কোন পথে বাংলাদেশ
১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:১৪
॥ ফারাহ মাসুম ॥
সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সংসদে বিরোধী জোটের দাবি চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সংবিধান নিয়ে বিতর্ক আর কেবল আইনজ্ঞ বা রাজনৈতিক নেতাদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি যেমন জোরালো হয়েছে, তেমনি নতুন করে সামনে এসেছে সংবিধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন। বিদ্যমান সংবিধানে কিছু সংশোধন করেই কি কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনা সম্ভব, নাকি রাষ্ট্রের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে একটি বিস্তৃত সাংবিধানিক সংস্কার; এমনকি নতুন সংবিধান প্রয়োজন? এই বিতর্কের উত্তর সহজ নয়। কারণ সংবিধান কেবল একটি আইনি দলিল নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন, ক্ষমতার বণ্টন, নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি। ফলে সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্ন মূলত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণের প্রশ্ন।
সংবিধান : রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি : আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সংবিধানকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সর্বোচ্চ সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস, সরকারের কাঠামো, মৌলিক অধিকার, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়। একটি কার্যকর সংবিধান কেবল সরকার গঠনের নিয়ম নির্ধারণ করে না; এটি সরকারের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধও করে।
বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর প্রণীত হয়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে এটি রচিত হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পালাবদলের কারণে সংবিধান একাধিকবার পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়।
আজকের বিতর্ক তাই কেবল নতুন কোনো ধারণা নয়; বরং পাঁচ দশকের সাংবিধানিক অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক পরিণতি।
সংস্কার ও সংশোধন : দুটি ভিন্ন ধারণা : জনপরিসরে দুটি শব্দ প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
সংবিধান সংশোধন হলো বিদ্যমান সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ বা বিধান পরিবর্তন, সংযোজন অথবা বর্জন। এতে সংবিধানের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে। সংসদ নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন আনে।
অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার অনেক বিস্তৃত ধারণা। এটি কেবল কয়েকটি ধারা সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, নির্বাহী-আইনসভা-বিচার বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার এবং জবাবদিহির কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সংস্কার নতুন সংবিধান প্রণয়নের পথও খুলে দেয়।
অর্থাৎ সংশোধন হলো অস্ত্রোপচার, আর সংস্কার অনেক সময় পুরো চিকিৎসা-পদ্ধতির পুনর্গঠন।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিবর্তন : বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি সংশোধনী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা ও একদলীয় ব্যবস্থা চালু হয়। পরে সামরিক শাসনের সময় পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক ফরমানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত হয় এবং পঞ্চদশ সংশোধনী দিয়ে পরবর্তীতে তা বিলুপ্ত হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আবার সংবিধানের মৌলিক কিছু প্রশ্নে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে; বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে।
এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাংবিধানিক পরিবর্তন জাতীয় ঐকমত্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে সংবিধান অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত হয়েছে।
কেন এখন সংস্কারের দাবি?
বর্তমান সাংবিধানিক বিতর্কের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রভাবিত করে আসছে। প্রথমত, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সমালোচকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তার, সংসদে কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা এবং কার্যকর বিরোধীদলের সীমিত ভূমিকার কারণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রত্যাশিত ভারসাম্য ও পারস্পরিক জবাবদিহি দুর্বল হয়েছে। ফলে সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়েছে।
তৃতীয়ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন মহল থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।
চতুর্থত, সংবিধানে স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব স্বীকৃত হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশিত স্বায়ত্তশাসন ও কার্যকারিতা অর্জন করতে পারেনি।
এসব কারণেই অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত সংশোধনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত সাংবিধানিক সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।
সংস্কারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র
বর্তমান সাংবিধানিক বিতর্কে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারকে আরও কার্যকর করার সঙ্গে সম্পর্কিত। আলোচনায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসÑ যাতে নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায়। একইসঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও স্বাধীন, সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করার প্রস্তাবও গুরুত্ব পাচ্ছেÑ যাতে তারা সরকারের কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি করতে পারে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত অর্থে বিকেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা প্রদান, মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষা আরও জোরদার করা এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতার ওপর কার্যকর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাবও আলোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় জনপরামর্শ, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দাবিও জোরালো হয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কেবল আইনি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য, আন্তঃদলীয় সংলাপ এবং জনগণের আস্থা। কারণ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া কোনো সাংবিধানিক সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ও টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সংশোধনের পক্ষে যুক্তি
