সংকট কেন, কাটবে কবে?
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২২
স্টাফ রিপোর্টার : দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোর বাসিন্দারাও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তিতে পড়ছেন। দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কোথাও অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, কোথাও জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি না থাকায় সেটি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতের তথ্যানুযায়ী, দেশের বর্তমান সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে খাতা-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। এত বড় উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়; প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটই বড় কারণ : দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিদ্যুৎ খাতের তথ্য বলছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনও চাহিদার তুলনায় কম। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। জ্বালানি সংকটের কারণে বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যুৎ নেই কেন?
বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট হলেও সব কেন্দ্র একসঙ্গে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। কোনো কেন্দ্র জ্বালানি সংকটে বন্ধ থাকে, কোনোটি কারিগরি ত্রুটিতে, আবার কোনোটি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে উৎপাদনের বাইরে থাকে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলে কাগজে-কলমে থাকা উৎপাদন সক্ষমতা আর বাস্তবে পাওয়া বিদ্যুতের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় গত ২৬ আগস্টের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্র অনুযায়ী, ওইদিন বিকেল ৩টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট। উৎপাদন হয়েছিল ১৩ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট। এর কয়েকদিন আগে পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। গত ২২ আগস্টের তথ্যানুযায়ী, সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াটে উঠেছিল। তার আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিমাণ কয়েক হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোর কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একসঙ্গে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি গ্রাম ও শিল্পাঞ্চলে
দীর্ঘসময়ের লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে দেশের গ্রামাঞ্চল ও শিল্প এলাকায়। লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায় দুই থেকে তিন মাস ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির হিসাবে চাহিদার তুলনায় সেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পাবনার বেড়ায় দিনের বেলায় ঘাটতি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং রাতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত থাকছে। লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। নরসিংদীর মাধবদীতে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস ঘেরাও করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন। দুই ঘণ্টার কর্মসূচিতে মহাসড়কের উভয় পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কাপড় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং তাদের আয়েও প্রভাব পড়ছে।
হাসপাতালেও ভয়াবহ প্রভাব
লোডশেডিংয়ের প্রভাব এখন হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতেও পৌঁছে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় নেবুলাইজার, এক্সরে, ইসিজি ও প্যাথলজি পরীক্ষা বন্ধ থাকছে। কোথাও অস্ত্রোপচারের মাঝখানেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মুঠোফোনের আলো এবং দ্রুত জ্বালানি কিনে জেনারেটর চালিয়ে অস্ত্রোপচার শেষ করার ঘটনা ঘটেছে। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে প্রতিদিনের অস্ত্রোপচারের সংখ্যাও কমেছে। হাসপাতালটির অস্ত্রোপচার কক্ষের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেনারেটর চালালে এসি চালানো যায় না। ফলে অস্ত্রোপচারের পরিবেশেও সমস্যা তৈরি হয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অনেক হাসপাতালে আবার জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি নেই। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র জেনারেটর জ্বালানির অভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। সেটি চালাতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল প্রয়োজন হলেও তেল কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ নেই। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরেও ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনের সময় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না।
রোগীদের বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগ
লোডশেডিংয়ের কারণে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষাসেবা ব্যাহত হওয়ায় রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। টাঙ্গাইলের সখীপুরে বিদ্যুৎ ও কম ভোল্টেজের কারণে এক্সরে মেশিন অচল থাকায় একজন রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ৫০০ টাকা খরচ করে এক্সরে করাতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষা করতে খরচ হতো ৫৫ টাকা। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরেও বিদ্যুৎ ও লো-ভোল্টেজের কারণে এক্সরে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
ঢাকায়ও কেন লোডশেডিং?
দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে সরকার এখন ঢাকার বিদ্যুৎ সরবরাহও সমন্বয় করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর আওতাধীন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী লোডশেডিং সমন্বয় করে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ গ্রামাঞ্চল ও শিল্প এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো কোনো একটি অঞ্চলকে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎবঞ্চিত না রেখে ঘাটতির চাপ তুলনামূলকভাবে সুষমভাবে ভাগ করে দেওয়া। এ কারণে আগে যেখানে ঢাকার বাইরে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি ছিল, এখন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ছে। গত ১২ আগস্ট রাত থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়।
সংকট কাটবে কবে?
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চলমান সংকটের বড় অংশই সাময়িক। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বলেন, খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাসিফিকেশন ইউনিটের সমস্যা ও সরবরাহের ঘাটতি দূর হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বাপেক্স ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের কাজ করছে। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে আনার জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন একটি এফএসআরইউ আনার উদ্যোগ এবং এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সরকার। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সেপ্টেম্বরে শুরুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দিকে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হবে।
তবে সংকট পুরোপুরি কাটার সময় নির্ভর করছে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর। এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়াও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে লোডশেডিং কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থায়ী সমাধান খুবই সহজ কোনো কাজ নয়।