শহীদ মীর কাসেম আলী : এক স্বপ্নদ্রষ্টা নির্মাতার মহাকাব্যিক জীবনগাঁথা
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪০
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু মানুষ কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিনিধি হয়ে থাকেন না; তারা সময়কে অতিক্রম করে পরিণত হন একটি স্বপ্নের প্রতীকে, একটি আদর্শের আলোকবর্তিকায়। তাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য, ব্যর্থতা কিংবা উত্থান-পতনের কাহিনী নয়; তাদের জীবন হয়ে ওঠে একটি জাতির সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ উপাখ্যান। শহীদ মীর কাসেম আলী ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।
তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল না কেবল কল্পনার আকাশে ভেসে থাকা কোনো অলীক আকাঙ্ক্ষা। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন জ্ঞান, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক শক্তি, নৈতিকতা এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। তাই তার জীবন ছিল স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে অবিরাম শ্রম দেওয়ার এক বিরল সমন্বয়।
শিক্ষা, সংগঠন, অর্থনীতি, শিল্পোদ্যোগ, ব্যাংকিং, গণমাধ্যম, চিকিৎসাসেবা, পর্যটন ও সমাজকল্যাণ— জীবনের বহুমাত্রিক অঙ্গনে তার কর্মপ্রয়াসের ছাপ ছড়িয়ে আছে। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠান গড়েননি; প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে মানুষ গড়ার চেষ্টা করেছেন। শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি; অর্থনীতিকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের শক্তিতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছেন। তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল, বিরাট কর্মপরিধির মধ্যেও তার অন্তরে ছিল সরলতার এক নির্মল আলো। সাফল্য তাকে অহংকারী করেনি, দায়িত্ব তাকে কঠোর করে তোলেনি। বিনয়, সদালাপ, মানুষের প্রতি মমতা এবং সত্যের প্রতি অবিচল আস্থা ছিল তার চরিত্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
কুরআনের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই মানুষটির কাছে জীবন ছিল নিছক ব্যক্তিগত অর্জনের নাম নয়। জীবন ছিল একটি আমানত, যার প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন দিতে হবে মহান স্রষ্টার কাছে। সেই উপলব্ধিই তার কর্মজীবনকে দিয়েছিল এক বিশেষ মাত্রা। আর জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে যখন তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, তখন তার চরিত্রের সেই অন্তর্গত শক্তিই যেন সর্বশেষবারের মতো প্রকাশিত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও বিতর্কিত বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটি ছিল গভীর বেদনার এক অধ্যায়। কিন্তু মৃত্যুর প্রহর যত ঘনিয়ে এসেছে, তার বিশ্বাস ততই যেন হয়েছে স্থির ও দীপ্ত।
তার জীবন ও মৃত্যু তাই একই সূত্রে গাঁথা। স্বপ্ন, সাধনা, সৃষ্টি, সংগ্রাম এবং আত্মোৎসর্গের এক দীর্ঘ কাব্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা পরাক্রমশালী ও প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।’ (সূরা আল-বুরুজ : ৮)।
শিক্ষাজীবন : জ্ঞানের অভিযাত্রা
মীর কাসেম আলীর জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ওপর। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় তিনি পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ এবং বৃহত্তর শিক্ষাজগৎ তার চিন্তার পরিধিকে ক্রমেই প্রসারিত করে। ১৯৬৭ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দুই বছর পর ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তবে তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কেবল ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়। এটি ছিল নিজেকে আবিষ্কার করার, সমাজকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ জীবনের দিকনির্দেশ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং সময়ের পরিবর্তনশীল চেহারা তাকে ভাবতে শেখায়। এ সময়েই তার মধ্যে ধীরে ধীরে বিকশিত হয় নেতৃত্বের গুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্যের জন্য নিজেকে নিবেদিত করার মানসিকতা। পরবর্তী জীবনে তার যে বিস্তৃত কর্মপরিধি আমরা দেখতে পাই, তার অনেক বীজ নিহিত ছিল এই ছাত্রজীবনের মধ্যেই।