তবে সবাই যে বৃহৎ পরিসরের সাংবিধানিক সংস্কার বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে, তা নয়। অনেক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের দৃষ্টিতে সমস্যার মূল উৎস সংবিধানের ভাষা বা কাঠামো নয়; বরং এর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা। অর্থাৎ ভালো সংবিধানও কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না।
এ মতের সমর্থকরা মনে করেন, সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা মৌলিক পুনর্লিখনের উদ্যোগ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে, পাশাপাশি বিদ্যমান বিচারিক ব্যাখ্যা, সাংবিধানিক নজির এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে জটিল করে তুলতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আইনি ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাদের যুক্তি হলো, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক নীতিগুলো অক্ষুণ্ন রেখে যেসব ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা রয়েছে, সেসব বিষয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সংশোধনই অধিক কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ সংবিধানকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে রচনার পরিবর্তে সময়োপযোগী সংশোধনের মাধ্যমে এর দুর্বলতা দূর করা এবং একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করাই হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই পথ।
নতুন সংবিধানের পক্ষে যুক্তি
অন্যদিকে নতুন সংবিধানের সমর্থকদের যুক্তি হলো, গত পাঁচ দশকে ধারাবাহিক সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের ফলে বাংলাদেশের সংবিধান তার মূল রাজনৈতিক দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের অনেকটাই হারিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল কয়েকটি অনুচ্ছেদের সমস্যা নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার বণ্টন এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সীমিত সংশোধনের পরিবর্তে একটি নতুন সাংবিধানিক বন্দোবস্তের প্রয়োজন হতে পারে।
এ মতের সমর্থকরা মনে করেন, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি গণপরিষদ বা অনুরূপ প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে সংবিধানের প্রতি জনগণের মালিকানাবোধ ও আস্থা বাড়বে, রাজনৈতিক বৈধতা শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে এ প্রস্তাবের বাস্তবায়ন সহজ নয়। নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর প্রয়োজন। যেমন- এই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি কী হবে, কে বা কোন প্রতিষ্ঠান এটি পরিচালনা করবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কীভাবে বিস্তৃত ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে এবং পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় রাখা হবে। এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান ছাড়া নতুন সংবিধানও নতুন বিতর্ক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে।
নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে গণপরিষদ গঠনের আদেশ গণভোটে পাস হয়েছিল, তা কার্যকর করা হয়নি। এখন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কার কিছুটা সম্ভব হলেও নতুন সংবিধান প্রণয়ন বেশি বাস্তব সম্মত মনে হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে সাংবিধানিক পরিবর্তনের কোনো একক বা সর্বজনগ্রাহ্য মডেল নেই। প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধানকে সংস্কার বা সংশোধন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ১৭৮৭ সালের সংবিধান বহাল রেখে সীমিতসংখ্যক সংশোধনীর মাধ্যমে সময়ের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে ভারত স্বাধীনতার পর শতাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে আধুনিক ও কার্যকর রেখেছে, তবে এর মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘মৌলিক কাঠামোতত্ত্ব’ প্রবর্তন করে স্পষ্ট করেছে যে, সংসদের সংশোধন ক্ষমতারও সাংবিধানিক সীমা রয়েছে এবং সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যাবে না।
অপরদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদ-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান গ্রহণ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। নেপালও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, রাজতন্ত্রের অবসান এবং নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। এসব উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয় হলোÑ সফল সাংবিধানিক পরিবর্তন নির্ভর করে কেবল সংশোধন বা নতুন সংবিধানের ওপর নয়; বরং রাজনৈতিক ঐকমত্য, অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের ওপর। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পথ খুঁজে নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশে সংবিধান প্রশ্নটি কেবল একটি আইনগত বা সাংবিধানিক বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বা প্রধান অংশীজনদের অংশগ্রহণ ব্যতীত গৃহীত সাংবিধানিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। বরং ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সংশোধনী নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং সংবিধানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হয়েছে। ফলে সংবিধানকে জাতীয় ঐকমত্যের দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ কারণে সংবিধান নিয়ে যেকোনো উদ্যোগের ভিত্তি হতে হবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। এতে সরকার ও বিরোধীদলসহ সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, গণমাধ্যম এবং তরুণ প্রজন্মের মতামত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করে সেগুলোর ওপর উন্মুক্ত আলোচনা ও জনপরামর্শের ব্যবস্থা করা হলে প্রক্রিয়াটি আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং পরিবর্তন বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও ধাপে ধাপে রূপান্তর পরিকল্পনা প্রণয়ন করাও জরুরি। এতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
অন্যথায় সংবিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ যদি একপক্ষীয় বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, তবে তা জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক বিভাজন, অবিশ্বাস এবং সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই সংবিধানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তনের পরিধি নয়; বরং সেই পরিবর্তন কতটা অংশগ্রহণমূলক, বৈধ, স্বচ্ছ এবং সর্বজনগ্রাহ্য- সেটিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য নির্ধারক হবে।
রাজনীতি কি রাজপথের সংঘাতে গড়াতে পারে?
