ইসরাইলের প্ররোচনায় ইরানে হামলা : চোরাবালিতে যুক্তরাষ্ট্র


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৬

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
আজকের ইরান ইতিহাসে ‘পারস্য’ সভ্যতা নামে পরিচিত, যার বিকাশধারা সুপ্রাচীন ও মহিমান্বিত। সহস্রাব্দ ধরে এই জনপদ তার প্রজ্ঞা আর সৃজন দিয়ে বিশ্ব-সংস্কৃতি ঋদ্ধ করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এক কঠোর শৃঙ্খলেরও নাম তবে বিদেশের কোনো আগ্রাসন মানে না। বাইরের চাপ যত বাড়ে, তাদের ভেতরের ফাটলগুলো তত বেশি সুসংহত হয়। ইরানের সুসংহত জনগণ, ধর্মীয় নেতৃত্ব, আনুগত্য, লড়াই এবং অনন্য সরকার ব্যবস্থা ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে এক অদম্য পরাশক্তিতে পরিণত করেছে। অন্যদিকে সিআইএ ও জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে ইসরাইলের প্ররোচনায় যুদ্ধে এসে চোরাবালিতে বিশ্ব-সামরিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরাইলের প্ররোচনায় যুদ্ধে ট্রাম্প : যুদ্ধের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিসে তার গোয়েন্দাপ্রধানকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন ইরানে হামলার বিষয়ে মতামত দিতে। তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের একটি চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে সেখানে আরও শক্তিশালী এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে ইচ্ছুক একটি নতুন শাসনব্যবস্থা ক্ষমতায় আসতে পারে। জবাবে তেহরান দ্রুত হরমুজ প্রণালীর চলাচল বন্ধ করে দেবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও তাদের অংশীদারদের ওপর ইরান হামলা চালাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বস্ততা নিয়ে মিত্রদের মনে প্রশ্ন তুলবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছিলেন— এই যুদ্ধ প্রাণহানি ঘটাবে, অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ এবং ইতোমধ্যে চাপে থাকা মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতায় ঘাটতি সৃষ্টি করবে। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে এখন সবচেয়ে দুর্বল। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার এবং একজন ‘শান্তিদূত’ হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি সুসংহত করার বিরল সুযোগ। সব উপেক্ষা করে ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পরামর্শেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরানে হামলার নির্দেশ দেন এবং ইরানের জনগণকে তাদের সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। ট্রাম্প যুদ্ধটি ছয় সপ্তাহে শেষ করতে চেয়েছিলেন, তবে ছয় মাসেও শেষ হয়নি। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষতির পাশাপাশি সেনারাও ইতোমধ্যেই মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে ভুগছে।
মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে মার্কিন সেনা : যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৬৬ দিন অভিযানে থাকার পর দেশের পথে রওনা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২০০ দিন এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও বিষয়টি জানিয়েছেন। জাহাজটির নাবিকদের মধ্যে মনোবল কমে যাওয়া ও প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যার খবর প্রকাশিত হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও জাহাজটিতে কর্মরত নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্য পাঠানো হয়। সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে রণতরীটি থেকে মানসিক অসুস্থতার কারণে আত্মহত্যা করতে এক নাবিক পানিতে ঝাঁপিয়েও পড়েন। নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও রণতরীটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বর্তমানে নাবিক ও ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তারা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। এক নাবিকের আকুতি, ‘এ মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু পরিবারে ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’ তবে থাইল্যান্ডের পাতায়া সমুদ্রসৈকতে নাবিকদের মনোরঞ্জের জন্য ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এঙ্কর করেছে এমন নিন্দনীয় খবর প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজয়ের পরও স্থানটিতে নোঙর করেছিল বলে জানা গেছে। এর মধ্যে ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে মানচিত্র প্রকাশ করেছেন। এটিকেও অনেকে ট্রাম্পের মানসিক সমস্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালী ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এলাকা’ মানচিত্র প্রকাশ : সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি মানচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো একই মানচিত্র পোস্ট করলেন ট্রাম্প। গত শুক্রবার নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর ‘খুব শিগগির’ তিনি হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করবেন। ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী মূলত এখন যুক্তরাষ্ট্রেরই এলাকা। আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমাদের অনুমতি ছাড়া এখন সেখানে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারে না।’ তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে কতটা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত, কিংবা এটি তার প্রশাসনের নতুন কোনো পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের বিভিন্ন উদ্ভট কর্মকাণ্ডের ফলে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিরও অবসান হয়েছে।