ইসলামী ছাত্র-আন্দোলনে আলোকিত অভিযাত্রা
মানুষের জীবনে কিছু সাক্ষাৎ থাকে, যা ক্ষণস্থায়ী হলেও তার অভিঘাত হয় আজীবন। কিছু মানুষকে আমরা হয়তো প্রথম দেখি একটি নির্দিষ্ট দিনে, একটি নির্দিষ্ট স্থানে; কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্ব আমাদের চিন্তার ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করে যে, পরবর্তী জীবন আর আগের মতো থাকে না। মীর কাসেম আলীর জীবনেও এসেছিল তেমন কিছু সন্ধিক্ষণ।
১৯৬৬ সালে তিনি যুক্ত হন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে। তরুণ মীর কাসেমের সামনে তখন খুলে যেতে থাকে এক নতুন চিন্তার জগৎ, যেখানে ব্যক্তিজীবনের সাফল্যের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজ ও মানুষের কল্যাণের প্রশ্নটিও হয়ে উঠে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন, একটি আদর্শকে ধারণ করা মানে শুধু তা বিশ্বাস করা নয়; বরং সেই বিশ্বাসকে চরিত্রে, আচরণে ও কর্মে রূপ দেওয়া। তবে তার জীবনদর্শনে গভীর ছাপ ফেলেছিল ১৯৬৭ সালের একটি সাক্ষাৎ— শহীদ আবদুল মালেকের সঙ্গে তার পরিচয়।
পরবর্তীকালে তিনি সেই স্মৃতি স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘মালেক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৬৭ সালে। ওই বছরের জুলাই মাসে ঢাকার গুলশানে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কর্মী ভাইয়েরা সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে আমরা কয়েকজন শাখা সভাপতি নাসির ভাইয়ের নেতৃত্বে ঢাকায় যাই। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূর্ণ না থাকলেও বিশেষ অনুমতিতে আমাকে সেই ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।’ একজন তরুণের জন্য সেই যাত্রা ছিল নিছক একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশগ্রহণ নয়। অদৃশ্যভাবে সেটিই যেন হয়ে উঠেছিল তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারোদ্ঘাটন।
সেই রাতের স্মৃতি
ঢাকায় রাত তখন নেমে এসেছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা তরুণ কর্মীদের পদচারণায় শহরের এক প্রান্তে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক আবহ। হাতে সামান্য মালপত্র, কাঁধে বিছানার চাদর, সুবিধা ছিল সীমিত, কিন্তু হৃদয়ের উদ্দীপনার কোনো সীমা ছিল না। রিকশা না পেয়ে তারা হেঁটেই এগিয়ে চললেন ফজলুল হক হলের দিকে। সেই পদযাত্রা আজ কেবল একটি পুরোনো স্মৃতি নয়; এটি যেন এক প্রজন্মের আত্মনিবেদনের প্রতীক। পথ ছিল সাধারণ, কিন্তু পথিকদের স্বপ্ন ছিল অসাধারণ। রাত প্রায় বারোটা। তারা পৌঁছালেন ফজলুল হক হলে। তাদের থাকার ব্যবস্থা হয় ১১২ নম্বর কক্ষে। সেখানেই প্রথম দেখা শহীদ আবদুল মালেকের সঙ্গে।
একজন শান্ত, হাস্যোজ্জ্বল অথচ দৃঢ়চেতা তরুণ তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার ব্যক্তিত্বে ছিল বিনয় ও প্রত্যয়ের এমন এক সমন্বয়, যা প্রথম দর্শনেই হৃদয় স্পর্শ করেছিল। মীর কাসেম আলীর মনে তার চেহারা ও চরিত্রের মধ্যে যেন ভেসে উঠেছিল হজরত বেলাল (রা.)-এর অবিচল ঈমান ও আত্মত্যাগের প্রতিচ্ছবি। কক্ষের দরজায় উৎকীর্ণ দুটি বাণী সেই রাতের পরিবেশকে আরও তাৎপর্যময় করে তুলেছিল। প্রথমটি পবিত্র কুরআনের আহ্বান, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তারাই সফলকাম।’