সংবিধান সংস্কার বনাম সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্ক কেবল একটি আইনি বা একাডেমিক আলোচনা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, ক্ষমতার কাঠামো এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে এ প্রশ্নে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এই বিতর্ক অবশ্যম্ভাবীভাবে রাজপথের সংঘাতে রূপ নেবেÑ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই।
সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ে তখনই, যখন প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপের পরিবর্তে অনাস্থা, একতরফা সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রাধান্য পায়। যদি কোনো পক্ষ মনে করে যে, সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নিয়ম একতরফাভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে বা তাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে, তাহলে তারা সংসদের বাইরে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় সাংবিধানিক প্রশ্নÑ যেমন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু প্রায়ই তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বর্তমান বিতর্ককেও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
অন্যদিকে সংঘাত এড়ানোর সুযোগও রয়েছে। যদি সংস্কার বা সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে মতপার্থক্য রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণ একটি গ্রহণযোগ্য ঐকমত্য গঠনে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংবিধানকে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তির প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্যের দলিল হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ সাংবিধানিক প্রশ্নে টেকসই সমাধান কখনোই কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আসে না; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক বৈধতা, পারস্পরিক আস্থা এবং জনগণের গ্রহণযোগ্যতা। তাই রাজপথের সংঘাতের সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংলাপ, সমঝোতা ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়াকে কতটা গুরুত্ব দেয়, তার ওপর।
কোন পথে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের সামনে সাংবিধানিক প্রশ্নে বাস্তবসম্মত পথ সম্ভবত কেবল ‘সংস্কার’ বনাম ‘সংশোধন’- এই দ্বৈত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হলো- বিদ্যমান সংবিধানের কোন ত্রুটিগুলো সাধারণ সংশোধনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব এবং কোন সমস্যাগুলো সমাধানে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। অর্থাৎ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত পরিবর্তনের ধরন নয়, বরং পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা।
গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সংবিধানের একাধিক সংশোধন সত্ত্বেও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি। যদি এসব সমস্যা বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব হয়, তবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পথই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত বিকল্প। এতে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকিও কম হবে।
অন্যদিকে যদি দেখা যায় যে বিদ্যমান কাঠামো নিজেই ক্ষমতার ভারসাম্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলে কেবল বিচ্ছিন্ন সংশোধন যথেষ্ট হবে না। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠবে।
তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, তার ভিত্তি হতে হবে জাতীয় ঐকমত্য, অংশগ্রহণমূলক সংলাপ, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং জনগণের আস্থা। সংবিধান কোনো রাজনৈতিক দলের দলিল নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার মৌলিক সামাজিক চুক্তি। তাই এর পরিবর্তনও হতে হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে সংবিধানে কতটি ধারা পরিবর্তন হলো, তা নয়; বরং পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় কার্যকর হলো- সেই বাস্তব ফলাফলই হবে প্রকৃত মানদণ্ড।
শেষ কথা
সংবিধান কোনো সরকারের নয়; এটি রাষ্ট্রের। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহারও নয়; বরং জনগণের সম্মিলিত আকাক্সক্ষার সাংবিধানিক প্রকাশ। তাই সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘বৈধতা, অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় ঐকমত্য’।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কেবল সংবিধানে কতটি ধারা পরিবর্তিত হলো, তার ওপর নয়; বরং সেই পরিবর্তন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা জবাবদিহিমূলক, ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ এবং নাগরিক অধিকারসম্মত করে তুলতে পারল, তার ওপর। সংবিধান তখনই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করবে, যখন তা ক্ষমতার দলিল নয়, জনগণের আস্থার দলিলে পরিণত হবে। সরকার এ বিষয়টি সময় থাকতে উপলব্ধি করতে না পারলে রাষ্ট্র বড় ধরনের অস্থিরতার মুখোমখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।