ছাত্রদলের কমিটি

কাউন্সিল না অনুমোদন


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৩

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব, ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। ছাত্ররাজনীতি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। আদর্শিক রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে এসব নেতৃত্ব উঠে আসে। ইতিবাচক জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রও এ ছাত্ররাজনীতি। বাংলাদেশ ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বৃহৎ একটি সংগঠন। একইসঙ্গে সংগঠনটি এখন সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ছাত্র সংগঠন।
ছাত্রদলের বিদ্যমান কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারি পদ থেকে বিদায় নেয়ার আভাস দিয়েছেন। যার মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে আসে। কমিটি দেয়ার প্রক্রিয়া ও বিএনপিপ্রধানের ইচ্ছাসহ যেসব বিষয় এর সাথে জড়িত, তা নিয়েও বিরোধীশিবিরে কিংবা সমালোচক মহলে আছে নানা প্রশ্ন। কয়েকটি প্রশ্ন বেশ চাউর, তা হলো- সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে দলের বিদ্যমান নেতাদের ক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক দলের প্রধানের ওপর কেন নির্ভর করতে হয়; কাউন্সিল না করে কেন নেতৃত্ব বাছাই ও অনুমোদন করা হয়; ছাত্র সংগঠন হলেও কেন অনিয়মিত কিংবা অছাত্র দ্বারা নেতৃত্ব দেয়া হয়; নেতৃত্ব নির্বাচনে তৃণমূলের ভূমিকা মুখ্য না হয়ে গৌণ করা।
কাউন্সিল না অনুমোদন
১৯৯২ সালের পর দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর ১ মাস বিরতির পর সরাসরি কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আর কোনো প্রত্যক্ষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ফ্যাসিবাদী আমলে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এরপর প্রায় ৮ বছর কেটে গেলেও হয়নি কাউন্সিল। সংগঠনটি চলছে আংশিক কমিটি কিংবা বিএনপি প্রধানের নেতৃত্ব অনুমোদনের মাধ্যমে।
এবার নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। কারণ চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্রসংগঠনগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা, পেশিশক্তির রাজনীতির পরিবর্তে গঠনমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণসহ নানা পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এছাড়া দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, যেখানে নিয়মিত ছাত্র কিংবা ক্লিন ইমেজ গুরুত্বপূর্ণ। এমনি সন্ধিক্ষণে সংগঠনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আভাস দিয়ে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব গত ১৪ আগস্ট নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, ‘আমি বিশেষভাবে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ থেকে বলছি, সবগুলো ক্যাম্পাসে আমি ব্যক্তিগতভাবে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি বিকাশে চেষ্টা করেছি। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দ্বারা ক্যাম্পাসগুলো একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও যেন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন, সেজন্য বিশেষ মনোযোগী ছিলাম।’
ঠিক একই দিন ছাত্রদলের সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন নাসির একইভাবে দীর্ঘ পোস্টের একটি অংশে লেখেন ‘তবে আমাদের কিছু অপূর্ণতাও আছে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিতাংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ আমার থাকবে। এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। যারা আগামী দিনের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন, তাদের জন্য শুভকামনা।’
ছাত্রদলের শীর্ষ এ দুই নেতা এখনো দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন কমিটির অনুমোদন ও নেতাকর্মীদের অপরাধের বিষয়ে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করছেন।
ছাত্রদলের কমিটিতে অছাত্র ও ছাত্রলীগ
ছাত্রদলের কমিটিতে অছাত্র ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের অভিযোগ যেমন বিরোধীশিবির থেকে আছে, তার বাস্তবতাও মিলেছে কোথাও কোথাও। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়া এ কে এম আবদুল্লাহ আল মাসুদকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বর্তমান ছাত্রত্ব নেই। এছাড়া তিনি বিবাহিত, শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকা এবং অতীতে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ছবি ও একটি খসড়া কমিটিতে তার নাম রয়েছে। গত ২২ আগস্ট শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (জাবিপ্রবি) ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাকিল আহমেদকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। দীর্ঘ আট বছর পর গত ১৩ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের আংশিক নতুন কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। কিন্তু এই আংশিক কমিটির শীর্ষ দুই পদে সরকারি চাকরিজীবীর ঠাই হয়। কমিটির আহ্বায়ক ডা. আব্দুল্লাহ আর রায়হান ও সদস্য সচিব ডা. মেশকাত শরীফ ভূঁইয়া দুজনই সরকারি চাকরিজীবী। আহ্বায়ক ডা. আব্দুল্লাহ আর রায়হান ঢামেকের কে-৭২ ব্যাচ এবং অপর দুজন কে-৭৩ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী, যারা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের আগেই চিকিৎসাবিদ্যায় তাদের পাঠ শেষ করেছেন। গত ১৮ আগস্ট নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) হলের সিট পরিবর্তন নিয়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মালেক উকিল হল ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।