বাংলাদেশকে নিজস্ব কক্ষপথ তৈরি করতে হবে
২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩৫
নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে দিল্লি কি পুরোনো মডেল থেকে বেরোচ্ছে?
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কখনোই কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অবস্থান নয়। বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগের ভৌগোলিক সেতু, চীন-ভারত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রান্ত এবং একইসঙ্গে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার নিম্নপ্রবাহের দেশ- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দিল্লির কাছে একইসঙ্গে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পানি ও ভূরাজনীতির প্রশ্ন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সমীকরণে বড় ধাক্কা লাগে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, ঢাকার পক্ষ থেকে তার প্রত্যর্পণের দাবি, সীমান্তে উত্তেজনা, পানিবণ্টন নিয়ে নতুন করে কঠোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্কের সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস- সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে একটি অনিশ্চিত পর্যায়ে প্রবেশ করে।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি আবার বদলেছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানকে নির্বাচনী বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, দিল্লি সফরের প্রশ্নে ঢাকা এখনো ‘অনুকূল পরিবেশ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। গত ১৬ আগস্ট রোববার বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন; একইসঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হয়ে রয়েছে।
এই অবস্থায় প্রশ্নটি আর কেবল ‘বাংলাদেশ কি ভারতের রাডারে?’- এত সরল নয়। বরং প্রশ্ন হলো- ঢাকাকে দিল্লি কোন ধরনের অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছে এবং ঢাকা নিজেকে কোন ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?
‘অখণ্ড ভারত’- আদর্শ, প্রতীক নাকি ভূরাজনৈতিক সংকেত? : ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণাটি নতুন নয়। এর শিকড় হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক চিন্তায় দীর্ঘদিনের। ধারণাটির বিস্তৃত ব্যাখ্যায় বর্তমান ভারত ছাড়াও বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারসহ উপমহাদেশের বিস্তৃত ভূখণ্ডকে একটি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক একক হিসেবে কল্পনা করা হয়। বিষয়টি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ভারতের নতুন সংসদ ভবনে যে ঐতিহাসিক মানচিত্রের ম্যুরাল স্থাপন করা হয়, সেখানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের ভূখণ্ডও দেখা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, এটি সম্রাট অশোকের আমলের ঐতিহাসিক ভারতের প্রতীক; ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রসীমা পুনর্নির্ধারণের দাবি হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি করতে হবে। ‘অখণ্ড ভারত’ একটি আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা এটিকে ভারতের আনুষ্ঠানিক পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে উপস্থাপন করলে বিশ্লেষণ বিভ্রান্তিকর হবে বলে বিভিন্ন সময় বলা হলেও বাস্তবে এই প্রভাব কোনোভাবেই এড়ানোর মতো থাকছে না। ভারতের সরকারি নীতির ঘোষিত কাঠামো ‘প্রতিবেশী আগে’ ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ এবং আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে বলে দাবি করা হয়। ভারতীয় সরকারি নথিতেও বাংলাদেশকে প্রতিবেশী নীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়।
একটি দেশের সরকারি নীতি একরকম হলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের আদর্শিক বয়ান প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্বে ভিন্ন বার্তা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্রে ‘অখণ্ড ভারত’ শব্দবন্ধ তাই কেবল ইতিহাসের আলোচনা নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও হয়ে ওঠে।
সুতরাং দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো- ভারতের সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক বয়ান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করার বাস্তব ভয় তাদের কাজের মাধ্যমে দূর করা।
শেখ হাসিনা প্রশ্ন : সম্পর্কের মাঝখানে সবচেয়ে বড় পাথর
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুরোধটি তারা গ্রহণ করেছে এবং নিজস্ব আইনি কাঠামোর অধীনে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
এই প্রশ্নটি কেবল একটি ব্যক্তিকে ঘিরে আইনি বিরোধ নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে দিল্লির দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও জটিল। দীর্ঘসময় ধরে শেখ হাসিনা সরকার ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও অনুগত অংশীদার ছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বন্দর ও ট্রানজিটÑ বহু ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা দিল্লির চাওয়া অনুসারে পরিপালিত হয়েছিল।
তাই দিল্লির জন্য শেখ হাসিনা প্রশ্নের সমাধান শুধু আইনি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অতীতের সম্পর্ক, নিরাপত্তা স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ এমনকি তাদের অখণ্ড ভারতের আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের প্রশ্নটিও।
এই কারণেই তারেক রহমানের ভারত সফরও সাধারণ সৌজন্য সফর হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এটি হতে পারে একটি নতুন ‘রিলেশনশিপ রিসেট’-এর পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারো আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রকল্প।
দিল্লি কি পুরোনো মডেল থেকে বেরোচ্ছে?
