বাজেট অধিবেশন পর্ব শেষ : জনগণের প্রত্যাশার গণভোট সরকারের উপেক্ষা


১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:২৭

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
প্রায় ২ হাজার জুলাইযোদ্ধা এবং দীর্ঘ ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আক্রোশের শিকার অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশ পর্ব গত ৩০ জুন মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। এটি ছিলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। দুঃখজনক ও নির্মম সত্য হলো, বাজেট পর্ব শেষে গুরত্বপূর্ণ আরো কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিতীয় অধিবেশনের সময় বেড়েছে। একটি ন্যায্য দাবি সরকারি দল অগ্রাহ্য করায় বিরোধীদলের ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। এবারের ৫ আগস্ট হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার তৃতীয় বর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু জুলাই চেতনা বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার এখনো উপেক্ষিত। রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে সরকার টালবাহানা করছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এর নেতৃত্বাধীন এনসিপি ও অন্যান্য দল থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও বিএনপি ও তাদের শরিকরা বিষয়টি নিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তারা ১৭ সদস্যের কমিটির কথা বলছে। পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। এ বিশেষ কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। কমিটির সদস্যরা হলেন- বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদিন, মীর হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক নূর এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলিউল্লাহ। এর প্রতিবাদে প্রধান বিরোধীদলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সর্বমোট ৫ বার ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বাজেট অধিবেশনে দুবার।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট অধিবেশন ছিলো প্রাণবন্ত। দীর্ঘ প্রায় দুুই দশক পর দেশবাসী একটি কার্যকর এবং প্রাণবন্ত জাতীয় সংসদের দেখা পেয়েছে। সদ্যসমাপ্ত বাজেট অধিবেশন পর্বের দিকে একঝলক নজর দেয়া যাক।
একঝলকে বাজেট অধিবেশন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয় ২০২৬ সালের ৭ জুন। এরপর অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট পেশ করেন। তিন সপ্তাহের বিস্তারিত আলোচনা-সমালোচনা শেষে গত ৩০ জুন মঙ্গলবার কণ্ঠভোটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই মূল বাজেটটি চূড়ান্তভাবে পাস হয়। এর আগের দিন ২৯ জুন অর্থবিল পাস করা হয়। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে।
প্রায় ৪৬ ঘণ্টার বাজেট আলোচনায় অংশ নেন ২৯১ জন সংসদ সদস্য : বাসস সূত্রে প্রকাশ, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত সাধারণ আলোচনায় মোট ২৯১ জন সদস্য অংশ নেন। আলোচনা চলে মোট ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাজেটের ওপর মোট ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনায় ২৯১ জন সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তিনি জানান, সরকারি দলের ২০০ জন সদস্য মোট ৩২ ঘণ্টা ৩ মিনিট বক্তব্য দেন। অন্যদিকে বিরোধীদলের ৯১ জন সদস্য মোট ১৩ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট আলোচনায় অংশ নেন। বাজেট পাসের পর টানা ছয় দিনের বিরতি শেষে ৭ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সংসদের বৈঠক পুনরায় বসে। সরকারি ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনা শেষে জাতীয় সংসদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পাস করে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সরকারি দলের ১৮ জন এবং বিরোধীদলের ৭ জনসহ মোট ২৫ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এ আলোচনা হয় ৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট স্থায়ী হয়। বাজেট ও সম্পূরক উভয় বাজেট আলোচনায় মোট ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। দুই আলোচনার মোট ব্যাপ্তি ছিল ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট।
প্রশ্নোত্তর পর্ব : অধিবেশন চলাকালীন সংসদ সদস্যদের জন্য মোট ৩,২২৮টি প্রশ্ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ১৯১টি এবং অন্য মন্ত্রীদের কাছে ৩,০৩৯টি প্রশ্ন করা হয়।
৬৪টি সংশোধনী : বাজেট বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি হিসেবে এর আগের দিন, অর্থাৎ ২৯ জুন জাতীয় সংসদে ৬৪টি সংশোধনীর মাধ্যমে ‘অর্থবিল ২০২৬’ পাস করা হয়।
প্রধান প্রধান সংশোধনী ও পরিবর্তনগুলো হলো
১. কর ও রাজস্ব খাতের প্রধান সংশোধনীসমূহ করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি : নিম্নআয়ের করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সাথে এটি আগামী ৫ বছরের একটি মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরবর্তী বছরগুলোয় যথাক্রমে ৪.৫ লাখ এবং ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
