ঈমানদারদের নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০৯
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মুসলিম জাতি হিসেবে আমাদের কাজ-কর্মে কোথাও নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ আমাদের বলেছেন, ‘তোমরা আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ তাই তো দুনিয়ার ইতিহাসে যুগে যুগে নবী-রাসূল এসেছেন মহান আল্লাহর তরফ থেকে ওই যুগের লোকদের হেদায়েত দেয়ার জন্য। সময়োপযোগী কথা সহজ-সরল ভাষায় নবী-রাসূলরা বললেও কেউ সঠিক পথে এসেছে আবার অনেকে গোমরাহির দিকেই রয়ে গেছে। যারা সঠিক পথে এসেছে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামত পেয়েছে এবং পাবে। আর যারা আল্লাহর নিয়ম-নীতি মেনে চলতে অস্বীকার করেছে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ও পড়বে।
যেমন মূসা আ.-এর সাথে ব্যর্থ হয়ে ফেরাউন পানিতে ডুবে মরেছে। যার লাশ এখনো মমি করে মিশরের যাদুঘরে রেখে দেয়া হয়েছে। আখিরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। নূহ আ.-এর অবাধ্য এক ছেলে এবং জাতিরা জালেমরা পানিতে ডুবে মরেছে। বাদশা আবরাহা মক্কায় কাবাঘর ভাঙতে এসে নিজেই কাবার অদূরে ছোট ছোট পাখি আবাবিলের পায়ের ও মুখের ছোট ছোট পাথরের আঘাতে কাবু হয়ে বাতাসের সাথে মিশে গেছে। আল্লাহর ঘর কাবা এখনো অক্ষত আছে। এখনো গোটা দুনিয়ার লাখ লাখ লোক হজ ছাড়াও তাওয়াফ করতে যায়। খাওয়া-থাকার কোনো অসুবিধা হয় না। কালো-ধলো, ছোট-বড়, ধনী-গরিব এক কাতারে কাবাঘর তাওয়াফ করছে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী। এটাই মহান আল্লাহর কুদরতি আচরণ এবং ঈমানদারের নিরাশ না হওয়ার বাণীর ফজিলত।
বেশি দূরে নয়, বৃহৎ শক্তিধর আমেরিকার অহংকার চুরমার করে দিল ইরানের বাহিনী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহদের প্রভুখ্যাত আমেরিকার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা চুক্তিতে’ সই করে মুসলমানদের মনে আশার আলো দেখাচ্ছে। আশা করা যায়, মিশর, কাতার, ইরানও এই চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডে আর আমেরিকার জঙ্গল থাকবে না। মজলুমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান ও নিরাশ না হয়ে তাদের সম্পদ গোটা মুসলিম জাতির জন্য ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে আল্লাহ মুসলমানদের দুনিয়া শাসনের মসনদে বসাবেন, ইনশাআল্লাহ।
ইতোমধ্যেই আমেরিকা, ইসরাইল, ভারতের আধিপত্য নিম্নগামী। স্বৈরাচার হাসিনাকে গোলাম বানিয়ে বাংলাদেশকে শাসনের পরিণতি ইতোমধ্যেই ভোগ করছে ভারত। স্বৈরাচার হাসিনাসহ তার লুটেরাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারত নাস্তানাবুদ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ আর ভারতে চিকিৎসার জন্য যায় না বললেই চলে। আবার ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বানেও কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সাড়া দিয়েছে। তাই হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া ভারতের কাল হবে নিঃসন্দেহে।
তাছাড়া ঈমানদারদের নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ যেভাবে ৩৬ জুলাই ঘটিয়েছিলেন যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। কোনো চিন্তা নেই, আসুন আমরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে কাজ করার মানুষদের নিয়ে যদি এগোতে পারি, আল্লাহর সাহায্য আসবেই, ইনশাআল্লাহ। জামায়াতে ইসলামী জোট যেভাবে দেশ চালানোর ক্ষেত্রে সরকারি দলকে সহযোগিতা করছে, তা ৫৫ বছরের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আমরা দেশের ভালো চাই, জনগণের ভালো চাই। আল্লাহর সাহায্যেই সামনে এগোতে চাই।