ভারতের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটাইÑ একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আর একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এক জিনিস নয়। ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর দিল্লির সামনে সেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর ভারতকে এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের বিজয়কে স্বাগত জানানো এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার বার্তা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। কিন্তু এই বার্তায় আওয়ামী লীগ থেকে যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য স্থানে। এখানে ভারতের সামনে পাঁচটি স্বার্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, নিরাপত্তা : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত। বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত না হওয়া দিল্লির মৌলিক নিরাপত্তা স্বার্থ। এ স্বার্থ পূরণে দিল্লি ডিফেক্টো ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
দ্বিতীয়ত, যোগাযোগ : বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পরিবহন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপথের প্রটোকল ইতোমধ্যে কলকাতা, হলদিয়া, মোংলা ও চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করছে এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরি করেছে।
তৃতীয়ত, বঙ্গোপসাগর : চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ হলেও এগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব ভারত, চীন ও অন্য আঞ্চলিক শক্তির কাছেও বাড়ছে। ভারত এর ওপর দিল্লির একতরফা নিয়ন্ত্রণ চাইছে।
চতুর্থত, অর্থনীতি : বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বড় বাজার এবং একইসঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগের সম্ভাব্য কেন্দ্র।
পঞ্চমত, চীনের প্রভাব : বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক উপস্থিতি ভারতের কৌশলগত হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক চাইবে- কিন্তু সেই সম্পর্কের ধরন কী হবে- বন্ধুত্বপূর্ণ নাকি অনুগত, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
পানি : বন্ধুত্বের পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন জায়গা
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোর একটি পানি। দুই দেশ ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে। কিন্তু ২০২৬ সাল এসে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যানুযায়ী, চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে।
এটি নিছক একটি পুরোনো চুক্তির নবায়ন নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষির ওপর চাপ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন- সবকিছু মিলিয়ে নতুন চুক্তির কাঠামো আগের চেয়ে জটিল।
ভারতের সরকার-সমর্থিত Indian Council of World Affairs (ICWA)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের চুক্তি যে পুরোনো জলপ্রবাহের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। ফলে নতুন কাঠামোয় ভবিষ্যৎ জলবায়ু ও জলপ্রবাহের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এটি বাংলাদেশ যে চুক্তিটিতে বাংলাদেশ গ্যারান্টি ক্লজ এর সংযুক্তি চাইছে তা পূরণ নয়, বরং এই অভিন্ন নদীর পানি ভারতের আরো বেশি ধরে রাখার চুক্তিবদ্ধ একটি ব্যবস্থার চাওয়া।
বাংলাদেশের জন্য তাই নতুন চুক্তির প্রশ্নটি শুধু কূটনীতি নয়- কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। আর এখানেই তিস্তা আবার সামনে আসে।
২০১১ সালে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে তিস্তা চুক্তি আটকে যায়। পশ্চিমবঙ্গের আপত্তি এর অন্যতম বড় কারণ। কিন্তু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকা তিস্তার পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিস্তা প্রশ্নে বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি পথ- দিল্লির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা অথবা বহুপাক্ষিক ও আন্তর্জাতিক কারিগরি সহযোগিতায় নদী ব্যবস্থাপনার বিকল্প কাঠামো তৈরি।
দ্বিতীয় পথটি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে; বিশেষ করে যদি চীন বড় ভূমিকা নেয়। ভারত তাতে বাধা দিয়ে এই প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে চায়।