২. কালো টাকা সাদা করার সুবিধা বাতিল : প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে ৩০% কর ও জরিমানা দিয়ে দলিলমূল্যের বাইরে থাকা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জনমতকে সম্মান জানিয়ে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাব বাতিলের অনুরোধ করায় ২৯ জুন সংশোধিত অথ বিল ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সম্পত্তি লেনদেনভিত্তিক এই বিশেষ কর-সুবিধা বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগটি আইনগতভাবে বাদ দেওয়া হয়।
৩. পরোক্ষ কর ও ভ্যাট সমন্বয় : বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ওপর প্রস্তাবিত ভ্যাট বা শুল্ক হারের কিছুটা সংশোধন করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
৪. করমুক্ত আয়সীমা হচ্ছে ৪ লাখ টাকা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেটে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (যা আগে ৩.৫ লাখ টাকা ছিল)। এর পাশাপাশি নারী, প্রবীণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের জন্য এই সীমা আরও বেশি রাখা হয়েছে।
৫. মুদি দোকানের কর প্রত্যাহার : প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে মুদি দোকানের ওপর আরোপিত করের প্রস্তাব তুলে নেওয়া হয়েছে।
৬. ব্যাংক লুটেরাদের মালিকানা নীতি বাতিল : ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনের একটি বিতর্কিত বিধানের মাধ্যমে ব্যাংক লুটেরাদের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার যে সুযোগ তৈরি হচ্ছিল, অর্থমন্ত্রী তা বাদ দিয়েছেন।
৭. করছাড় এবং নতুন কর ধাপ : করছাড় এবং নতুন কর ধাপের (Tax Slabs) মূল তথ্যগুলো হলো : নতুন করমুক্ত আয় সীমাসাধারণ করদাতা: ৪,০০,০০০ টাকা।
নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ : ৪,৫০,০০০ টাকা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি: ৫,০০,০০০ টাকা। গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা : ৫,৭৫,০০০ টাকা। নতুন আয়কর হার (Tax Slabs) করমুক্ত সীমা অতিক্রম করার পর আয়ের ওপর ক্রমান্বয়ে ৫% থেকে সর্বোচ্চ ৩০% পর্যন্ত কর ধার্য করা হয়েছে: প্রথম ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত : ০% (কোনো কর নেই) পরবর্তী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত: ৫% পরবর্তী ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত : ১০% পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত: ১৫% পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত: ২০% পরবর্তী ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত: ২৫% অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর : ৩০% এই নতুন কর কাঠামোর ফলে মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী শ্রেণির ভোক্তাদের হাতে ব্যয়যোগ্য আয় (Disposable Income) কিছুটা বাড়বে, যা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
৮. ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা : বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ। বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
৯. সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের তালিকায় অর্থ বিভাগ : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামগ্রিক অর্থ বিভাগকেই (Finance Division) সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পদ্ধতিগতভাবে অর্থ বিভাগের এই বিশাল বরাদ্দের বড় অংশটি সরাসরি নিজস্ব পরিচালন ব্যয়ের জন্য নয়, বরং সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতের ভর্তুকির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আর্থিক দায় মেটাতে বরাদ্দ রাখা হয়। তবে সাধারণ খাত বা উন্নয়নভিত্তিক মন্ত্রণালয়গুলোর বরাদ্দের তুলনা করলে চিত্রটি অন্যরকম হবে।
বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, ‘জনগণ জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে একটি দূরদর্শী ও জনবান্ধব বাজেট প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু ঘোষিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা নেই।’ এছাড়া কর প্রশাসন ও দুর্নীতি দমনে কোনো দৃশ্যমান সংস্কারের প্রতিফলন এই বাজেটে দেখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যদি এই বিশাল সরকারি ব্যয় কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে না পারে, তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া এই ব্যয় উল্টো মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে’। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক হলেও, তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে তিনি বড় ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং আইসিটি খাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণায় শিক্ষিত তরুণদের মাঝে কিছুটা আশা দেখা গেছে। তবে তারা কেবল কাগুজে ঘোষণা না রেখে দ্রুত এর বাস্তব রূপায়ণ ও মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাজেট অধিবেশেনে রাষ্ট্র সংস্কারের বাধা দূর না হওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অপরিহার্য গণভোটকে সরকার উপেক্ষা করায় ছাত্র-জনতা; বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া তরুণদের মনে ক্ষোভের আগুন তীব্রতর হচ্ছে।