সম্পাদকীয়

খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিন


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৫

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। জাতীয় অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃষি। অপ্রিয় হলেও, সত্য বিএনপি সরকার গঠনের পরই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক বর্তমান পরিস্থিতির ওপর দায় চাপিয়ে ছাই দিয়ে মাছের দুর্গন্ধ ঢাকার সুযোগ নেই। কারণ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর ‘অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই’— মন্তব্য জাতিকে হতাশ করেছে। ফ্যাসিস্ট পতিত হাসিনার কণ্ঠস্বর, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিব’ এর প্রতিধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে নবরূপে, যা গণতান্ত্রিক সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখে বেমানান। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ‘আমি পারছি না, অতএব পদত্যাগ করলাম।’ অযোগ্যতা, অদক্ষতা নিয়ে দেশ ও জনগণের দুর্ভোগ বাড়াতে পদ ধরে রাখার কোনো মানে হয় না। অবশ্য এদেশে এমন দৃষ্টান্ত নেই। জনগণ পদত্যাগের দাবি করলে তাদের বুকে গুলি চালিয়ে হলেও চেয়ার রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়। এখন যিনি দায়িত্বে আছেন, ব্যর্থতার দায়ে তাকে বেগম খালেদা জিয়া দায়িত্ব থেকে বাদ দিয়েছিলেন। তারপরও কেন বর্তমান সরকার তার ওপরই ভরসা রাখছে? এমন প্রশ্নের উত্তর নেই। কিন্তু উত্তর জেনে সমাধান না করলে দেশ পড়বে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে। ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটের সাথে যোগ হয়েছে সার সংকট।
সার সংকট দেশের সামগ্রিক কৃষি খাতকে এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বোরো ও আমন মৌসুমে সেচ ব্যবস্থার অনিয়ম এবং সঠিক সময়ে সুষম সার না পাওয়ায় মাঠে মাঠে হাহাকার করছেন কৃষকরা। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়। আমরা মনে করি, বর্তমান সংকট হুট করে তৈরি হয়নি। বরং এটি সরকারের অনুসৃত ভুল নীতি, আগাম পরিকল্পনার অভাব এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনারই পরিণতি। সরকার প্রতি বছর কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বললেও সংকটকালে কৃষককে সহায়তায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সঠিক সমন্বয়ের অভাবে সেচ মৌসুমে গ্রামীণ বিদ্যুৎ সঞ্চালনে তীব্র বিপর্যয় ঘটছে। শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলের কৃষি পাম্পগুলোয় দিনের পর দিন লোডশেডিং চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ডিজেল ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যা অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তদারকির চরম অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার ডিলার ও অসাধু সিন্ডিকেটের হাতে আটকে থাকছে। বাজারে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুর্বল নজরদারির কারণেই এ অসাধু চক্র সুযোগ পাচ্ছে। কৃষি খাত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং খাদ্য সংকট এড়াতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেচ মৌসুমে গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে শহরের আলোকসজ্জা ও অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে কৃষি খাতে বিদ্যুৎ ডাইভার্ট করতে হবে। সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলের ওপর কৃষকদের বিশেষ ভোজ্য-ভর্তুকি দিতে হবে— যেন উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ডিলার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সরাসরি কৃষকদের হাতে সার পৌঁছাতে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। আগামী মৌসুমের চাহিদা বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার আমদানি নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের সার কারখানাগুলোয় পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করে উৎপাদন সচল রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকের ক্ষোভ ও দুর্ভোগকে উপেক্ষা করে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারই টেকসই হতে পারে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো এখন সময়ের দাবি। সরকার যদি অবিলম্বে সমন্বিত কৌশল ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে আগামীতে দেশে খাদ্য সংকট আরো তীব্রতর হবে। যার দায়ভার সরকারকেই বহন করতে হবে। তাই সরকারের উচিত হামবড়া ভাব ছেড়ে বিরোধীদলকে সাথে নিয়ে সংকট সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করা।