অন্য বাণীটি ছিল কুরআনকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়-ঘোষণা। সেই বাণীগুলো তরুণ মীর কাসেমের হৃদয়ে যেন নতুন এক আগুন জ্বেলে দিল। আদর্শ তখন আর শুধু চিন্তার বিষয় রইল না; তা হয়ে উঠল জীবনের লক্ষ্য। পরদিন শুরু হলো প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। দায়িত্বে ছিলেন আবদুল মালেক। তার সময়ানুবর্তিতা, কর্মনিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণ তরুণ মীর কাসেমকে গভীরভাবে অভিভূত করেছিল।
রাত গভীর হয়ে গেলে অন্যরা যখন বিশ্রামে যেতেন, মালেক তখনো কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। আবার ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই তিনি সবাইকে জাগিয়ে দিতেন। কখন তিনি বিশ্রাম নিতেন— সেটি যেন কারো জানা ছিল না। একজন তরুণের সামনে তখন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল আদর্শের এক বাস্তব রূপ। মীর কাসেম আলী বুঝতে পেরেছিলেন— মহৎ কোনো স্বপ্ন শুধু বক্তৃতার ভাষায় বেঁচে থাকে না। তাকে জীবন্ত করতে হয় শ্রমে, শৃঙ্খলায়, আত্মসংযমে এবং ত্যাগে। শহীদ আবদুল মালেকের সেই সংস্পর্শ তার মনে যে ছাপ রেখে যায়, তা পরবর্তী দীর্ঘ জীবনের নানা অধ্যায়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
কর্মের মহাকাব্যে এক জীবন
১৯৭৮ সালের অক্টোবরে ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তির পর মীর কাসেম আলী প্রবেশ করেন কর্মজীবনের বিস্তৃত পরিসরে। কিন্তু তার জন্য কর্মজীবন ছিল না নিছক জীবিকা অর্জনের একটি পথ। তিনি কাজকে দেখেছিলেন বৃহত্তর পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। তার মেধা, ব্যবস্থাপনা-দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ এবং দূরদর্শিতা অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে তোলে। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা রাবেতা আলম আল-ইসলামীর বাংলাদেশ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন তরুণের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; কিন্তু মীর কাসেম আলীর কাছে পদমর্যাদার চেয়ে বড় ছিল এর মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ।
দেশের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মসজিদ, মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। বিশেষত দেশের অনুন্নত ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য এসব উদ্যোগ ছিল তার সামাজিক দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। তার চিন্তায় অর্থনীতি ও মানবকল্যাণ ছিল পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনৈতিক শক্তি যদি মানুষের জীবন বদলাতে না পারে, তবে সেই উন্নয়নের পূর্ণতা নেই। এই উপলব্ধিই তাকে ইসলামী অর্থব্যবস্থার সম্ভাবনার দিকে গভীরভাবে মনোযোগী করে তোলে।
ইসলামী ব্যাংকিং : স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা
একসময় ইসলামী ব্যাংকিং ছিল বাংলাদেশের আর্থিকজগতে এক নতুন ও অপরিচিত ধারণা। কিন্তু মীর কাসেম আলী ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন সেই নতুন ধারণার মধ্যে। তিনি বিশ্বাস করতেন, অর্থনীতি শুধু পুঁজি সঞ্চালনের ব্যবস্থা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নৈতিকতা, আস্থা, সামাজিক দায়িত্ব এবং মানুষের মর্যাদা। এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন।
১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হয় এবং ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। মীর কাসেম আলী ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার চিন্তা, শ্রম ও সাংগঠনিক দক্ষতা এই নতুন আর্থিক দর্শনকে বাস্তব কাঠামো দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তার কাছে ব্যাংক ছিল কেবল মুনাফা অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি হতে পারে মানুষের আস্থা তৈরির একটি মাধ্যম, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের একটি দরজা এবং সামাজিক কল্যাণের একটি শক্তিশালী উপকরণ, এই বিশ্বাস তার কর্মপ্রচেষ্টাকে বিশেষ অর্থ দিয়েছিল। ব্যাংকিংয়ের বাইরে চিকিৎসাসেবা, পর্যটন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তার উদ্যোগ ছিল একই বৃহত্তর দর্শনের অংশ। তার লক্ষ্য ছিল এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, যেগুলো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, দক্ষতা বাড়াবে এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে।