সমঝোতা চুক্তির ‘অবসান’ : সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি বন্দর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। আর ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ সম্পন্ন হওয়ার পর ইরানের কাছাকাছি অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি প্যাকেজ নিয়ে কাজ শুরু করার শর্ত ছিল। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ও দেশটির আয়োজনে গত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঐ সমঝোতা স্মারক সই করেন। এই সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির লক্ষ্য ছিল তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। সে সময়ে চুক্তিতে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেবে’। এতে আরও বলা হয়, একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করবে। ওই সমঝোতা স্মারকে আরও বলা হয়, একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’ হলে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পাবে। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে। তবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ট্রাম্প ইরানের আঞ্চলিক হামলাগুলোকে চুক্তির ‘নির্বোধ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ গুরুতর লঙ্ঘন। পাল্টাপাল্টি হামলা এবং পরস্পরকে দোষারোপ করার মধ্যে গত ৭ জুলাই ট্রাম্প চুক্তির ‘অবসান’ ঘোষণা করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, ‘ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধের অবসানের কথা বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির নয়।’ আরাঘচি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন থেকে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন থেকে ৬০ দিনের কোনো যুদ্ধবিরতিই আর নেই। তাই মেয়াদ বৃদ্ধি করারও কিছু নেই। এখন ইরানের সব পথ খোলা। এ বিষয়ে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেছেন, ‘সমঝোতার অবসান, নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা।’ অন্যদিকে মুজতবা খামিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়ার আহ্বান করছেন।
আঞ্চলিক ঐক্যের আহ্বান মুজতবা খামিনির : ইরান যুদ্ধের ছয় মাস অতিবাহিত। এমন সময় এক বার্তায় আঞ্চলিক দেশগুলোকে ‘প্রকৃত শত্রু চিনে’ তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান খামিনি। একই সঙ্গে ইরানিদেরও নিজেদের মতপার্থক্য ভুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মুজতবা খামিনি। তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামী দেশগুলোর সমস্যার সমাধান হলো ঐক্য, বন্ধুত্ব এবং কল্যাণের পথে সহযোগিতা।’ ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলাতে পারবে না, তাই তারা আঞ্চলিক ঐক্যের কথা ভাবছে। ইতোমধ্যে মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। ইরান এখন পর্যন্ত জোটটির সদস্য নয়, তবে সে আমন্ত্রিত। অপেক্ষা করতে হবে জোটটি মুজতবা খামিনি যে উদ্দেশ্যে ঐক্যের আহ্বান করেছিলেন সেই একই উদ্দেশ্যে গঠিত কিনা, তা দেখার জন্য। এদিকে যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়ছে বিভিন্ন সময়ে এমন খবর এলেও ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। তাই ইরান যুদ্ধে কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে গত সপ্তাহে ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে একটি ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেন। তিনি এর নাম দেন ‘ইকোনমিক ডি-ডে’।
‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ : মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছেন। ইতোমধ্যে মিশরের ব্যাংক মিশরকেও ইরানের সঙ্গে ব্যবসার কারণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের ব্যাংক মেল্লির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইল এখনো পুরো অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এইচ এ হেলিয়ার। তিনি বলেছেন, ‘আগামী ছয় মাসে তেহরানের সরকার পড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’ তার মতে, অর্থনৈতিক চাপ একইভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছর পর ইরানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এদিকে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার কারণে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীও জুলাইয়ে আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গালফ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান অর্থনীতিবিদ জন স্ফাকিয়ানাকিস বলেছেন, তেলের দাম বাড়লেও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য তা পুরোপুরি স্বস্তির নয়। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী দেশটির আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ইরান ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে দেখছে। তার কথায়, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়; শত্রুদের আক্রমণের জন্যও প্রস্তুত।