সীমান্ত : নিরাপত্তা বনাম মানবাধিকার
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গভীর ক্ষত সীমান্ত। ভারত নিরাপত্তা, চোরাচালান, মাদক, মানব পাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধকে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশও সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে চায়। কিন্তু সীমান্তে বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের জুনে বিএসএফ ও বিজিবির ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে সমন্বিত টহল, তথ্য বিনিময় ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে নিরাপত্তা সহযোগিতা আর সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। ঢাকার জন্য এখন ‘শূন্য সীমান্ত হত্যা’ কেবল কূটনৈতিক আলোচনার একটি পয়েন্ট নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।
দিল্লির জন্যও বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশের জনমনে সীমান্ত হত্যার ছবি যত বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, ততই ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ান শক্তিশালী হবে।
বন্দর ও ট্রানজিট : যেখানে দুই দেশের স্বার্থ একসঙ্গে জড়িত
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত-বাংলাদেশ নৌ প্রটোকল রুটের মোট দৈর্ঘ্য ২,৬৬০ কিলোমিটার; এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ ১,৭৯২ কিলোমিটার। এই রুট কলকাতা-হলদিয়া থেকে মোংলা ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করেছে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথ সৃষ্টি করেছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো- ট্রানজিট কি শুধু ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধা দেবে, নাকি বাংলাদেশও এর যথাযথ আর্থিক ও অবকাঠামোগত সুফল পাবে?
নতুন ঢাকা যদি ‘সমতার ভিত্তিতে সংযোগ’ নীতি গ্রহণ করে, তাহলে ট্রানজিট হবে পারস্পরিক লাভের ব্যবস্থা। কিন্তু ভারতের নেতৃত্বে চাওয়া হলো একতরফা সুবিধার ধারণা তৈরি। এটি হলে তা রাজনৈতিকভাবে টেকসই হবে না। বাংলাদেশ তাতে সম্মতিও জানাতে পারবে না।
চীন-পাকিস্তান : দিল্লির হিসাবের অদৃশ্য অঙ্ক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন বাস্তবতায় চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও দিল্লির হিসাবকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ যদি চট্টগ্রাম, মোংলা, তিস্তা অববাহিকা, শিল্পাঞ্চল ও অবকাঠামোয় চীনা বিনিয়োগ বাড়ায়, ভারত সেটিকে শুধু অর্থনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখবে না; এর কৌশলগত অভিঘাতও বিবেচনা করবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও ২০২৪-পরবর্তী সময়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ঢাকার জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- চীনকে ব্যবহার করে ভারতকে চাপ দেওয়া কিংবা ভারতকে ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে দরকষাকষি- দুটিই স্বল্পমেয়াদি কৌশল।
বাংলাদেশের জন্য টেকসই পথ হলো ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’- ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক। অর্থাৎ কারো শিবিরে যোগ দেওয়া নয়; বরং সবার সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা। দিল্লি বাংলাদেশে সেটি বাস্তবায়িত হতে দিতে চাইছে না।
নরম কূটনীতি : মানুষের মন জয়ের প্রতিযোগিতা
রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়ে তৈরি হয় না। ভিসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও মানুষের যাতায়াতও সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ভিসা, শিক্ষার্থী যাতায়াত এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগে ভারতের গুরুত্ব রয়েছে। আবার ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও যোগাযোগের ক্ষেত্র। তাই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ‘People-to-people diplomacy’ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভারত যদি বাংলাদেশে তার ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতে চায়, তাহলে শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ যথেষ্ট নয়। সীমান্তে প্রাণহানি কমানো, বাণিজ্য বাধা কমানো, ভিসা সহজ করা এবং পানির প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি- এসবই হবে প্রকৃত নরম শক্তি। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সব ক্ষেত্রে ভারত অনুগত নীতি গ্রহণ করার বিষয়ে সর্বাত্মক চাপের কারণে।