মানুষের জন্য, দেশের জন্য
মীর কাসেম আলীর স্বপ্নের বাংলাদেশ ছিল কেবল ইট পাথরের উন্নয়নে নির্মিত কোনো দেশ নয়; তিনি এমন একটি সমাজ কল্পনা করেছিলেন, যেখানে মানুষ শিক্ষা পাবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে জীবন গড়বে। এই কারণে তার কর্মের বিচিত্রতা ছিল আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর। কোথাও তিনি উদ্যোক্তা, কোথাও সংগঠক, কোথাও সমাজসেবী, কোথাও অর্থনৈতিক চিন্তার বাস্তবায়নকারী। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, সব পথ এসে মিলেছে একটি কেন্দ্রে— মানুষের কল্যাণ এবং একটি মর্যাদাশীল জাতি নির্মাণ।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই সমন্বয় করার ক্ষমতা। তিনি স্বপ্নকে প্রতিষ্ঠান দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছেন কর্মী, আর কর্মকে দিয়েছেন একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য। এ কারণেই তার জীবনকে কেবল একজন ব্যক্তির জীবনী বলা কঠিন। এটি এক ধরনের নির্মাণের ইতিহাস, মানুষ নির্মাণ, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ইতিহাস।
শেষ যাত্রার নীরব পদধ্বনি
তারপর এলো সেই রাত। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শনিবার। কারাগারের দেয়ালগুলো তখন নিস্তব্ধ। লোহার দরজা, দীর্ঘ করিডোর আর প্রহরীদের নীরব পদচারণার মধ্যে যেন অদৃশ্য কোনো ভার ঝুলে ছিল। রাত প্রায় সাড়ে ৯টা। কারা কর্তৃপক্ষ তার সেলের সামনে এসে দাঁড়াল। জীবনের শেষ প্রহর এসে গেছে, এ সংবাদ তার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে মুহূর্তের দিকে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেটি যেন তার কাছে আতঙ্কের নয়; বরং বিশ্বাসের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা।
কারা কর্তৃপক্ষ তাকে শেষ প্রস্তুতির জন্য প্রস্তুত করল। এরপর হাতে হাতকড়া পরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আমার হাতে হাতকড়ার প্রয়োজন নেই। আমি এই পবিত্র জিলহজ মাসে আল্লাহর দরবারে নিজেকে সমর্পণ করতে যাচ্ছি।’ তারপর বললেন, ‘আমি নিজ পায়ে হেঁটেই যাব।’
কথাগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত উচ্চারণের মধ্যে যেন লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ জীবনের দৃঢ়তা। তিনি নিজ পায়ে এগিয়ে চললেন। কারাগারের করিডোর তখন নীরব। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সেই নীরবতার বুকের ওপর একটি করে শব্দ লিখে যাচ্ছিল। সামনে মৃত্যুর দরজা, পেছনে ফেলে আসা দীর্ঘ জীবন-সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠান, স্বপ্ন, পরিবার, সহযোদ্ধা এবং অসংখ্য স্মৃতি।
ফাঁসির মঞ্চের পথে তিনি সহবন্দিদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। যারা দীর্ঘদিন তার সঙ্গে কারাগারের প্রাচীরের ভেতরে ছিলেন, তাদের অনেকের চোখে তখন অশ্রু। কিন্তু বিদায়ের সেই মুহূর্তেও মীর কাসেম আলীর কণ্ঠে ছিল আশ্বাস। তিনি বললেন, ‘আপনারা সবসময় ভালো কাজের ওপর অটল থাকবেন। আল্লাহ যদি জান্নাত নসিব করেন, সেখানে আবার আমাদের দেখা হবে।’
এ ছিল পৃথিবীর পথে শেষ বিদায়, কিন্তু তার বিশ্বাসে এটি ছিল বিচ্ছেদ নয়, আখিরাতের পুনর্মিলনের প্রত্যাশা। তিনি কালেমা তাইয়্যেবা ও কালেমা শাহাদাত পাঠ করতে করতে এগিয়ে চললেন। পবিত্র কুরআনের আয়াত উচ্চারণে তার কণ্ঠ যেন ক্রমেই আরও গভীর হয়ে উঠছিল। মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া একজন মানুষের জন্য এটি ছিল এক অসাধারণ দৃশ্য, যেখানে ভয়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল বিশ্বাস।