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়নি এবং অন্যান্য দেশও ওয়াশিংটনের চাপ প্রতিরোধ করবে বলে তেহরানের আশা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের চীন ও এশিয়া প্যাসিফিক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জি বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক মিত্রদের নিশানা করে ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে ‘ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা ও বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসবে না’। চীন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীনও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা তারা সমর্থন করে না। এদিকে নিষেধাজ্ঞার দিনেই হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত হামলার শিকার হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। ওমানের আশ শিশাহ এলাকার কাছে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশল বদলে এখন অর্থনীতিকে হাতিয়ার করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কূটনৈতিক টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে এক কঠোর ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে তেহরানকে কোণঠাসা করা। এই কৌশলের সবচেয়ে প্রধান ও মূল হাতিয়ার হলো নৌ-অবরোধ। মার্কিন নৌবাহিনী কেবল হরমুজ প্রণালীতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ভারত মহাসাগরেও অবস্থান নিয়ে ইরানের জ্বালানি তেলের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজের বহর জব্দ করছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মতে, অবকাঠামোয় হামলা চালালে সাধারণ ইরানিরা বর্তমান সরকারের পক্ষে জাতীয়তাবাদী শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে সাধারণ জনগণের তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে তেহরানের সরকার হুমকির মুখে পড়বে। তবে ইরানও বসে নেই। তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক আলী আকবর দারে ইনি বলেছেন, এ পর্যন্ত যে যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিততে ব্যর্থ হয়েছেন, তা শেষ করতে তিনি ‘অ্যানাকোন্ডা কৌশল’ ব্যবহার করছেন। দারে ইনি আল-জাজিরাকে বলেন, সামরিক হামলা চালানোর আগে শত্রুকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দমবন্ধ করে দেওয়াই এই কৌশলের লক্ষ্য। অ্যানাকোন্ডা যেভাবে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে তার শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও এই কৌশল অনুসরণ করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অর্থনৈতিক চাপকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ঐতিহাসিক জয়যাত্রার শুরুর দিন ডি-ডের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। উল্লেখ্য, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চলছে ১৯৭৯ সাল থেকে। যদিও গত এক থেকে দুই মাসে ইরান প্রায় (৭৫০ কোটি ডলার) ৭০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার বাইরেও ইরানের তেল বিক্রির নিজস্ব পথ রয়েছে। এদিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পেন্টাগনের উচ্চ নির্ভুলতার অস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে কেউ কেউ মনে করেন যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়ায় যুদ্ধের চোরাবালি থেকে বের হতে ট্রাম্পের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ইরানে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা : এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মেনে না নিলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস হবে’। সম্প্রতি পডকাস্টার টাকার কার্লসনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সন্ত্রাসবিরোধী সাবেক উপদেষ্টা জো কেন্ট বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কাকে বাস্তব হিসেবেই দেখা উচিত। তার ভাষায়, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনটা ঘটতে পারে— এ কথা ভাবাই অসম্ভব মনে করা বোকামি হবে।’ তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এখন এ সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। কেন্ট বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ট্রাম্প তার লক্ষ্য বারবার পরিবর্তন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রায় সবকিছুই ব্যবহার করা হয়েছে।
অতি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। সমঝোতার অবসান ঘোষণার পর ইরানে এটি প্রথম মার্কিন হামলা। প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসির মুখপাত্র সেরদার মোহেবি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘কৌশলগত ও মারাত্মক’ ভুল করছে। এজন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। এদিকে লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে জর্ডানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান লক্ষ করে হামলা চালিয়েছে ইরান। এই অভিযানে জর্ডানের কিং হোসেন ও আল-আজরাক ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে। এ অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থ উপেক্ষা করে ইসরাইলের প্ররোচনায় ‘আগ্রাসনের শাস্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে আইআরজিসি। আইআরজিসি আরো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এমন চোরাবালিতে পা দিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়া যায় না।
সূত্র : রয়টার্স, তাসনিম, সিবিএস, তাস।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com