতার মৃত্যুর পর মামাবাড়ি আজমেহেরপুরে চলে আসেন এবং রায়পুর স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে খাজুরা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে এই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজে এইচএসসি ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫২ সালে এইচএসসি এবং ১৯৫৪ সালে বিএ পাস করেন তিনি।
শিক্ষাজীবন শেষ করে পেশাগত জীবনে ১৯৫৪ সালেই সর্বপ্রথম বাঘারপাড়া মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। পরে ধলগ্রাম স্কুলে ৫ মাস শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সদর উপজেলার হাশিমপুর হাইস্কুলে যোগদান করেন। এরপর বাঘারপাড়া উপজেলার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রায়পুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন মাস্টার মসিহ-উল আযম। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে রূপান্তরিত হয়। প্রতিষ্ঠানের অনার বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ১৬ আগস্ট ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো যোগদান করেন। যদিও পরিবারের দাবি ১৯৫৮ সালের ১৫ আগস্ট প্রথমবার রায়পুর স্কুলে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালের ৯ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালের ১ জুলাই দ্বিতীয়বারের মতো একই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকপদে যোগদান করেন। এই পর্বে ১৯৭৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১৩ জানুয়ারি একই পদে তৃতীয়বারের মতো যোগদান করেন। ২০০০ সালের ২ এপ্রিল শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যান তিনি। তার হাত ধরেই বিদ্যালয়টি স্কুল অ্যান্ড কলেজে উন্নীত হয়। নামকরণ করা হয় ‘রায়পুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। তিনি অবসরের পূর্ব পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ে তিনি বাইসাইকেলে যাতায়াত করতেন। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি এবং সাদা রুমাল ব্যবহার করতেন। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান তারই ছাত্র। অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক গুণী এ মানুষটি বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। এখনো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়ও তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে।
কথা হয় মাস্টার মসিহ-উল আযমের সঙ্গে। বার্ধক্যজনিত কারণে কণ্ঠে জড়তা ভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো দুই-একজন রোগী প্রতিদিন হোমিও চিকিৎসাসেবা নিতে তার কাছে আসেন। তার রাজনৈতিক দল বর্তমানে দেশের প্রধান বিরোধীদল। এ বিষয়ে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি সুখানুভূতি প্রকাশ করেন। এই খবর যখন জেনেছিলেন, তখন খুশি হন। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন। যদিও দল ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখেন তিনি। দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। দলের উন্নতি হয়েছে বলে জানান সাবেক এই জেলা আমীর। গণমাধ্যম ও মানুষের মাধ্যমে দেশ এবং রাজনীতির খবর রাখেন বলে জানান তিনি।
কীভাবে ওইসময় বিশাল এলাকা সফর করেছেন, নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করেছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘পায়ে হেঁটেই বেশি যাতায়াত করেছেন। বাইসাইকেল ছিল উন্নত বাহন। এছাড়া বাসে করে দূরের পথে সফর করতেন। চিঠিপত্র ও একে অপরের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানই ছিল একমাত্র উপায়।