বাংলাদেশের জন্য পাঁচটি কূটনৈতিক অগ্রাধিকার
নতুন বাস্তবতায় ঢাকার সামনে পাঁচটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট।
এক. সম্পর্কের রাজনৈতিকীকরণ কমানো। কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু কোনভাবেই আগের মতো অনুগত সম্পর্ক নয়, সম মর্যাদার সম্পর্ক।
দুই. পানি কূটনীতিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া : গঙ্গা চুক্তির নবায়নকে তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পানির ন্যায্য অংশ নিশ্চিত না হলে চীনা বিনিয়োগে অববাহিতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
তিন. সংযোগের বিনিময়ে প্রতিদান নিশ্চিত করা : ট্রানজিট, বন্দর ও রেলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক মূল্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেটি শেখ হাসিনা অন্যায্যভাবে বিসর্জন দিয়েছিলেন।
চার. সীমান্তে মানবিক নিরাপত্তা : ‘শূন্য সীমান্ত হত্যা’কে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রীয় শর্তে পরিণত করা দরকার। শুধু শর্ত নয়, তা চীন-পাকিস্তান সীমান্তের মতো বাস্তবে পরিণত করা।
পাঁচ. বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি : ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যেমন প্রয়োজন, তেমনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক জরুরি। এক্ষেত্রে দিল্লির যেকোনো বাধাকে আমলযোগ্য নয় বলে বিবেচনা করা।
শেষ কথা : রাডারে থাকা নয়, নিজের কক্ষপথ তৈরি করা
বাংলাদেশ আবার দিল্লির রাডারে এসেছে- এ কথাটি মোটেই অতিরঞ্জিত নয়। বরং ভূগোল, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ভারতের কৌশলগত হিসাবের বাইরে যাওয়ার সুযোগও নেই। কিন্তু ‘রাডারে থাকা’ এবং ‘রাডার দ্বারা পরিচালিত হওয়া’ এক বিষয় নয়।
২০২৬ সালের বাংলাদেশ সেই পার্থক্যটিই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তিনটি বিষয়- পারস্পরিক সম্মান, স্বার্থের ভারসাম্য এবং বাস্তব ফলাফল।
শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য দিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব নয়। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, তিস্তা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য বৈষম্য এবং ট্রানজিট প্রতিটি ইস্যুতেই দৃশ্যমান সমাধান প্রয়োজন।
অন্যদিকে ঢাকারও উপলব্ধি করতে হবে, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক স্বার্থে আসতে পারে। তবে সহযোগিতা আর নির্ভরতা এক নয়।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক, কিন্তু ভারতের ওপর একক নির্ভরতা নয়। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা, কিন্তু একক নির্ভরতা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, কিন্তু সামরিক জোটে আবদ্ধতা নয়। ওআইসির শীর্ষ দেশগুলোর সাথে কৌশলগত ও নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করা- যাতে সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত হলে কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায়। এই ভারসাম্যই হবে বাংলাদেশের প্রকৃত কূটনৈতিক শক্তি।
‘অখণ্ড ভারত’ নিয়ে আদর্শিক বিতর্ক যতই চলুক, ২১ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা হলো- রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা স্বার্থ নিয়েই এগোবে। বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে অন্যের কৌশলের উপাদান না বানিয়ে নিজস্ব কৌশলের সম্পদে পরিণত করা।
দিল্লি বাংলাদেশকে তার রাডারে রাখতে চাইতে পারেই। কিন্তু ঢাকার লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও বড়- কোনো একটি দেশের রাডারে আটকে থাকা নয়; বরং এমন একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করা, যেখানে বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থই তার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ‘প্রভাবশালী প্রতিবেশী ও ছোট প্রতিবেশী’র পুরোনো কাঠামো পেরিয়ে সমতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং দরকষাকষির সক্ষমতার নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারবে।
আর ২০২৬ সালের ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অর্জন হবে- দিল্লির রাডারে থাকা নয়, নিজের কক্ষপথ নিজে নির্ধারণ করতে পারা।