ফাঁসির মঞ্চে শেষ উচ্চারণ
অবশেষে তিনি পৌঁছালেন সেই স্থানে, যেখান থেকে আর পৃথিবীর পথে ফিরে আসা যায় না। ফাঁসির মঞ্চ তার সামনে। চারপাশে উপস্থিত কর্মকর্তারা। নীরব রাত। সময় এগিয়ে যাচ্ছে তার নির্ধারিত মুহূর্তের দিকে। কিন্তু তার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা। শেষবার কথা বলার সুযোগ পেয়ে তিনি উপস্থিত সবাইকে সালাম জানালেন। তারপর বললেন, ‘এখানে যারা আছেন, সবাইকে আমার সালাম। আজ আমি চলে যাচ্ছি, একদিন আপনারাও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন। সবাইকে আল্লাহর দরবারে এই জীবনের সব কাজের হিসাব দিতে হবে।’
তারপর উচ্চারণ করলেন, ‘একদিন প্রকাশ পাবে আমার ওপর কী করা হয়েছে। আমি আমার বিচার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম। দেশবাসীর প্রতি আমার সালাম।’ এই কয়েকটি বাক্যে যেন মিশে গেল তার জীবনের শেষ আর্তি, বিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং ইতিহাসের কাছে রেখে যাওয়া এক প্রশ্ন। রাত আরও গভীর হলো। সময় তার অমোঘ নিয়মে এগিয়ে চলল। তার ঠোঁটে তখনো আল্লাহর নাম, হৃদয়ে তার রবের প্রতি আস্থা। ফাঁসির রশি যখন তার গলায় পরানো হলো, তখনো তার কণ্ঠে ছিল কালেমার উচ্চারণ। তারপর থেমে গেল কণ্ঠস্বর। নিস্তব্ধ হয়ে গেল কারাগারের রাত। একটি জীবন শেষ হলো।
কিন্তু সত্যিই কি সব শেষ হয়ে গেল? ইতিহাসের উত্তর না।
কারণ কিছু মৃত্যু শরীরের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু চিন্তার নয়। কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যান, কিন্তু তাদের স্বপ্ন থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। কিছু কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়, অথচ তাদের উচ্চারিত প্রশ্ন যুগের পর যুগ ফিরে আসে। মীর কাসেম আলীর জীবন ও মৃত্যুও তেমনই এক প্রশ্ন রেখে গেছে— একজন মানুষ কতটা গভীরভাবে একটি স্বপ্নকে ধারণ করলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তার বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয় না?
তার জীবন আমাদের সামনে রেখে যায় কর্মের শিক্ষা; তার প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার শক্তির কথা; আর তার শেষ যাত্রা মনে করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত শক্তি কখনো কেবল তার দেহে থাকে না, থাকে তার বিশ্বাস, চরিত্র ও আদর্শের গভীরে। একদিন হয়তো সময় তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে আরও নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করবে। তার কর্মের সাফল্য-ব্যর্থতা, তার রাজনৈতিক ভূমিকা, তার প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং তার মৃত্যুর বিচার সবই ইতিহাসের বিচারের বিষয় হয়ে থাকবে। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন। তিনি তার জীবনকে নিছক নিজের জন্য ব্যয় করেননি।
তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। তিনি মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন। তিনি তার বিশ্বাসকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়েই সেই বিশ্বাসের মূল্য পরিশোধ করেছিলেন। ইতিহাসের বিশাল প্রান্তরে তার পদচিহ্ন তাই কেবল একটি নাম নয়; এটি এক স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষের রেখে যাওয়া দীর্ঘ ছায়া।
যে ছায়ার ভেতরে আছে নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা, ত্যাগের দীপ্তি এবং একটি সোনার বাংলার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন হয়তো তার জীবন থেমে যাওয়ার সঙ্গে থেমে যায়নি। যে বাংলাদেশকে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্ব এখন তার আদর্শের উত্তরসূরিদের।