সরকারি দল ইতোমধ্যেই মারাত্মক ভুল করে বসেছে। ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। জনগণ এ প্রতারণা সহ্য করবে না। ইতোমধ্যেই জামায়াত জোটের সংসদ সদস্য ও সাধারণ মানুষ রাজপথে কথা বলা শুরু করেছে, সরকার কার কথায় চলছে। ছয় মাসেই স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গায় দলীয় ঘরানার মহোৎসব চলছে। ভালো লোকের সন্ধান তারা করতে পারছে না। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিভিন্ন পদে বসানোর কারণে মানুষ যে আশা-আকাঙ্ক্ষা করেছিল, তা যেন পথে বসতে শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। অতিসত্বর এগুলোর সমাধানও সরকারের কাছে নেই। কারণ তারা আগের স্বৈরাচারের পথেই চলছে। দেশে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস ও তেলের সন্ধান পেলেও চুরির কারণে এই গ্যাস, তেল না উঠিয়ে এলপিজি গ্যাস আমদানির প্রতি অতি উৎসাহী আগের সরকারের মতোই। কারণ এখানে নগদ টাকা লুট করার সুযোগ বেশি। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। আমাদের সম্পদ কাজে না লাগিয়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানি দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। আমার জানা মতে, পাকিস্তান আমলে পাবনার মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও এখনো তা উত্তোলনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জানি না, কোন অজানা কারণে। এখনো আমাদের ভূখণ্ডে এবং জলসীমায় প্রচুর গ্যাস ও তেলের মজুদ রয়েছে, যা অতিসত্বর কূপ খননের ব্যবস্থা করে জ্বালানির স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। আমার প্রস্তাব হলো— প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় সরকারি ও বিরোধীদলের নির্বাচিত ও অনিবার্চিত সদস্য নিয়ে স্থানীয় ইউএনও ও ওসিকে সাথে নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি করে চাঁদাবাজদের লিস্ট করে তাদের আটকানোর ব্যবস্থা করা। প্রতিটি এলাকার সাধারণ মানুষ জানে, ওই এলাকায় কারা চাঁদাবাজি করছে। সরকারি দল ও বিরোধীদলে ঐকমত্য হলে খুব কম সময়ে চাঁদাবাজদের থেকে দেশ উদ্ধার করা যাবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলে মানুষের নিত্যপণ্যের দাম অনেক কমে আসবে। আর কৃষকরাও ন্যয্যমূল্য পেয়ে উৎপাদনে মনোযোগ দেবে। আমাদের দেশে কৃষি বিভাগও কিন্তু খুবই যোগ্য ও তৎপর। তাদের কাজে লাগাতে পারলে সীমিত ভূখণ্ড থেকেই আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদন করে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব। বাজারে সৌদি আরবের খেজুরের সাথে সাথে আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে খেজুর উৎপাদন হচ্ছে, যা আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমি আবার বলতে চাই, আল্লাহর ওপর ভরসা করে পথ চলতে থাকলে মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ দেখাবেনই, কোনো সন্দেহ নেই।
স্বৈরাচার হাসিনা ও লুটেরারা যেভাবে জেঁকে বসেছিল, মনে হচ্ছিল এদের পতন সম্ভব নয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার রক্ত ও পঙ্গুত্বের মাধ্যমে এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে চিরতরে বিদায় করে দিয়েছেন জুলাই যোদ্ধারা। মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিলেও দাদার দেশ থেকে আর আমাদের এই পবিত্র জন্মভূমিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। যারা পালায়, তারা আর ফিরতে পারে না। এটা ঐতিহাসিক সত্য।
দেশদরদিদের অনেক কাজ। সরকারি দল হোক আর বিরোধীদল হোক। বুদ্ধিজীবী হোক আর চিন্তাবিদ হোক। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জন্য, দশের জন্য কাজ করতে হবে। ফল মহান আল্লাহ তায়ালা দেবেন। তার ভাণ্ডারে কোনো ঘাটতি নেই। শুধুই আমাদের প্রচেষ্টা।
দেশ-বিদেশের অনেক লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, কথা হয়েছে। দীন ও দুনিয়ার ভালোর জন্য আমরা পরামর্শ করেছি। আমি বলব, আমার মতো একজন ক্ষুদ্র লোকের আকাঙ্ক্ষা তো দেখছি মহান আল্লাহও কবুল করেছেন। ১৯৯০ সালে প্রথম হজ পালনে মক্কায় গিয়ে পেলাম শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে। অবশ্যই আমি মনে করি, এটা দুনিয়ায় বড় পাওনা। আরাফাতের ময়দানে আমরা তখন ছোট জিয়া ট্রি নিমগাছের নিচে স্ত্রীসহ শহীদ নিজামী ভাইয়ের সাথে দোয়ায় শরিক হয়েছিলাম। আমি মনে করি, মানুষ যা চায়, তা আল্লাহ দিয়ে দেন, যদি বৈধ চাওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, টাকার লোভ, নারীর লোভ ও পদের লোভ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। দেয়ার মালিক তো মহান আল্লাহ। এই ৭৪ বছর বয়সে দুনিয়ার পাওয়া শেষ, এখন চাওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস। মহান আল্লাহ আমাদের কবুল করুন, আমিন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com